বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অবকাঠামো হাবে রূপান্তরের পথে জোহর এখন এক সংকটপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, অঞ্চলটির প্রধান বাধা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থেকে নাটকীয়ভাবে সরে এখন গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামোতে এসে ঠেকেছে। এতে বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে কত সময় লাগবে, সেই সংকট তৈরি হয়েছে, যা নির্ধারণ করছে কোন প্রকল্প এগোবে আর কোনটি থমকে যাবে। এরিয়া মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জোহর নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনের আবেদনগুলোর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ প্রত্যাখ্যান করেছে। উল্লেখযোগ্য এই হার বাজারের গতিশীলতায় মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
এই সংকটের প্রভাব প্রশাসনিক বিলম্বের গণ্ডি বহুদূর ছাড়িয়ে গেছে। এখন প্রকল্পের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে বিনিয়োগের অর্থ বা জমির প্রাপ্যতা দিয়ে নয়; বরং এমন একটি বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগ পেতে কত সময় লাগবে, তা দিয়ে, যে গ্রিড ডিজিটাল অবকাঠামো স্থাপনের বিস্ফোরক গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইউটিলিটি সংস্থার সময়সূচির সঙ্গে প্রকল্পের সময়সূচির অসামঞ্জস্য, সাবস্টেশন অবকাঠামোর দায়িত্ব কার—তা নিয়ে অস্পষ্টতা এবং উন্নয়নের শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়া পরিকল্পনাগত সমস্যার কারণে আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। দ্রুত সম্প্রসারণে অভ্যস্ত এই শিল্পের জন্য এটি এমন এক কাঠামোগত বাধা, যা অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধির গতিপথ সংকুচিত করার হুমকি তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক চাহিদা অবকাঠামোর সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কারণে কম্পিউটিং সক্ষমতার অভূতপূর্ব চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জোহরের সংকট বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া একটি প্রবণতারই প্রতিফলন। নাইট ফ্র্যাঙ্কের গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১৩ গিগাওয়াট সক্ষমতার নতুন প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬০ শতাংশ বেশি। এই উল্লম্ফন বাস্তবায়নে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ডিজিটাল অবকাঠামোর বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল হাব হিসেবে অঞ্চলটির অবস্থান আরও দৃঢ় করছে।
তবে জমি, বিদ্যুৎ ও পরিকল্পনার অনুমোদন নিশ্চিত হওয়া প্রকল্পের মাধ্যমে নির্ধারিত সরবরাহ ২০১৯ সাল থেকে ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে, অথচ বাস্তব নির্মাণকাজ সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। বাজার-বিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিসি বাইট বলছে, নির্মাণাধীন সক্ষমতা এখন আর প্রকল্প ঘোষণার মতো একই হারে বাড়ছে না। পরিকল্পিত ও চালু সক্ষমতার এই ব্যবধান বিশ্বজুড়ে বাজারগুলোর ওপর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।
বাজারের গতি কমছে না। বরং প্রতিশ্রুত প্রকল্পের সংখ্যা বাস্তবায়নক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে প্রকৃত টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে। নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্পগুলোর জন্য ইজারা চুক্তি হচ্ছে, কিন্তু গ্রিডে বিলম্ব এবং অনুমোদন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সরবরাহের সময় আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। এটি চাহিদার সমস্যা নয়; উন্নয়ন বাস্তবায়নের বাধা।
ডিসি বাইটের আমেরিকা অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কলবি কক্স জোর দিয়ে বলেন, যারা শুধু সক্ষমতার ঘোষণা নয়, তা বাস্তবে চালু করতে পারবে, তারাই বাজারে নেতৃত্ব দেবে। জোহরের ক্ষেত্রেও কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। সেখানে সময়মতো গ্রিড সংযোগ নিশ্চিত করার সক্ষমতাই এখন কার্যকর প্রকল্প ও স্থবির বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের সীমাবদ্ধতায় জোহরের সম্প্রসারণ
ডেটা সেন্টারের আকর্ষণকেন্দ্র হিসেবে জোহরের উত্থানের পেছনে মূলত প্রতিবেশী সিঙ্গাপুরের আরোপিত বিধিনিষেধ বড় ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটির প্রধান ডিজিটাল হাব সিঙ্গাপুর বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকটের কারণে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে তিন বছরের স্থগিতাদেশ দিয়েছিল, যা ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর ছিল। পরে নগররাষ্ট্রটি গ্রিন ডেটা সেন্টার রোডম্যাপ চালু করে এবং অতিরিক্ত ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার অনুমোদন দেয়। তবে কঠোর টেকসই উন্নয়নবিষয়ক শর্ত এবং সীমিত ভৌত জায়গার কারণে সেখানকার প্রবৃদ্ধি এখনো নিয়ন্ত্রিত।
