বিশ্বের প্রথম সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন শুরু, মেরু অঞ্চলের তীব্র ঠান্ডাও সামলাবে

পড়তে 11 মিনিট
বিশ্বের প্রথম সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন শুরু, মেরু অঞ্চলের তীব্র ঠান্ডাও সামলাবে

বাজারে নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তি

সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তিতে চালিত প্রথম গণ-উৎপাদিত যাত্রীবাহী গাড়ি উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছেছে। চীনা গাড়ি নির্মাতা চ্যাংআন অটোমোবাইল এবং ব্যাটারি জায়ান্ট সিএটিএল জানিয়েছে, নিও এ০৬ সেডান হবে প্রথম উৎপাদিত গাড়ি, যার শক্তি সঞ্চয়ে লিথিয়ামের বদলে সোডিয়াম ব্যবহার করা হবে। নির্মাতাদের বিদ্যুতায়ন পদ্ধতিতে এটি একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. বাজারে নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তি
  2. সোডিয়াম-আয়নে বদলে যাচ্ছে ব্যাটারির বাজার
  3. হিমশীতল উত্তরাঞ্চলের চ্যালেঞ্জ জয়
  4. চরম পরীক্ষায় টিকে থাকার মতো নির্মাণ
  5. সহজলভ্য উপাদানের অর্থনীতি
  6. পাশাপাশি লিথিয়াম ও সোডিয়াম
  7. গবেষণাগার থেকে শোরুমে
  8. মূল বিষয়গুলো

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার ইয়াকেশিতে আয়োজিত এক কৌশলগত উন্মোচনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে চরম শীতের মধ্যে প্রযুক্তিটি প্রদর্শন করে প্রতিষ্ঠান দুটি। সিএটিএলের ন্যাক্সট্রা ব্যাটারি প্যাকটির ধারণক্ষমতা ৪৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। প্রচলিত পরীক্ষার শর্তে এটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ চলতে পারে, ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে জনপ্রিয় লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামছে এটি।

এই অগ্রগতির বিশেষত্ব কেবল একটি মৌলের বদলে আরেকটি মৌল ব্যবহার নয়; বরং প্রচলিত ব্যাটারি যেখানে হিমশিম খায়, সেসব অঞ্চলে সোডিয়াম প্রযুক্তির নির্দিষ্ট কার্যকারিতাগত সুবিধাও এর কারণ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তবে শীতল আবহাওয়ায় এর সীমাবদ্ধতা এবং নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা নির্মাতাদের বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করেছে। নিও এ০৬ গবেষণাগারের কৌতূহল থেকে বাণিজ্যিক বাস্তবতায় উত্তরণের উদাহরণ। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এর উৎপাদন শুরুর কথা রয়েছে।

চ্যাংআন ও সিএটিএলের অংশীদারত্বে কয়েক দশক ধরে বিকাশের পর্যায়ে থাকা বিকল্প ব্যাটারি প্রযুক্তি পরিণতির পথে এগোচ্ছে। সোডিয়াম-আয়ন নিয়ে গবেষণা ১৯৮০-এর দশকে শুরু হলেও শক্তি ঘনত্বের সীমাবদ্ধতা ও চার্জ-চক্রের আয়ুষ্কালসংক্রান্ত সমস্যা এত দিন গাড়িতে বাণিজ্যিক ব্যবহার ঠেকিয়ে রেখেছিল। ইলেকট্রোড উপাদান ও ইলেকট্রোলাইটের মিশ্রণে সাম্প্রতিক অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বাধাগুলো দূর করেছে। নিও এ০৬ পরীক্ষামূলক নমুনা বা সীমিত উৎপাদনের প্রদর্শনী গাড়ি নয়; বরং বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন আবহাওয়ার কিছু অঞ্চলে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য তৈরি একটি গণ-উৎপাদিত গাড়ি।

