সব সময় কাজের জন্য প্রস্তুত কর্মীবাহিনী
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি তিনজন কর্মীর মধ্যে দুজন গত এক বছরে অফিস সময়ের বাইরে কাজসংক্রান্ত ফোন বা বার্তা পেয়েছেন। ১৯ বছর বা তার বেশি বয়সী ১,০০০ দক্ষিণ কোরীয়কে নিয়ে গ্লোবাল রিসার্চের করা ওই জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৬৬ শতাংশ অন্তত একবার কাজ শেষে কিংবা সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনে ঊর্ধ্বতনদের কাছ থেকে যোগাযোগ পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান এমন এক দেশের ক্রমবর্ধমান সংকট তুলে ধরে, যেখানে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে পড়েছে; কর্মীরা সারাক্ষণ ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন এবং কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সূচিপত্র
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত সময়েও এই অনুপ্রবেশ গভীরভাবে বিস্তৃত। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তাদের প্রায় ৩১ শতাংশ রাত ১০টার পর বার্তা পেয়েছেন; আর ৪৫ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, যোগাযোগের বিষয়টি তাদের কাছে জরুরি বলে মনে হয়নি। অনেক অনুরোধ জরুরি না হলেও সাড়া দেওয়ার হার বেশি। যোগাযোগ পেলে ৩০.৫ শতাংশ কর্মী দূর থেকে সঙ্গে সঙ্গেই অনুরোধটি পূরণ করেছেন, আর ৬০.৬ শতাংশ পরবর্তী কর্মদিবসে বিষয়টি সামলেছেন। মাত্র ৮.৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো সাড়াই দেননি।
শ্রমিক অধিকার সংগঠন ওয়ার্কপ্লেস গাপজিল ১১৯-এর আইনজীবী জুং সো-ইয়ন এই সার্বক্ষণিক সংযুক্ত থাকার মানবিক মূল্য তুলে ধরেছেন।
সার্বক্ষণিক যোগাযোগের কারণে ক্লান্তিতে ভোগার অভিযোগ জানানো কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। জরুরিভিত্তিতে আইনি সুরক্ষা দরকার।
যোগাযোগের হার ও ধরন
১ অক্টোবর থেকে ১৪ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালিত গ্লোবাল রিসার্চের জরিপে কর্মঘণ্টার পর যোগাযোগের হার বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উত্তরদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ২১.২ শতাংশ, জানিয়েছেন মাসে এক থেকে তিনবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর রয়েছেন সপ্তাহে এক বা দুইবার যোগাযোগ পাওয়া ব্যক্তিরা (২০.৬ শতাংশ), বছরে এক থেকে ১০ বার যোগাযোগ পাওয়া ব্যক্তিরা (১৮.৬ শতাংশ) এবং সপ্তাহে তিনবারের বেশি যোগাযোগ পাওয়া ব্যক্তিরা (৫.৬ শতাংশ)। কেউ কেউ মাঝেমধ্যে আসা বার্তাকে নিরীহ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু এর ক্রমাগত প্রভাব তৈরি করে সেই অবস্থা, যাকে গবেষকেরা ‘টেকনোস্ট্রেস’ বলেন। ১৯৮০-এর দশকে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই অবস্থা দ্রুত বিকশিত হতে থাকা ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারাকে বোঝায়।
ঐতিহাসিক উপাত্তে দেখা যায়, গত এক দশকে সমস্যাটি আরও তীব্র হয়েছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব লেবার রিসার্চের ২০১৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, তখনই ৭০.৩ শতাংশ কর্মী কর্মঘণ্টার পর বা ছুটির দিনে কাজসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করতেন। ২০২১ সালে গিয়ংগি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০০ জন মজুরিভিত্তিক কর্মীর ৮৭.৮ শতাংশ কর্মঘণ্টার পর কাজের নির্দেশনা পেয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাকাওটকের মতো ব্যক্তিগত মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে। কোভিড-১৯ মহামারি দূর থেকে কাজের ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে এবং কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিতে সার্বক্ষণিক সংযুক্তিকে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
স্বাস্থ্যের নথিভুক্ত ক্ষতি
