বাজারের উদ্বেগের বিপরীতে সরকারি আশাবাদ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সর্বোচ্চ ৬% প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী। উচ্চাভিলাষী এই লক্ষ্য দেশটির আর্থিক বাজারে চলমান অস্থিরতার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে। সম্প্রতি শেয়ারবাজারে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ধস, মুডিস রেটিংসের নেতিবাচক পূর্বাভাস এবং দেশটির বাজারের স্বচ্ছতার মান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়তে থাকা নজরদারির মধ্যেই এই পূর্বাভাস এসেছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসনের অধীনে ইন্দোনেশিয়ার রাজস্বগত গতিপথ কতটা টেকসই, তা নিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নের মুখে অর্থনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এটি আত্মবিশ্বাসের জোরালো ঘোষণা।
সূচিপত্র
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রাজস্বের স্থায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও, অভ্যন্তরীণ ভোগ এবং কৌশলগত সরকারি ব্যয় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে বলে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস এই আশাবাদী পূর্বাভাসে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে অর্থনীতি ৫.৩৯% প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, যা পুরো বছরের ৫.১১% প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। অনুকূল মৌসুমি পরিস্থিতি এবং পরিবারগুলোর ব্যয় ও অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আনতে নেওয়া লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত প্রণোদনার সহায়তায় এই গতি নতুন বছরেও বজায় থাকবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাকার্তায় এক ব্রিফিংয়ে উপ-অর্থমন্ত্রী জুদা আগুং এই পূর্বাভাসে সমর্থন জানিয়ে বলেন, প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি গত বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্জিত ৫.৩৯% ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। তিনি ভোক্তা আস্থার উন্নতি এবং শ্রমবাজারের শক্তিশালী অবস্থাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকেই কর্মশক্তি ১৩ লাখ ৭০ হাজার বেড়েছে। অনুষ্ঠানে আগুং বলেন, “২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে ৫.৩৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এখনো সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম। অর্থাৎ, এটিকে আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।”
আগুং জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সুফল জনকল্যাণে দৃশ্যমান উন্নতি হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। তিনি প্রবৃদ্ধির সূচক, ভোক্তা আস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর উল্লেখ অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির গতির দিক থেকে আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এখন চতুর্থ, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের পরে; তবে সৌদি আরব ও চীনের আগে। প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহতভাবে বাড়লে দেশটি র্যাঙ্কিংয়ে আরও ওপরে উঠতে পারে।
৮০ বিলিয়ন ডলারের বাজারধস
সরকারি পূর্বাভাসের আশাবাদের সঙ্গে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ার পুঁজিবাজারে আঘাত হানা আস্থার সংকটের তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি, দুই দিনে জাকার্তা কম্পোজিট ইনডেক্স ১১.৫%-এর বেশি পড়ে যায়। এতে বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার মুছে যায় এবং ইন্দোনেশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর ও ইন্দোনেশিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটির প্রধানসহ জ্যেষ্ঠ নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন। দেশটির সাম্প্রতিক আর্থিক ইতিহাসে এটি ছিল বাজারের সবচেয়ে গুরুতর অস্থিরতার ঘটনাগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের এক সমালোচনামূলক বিবৃতির পর এই ধসের সূত্রপাত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারবাজারকে “উদীয়মান বাজার” থেকে “সীমান্তবর্তী বাজার” মর্যাদায় নামিয়ে আনার সম্ভাবনা পর্যালোচনার আওতায় রাখে। এমএসসিআই কম ফ্রি-ফ্লোট স্তর নিয়ে নির্দিষ্ট উদ্বেগ জানায়। অনেক বড় কোম্পানি ধনী পরিবারগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং জনসাধারণের কাছে মাত্র ১০% বা তারও কম শেয়ার ছাড়ে। এতে বাজারে তারল্য কমে, মূল্য কারসাজির ঝুঁকি তৈরি হয় এবং স্বচ্ছতার বড় ঘাটতি দেখা দেয়, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাজারে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য ইন্দোনেশিয়াকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছে সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে জনসাধারণের ন্যূনতম শেয়ার মালিকানা ১৫%-এ উন্নীত করা এবং করস্বর্গে অফশোর শেল কোম্পানি ব্যবহারের সুযোগ বন্ধে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী মালিকদের পরিচয় প্রকাশ করা। মর্যাদা কমে গেলে উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগে আইনি বিধিনিষেধের আওতায় থাকা বহু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিলকে অবিলম্বে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ার বিক্রি করতে হবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, এতে সর্বোচ্চ ৭.