উন্নত ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন বাড়াচ্ছে টোকিও
হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল ও গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ নতুন প্রজন্মের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় তৈরি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে জাপান। উন্নত টাইপ ০৩ চু-স্যাম কাই টোকিওর সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করছে। মূল সময়সূচির কয়েক বছর আগেই ব্যবস্থাটি পরীক্ষামূলক উন্নয়ন থেকে পূর্ণমাত্রার উৎপাদনে যাচ্ছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর তারিখের একটি নথি অনুযায়ী, ব্যাপক উৎপাদন শুরুর সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তার নিয়ে জরুরি উদ্বেগ এবং ক্রমেই অত্যাধুনিক হয়ে ওঠা হামলা থেকে জাপানের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রয়োজন।
সূচিপত্র
জাপানের স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করছে উন্নত এই ব্যবস্থা। এটি দূরপাল্লার নৌ-ইন্টারসেপ্টর ও স্বল্পপাল্লার এলাকা-সুরক্ষা ব্যবস্থার মাঝামাঝি স্তরে থাকবে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চু-স্যাম কাই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর, যা বাইরের প্রতিরক্ষা ভেদ করে আসা বা উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে অনিশ্চিত কৌশল নেওয়া হুমকি মোকাবিলা করতে পারে। ২০২৬ সালের বাজেটে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষেপণাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের জন্য ৫.১ বিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৩২.৬ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জাপানি দ্বীপপুঞ্জজুড়ে এই সক্ষমতা মোতায়েনে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে এ বরাদ্দ।
উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলবে। দ্বিমুখী এই উদ্যোগের ফলে উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি আরও উন্নত করার পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর ইউনিট মোতায়েন করতে পারবে টোকিও। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তীব্র ইলেকট্রনিক জ্যামিং ও বিঘ্নের অনুকরণে তৈরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ব্যবস্থাটির কঠোর পরীক্ষা ইতিমধ্যে হয়েছে। যেকোনো প্রকৃত সংঘাতের সময় এ ধরনের বাধা দেখা দিতে পারে। পরীক্ষায় এসব মোকাবিলায় ব্যবস্থাটির সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে।
বিমান শিকারি থেকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র-রোধী
দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাপানের স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে টাইপ ০৩ চু-স্যাম পরিবার। ২০০৩ সালে জাপান গ্রাউন্ড সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সে (জেজিএসডিএফ) মূল ব্যবস্থাটি চালু হয়। এর মাধ্যমে ১৯৬০-এর দশক থেকে জাপানের আকাশ পাহারা দেওয়া পুরোনো ইমপ্রুভড হক ব্যাটারির জায়গা নেয় নতুন ব্যবস্থা। মিতসুবিশি ইলেকট্রিক ও টেকনিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (টিআরডিআই) যৌথ উদ্যোগে তৈরি মূল টাইপ ০৩ সে সময়ের জন্য যুগান্তকারী সক্ষমতা নিয়ে আসে। এর মধ্যে ছিল সক্রিয় রাডার-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র, ট্রাকে স্থাপিত উল্লম্ব উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং একই সময়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম ফেজড-অ্যারে রাডার।
চু-স্যাম কাইয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাটির উন্নয়ন অব্যাহত থাকে। ২০১৪ সালে এর প্রথম মূল্যায়ন হয় এবং প্রায় ২০১৭ সাল থেকে এটি মোতায়েন করা হয়। এই মধ্যবর্তী সংস্করণে সেন্সরের সক্ষমতা ও নেটওয়ার্কিং কার্যক্রম উন্নত করা হয়, পাশাপাশি ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়। পরিবর্তিত কাই সংস্করণটি মোকাবিলার পাল্লা বাড়ায় এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্রের মতো আরও জটিল হুমকিতে লক্ষ্য স্থির করার সক্ষমতা যোগ করে। তবে এখন ব্যাপক উৎপাদনে যাওয়া সর্বশেষ সংস্করণটি সামান্য উন্নতি নয়, বরং সক্ষমতার গুণগত অগ্রগতি।