সোডিয়াম-আয়নে বদলে যাচ্ছে ব্যাটারির বাজার

চার্জ ও ডিসচার্জের সময় ইলেকট্রোডের মধ্যে আয়ন চলাচলের মাধ্যমে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কাজ করে। এই নীতি লিথিয়াম ব্যাটারির মতোই। তবে লিথিয়ামের বদলে সোডিয়াম ব্যবহার করায় উপাদানের বৈশিষ্ট্য বদলে যায়, যা ব্যাটারির কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। সিএটিএলের ন্যাক্সট্রা সেলগুলোর শক্তি ঘনত্ব প্রতি কিলোগ্রামে ১৭৫ ওয়াট-ঘণ্টা, যা বর্তমান লিথিয়াম আয়রন ফসফেট প্রযুক্তির কাছাকাছি হলেও নিকেলসমৃদ্ধ রাসায়নিক প্রযুক্তির চেয়ে কম।

ব্যাটারিতে সেল-টু-প্যাক নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সেলগুলো সরাসরি প্যাকের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে, ফলে মাঝখানের মডিউল বাদ পড়ে এবং জায়গার ব্যবহার উন্নত হয়। এই নকশা কাঠামোগত বাড়তি অংশ কমিয়ে সোডিয়াম প্রযুক্তির কম আয়তনভিত্তিক শক্তি ঘনত্বের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দেয়। নিও এ০৬-এ বসানো ৪৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টার প্যাকটির ওজন প্রায় ২৫৭ কিলোগ্রাম। তাই সীমিত পাল্লার চাহিদা থাকা ছোট ও মাঝারি আকারের গাড়িতে এটি ব্যবহারযোগ্য।

প্রচলিত মডুলার নকশায় সেলগুলোকে আলাদা খাপে রেখে পরে প্যাকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ন্যাক্সট্রা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত সেল-টু-প্যাক পদ্ধতিতে সেলগুলো সরাসরি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে। এতে ওজন ও জটিলতা কমে এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ে। ফলে প্যাক সাজানোর দক্ষতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যা প্রাথমিক প্রজন্মের সোডিয়াম সেলের স্বাভাবিক শক্তি ঘনত্বের সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে দিতে সহায়তা করে। উন্নত নিকেল-কোবাল্ট-অ্যালুমিনিয়াম প্রযুক্তির তুলনায় প্রতি কিলোগ্রামে ওয়াট-ঘণ্টার মান কম হলেও এ কারণে প্রতিযোগিতামূলক পাল্লা পাওয়া সম্ভব হয়।

সিএটিএল এই প্রযুক্তি বিকাশে প্রায় এক দশক বিনিয়োগ করেছে। গবেষণায় ১০ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি ব্যয় করেছে এবং যাচাইপর্বে প্রায় তিন লাখ পরীক্ষামূলক সেল তৈরি করেছে। গাড়িতে সোডিয়াম প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি ৩০০ জনের বেশি গবেষক নিয়ে বিশেষ দল গঠন করেছে, যাঁদের মধ্যে ২০ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ। এ দীর্ঘ প্রস্তুতির ফলে যাত্রীবাহী গাড়ির সনদমান পূরণে সক্ষম ব্যাটারি তৈরি হয়েছে, যা সোডিয়াম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রথম।

বিজ্ঞাপন

হিমশীতল উত্তরাঞ্চলের চ্যালেঞ্জ জয়

শূন্যের নিচে তাপমাত্রায় ন্যাক্সট্রা সোডিয়াম-আয়ন ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেখা যায়। প্রচলিত লিথিয়াম ব্যাটারির কার্যক্ষমতা সাধারণত এমন পরিবেশে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ইনার মঙ্গোলিয়ায় যাচাই পরীক্ষায় নিও এ০৬ মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত এর কার্যক্রম স্থিতিশীল ছিল। মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ব্যাটারিটি ব্যবহারযোগ্য ধারণক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি ধরে রেখেছে, যা প্রচলিত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট সেল দিয়ে অর্জন করা কঠিন।