এই নিয়ন্ত্রক পরিবেশের ফলে বিপুলসংখ্যক প্রকল্প পাশের অঞ্চলে সরে যায়। জোহর প্রণালির ঠিক ওপারে অবস্থিত জোহরে সিঙ্গাপুরের দ্বীপভিত্তিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় সস্তা জমি, প্রচুর সম্পদ এবং আর্থিক কেন্দ্রটির ফাইবার সংযোগের কাছাকাছি অবস্থানের সুবিধা রয়েছে। পরিসংখ্যানেই এই পরিবর্তনের ব্যাপ্তি স্পষ্ট। নাইট ফ্র্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, জোহরে বর্তমানে প্রায় ৫৮০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার চালু আছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রকল্পসহ মোট পরিকল্পিত সক্ষমতা প্রায় ১০ গুণ, ৫.৮ গিগাওয়াট। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত রাজ্যটি ১৬৪.৪৫ বিলিয়ন রিঙ্গিত (৩৯.০৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের ৪২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। মালয়েশিয়ার চালু আইটি সক্ষমতার ৭৮.৬ শতাংশ এর অবদান।
তবে এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। কেনাঙ্গা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বেরহাদ ধারণা করছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার ডেটা সেন্টারগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ২০ শতাংশের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। মালয়েশিয়া সরকার গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬ থেকে ৮ গিগাওয়াট বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়, বরং তা সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ায়। এসব নেটওয়ার্ক উন্নত করতে কয়েক বছর সময় লাগে।
সংযোগে বিলম্বের নেপথ্যে কারিগরি সীমাবদ্ধতা
জোহরের বর্তমান সংকট বুঝতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া তুলনামূলক দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারলেও এসব কেন্দ্র থেকে পৃথক ডেটা সেন্টার প্রাঙ্গণে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার ও সঞ্চালন লাইন স্থাপনে বিস্তৃত পরিকল্পনা, অনুমোদন এবং নির্মাণের সময় লাগে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের বিশ্লেষণ বলছে, নতুন জমিতে একটি সাধারণ ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে দুই থেকে তিন বছর লাগলেও, সংশ্লিষ্ট সংযোগবিষয়ক সমীক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সাধারণত চার থেকে আট বছর লাগে।
এই অসামঞ্জস্যের কারণে খাতসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা যে সমস্যাকে ‘বিদ্যুৎ পেতে বিলম্ব’ বলে থাকেন, তা তৈরি হয়েছে। জোহর নিয়ে এরিয়া মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতার জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে: ইউটিলিটি সংস্থার সময়সূচি উন্নয়নকারীদের নির্মাণ পরিকল্পনার সঙ্গে না মেলা, সাবস্টেশন অবকাঠামোতে বিনিয়োগের দায়িত্ব কার—তা অস্পষ্ট থাকা এবং প্রাথমিক অনুমোদনের ধাপ পেরিয়ে প্রকল্প অনেকটা এগোনোর পরই ধরা পড়া পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান দেখে গ্রিডে পর্যাপ্ত সক্ষমতা আছে বলে ধরে নিলেও উন্নয়নকারীরা প্রায়ই পরে আবিষ্কার করেন, স্থানীয় সঞ্চালন অবকাঠামো তাদের নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
কারিগরি জটিলতার মধ্যে বিদ্যুৎমান ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টিও রয়েছে। ডেটা সেন্টারের শুধু কয়েক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা নয়, নির্দিষ্ট ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সি বৈশিষ্ট্যসহ অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং বিকল্প-ব্যবস্থাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দরকার। এই মান পূরণে বিদ্যমান গ্রিড অবকাঠামো উন্নত করতে জাতীয় ইউটিলিটি সংস্থা তেনাগা ন্যাসিওনাল বেরহাদ, স্থানীয় নিয়ন্ত্রক এবং বেসরকারি উন্নয়নকারীদেরসহ একাধিক পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। এসব উন্নয়নের খরচ ও দায়িত্ব কার—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো না থাকলে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় প্রকল্প থমকে যায়।
পানিসম্পদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতা
চাপের মুখে থাকা সম্পদ শুধু বিদ্যুৎ নয়। শীতলীকরণের জন্য ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ পানি লাগে। ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি স্থাপনা প্রতিদিন প্রায় ৪২ লাখ লিটার পানি ব্যবহার করে, যা হাজারো বাসিন্দার দৈনিক চাহিদার সমান। জোহর ইতিমধ্যে পরিশোধিত পানির উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য প্রতিবেশী সিঙ্গাপুরের ওপর নির্ভরশীল এবং কয়েক দফা সরবরাহ বিঘ্নেরও মুখে পড়েছে। ফলে পানি ও বিদ্যুৎ—দুই সম্পদেই সংকট দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয়দের বিরোধিতা বাড়াচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য এক ঘটনায়, ডেটা সেন্টারের নির্মাণস্থলের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন জোহরের বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, সেখানকার ধুলো দূষণ তৈরি করছে; পাশাপাশি সম্ভাব্য পানিসংকট নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মালয়েশিয়ায় এই শিল্পের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম বড় ধরনের জনবিক্ষোভ, যা খাতটির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে জনসমর্থন ক্ষয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়ার সম্পত্তি অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নাজিব রাজালি বলেন, আবাসিক গ্রাহক ও অপরিহার্য শিল্প ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় পানি ও বিদ্যুতের বরাদ্দ সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত এখন নিয়ন্ত্রকেরা দিচ্ছেন।
চাহিদা হলেই পরিশোধিত পানি ও গ্রিডের বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা আর ধরে নেওয়া হচ্ছে না। বরং এগুলো শর্তসাপেক্ষ সম্পদ হয়ে উঠছে, যার ব্যবহারে সীমা, দক্ষতার শর্ত এবং নীতিগত পর্যালোচনা প্রযোজ্য।
ড. নাজিব ব্যাখ্যা করেন, বিকল্প পানির উৎসে প্রবেশাধিকার, পুনর্ব্যবহৃত পানির ব্যবস্থা বা উন্নত জ্বালানি দক্ষতার মাধ্যমে ইউটিলিটি-সুবিধা নিশ্চিত—এমন জমির মূল্য বেশি হয় এবং সেখানে বিলম্বও কম হয়। বিপরীতে, পৌরসভার পানি বা প্রচলিত গ্রিড সংযোগের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল স্থানে অবস্থান যত ভালোই হোক, অনিশ্চয়তা বেশি থাকে। এতে পানি ও বিদ্যুৎ আর গৌণ অবকাঠামোগত বিষয় থাকছে না; বরং জমির মূল্য ও বিনিয়োগ-ঝুঁকি নির্ধারণের প্রধান উপাদান হয়ে উঠছে।
এই চাপ মোকাবিলায় জোহরে তিনটি নতুন জলাধার ও পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদিকে সরকার ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য পানির শুল্ক বাড়িয়েছে এবং শিল্পটিকে পুনর্ব্যবহৃত বর্জ্যপানি ব্যবহারের দিকে যেতে বলেছে। নতুন কিছু স্থাপনা বায়ু-শীতলীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যাতে পানি ব্যবহার একেবারে বন্ধ করা যায়। তবে এসব প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লাগে এবং জোহরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে এগুলো কম দক্ষ।
ভূরাজনৈতিক চাপ উন্নয়নকে জটিল করছে
কারিগরি বাধাগুলোর সঙ্গে জটিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও জড়িয়ে আছে। ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ ধীর করার মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতাধীন উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার চীনের প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলছে। টেনসেন্ট, হুয়াওয়ে ও আলিবাবাসহ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো একই সুবিধার টানে জোহরে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি গড়ে তুলেছে। তবে ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, চীনের বাইরের ডেটা সেন্টারগুলো এমন নিষিদ্ধ এনভিডিয়া চিপ কিনতে পারে, যা দিয়ে চীনা সামরিক কাজে সহায়ক এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে মালয়েশিয়া ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সব উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের রপ্তানি, পুনঃরপ্তানি এবং দেশটির মধ্য দিয়ে পরিবহনের জন্য অনুমতি নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক বিধির কিছু ফাঁকফোকর থাকায় চীনা ডেটা সেন্টারগুলো তাত্ত্বিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহারের জন্য চিপ আমদানি করতে পারে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলায় কুয়ালালামপুর এসব প্রকল্পের ওপর নজরদারি জোরদার করছে। ফলে মালয়েশিয়ার নীতিনির্ধারকদের জন্য ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে: চীনা বিনিয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উদ্বেগও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
জোহর রাজ্যের ডেটা সেন্টার উন্নয়ন সমন্বয়বিষয়ক উপসভাপতি লি টিং হানের মতে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট পুনর্গঠন, যার মধ্যে মূল প্রতিষ্ঠান জিডিএস হোল্ডিংস থেকে ডেওয়ান-এর আলাদা হওয়াও রয়েছে, সম্ভবত বদলে যাওয়া বাণিজ্যিক উত্তেজনার কথা মাথায় রেখে গ্রাহকভিত্তি বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগ। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ভূরাজনৈতিক চাপ কীভাবে একসঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বদলে দিচ্ছে, পরিস্থিতিটি তা দেখায়। কিছু প্রকল্পকে একই সঙ্গে কারিগরি বিলম্ব এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা—দুই দিকের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিকল্প বিদ্যুৎ কৌশলের উত্থান
গ্রিড সংযোগে বিলম্বের মুখে দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য পরিচালকেরা নানা কৌশল খতিয়ে দেখছেন। একই ধরনের গ্রিড বিলম্বের কারণে মেক্সিকোর কেরেতারোতে নিজেদের স্থাপনায় মাইক্রোসফট গ্যাস জেনারেটর ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে দেখা যায়, কার্যক্রম চালু রাখতে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও অস্থায়ী জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক সমাধান নিতে প্রস্তুত। ভ্যান্টেজ ডেটা সেন্টারস ভোল্টাগ্রিডের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে উত্তর আমেরিকায় এক গিগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত মাইক্রোগ্রিড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো নির্মাণে বছরের বদলে কয়েক মাস লাগার কথা।
মালয়েশিয়ায় ভিন্ন পথে এগিয়েছে গুগল। সিত্রা এনার্জিসের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক টেরাওয়াট-ঘণ্টা প্রত্যয়িত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি টোটালএনার্জিসের সঙ্গে ২১ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে। মালয়েশিয়ার করপোরেট গ্রিন পাওয়ার কর্মসূচির আওতায় হওয়া এই চুক্তি দেখায়, হাইপারস্কেল প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রচলিত ইউটিলিটি সরবরাহব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করছে। এতে তাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি গ্রিডের কিছু সীমাবদ্ধতাও এড়ানো যায়।
মিটারের পেছনে থাকা সম্পদ—যেমন সৌর প্যানেল, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন—অস্থায়ী সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এসব সমাধানের সীমাবদ্ধতা আছে। ডেটা সেন্টারে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ দরকার, যা স্বতন্ত্র ব্যবস্থার পক্ষে নিশ্চিত করা কঠিন। আর গিগাওয়াট-পর্যায়ে চলা স্থাপনাগুলোকে সহায়তা করার মতো করে এসব সম্পদ সম্প্রসারণ করতে বড় কারিগরি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের মতে, গ্রিড-সংযুক্ত ডেটা সেন্টারই সম্ভবত পছন্দের ব্যবস্থা থাকবে। তবে এসব সংযোগ সহজ করতে গ্রিড-সংযোগ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং ইউটিলিটি সংস্থার বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে চুক্তিগত নতুনত্ব দরকার।
সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা তৈরি করতে এবং বর্তমান বাধা তৈরি করা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার সম্ভাবনা যাচাই করতে মালয়েশিয়া সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে একটি টেকসই ডেটা সেন্টার কাঠামো চালুর পরিকল্পনা করেছে। প্রকল্প বিলম্বিত করা সাবস্টেশনের দায়িত্ব নিয়ে অস্পষ্টতার বিষয়টি কাঠামোতে সমাধান হতে পারে, তবে বিস্তারিত এখনো জানানো হয়নি।
মূল কথা
- বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির কারণে নয়, গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কারণে জোহর ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টার স্থাপনের আবেদনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ প্রত্যাখ্যান করেছে।
- রাজ্যটিতে বর্তমানে ৫৮০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার চালু আছে; বিপরীতে পরিকল্পিত সক্ষমতা ৫.৮ গিগাওয়াট, যা অবকাঠামোর ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে।
- ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টার সক্ষমতার বৈশ্বিক চাহিদা ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ও অনুমোদন-সংক্রান্ত বিলম্বের কারণে নির্মাণকাজ প্রকল্প ঘোষণার গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
- পানি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগে স্থানীয় বিক্ষোভ হয়েছে। নিয়ন্ত্রকেরাও ইউটিলিটি সুবিধাকে নিশ্চিত অবকাঠামো নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন।
- এআই চিপে প্রবেশাধিকার নিয়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মালয়েশিয়ার ডেটা সেন্টার কৌশল জটিল করছে, বিশেষত চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে।
- খাতটির সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে রয়েছে নিজস্ব গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং পর্যাপ্ত গ্রিড সক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় পর্যায়ের বাজার গড়ে তোলা।