৮ বিলিয়ন ডলারের পুঁজি দেশ ছেড়ে যেতে পারে; সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে তা ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সংকটের পেছনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর শিকড় ইন্দোনেশিয়ার করপোরেট অভিজাতদের প্রতিষ্ঠিত চর্চায়। তাঁরা ব্যাপকভিত্তিক পুঁজি গঠনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সম্পদ সংরক্ষণ ও কর অপ্টিমাইজেশনের হাতিয়ার হিসেবে মূলত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিকে ব্যবহার করেছেন। ৯০% শেয়ারের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারগুলো শেয়ার বিক্রিতে মাত্র ০.১% চূড়ান্ত করহারের সুবিধা পায়। এর বিপরীতে ব্যক্তিগত লেনদেনে মূলধনি মুনাফার ওপর কর ২৫%। বাজারের স্থিতিশীলতার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ কম রাখার জন্য এটি শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি করে।
রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা রেটিং সংস্থার
বাজারের চাপ আরও বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম বন্ডের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে মুডিস রেটিংস। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, আগ্রাসী রাজস্ব সম্প্রসারণ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ঋণের স্থায়িত্বের জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর প্রধান সামাজিক কর্মসূচিগুলোকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনা মূল্যে স্কুলের খাবার কর্মসূচি এবং লাল-সাদা সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নে বাড়তি ব্যয়। এসব উদ্যোগে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ২.৯২%-এ পৌঁছেছে, যা মহামারি-পর্ব বাদ দিলে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারি ব্যয় ব্যবহারের ওপর বাড়তি মনোযোগ রাজস্বগত ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষত ইন্দোনেশিয়ার রাজস্বভিত্তি দুর্বল হওয়ায়।
মুডিসের বিবৃতি থেকে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে যে ১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগের এশীয় আর্থিক সংকটের পর থেকে ইন্দোনেশিয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা রাজস্ব শৃঙ্খলা বর্তমান প্রশাসনের কাছে আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নয়। সাবেক সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সরকারি উদার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হন। পাঁচ বছরের মেয়াদে তিনি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮%-এ উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজায় থাকা প্রায় ৫% গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় বড় উল্লম্ফন।
এসব সতর্কতা সত্ত্বেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবৃদ্ধির কর্মসূচি থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা নেই। অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো বর্তমান কৌশলকে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখান থেকে ফেরার উপায় নেই। এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, প্রধান কর্মসূচিগুলো এখন সরকারের স্থায়ী অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র বলেন, “আমরা এখন আর ফেরার অবস্থায় নেই, কারণ এগুলো সরকারের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।” পরে সরকারের মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, ঘাটতি নির্ধারিত ৩% সীমার নিচেই আছে এবং বছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলতে ব্যয়ের বড় অংশ ওই সময়ে করা হবে।
মৌসুমি প্রভাব ভোগব্যয়ের পূর্বাভাসে গতি আনছে
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে সহায়ক একটি বড় কারণ হলো ইসলামের পবিত্র রমজান মাস এবং এরপর ঈদুল ফিতরের উদ্যাপনের সময়। এই দুই উপলক্ষই বছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে পড়েছে। ২০২৫ সালে ছুটির সময়গুলো ছিল দ্বিতীয় প্রান্তিকে। ফলে তুলনামূলক ভিত্তি অনুকূল হচ্ছে এবং আগের বছরে দেখা যায়নি—এমন মাত্রায় ২০২৬ সালের প্রথম দিকের মাসগুলোতে ভোক্তা ব্যয় কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ক্যালেন্ডারের এই সমাপতনকে অভ্যন্তরীণ চাহিদায় গতি আনার বড় সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (বিপিএস)। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় ৫২.৯% আসে পারিবারিক ভোগ থেকে। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে এই ভোগ ৫.১১% বেড়েছিল। ছুটির মৌসুমের আগে খাবার, পরিবহন, যোগাযোগ ও খুচরা পণ্যে ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও একই রকম বা আরও ভালো ফল আশা করছেন কর্মকর্তারা। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাহ্যিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত হিসেবে ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে প্রায় ৫,০৮৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