সব সময় কাজে সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকার মানসিক চাপ এখন পরিমাপযোগ্য শারীরিক উপসর্গেও রূপ নিচ্ছে। অ্যানালস অব অকুপেশনাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় কোরিয়ান ওয়ার্কিং কন্ডিশনস সার্ভের ষষ্ঠ পর্বের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কর্মঘণ্টার পর টেলিযোগাযোগ যন্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে কাজসংক্রান্ত মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকেরা পূর্ণকালীন, শিফটে কাজ করেন না এমন ৮,৬৪৪ জন শ্বেতপোশাক কর্মীর তথ্য পরীক্ষা করে দেখেছেন, কর্মঘণ্টার পর খুব কম যোগাযোগ পেলেও, যাদের সঙ্গে কখনো যোগাযোগ করা হয়নি তাদের তুলনায় এসব উপসর্গ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ২৯.২ শতাংশ বেড়েছে।
যোগাযোগের হার বাড়ার সঙ্গে এই সম্পর্কও জোরালো হয়েছে। মাসে কয়েকবার যোগাযোগ পাওয়া কর্মীদের মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তির সম্ভাবনা ৫৫.১ শতাংশ বেশি ছিল; আর যাদের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ করা হতো, তাদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ৫৪.৮ শতাংশ। আশ্চর্যজনকভাবে, সপ্তাহে বা প্রতিদিন যোগাযোগ পাওয়া কর্মীদের তুলনায় মাসে কয়েকবার যোগাযোগ পাওয়া কর্মীদের ঝুঁকি সামান্য বেশি দেখা গেছে। এর কারণ হতে পারে, অনিয়মিত যোগাযোগের অনিশ্চয়তা ও চাপ বিশ্রামের সময় ব্যাহত করে।
নিয়মিত কর্মঘণ্টার পর কাজের জন্য টেলিযোগাযোগ যন্ত্র ব্যবহার করেন এমন কর্মীদের মধ্যে, তা ব্যবহার করেন না এমন কর্মীদের তুলনায় কাজসংক্রান্ত মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তি দেখা দেওয়ার প্রবণতা বেশি।
গবেষণায় এসব উপসর্গের কারণ হিসেবে কাজসংক্রান্ত চিন্তায় ডুবে থাকাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় কর্মীরা ব্যক্তিগত সময়েও কাজের বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকেন, ফলে কর্টিসল নিঃসরণ বাড়ে এবং ঘুমের মান খারাপ হয়। ঘুমের সমস্যায় ভোগা কর্মীদের মধ্যে কাজসংক্রান্ত মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তির সম্ভাবনা ঘুমের সমস্যা নেই এমন কর্মীদের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এতে স্বাস্থ্যের অবনতির একটি চক্র তৈরি হয়, যা সুস্থতা ও উৎপাদনশীলতা দুটিকেই প্রভাবিত করে।
আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার
হস্তক্ষেপের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কর্মীদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। গ্লোবাল রিসার্চের জরিপে ৮০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা কর্মঘণ্টার পর কাজসংক্রান্ত যোগাযোগ সীমিত করতে আইনি ব্যবস্থা তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে শ্রম মানদণ্ড আইনে একাধিক সংশোধনী ২০১৬ সাল থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে, কিন্তু জাতীয় পরিষদের ২০তম ও ২১তম অধিবেশনে মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেগুলো সবই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকারের ধারণাটি ২০১৫ সালে প্রথম প্রস্তাব করেন ব্রুনো মেটলিং। পরে ২০১৭ সালে এটি ফ্রান্সের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়। স্লোভাকিয়া, ইতালি ও ফিলিপাইনের মতো দেশও এরপর একই ধরনের সুরক্ষা চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া এই তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত। ফলে বিশ্রামের সময় মনোযোগ দাবি করে নিয়োগকর্তারা চাপ দিলে কর্মীদের হাতে কোনো আইনি প্রতিকার থাকে না।
বর্তমানে ২২তম জাতীয় পরিষদে এ-সংক্রান্ত দুটি বিল বিবেচনাধীন। বিল দুটি উত্থাপন করেছেন কোরিয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি পার্ক হং-বে এবং পিপল পাওয়ার পার্টির প্রতিনিধি কিম উই-সাং। ব্যক্তিগত সময়ের সীমানা নির্ধারণের এটাই সর্বশেষ উদ্যোগ, যদিও গত এক দশকের আইন প্রণয়নের ধারা বিবেচনায় বিলগুলোর ভাগ্য অনিশ্চিত।