উত্তরাঞ্চলের শীতপ্রধান এলাকায় বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সম্ভাব্য গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের একটি সমাধান হতে পারে এ শীতসহনশীলতা। চরম শীতের পরিস্থিতিতে বর্তমান লিথিয়াম ব্যাটারির কার্যকর পাল্লা অর্ধেক কমে যেতে পারে, ফলে দীর্ঘ শীতকাল থাকা অঞ্চলের চালকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির ডিসচার্জ ক্ষমতা তুলনীয় লিথিয়াম আয়রন ফসফেট প্যাকের প্রায় তিন গুণ। এতে আশপাশের তাপমাত্রা অনেক কমে গেলেও গাড়ির তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও ড্রাইভট্রেন পর্যাপ্ত শক্তি পায়।

এর প্রভাব কেবল আরামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, গাড়ির ব্যবহারিক উপযোগিতার সঙ্গেও জড়িত। যেসব অঞ্চলে শীতকালে তাপমাত্রা নিয়মিত মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, সেখানে পাল্লা ও চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারলে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারিক সম্ভাবনাই বদলে যায়। সিএটিএল জানিয়েছে, এ কার্যকারিতার কারণে উত্তর চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল এবং নর্ডিক দেশগুলোর বাজারে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। এসব অঞ্চলে শীতের কারণে ঐতিহাসিকভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি গ্রহণের হার কম ছিল।

শীতকালে কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় ঠান্ডা অঞ্চলের বৈদ্যুতিক গাড়ির মালিকদের এত দিন চালানোর অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ব্যাটারির চার্জ বাঁচাতে তাঁরা কেবিন গরম করার ব্যবহার কমিয়েছেন এবং মহাসড়কে গতি সীমিত রেখেছেন। সোডিয়াম-আয়নের বিকল্পটি এসব আপসের অনেকটাই এড়াতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলে জানুয়ারি মাসে গাড়ি চালানোর সময় সাধারণত যে পাল্লা নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালানো সম্ভব হতে পারে। সারা বছর ব্যবহারের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়িকে যেসব অঞ্চলের ভোক্তারা আগে অবাস্তব মনে করতেন, সেখানে এই সক্ষমতা গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চরম পরীক্ষায় টিকে থাকার মতো নির্মাণ

নিরাপত্তার বিষয়টি সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে, বিশেষ করে তাপীয় স্থিতিশীলতা ও শারীরিক ক্ষতি প্রতিরোধের সক্ষমতার কারণে। সিএটিএল ন্যাক্সট্রা ব্যাটারিকে জাতীয় নিরাপত্তামানের চেয়েও কঠোর একাধিক পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন দিক থেকে চাপ প্রয়োগ, বৈদ্যুতিক ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করা এবং পুরোপুরি চার্জ থাকা অবস্থায় প্যাকটি সম্পূর্ণ করাত দিয়ে কেটে ফেলা। এসব চরম পরীক্ষায় ব্যাটারি থেকে ধোঁয়া বা আগুন বের হয়নি, তাপীয় অনিয়ন্ত্রণও দেখা যায়নি। উল্লেখযোগ্যভাবে, শারীরিকভাবে কেটে ফেলার পরও ব্যাটারিটি স্বাভাবিকভাবে ডিসচার্জ হতে থাকে।

সোডিয়াম-আয়ন সেলের মৌলিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে নিকেল-ম্যাঙ্গানিজ-কোবাল্ট ও লিথিয়াম আয়রন ফসফেট—উভয় ধরনের ব্যাটারির তুলনায় তাপীয় অনিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি কম। সোডিয়াম যৌগের উপাদানগত বৈশিষ্ট্য থেকে এ নিরাপত্তা সুবিধা আসে। যেসব আঘাত বা ক্ষতির পরিস্থিতিতে লিথিয়ামভিত্তিক ব্যবস্থা অকার্যকর হতে পারে, সেখানেও সোডিয়াম যৌগ স্থিতিশীল থাকে। গাড়ির যাত্রীদের জন্য সংঘর্ষ বা উৎপাদনজনিত ত্রুটির ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমে যাওয়ার অর্থ এটি।