প্রবৃদ্ধির সূচক ও জনকল্যাণের সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে আগুং বলেন, ভোক্তা আস্থা সূচকের বৃদ্ধি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রবৃদ্ধির প্রধান সূচক কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে বাস্তব উন্নতি হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। বিপিএসের প্রধান আমালিয়া আদিনিংগারও ব্যয়ের আচরণে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। লেনদেনের বড় অংশ অনলাইনে চলে যাচ্ছে এবং তরুণ জনগোষ্ঠী ক্রমবর্ধমানভাবে ভোগের ধরনকে প্রভাবিত করছে, ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলে যাওয়া খুচরা বাজারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। বৈশ্বিক ঝুঁকি ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও বছরের প্রথম দিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি করায় মৌসুমি সময়কে কর্মকর্তারা ইন্দোনেশিয়ার ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির গতিপথের জন্য সহায়ক ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।
কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও বিনিয়োগ পরিবেশ
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের আড়ালে ইন্দোনেশিয়া বড় ধরনের কাঠামোগত প্রতিকূলতার মুখে রয়েছে, যা সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নকে জটিল করতে পারে। নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক চাহিদার পূর্বাভাস দুর্বল হওয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রকল্প স্থগিত রাখে। এর ফলে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বার্ষিক হিসাবে ৮.৯% কমে যায়। টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকে সংকোচনের পাশাপাশি ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকের পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় পতন। চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী থাকলেও সামগ্রিক প্রবাহ আগের সময়গুলোর পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
দেশীয় বিনিয়োগ এই পতনের আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এর বাস্তবায়নমূল্য দাঁড়ায় ৪৯১.৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ, যা বার্ষিক হিসাবে ১৩.৯% বেশি। তবে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ এমন খাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেখানে উৎপাদনশীলতার সুফল অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত; অথবা তা বাজারের মৌলিক পরিস্থিতির বদলে নীতিগত প্রণোদনার কারণে হয়েছে। বৈশ্বিক কয়লার চাহিদা কমে যাওয়া ও তামার উৎপাদন হ্রাসের প্রভাবে তৃতীয় প্রান্তিকে খনি খাত প্রায় ২% সংকুচিত হয়, যা অন্য খাতগুলোর শক্তিশালী অবস্থার মধ্যেও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি করে।
সমালোচকদের যুক্তি, ৮% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনের মনোযোগ একসময় এমন সাময়িক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে, যা দীর্ঘস্থায়ী আস্থাকে দুর্বল করবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইন্দোনেশিয়া প্রকল্পের বিশ্লেষকেরা বলেন, “শুধু লক্ষ্য নির্ধারণে নয়, দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে।” বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা বর্তমানের কিছু লক্ষ্যকে অবাস্তব বলে বর্ণনা করেন।
রাজস্ব ব্যয়ের সুযোগ সীমিত এবং মুদ্রানীতির কার্যকারিতা কমে আসায় প্রচলিত প্রণোদনা দিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বিশ্বাসযোগ্য পথ ইন্দোনেশিয়ার হাতে খুব বেশি নেই। কম উৎপাদনশীলতা ও দুর্বল প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মোকাবিলায় সাহসী নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠছে। এর মধ্যে রয়েছে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, শুল্কের বাইরের বাধা কমানো এবং অঞ্চলভেদে নিয়মকানুনের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
খাতভিত্তিক চালিকা শক্তি ও নির্মাণ খাতের গতি
বৃহত্তর অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধিতে কিছু নির্দিষ্ট খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কথা। ২০২৬ সালে নির্মাণশিল্প ৬.৪% সম্প্রসারিত হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, বাটামে নংসা ডিজিটাল পার্কের ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসসহ ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে সরকারের পরিচালিত উদ্যোগ। জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আওতায় ২০৩৪ সাল পর্যন্ত মোট ৬৯.৫ গিগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য নিকেল ও তামাসহ প্রাকৃতিক সম্পদের পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াকরণে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও বিনিয়োগ আসছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে উৎপাদন খাত স্থিতিস্থাপকতা দেখায়। তৃতীয় প্রান্তিকে উৎপাদন ৫.