অতিরিক্ত কাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি
কর্মঘণ্টার পর যোগাযোগ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সংগ্রাম দেশটির শ্রমবাজার ও সামাজিক রীতিনীতির আরও গভীর কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে ১৬,০০০ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতককে নিয়ে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরীয়রা সপ্তাহে গড়ে মাত্র ০.৫ দিন বাড়ি থেকে কাজ করেন, যা জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৪০টি বড় দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। তালিকায় কানাডা শীর্ষে ছিল, সেখানে গড়ে সপ্তাহে ১.৯ দিন বাড়ি থেকে কাজ করা হয়। জাপান (০.৭ দিন) ও চীনের (০.৬ দিন) মতো আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের মধ্যেও কিছুটা বেশি নমনীয়তা দেখা গেছে।
গবেষকেরা এই অনমনীয়তার জন্য কর্মক্ষেত্রের সমষ্টিবাদী রীতিনীতি, করপোরেট কাঠামোর স্তরবিন্যাস এবং সশরীরে তদারকির ওপর জোর দেওয়াকে দায়ী করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার পূর্ণকালীন কর্মীদের ৮০ শতাংশের বেশি বলেছেন, তাদের কাজের সময়সূচি পুরোপুরি নিয়োগকর্তারা নির্ধারণ করেন। ইউরোপীয় গড়ের চেয়ে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এই স্বায়ত্তশাসনের অভাব দূর থেকে কাজের বাইরেও বিস্তৃত; কর্মীরা নিজেদের কাজ শুরুর ও শেষের সময় নির্ধারণ করতে কিংবা কম সময় কাজ করতেও পারেন না।
সব সময় উৎপাদনশীল থাকার সাংস্কৃতিক চাপ ‘কাগংজোক’-এর মতো প্রবণতায় প্রকাশ পায়। শব্দটি এমন তরুণ দক্ষিণ কোরীয়দের বোঝায়, যারা দীর্ঘ সময় ক্যাফেতে পড়াশোনা বা কাজ করেন। সারাদিনের কর্মস্থল গড়ে তুলতে ডেস্কটপ মনিটর, প্রিন্টার ও ছয়-সংযোগের পাওয়ার স্ট্রিপ নিয়ে আসা গ্রাহকদের চরম আচরণ ঠেকাতে সম্প্রতি স্টারবাকস কোরিয়া নির্দেশিকা চালু করেছে। এতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রতিফলন থাকলেও, একই সঙ্গে দেখা যায় এমন এক সমাজ, যেখানে বিশ্রামের জন্য জনপরিসর ও ব্যক্তিগত পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতা প্রতিটি ফাঁকা জায়গায় ঠাঁই করে নিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বৈপরীত্য ও এআইয়ের প্রভাব
পরিস্থিতিতে অর্থনীতির পরস্পরবিরোধী সূচক দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সাল থেকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধাপে ধাপে চালু হওয়া ৫২ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ ব্যবস্থার ফলে গড় দৈনিক কর্মঘণ্টা ২০১৯ সালের ৬ ঘণ্টা ২৩ মিনিট থেকে ২০২৪ সালে ৬ ঘণ্টা ৮ মিনিটে নেমে এসেছে। অথচ ১৯৯৯ সালে হিসাব রাখা শুরুর পর প্রথমবারের মতো একই সময়ে ঘুমের সময়ও কমেছে। কোরীয়রা এখন দিনে গড়ে ৮ ঘণ্টা ৪ মিনিট ঘুমান, যা ২০১৯ সালের ৮ ঘণ্টা ১২ মিনিটের চেয়ে কম।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালিত ব্যাংক অব কোরিয়ার এক জরিপ অনুযায়ী, কোরিয়ার ৫১.৮ শতাংশ কর্মী কাজে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের হারের প্রায় দ্বিগুণ। কোরীয় কর্মীরা সপ্তাহে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা এআই ব্যবহার করেন; তুলনায় মার্কিন কর্মীরা ব্যবহার করেন ০.৫ থেকে ২ ঘণ্টা। এআই আনুমানিক ৩.৮ শতাংশ কর্মঘণ্টা কমালেও, কর্মঘণ্টার পর শ্রমের নতুন ধরন তৈরি করেছে। কল সেন্টার কর্মীদের নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩.১ শতাংশ এআই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত গ্রাহকের অভিযোগ বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এতে শিফট শেষ হওয়ার পরও কাজ প্রক্রিয়াকরণের সময় বেড়েছে। এক কর্মী জানিয়েছেন, কল শেষ হওয়ার পরের কাজ প্রক্রিয়া করতে শিফট শেষে তাকে অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ব্যয় করতে হয়।