কারিগরি বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যবস্থাটির অত্যাধুনিকতা তুলে ধরে। উন্নত টাইপ ০৩-এ রয়েছে উন্নত সক্রিয় ইলেকট্রনিকভাবে স্ক্যান করা অ্যারে (এইএসএ) রাডার, যা একসঙ্গে ১০০টি লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করতে এবং একই সময়ে ১২টিকে মোকাবিলা করতে পারে। আট চাকার অফ-রোড ট্রাক থেকে উল্লম্বভাবে উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ম্যাক ২.৫ গতিতে পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, এগুলোর পাল্লা প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার; তবে আগের সংস্করণগুলোর পাল্লা ছিল প্রায় ৫০ কিলোমিটার। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে রয়েছে থ্রাস্ট ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ ও সবদিকে নড়াচড়া করতে সক্ষম অ্যারোডাইনামিক পৃষ্ঠ। দ্রুতগতির, দিক পরিবর্তনকারী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য প্রয়োজনীয় তীব্র কৌশলগত সক্ষমতা দেয় এসব বৈশিষ্ট্য।
পূর্ব এশিয়ায় হাইপারসনিক হুমকি
দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সাড়া দিচ্ছেন জাপানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদরা। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। বায়ুমণ্ডলের ভেতর অনিশ্চিতভাবে গতিপথ বদলে ম্যাক ৫-এর বেশি গতিতে চলা হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল প্রচলিত ইন্টারসেপ্টরের জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ব্যালিস্টিক গতিপথে আঘাত হানার জন্য প্রোগ্রাম করা এসব ইন্টারসেপ্টর দিয়ে এ ধরনের যান মোকাবিলা করা কঠিন। জাপানি ঘাঁটি ও নৌবাহিনীকে আঘাত হানতে সক্ষম ডিএফ-১৭সহ অন্যান্য হাইপারসনিক ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে চীন। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক বলে দাবি করা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পূর্বানুমানযোগ্য পরাবৃত্তাকার পথে চলে। ফলে উৎক্ষেপণ শনাক্ত হওয়ার পর প্রতিরক্ষাকারীরা আঘাতের স্থান হিসাব করতে পারে। এর বিপরীতে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল উড্ডয়নের সময় গতিপথ বদলাতে পারে এবং ২০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় বায়ুমণ্ডল ঘেঁষে চলতে পারে। এই অনিশ্চয়তা প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দেয় এবং অবিরাম অনুসরণ ও দ্রুত গতিপথ হালনাগাদ করতে সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন তৈরি করে। উন্নত রাডার, দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং উন্নত হুমকির এড়ানোর কৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উন্নত টাইপ ০৩ এসব চাহিদা পূরণ করে।
ব্যবস্থাটির নকশা বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুর উড্ডয়নের শেষ পর্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি। আঘাত হানার আগের শেষ কয়েক সেকেন্ডে হাইপারসনিক যান কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে এবং তখন সেগুলোকে ইন্টারসেপ্ট করা তুলনামূলক সহজ হয়। জাপানের বিদ্যমান এজিস-সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার বায়ুমণ্ডলের বাইরে এসএম-৩ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দূরপাল্লার প্রতিরোধের চেষ্টা করে; আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার চারপাশে এলাকা-সুরক্ষা দেয় প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ব্যাটারি। এই ব্যবস্থাগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে শেষ পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ভূমিকা। সব মিলিয়ে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করতে প্রতিপক্ষকে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তৈরি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা বলয়।
হোয়াইট স্যান্ডসে পরীক্ষিত সক্ষমতা
চু-স্যাম কাইয়ের উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করেছে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে পরীক্ষার ওপর। ২০০১ সাল থেকে সেখানে জাপানি দলগুলো ব্যাপক সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে টেকনিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (টিআরডিআই) দল ১০টি সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা চালায়। বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধের হার ছিল ১০০ শতাংশ। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল জিকিউএম-১৬৩এ কায়োট, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একটি সুপারসনিক লক্ষ্যব্যবস্থা, যা উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজবিধ্বংসী হুমকির প্রতিনিধিত্ব করে।