এ ছাড়া, কোবাল্টের ব্যবহার বাদ দেওয়া এবং সোডিয়াম-আয়নের কিছু মিশ্রণে তামার চাহিদা কমানোর ফলে সমস্যাজনক খননপদ্ধতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খনিজের ওপর নির্ভরতা কমে। ন্যাক্সট্রা সেলে সিএটিএলের নির্দিষ্ট মালিকানাধীন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যার পূর্ণ বিবরণ প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করেনি। তবে সোডিয়ামের দিকে সাধারণভাবে অগ্রসর হওয়া কিছু অঞ্চলে লিথিয়াম উত্তোলনের নৈতিকতা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের সমাধানে সহায়তা করে।

ব্যবহার শেষে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাতেও কিছু সুবিধা রয়েছে। এগুলোর উপাদানে বিষাক্ততার উদ্বেগ কম এবং ভারী ধাতুযুক্ত লিথিয়াম ব্যাটারির তুলনায় পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তিতে কম জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। সোডিয়াম ব্যবস্থার জন্য পূর্ণাঙ্গ পুনর্ব্যবহার অবকাঠামো এখনো গড়ে উঠছে। তবে মৌলিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায়, গাড়ির পুরো জীবনচক্রে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কম হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সহজলভ্য উপাদানের অর্থনীতি

সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির কাঁচামাল অর্থনীতি ব্যাপক ব্যবহারের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেয়। পৃথিবীর ভূত্বকে সোডিয়ামের প্রাচুর্য লিথিয়ামের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি। এটি নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত নয়, বরং বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে লিথিয়াম কার্বনেটের বাজারে দেখা দেওয়া সরবরাহ সংকট ও দামের ওঠানামা প্রায় দূর করা সম্ভব। চলতি বছরের শুরুর দিকে লিথিয়াম কার্বনেটের দাম প্রতি টনে ১ লাখ ৭০ হাজার ইউয়ানে পৌঁছেছিল, যেখানে ২০২১ সালে দাম ছিল প্রায় ৫০ হাজার ইউয়ান।

শিল্প বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে উল্লেখযোগ্য ব্যয়সুবিধা মিলবে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রজন্মের সোডিয়াম সেলের দাম প্যাক পর্যায়ে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৭৭ ডলারে নামতে পারে। দ্বিতীয় প্রজন্মে তা প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৪০ ডলারে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্লুমবার্গএনইএফের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান লিথিয়াম আয়রন ফসফেট প্যাকের গড় দাম প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৮১ ডলার। এ হিসাবে সোডিয়াম প্রযুক্তির দাম প্রতিযোগিতামূলক, যদিও গাড়িতে একীভূত করার প্রকৃত ব্যয় নির্মাতাভেদে অনেক বদলে যায়।

তাৎক্ষণিক দামের বাইরে, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য একক উৎসের খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাওয়া গাড়ি নির্মাতাদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। সোডিয়াম নানা অঞ্চলে পাওয়া যায় বলে বর্তমানে লিথিয়াম সরবরাহব্যবস্থার বাইরে থাকা এলাকাতেও ব্যাটারি উৎপাদন সম্প্রসারণ সম্ভব। এতে কাঁচামাল পরিবহনের খরচ ও কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে। সিএটিএল জানিয়েছে, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে প্রাথমিক পর্যায়ের বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে, ফলে আরও বেশি ভোক্তার কাছে বৈদ্যুতিক যান চলাচল সহজলভ্য হবে।

সোডিয়াম প্রযুক্তিতে সিএটিএলের অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে এ প্রযুক্তির জন্য নির্দিষ্ট উৎপাদন লাইন এবং সরবরাহব্যবস্থার অংশীদারত্ব। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির সরবরাহ ২০২৫ সালের ৯ গিগাওয়াট-ঘণ্টা থেকে চার বছরের মধ্যে বেড়ে ১,০০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি হবে। উদীয়মান ব্যাটারি প্রযুক্তির মধ্যে এটি দ্রুততম উৎপাদন সম্প্রসারণের একটি হতে পারে। এ উৎপাদন সক্ষমতা শুধু গাড়ি নয়, স্থির জ্বালানি সঞ্চয়ব্যবস্থাতেও কাজে লাগবে, যেখানে ওজন ও আয়তনের চেয়ে দাম ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি লিথিয়াম ও সোডিয়াম