মাইক্রোসফটের ২০২৫ ওয়ার্ক ট্রেন্ড ইনডেক্স এই ঘটনাকে ‘অন্তহীন কর্মদিবস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে কর্মদিবস সন্ধ্যা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়; বিশ্বজুড়ে রাত ৮টার পরের বৈঠক এক বছরের ব্যবধানে ১৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত ১০টার মধ্যে সক্রিয় কর্মীদের প্রায় ২৯ শতাংশ আবার ইমেইল ইনবক্সে ঢুঁ মারেন। এতে কর্মঘণ্টার পরের কাজকর্ম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার ইঙ্গিত মেলে। প্রবণতাটি জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও, উচ্চ চাপের কাজের সংস্কৃতিতে এর প্রভাব বিশেষভাবে বেশি।
জনমিতিক ও সামাজিক প্রভাব
কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার প্রভাব ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বাইরেও বিস্তৃত; এটি দেশের জনমিতি ও পারিবারিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার ২০২৩ সালে রেকর্ড সর্বনিম্ন ০.৭২-এ নেমে আসে। গবেষকদের মতে, কর্মজীবী মা-বাবার জন্য নমনীয়তার অভাব পরিবার গঠনের পথে বড় বাধা। কোরিয়ান উইমেন ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ড. জুং সুং-মির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় বছরের কম বয়সী সন্তান আছে এমন নারীদের মাত্র ২১.৯ শতাংশ এবং পুরুষদের ১৭.৯ শতাংশ নমনীয় কাজের ব্যবস্থা পান। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই হার নারীদের ৬০ শতাংশের বেশি এবং পুরুষদের প্রায় ৫৮ শতাংশ।
ড. জুংয়ের গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নিজের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা নগদ ভর্তুকি বা শিশু ভাতার মতো প্রচলিত প্রণোদনার চেয়ে পরিবার পরিকল্পনার সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, কর্মজীবী পরিবারের জন্য সময় যখন বিলাসে পরিণত হয়েছে, তখন কর্মীদের সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয় এমন নীতি জন্মহার বাড়াতে যেকোনো আর্থিক ভর্তুকির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।
২০২১ সালে নমনীয় ব্যবস্থা চালু করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান গড়ে ৩.৬ শতাংশ বেড়েছে; ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। এ পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, নমনীয়তা অর্থনৈতিক ফলাফলের পাশাপাশি সামাজিক সুস্থতারও উপকার করে। এতে সারাক্ষণ কাজে প্রস্তুত থাকলেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে, এমন ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মীদের দুই-তৃতীয়াংশ গত এক বছরে অফিস সময়ের বাইরে কাজসংক্রান্ত যোগাযোগ পেয়েছেন; ৩১ শতাংশের সঙ্গে রাত ১০টার পর যোগাযোগ করা হয়েছে।
- ৮০ শতাংশের বেশি কর্মী কর্মঘণ্টার পর কাজসংক্রান্ত যোগাযোগ সীমিত করতে আইনি ব্যবস্থার পক্ষে; তবে ২০১৬ সাল থেকে বিবেচনাধীন বিলগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
- চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় কর্মঘণ্টার পর ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার যোগসূত্র পাওয়া গেছে; আক্রান্ত কর্মীদের ঝুঁকি কখনো যোগাযোগ না পাওয়া কর্মীদের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ বেশি।
- দূর থেকে কাজের নমনীয়তায় দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে; সেখানে সপ্তাহে গড়ে ০.৫ দিন বাড়ি থেকে কাজ করা হয়, কানাডায় যা ১.৯ দিন।
- এআই ব্যবহারে কর্মঘণ্টা ৩.৮ শতাংশ কমলেও কর্মঘণ্টার পর যোগাযোগ বাড়ছে; এতে ঘুমের সময় কমে যাওয়া এবং জন্মহার রেকর্ড সর্বনিম্নে পৌঁছানোর প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে।