চু-স্যাম কাই কর্মসূচির হোয়াইট স্যান্ডস পরীক্ষাকর্মকর্তা হেনরি সেদিলো মূল্যায়নের সময় জাপানি দলের পেশাদারত্ব ও কারিগরি দক্ষতার প্রশংসা করেন।
আমরা যে জাপানি পরীক্ষা দলের সঙ্গে কাজ করি, তারা অসাধারণ। তারা অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং সফলতার জন্য কী প্রয়োজন, সে বিষয়ে প্রশিক্ষিত।
কায়োট লক্ষ্যবস্তুটি নিচু উচ্চতায় উড়তে অথবা সুপারসনিক গতিতে ওপরে উঠে আবার নিচে নামতে পারে। এ সক্ষমতা জটিল হুমকির ধরন মোকাবিলায় ব্যবস্থাটির সামর্থ্য যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টিআরডিআইয়ের চু-স্যাম কাই পরীক্ষা কমান্ডার কাজুহিরো তোবো বলেন, আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা পরীক্ষার সব চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত আয়তন ও নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমা জাপানে নেই। তাই ব্যবস্থা যাচাইয়ে হোয়াইট স্যান্ডসের সঙ্গে অংশীদারত্ব অপরিহার্য।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিভাগের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ৩৯.২ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় পরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে। এই চুক্তিতে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত উন্নয়ন ও যাচাই পরীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে। ২০২৫ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে সরাসরি পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনিশ্চিত গতিপথে চলা দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান অনুসরণ ও গতিপথ অনুমানের কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই এসব পরীক্ষার লক্ষ্য। ব্যাপকভাবে মোতায়েনের আগে ব্যবস্থাটি যেন কার্যকরী প্রয়োজন পূরণ করে, তা নিশ্চিত করাও এর উদ্দেশ্য।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রতিরক্ষা
উন্নত টাইপ ০৩ মোতায়েনের কৌশলগত পরিকল্পনায় জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তাইওয়ানের মাত্র ১১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ইয়োনাগুনি দ্বীপও রয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইয়োনাগুনিতে জেজিএসডিএফ ঘাঁটি পরিদর্শন করে নিশ্চিত করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক পালাবদল সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের জন্য বিদ্যমান ঘাঁটির কাছে প্রায় ৪৫ একর জমি কিনেছে মন্ত্রণালয়।
এ অঞ্চলে চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় জাপানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ গুরুত্বের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ওকিনাওয়া, ইশিগাকি ও মিয়াকোসহ নানসেই দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। পরিকল্পিত ১৪টি চু-স্যাম কাই ইউনিটের মধ্যে সাতটি এ অঞ্চলে মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে টোকিও। এর ফলে ঘাঁটি, বন্দর ও বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষায় গড়ে উঠবে ঘন প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক। এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বাসিন্দাদের দুই সপ্তাহ পর্যন্ত আশ্রয় দিতে সক্ষম ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। অস্বীকারের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ এসব উদ্যোগ।
সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে সম্ভাব্য আগ্রাসীদের আত্মবিশ্বাস দুর্বল করাই এই কৌশলের উদ্দেশ্য। সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্রগুলোর কাছে দ্বীপে উন্নত ইন্টারসেপ্টর মোতায়েন করে উচ্চমাত্রার সংঘাতেও ভূখণ্ড রক্ষার সক্ষমতার বার্তা দিচ্ছে জাপান। এই ব্যবস্থা জাপানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষাও বাড়ায়। ফলে প্রতিপক্ষের লক্ষ্য নির্ধারণের হিসাব আরও জটিল করে তুলবে এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি হবে।