সিএটিএল এ উন্মোচনকে দ্বৈত রাসায়নিক প্রযুক্তির যুগের সূচনা বলে বর্ণনা করেছে। এ যুগে সব ক্ষেত্রে লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাতারা ব্যাটারি প্রযুক্তি নির্বাচন করবেন। প্রতিষ্ঠানটি একই সময়ে লিথিয়াম প্রযুক্তির অগ্রগতির কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫সি চার্জিং প্যাক, যা খালি থেকে পূর্ণ চার্জ হতে প্রায় ১২ মিনিট নেয় এবং ৩,০০০ চার্জ-চক্রের পরও ৮০ শতাংশ ধারণক্ষমতা ধরে রাখে। এতে গাড়িটি ১০ লাখ মাইলের বেশি চলতে পারে।

সমান্তরালে এ দুই প্রযুক্তির বিকাশ থেকে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে এগুলো পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে। সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চরম তাপমাত্রায় চলা গাড়ি, মাঝারি পাল্লার চাহিদা থাকা শহুরে যাত্রী এবং দাম-সচেতন বাজারের জন্য বেশি উপযোগী বলে মনে হচ্ছে। দীর্ঘ পাল্লার গাড়ি ও দ্রুত চার্জের প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যবহারে লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি, বিশেষ করে উন্নত নিকেলসমৃদ্ধ মিশ্রণ ও উচ্চ ঘনত্বের ফসফেট প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

একই সময়ে ঘোষিত সোডিয়াম-আয়ন ন্যাক্সট্রা ও ৫সি লিথিয়াম প্যাকের পার্থক্য ভবিষ্যতে ব্যাটারি নির্বাচনে বিশেষায়িত পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে। সোডিয়াম প্যাক যেখানে তাপীয় স্থিতিশীলতা ও শীতসহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়, ৫সি লিথিয়াম ব্যবস্থা সেখানে দ্রুত চার্জ এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব চাওয়া চালকদের লক্ষ্য করে। তাত্ত্বিকভাবে এ ৫সি ব্যবস্থা অল্প সময়ের বিরতিতে পুরো চার্জ নিতে পারে, যা সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক গাড়ি ক্রেতাদের আরেকটি বড় উদ্বেগের সমাধান করে। দুই ধরনের সমাধান দেওয়ায় সিএটিএল গাড়ি নির্মাতাদের সব গ্রাহকের ওপর একটিমাত্র আপসের সমাধান চাপিয়ে না দিয়ে প্রকৃত ব্যবহারধারা অনুযায়ী পাওয়ারট্রেনের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের সুযোগ দিচ্ছে।

চ্যাংআন অ্যাভাটার, ডিপাল, ছিয়ুয়ান ও ইউনিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়িতে সোডিয়াম-আয়ন বিকল্প যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এতে পাওয়ারট্রেনের বিকল্প বাড়ানোর কৌশলগত অঙ্গীকারের ইঙ্গিত মেলে। প্রতিষ্ঠানটি চোকো-সোয়াপ ব্যাটারি বদল নেটওয়ার্কও চীনের ১৪০টি শহরে তিন হাজারের বেশি স্টেশনে সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। শীতের কারণে ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন উত্তরাঞ্চলকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় সোডিয়াম ব্যাটারিচালিত গাড়ি বাস্তবে ব্যবহারের জন্য এ অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়ক হবে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণাগার থেকে শোরুমে

চ্যাংআন নিও এ০৬ ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ চীনের বাজারে আসবে। সিএটিএল প্রথম সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তির পরিকল্পনা ঘোষণার পর প্রায় তিন বছরের নিবিড় উন্নয়নের পরিণতি হবে এ গাড়ি। কিয়ুয়ান এ০৬ নামেও পরিচিত গাড়িটির প্ল্যাটফর্মটি আগে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিসহ বাজারে এসেছিল, যার পাল্লা ৬৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তবে সোডিয়াম সংস্করণটি এমন একটি নির্দিষ্ট বাজারের জন্য, যেখানে সর্বোচ্চ পাল্লার চেয়ে শীতকালে নির্ভরযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজারের পূর্বাভাসে এ প্রযুক্তি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রিসিডেন্স রিসার্চের হিসাব, বৈশ্বিক সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাজার ২০২৫ সালের ১.৩৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৪ সালে ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ২০২৬ সালকে গাড়িতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হচ্ছে। সিএটিএল জানিয়েছে, ন্যাক্সট্রার ভবিষ্যৎ সংস্করণে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির পাল্লা ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার হতে পারে। বর্ধিত পাল্লার ও হাইব্রিড গাড়িতে শুধু বৈদ্যুতিক শক্তিতে ৪০০ কিলোমিটার চলার সক্ষমতাও আসতে পারে।