৫৪% বাড়ে; ইস্পাত, যন্ত্রপাতি ও যানবাহন উৎপাদনের শক্তিশালী ফল এতে সহায়তা করে। ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ ক্রয় ব্যবস্থাপনা সূচক বেড়ে ৫১.২-এ দাঁড়ায়, যা কারখানার কার্যক্রমের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণও শক্তিশালী রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণবন্ত প্রযুক্তি স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমগুলোর একটি ধরে রেখেছে ইন্দোনেশিয়া। ই-কমার্সের প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ১০% ছাড়িয়ে চলেছে; আর সরবরাহ ও পরিবহন নেটওয়ার্কে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে ধীরে ধীরে পুরো দ্বীপপুঞ্জজুড়ে ব্যয় কমছে। দেশীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্তের সহায়তায় সৌর ও ভূতাপীয় প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও গতি এসেছে।
মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক ভারসাম্য
২০২৫ সালের শেষ দিকে একাধিকবার সুদের হার কমিয়ে নীতিগত সুদের হার ৪.৭৫%-এ নামিয়ে এনেছে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া। ২০২২ সালের অক্টোবরের পর এটিই সর্বনিম্ন। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধিতে অব্যাহত সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রাস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে, প্রায় ২.৬৫%-এ রয়েছে। ফলে অতিরিক্ত উত্তাপের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ছাড়াই প্রয়োজনে আরও প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে পুঁজিপ্রবাহের অস্থিরতা ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২৫ সালজুড়ে ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহর ওপর উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়নের চাপ ছিল, যাতে আগের লাভ মুছে যায়। বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে সতর্কভাবে সামঞ্জস্য না রেখে আরও সুদের হার কমালে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়া বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন। বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হওয়া এবং পণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য বাণিজ্য শর্ত কম অনুকূল হয়ে ওঠায় চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তৃতীয় প্রান্তিকে ৯.৯১% প্রবৃদ্ধিসহ ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি কার্যক্রম স্থিতিস্থাপক থাকলেও চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে চাহিদা মন্থর হওয়ার কারণে তা চাপের মুখে পড়তে পারে। পণ্য রপ্তানির ওপর দেশের নির্ভরতা মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিতে ফেলেছে। এর প্রভাব সরকারি রাজস্ব এবং করপোরেট বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে পড়তে পারে, বিশেষত কয়লা ও পাম তেল খাতে।
মূল বিষয়গুলো
- বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও মুডিসের নেতিবাচক পূর্বাভাস সত্ত্বেও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৬% হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী।
- স্বচ্ছতা ও ফ্রি-ফ্লোট নিয়ে উদ্বেগের কারণে এমএসসিআই সীমান্তবর্তী বাজারের মর্যাদায় নামিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা জানানোর পর, ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে জাকার্তা কম্পোজিট ইনডেক্স দুই দিনে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ধসের মুখে পড়ে।
- উপ-অর্থমন্ত্রী জুদা আগুংয়ের প্রত্যাশা, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে অর্জিত ৫.৩৯% প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়ে যাবে। তাঁর মতে, রমজান ও ঈদুল ফিতর পুরোপুরি প্রথম প্রান্তিকে পড়ায় মৌসুমি ভোগব্যয় বাড়বে।
- বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসন ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচিসহ আগ্রাসী ব্যয়ের উদ্যোগ বজায় রেখেছে। এতে রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ২.৯২%-এ পৌঁছেছে।
- ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৮.৯% কমেছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নির্মাণ, উৎপাদন ও পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়াকরণ খাত প্রবৃদ্ধিতে গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা দিতে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া সুদের হার কমিয়ে ৪.৭৫% করেছে। মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে, প্রায় ২.৬৫%-এ রয়েছে।
- বাজারের স্বচ্ছতা সংস্কার বাস্তবায়নে ইন্দোনেশিয়াকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময় দিয়েছে এমএসসিআই। তা না হলে সম্ভাব্য পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের মুখে পড়তে পারে দেশটি, যা পুঁজিপ্রবাহে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বহিঃপ্রবাহ ঘটাতে পারে।