শিল্পভিত্তি ও রপ্তানি সম্ভাবনা
উন্নত টাইপ ০৩-এর ব্যাপক উৎপাদন জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তির সক্ষমতা, বিশেষ করে মিতসুবিশি ইলেকট্রিক ও এর সহযোগী ঠিকাদারদের সামর্থ্য, তুলে ধরছে। মূলত দশকের পরের দিকে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও তা এগিয়ে ২০২৬ অর্থবছরে আনা হয়। এ জন্য সমান্তরালে উন্নয়ন ও উৎপাদন চালাতে হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাঝারি পাল্লার ব্যবস্থা খুঁজছে—এমন ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারদের সম্ভাব্য রপ্তানি আগ্রহ পর্যবেক্ষণ করছেন কর্মকর্তারা।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টাইপ ০৩ ব্যবস্থা রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে জাপান ও ফিলিপাইনের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে বলে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অস্বীকার করেছে। তবে এই সম্ভাবনা জাপানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি নীতির পরিবর্তনশীল চিত্র তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত অফিশিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স কাঠামোর আওতায় ফিলিপাইনের মতো কৌশলগত অংশীদারদের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা এখনো রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্প কেবল অভ্যন্তরীণ গ্রাহকদের জন্য কাজ করেছে, ফলে উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত এবং খরচ বেশি। ২০২২ সালে অনুমোদিত প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বিপুল বৃদ্ধিসহ আত্মরক্ষা বাহিনীর বর্তমান ক্রয়বৃদ্ধি অদূর ভবিষ্যতে উপলভ্য উৎপাদন সক্ষমতার বেশির ভাগই ব্যবহার করবে। রপ্তানি হলে তা সম্ভবত অবসরে যাওয়া ব্যবস্থা কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিতে প্রভাব না ফেলে—এমন সতর্কভাবে নির্ধারিত উৎপাদন বরাদ্দের মধ্যেই সীমিত থাকবে।
মূল বিষয়গুলো
- আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি বাড়তে থাকায় কয়েক বছর এগিয়ে এনে ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর উন্নত টাইপ ০৩ চু-স্যাম কাইয়ের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে জাপান।
- উড্ডয়নের শেষ পর্যায়ে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল, স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্ট করার জন্য ব্যবস্থাটি তৈরি। দূরপাল্লার নৌ-প্রতিরক্ষা ও স্বল্পপাল্লার এলাকা-সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করবে এটি।
- কারিগরি সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে সক্রিয় ইলেকট্রনিকভাবে স্ক্যান করা অ্যারে রাডার, যা একই সময়ে ১০০টি লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ ও ১২টি মোকাবিলা করতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ম্যাক ২.৫ গতিতে চলে এবং এদের পাল্লা প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
- ২০১৫ সাল থেকে হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে ব্যাপক পরীক্ষায় সুপারসনিক ও গতিপথ পরিবর্তনকারী লক্ষ্যবস্তু, যার মধ্যে জিকিউএম-১৬৩ কায়োট লক্ষ্য ড্রোনও রয়েছে, ইন্টারসেপ্ট করার ব্যবস্থাটির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
- দেশজুড়ে স্থলভিত্তিক ১৪টি ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি তাইওয়ান থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে ইয়োনাগুনিসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জে মোতায়েনের কথা রয়েছে, যাতে চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মোকাবিলা করা যায়।
- প্রাথমিক পর্যায়ের সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য ২০২৬ সালের বাজেটে ৫.১ বিলিয়ন ইয়েন (৩২.৬ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার গবেষণা ও উন্নয়ন চলবে।
- মিতসুবিশি ইলেকট্রিক ব্যবস্থাটি তৈরি করছে। হাইপারসনিক হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনকারী বিশেষ কয়েকটি দেশের দলে যোগ দিয়ে জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্প উল্লেখযোগ্য অর্জন দেখাচ্ছে।