নিও এ০৬-এর যাচাই পরীক্ষা শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিভিন্ন ভূপ্রকৃতিতে বাস্তব ব্যবহারের পরিস্থিতিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইনার মঙ্গোলিয়ার ইয়াকেশি পরীক্ষাক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়মিত মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ছিল। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর্দ্রতা ও ইউরোপের আল্পস অঞ্চলের উচ্চতায় কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের কর্মসূচিও নেওয়া হবে। ভোক্তাদের হাতে পৌঁছানোর আগে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি যাতে পরীক্ষিত লিথিয়াম ব্যবস্থার সমমানের নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করে, তা নিশ্চিত করাই এ বিস্তৃত পরীক্ষার লক্ষ্য।

আপাতত এ গাড়ির বাজারজাতকরণ চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যদিও ১১৭টি আন্তর্জাতিক বাজারে চ্যাংআনের বিক্রয় কার্যক্রম রয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ লাখ গাড়ি বিক্রি করেছে। সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠায় এই বিপুল বিক্রির পরিমাণ সহায়ক। প্রযুক্তিটি পরিণত হলে এবং সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠলে উত্তরাঞ্চলের শীতপ্রধান এলাকায় বৈদ্যুতিক গাড়ি গ্রহণের পথে বাধা হয়ে থাকা কার্যক্ষমতাসংক্রান্ত অভিযোগের সমাধানে পশ্চিমা নির্মাতারাও একই ধরনের গাড়ি আনতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • সিএটিএলের ৪৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টার ন্যাক্সট্রা প্যাক ব্যবহার করে চ্যাংআন নিও এ০৬ সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিচালিত প্রথম উৎপাদিত যাত্রীবাহী গাড়ি হতে যাচ্ছে
  • মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সোডিয়াম প্রযুক্তির ধারণক্ষমতার ৯০ শতাংশের বেশি বজায় থাকে এবং মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও স্বাভাবিকভাবে চার্জ নেওয়া যায়; চরম শীতে লিথিয়াম ব্যাটারির চেয়ে এটি ভালো কাজ করে
  • চীনের সিএলটিসি পরীক্ষাচক্রে ব্যাটারিটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পাল্লা দেয়, যা প্রাথমিক পর্যায়ের লিথিয়াম আয়রন ফসফেট গাড়ির কাছাকাছি
  • ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করা ও করাত দিয়ে কাটাসহ চরম পরীক্ষায় আগুন বা তাপীয় অনিয়ন্ত্রণ দেখা যায়নি, যা উন্নত নিরাপত্তার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে
  • লিথিয়ামের তুলনায় সোডিয়াম প্রায় এক হাজার গুণ বেশি সহজলভ্য; উৎপাদন বাড়লে সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য ও সম্ভাব্য ব্যয়হ্রাসের সুযোগ রয়েছে
  • সিএটিএল ও চ্যাংআনের মতে, এটি দ্বৈত রাসায়নিক প্রযুক্তির যুগের শুরু। সোডিয়াম শীতপ্রধান অঞ্চল ও দাম-সচেতন বাজারের জন্য, আর লিথিয়াম দীর্ঘ পাল্লার গাড়ির জন্য ব্যবহৃত হবে
  • ২০২৬ সালের মাঝামাঝি চীনে গাড়িটি বাজারে আসবে। অ্যাভাটার, ডিপাল, ছিয়ুয়ান ও ইউনিসহ চ্যাংআনের বিভিন্ন ব্র্যান্ডে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে