মুডিসের কড়া সতর্কবার্তায় বাজারে পতন
মুডিস ইনভেস্টরস সার্ভিসের কড়া সতর্কবার্তায় প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার বাজার বড় দরপতন নিয়ে লেনদেন শুরু করে। জাকার্তা কম্পোজিট সূচক ২ শতাংশের বেশি কমে যায় এবং রুপিয়ার দর প্রতি ডলারে ১৬,৮৮০-এ নেমে আসে, যা ২২ জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন। বৃহস্পতিবার মুডিস দেশটির ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিলে বিক্রির চাপ আরও বাড়ে। সংস্থাটি Baa2 ঋণমান অপরিবর্তিত রেখেছে, তবে সতর্ক করেছে যে নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সূচিপত্র
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে খারাপ সময় বোধ হয় হতে পারত না। বৈশ্বিক সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান MSCI Inc. ইন্দোনেশিয়ার সিকিউরিটিজে স্বচ্ছতার গুরুতর ঘাটতি চিহ্নিত করার কয়েক দিন পরই এই পূর্বাভাস অবনমন হলো। এর জেরে টানা দুই দিনের বাজারধসে ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্য হারায়। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর অধীনে নীতির গতিপথ নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দেন। স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার থেকে বিদেশিরা নিট ৮৬০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এতে ২০২৫ সালে মোট অর্থপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে।
বাজারের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। বৃহস্পতিবার ০.৫ শতাংশ কমে বন্ধ হওয়া বেঞ্চমার্ক জাকার্তা কম্পোজিট সূচক গত সপ্তাহের ৬.৯ শতাংশের বড় পতন আরও বাড়ানোর পথে ছিল। মুডিসের ঘোষণার পর দীর্ঘমেয়াদি ডলার-নির্ধারিত সরকারি বন্ডের দাম ০.৩ থেকে ০.৫ সেন্ট কমে যায়। ট্রেডওয়েবের তথ্য অনুযায়ী, অনেক বন্ড পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন দরে লেনদেন হচ্ছিল। গত মাসের শেষ দিকে প্রতি ডলারে ১৬,৯৮৫-এ নেমে রেকর্ড সর্বনিম্ন ছোঁয়ার পর রুপিয়ার দর সেই পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে; চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে মুদ্রাটির দর প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
নেতিবাচক পূর্বাভাসের কারণ কী?
Baa2 ঋণমান বহাল রেখে পূর্বাভাস নেতিবাচক করার মুডিসের সিদ্ধান্তে নতুন সরকারের নীতির গতিপথ নিয়ে নির্দিষ্ট উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে। সংস্থাটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নীতিনির্ধারণে পূর্বানুমানযোগ্যতা কমে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের ভাষ্য, নীতিগুলোর মধ্যে দুর্বল সমন্বয় এবং বাজারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ যোগাযোগ শেয়ারবাজারের অস্থিরতা ও বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, পাশাপাশি নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে ধারণাও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
পূর্বাভাস পরিবর্তনের পেছনে ছয়টি বড় কারণের কথা বলেছে সংস্থাটি। প্রথমত, মুডিসের মূল্যায়নে সরকারি নীতির গতিপথ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা দুর্বল হয়েছে; বিশ্বব্যাপী সুশাসন সূচকে, বিশেষ করে সরকারের কার্যকারিতা ও নিয়ন্ত্রক মানের ক্ষেত্রে, অবনতিই এর প্রতিফলন। তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয় নীতির কারণে রাজস্ব ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চাভিলাষী সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সীমিত রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার অসামঞ্জস্যের দিকে নজর দিয়েছে সংস্থাটি।
এসব কর্মসূচির মধ্যে বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার উদ্যোগ এবং সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ কমিয়ে এবং বাজেট পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে এগুলোর অর্থায়ন হচ্ছে। মুডিস সতর্ক করেছে, কর্মসূচিগুলো আরও সম্প্রসারণ করা হলে অর্থনীতির আকারের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট বাজেট সামলানোর ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতার ওপর চাপ পড়তে পারে। চতুর্থত, ৯০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ তদারককারী সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারার শাসনব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এই সম্পদের মূল্য ইন্দোনেশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।
পঞ্চমত, বিতর্কিত নীতিগত আলোচনা অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান ৩ শতাংশ সীমার বেশি রাজস্ব ঘাটতির অনুমোদিত সীমা বাড়ানোর বিতর্ক, ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার দায়িত্ব ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নীতিতে পরিবর্তন। ষষ্ঠত, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছে মুডিস। আয় বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি জনবিক্ষোভও বাড়ছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, উদ্বেগটি ভুল-বোঝাবুঝি
মুডিসের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ। তারা একে অর্থনৈতিক কৌশলের মৌলিক সমালোচনা নয়, বরং সাময়িক ভুল-বোঝাবুঝি হিসেবে তুলে ধরেছে। অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাংগা হার্তার্তো এই অবস্থানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর দাবি, রেটিং সংস্থা ও বৈশ্বিক আর্থিক বাজার দেশটির নতুন প্রবৃদ্ধির মডেল বুঝতে পারছে না।
এটা ঠিক যে আমাদের বাজেট কিছুটা ভিন্ন, কারণ আমরা বিনা মূল্যে খাবার, রেড অ্যান্ড হোয়াইট সমবায় এবং জনসেবার মতো প্রেসিডেন্টের কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আর্থিক সেবা কর্তৃপক্ষের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এয়ারলাংগা বলেন, আগে বিনিয়োগে সরাসরি অর্থায়ন করত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা সরকারি বাজেট। এখন তা দানান্তারার মাধ্যমে করা হচ্ছে। তাঁর যুক্তি, এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাবনা কাজে লাগানো ও সংস্কার করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে চেয়ে আসছিলেন।
সেপ্টেম্বরে সম্মানিত শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীকে বরখাস্ত করার পর দায়িত্ব নেওয়া অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া শুক্রবার একইভাবে বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, পূর্বাভাসের পরিবর্তনটি কেবল একটি ধারণাভিত্তিক প্রক্ষেপণ; দেশের বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের ওপর এর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব নেই। তিনি স্বীকার করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি নিয়ে মুডিস উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে পরিস্থিতি সামলানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন তিনি।
তারা উদ্বিগ্ন যে ঘাটতি বাড়তে পারে। তবে তারা এটাও জানে যে আমি পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলাতে পারি। কোনো অনিয়ন্ত্রিত অপচয় হচ্ছে না, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার গভর্নর পেরি ওয়ারজিয়ো বলেন, পূর্বাভাস অবনমনের অর্থ অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া নয়। পর্যাপ্ত তারল্য, ব্যাংকের শক্তিশালী মূলধন এবং ঋণঝুঁকি কম থাকায় আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ভালোভাবে বজায় রয়েছে বলে তিনি জোর দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতির সমন্বয় জোরদার এবং যোগাযোগ ও বাজারের আস্থা ধরে রাখতে সরকারের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
প্রাবোওর উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির সঙ্গে বাজার বাস্তবতার সংঘাত
নেতিবাচক পূর্বাভাসে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্য এবং ইন্দোনেশিয়ার বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সতর্ক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মধ্যে বাড়তে থাকা টানাপোড়েন প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় আসার পর ৭৪ বছর বয়সী সাবেক বিশেষ বাহিনীর এই কমান্ডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থির ৫ শতাংশ থেকে বছরে ৮ শতাংশে উন্নীত করতে আগ্রাসী কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রের বড় ধরনের হস্তক্ষেপ ও সামাজিক ব্যয় প্রয়োজন।
প্রাবোওর নীতি জোকো উইদোদোর শাসনামলের কারিগরিনির্ভর সতর্কতা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি। রাজস্ব বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থানের জন্য বহুল সম্মানিত অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাবতীর স্থলে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষে থাকা সম্প্রসারণমুখী অর্থনীতিবিদ পুরবায়া ইউধি সাদেওয়াকে। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর আরোপিত ৩ শতাংশ সীমার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবারসহ বড় পরিসরের সামাজিক কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় কয়েক কোটি স্কুলশিক্ষার্থী ও গর্ভবতী নারীকে ভর্তুকি মূল্যে খাবার দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণগুলোর একটি।
নতুন কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে দানান্তারা ইন্দোনেশিয়া, একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল, যা ৯০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনাকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ একীভূত করে। তহবিলটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে প্রতিবেদন দেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে আরও দক্ষ করা এবং ভবিষ্যতের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য মূলধন জোগানো এর লক্ষ্য। তবে এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের শাসনব্যবস্থা, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকার এখনও স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেছে মুডিস। প্রচলিত বাজেট প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এটি কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগও বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করেছে। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিজের ভাতিজাকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রাবোও। রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ঘনিষ্ঠতর সমন্বয় যখন চাইছে সরকার, তখন এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার ঋণ অর্থায়ন কর্মসূচিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টাও করেছে প্রশাসন। এতে মূল্যস্থিতিশীলতাকে প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বজায় রাখার বদলে সরকারি ঘাটতিতে অর্থ জোগানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
একাধিক সংকটে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয়
২০২৬ সালের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে অস্থিরতার মধ্যে মুডিসের পূর্বাভাস অবনমন সর্বশেষ ধাক্কা মাত্র। গত সপ্তাহে MSCI Inc. সতর্ক করার পর সংকটের শুরু হয়। সংস্থাটি জানায়, মালিকানা ও লেনদেনে স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ মে মাসের মধ্যে সমাধান না হলে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারকে উদীয়মান বাজার থেকে সীমান্তবর্তী বাজারের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার স্বচ্ছতার দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরে সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি। তাদের ভাষ্য, জটিল পারস্পরিক শেয়ার মালিকানার কাঠামো এবং বাজারে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের কম অনুপাতের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পক্ষে প্রকৃত বাজার মূলধন ও তারল্য যাচাই করা কঠিন। ওই সতর্কবার্তায় আতঙ্কিত বিক্রি শুরু হয়; বাজারমূল্য থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুছে যায় এবং স্টক এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।
কর্তৃপক্ষ পরে পুঁজিবাজারের শাসনব্যবস্থা সংস্কার এবং MSCI-এর উদ্বেগ নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের ন্যূনতম অনুপাত দ্বিগুণ করে ১৫ শতাংশ করার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এই ঘটনা দেশটির বাজার অবকাঠামোর গভীর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। আস্থা স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে দ্রুত পদত্যাগ ও নীতিগত সমন্বয় করা হলেও অনিচ্ছাকৃতভাবে তা সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নিয়ে মুডিসের উদ্বেগ আরও জোরদার করে থাকতে পারে। সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য MSCI ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষকে মে মাস পর্যন্ত সময় দিয়েছে; তা না হলে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস করা হবে, যার ফলে উদীয়মান বাজারভিত্তিক সূচক তহবিলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ার বিক্রি করবে।
সুমাত্রার মার্তাবে সোনার খনি নিয়ে চলমান বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। হংকংভিত্তিক জার্ডিন ম্যাথিসন হোল্ডিংসের নিয়ন্ত্রণে থাকা খনিটি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান PT Astra International-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের ভয়াবহ বন্যার পর লাইসেন্স বাতিল হওয়া ২৮টি খনির একটি মার্তাবে অধিগ্রহণের কথা ভাবছিল দানান্তারা। ওই বন্যায় ১,১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। খনিটি নিয়ে যোগাযোগে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দানান্তারার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা দোনি ওস্কারিয়া সম্পদটি অধিগ্রহণের জন্য পারমিনাস নামে নতুন কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। পরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জার্ডিনকে জানান, এমন কোনো অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেই।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরকার সম্পদ দখল করতে পারে বলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা বেড়েছে। প্রাবোও যাদের "লুটেরা ধনকুবের" বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। ২০২৬ সালে কথিত অবৈধ পরিচালকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পরিমাণ জমি বাজেয়াপ্ত করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। গত মাসে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে "লোভনির্ভর অর্থনীতি"র সমালোচনা করে দরিদ্র নাগরিকদের অবস্থার উন্নয়নের অঙ্গীকার করেন প্রাবোও। এতে প্রতিষ্ঠিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আইনের শাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক ঝুঁকি ও বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের সীমা
ইন্দোনেশিয়ার পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য অর্থনীতিগুলোর চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন, বিশেষত ফিলিপাইনের। মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব সংহতি নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগে ২০২১ সালে ফিচ রেটিংস ফিলিপাইনের পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছিল। ফিচের হিসাবে বর্তমানে দুই দেশেরই ঋণমান BBB। কোনো একটির ঋণমান সরাসরি কমে গেলে তারা BBB-তে নেমে বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের শেষ প্রান্তে পৌঁছাবে; সেখান থেকে মাত্র এক ধাপ নামলেই ঋণমান ‘জাঙ্ক’ বা বিনিয়োগ-অনুপযোগী হবে।
বিনিয়োগযোগ্য ঋণমান হারানোর পরিণতি গুরুতর হতে পারে। ২০২১ সালে S&P ও ফিচের কাছ থেকে পরপর দুটি অবনমনের পর কলম্বিয়ার ঋণমান বিনিয়োগ-অনুপযোগী পর্যায়ে নেমে গেলে দেশটির বন্ড ও মুদ্রায় চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের সম্পদ ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এতে বিনিয়োগ থেকে সরে যান। একই পরিণতিতে বিদেশি তহবিলের ব্যাপক বিক্রি শুরু হবে এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে, এ বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা পুরোপুরি সচেতন।
ফিলিপাইনের তুলনায় বর্তমান সংকটের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি কিছুটা শক্তিশালী ছিল। ২০২০ সালে দেশটির জিডিপি ২.০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল, যা ফিলিপাইনের ৯.৬ শতাংশ পতনের তুলনায় অনেক কম। আর জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশের সমান ঋণের অনুপাত ম্যানিলার ৫২ শতাংশের তুলনায় সামলানো সহজ। তবে ফিলিপাইনের সমস্যা ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান সংকটের কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। এতে মনে হচ্ছে, রেটিং সংস্থাগুলো এখন জাকার্তার দিকেও একই ধরনের সংশয় নিয়ে নজর দিচ্ছে।
বাহ্যিক দুর্বলতা ঝুঁকির আরও একটি স্তর যোগ করেছে। মহামারির সময় আমদানি চাহিদা ভেঙে পড়ায় দুই দেশেরই চলতি হিসাবের ভারসাম্যের উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু অর্থনীতি খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চলতি বছরে ডলারের বিপরীতে রুপিয়ার দর প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। মুদ্রার আরও অবমূল্যায়ন হলে ডলার-নির্ধারিত ঋণ পরিশোধে কর্তৃপক্ষকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে; এতে মুদ্রার দর আরও কমার ঝুঁকি রয়েছে।
আরও অবনমনের ধারার আশঙ্কা বিশ্লেষকদের
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জাকার্তা নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে অন্য রেটিং সংস্থাগুলোও শিগগির একই পথে হাঁটতে পারে—মুডিসের পূর্বাভাস পরিবর্তন সেই সতর্কবার্তা। OCBC-এর অর্থনীতিবিদেরা এই পদক্ষেপকে "সতর্কবার্তার প্রথম ধাক্কা" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে S&P বা ফিচও একই পদক্ষেপ নিতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
মুডিসের পূর্বাভাস অবনমন একটি সতর্কবার্তার প্রথম ধাক্কা। নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা বেশি থাকলে অন্য রেটিং সংস্থাগুলোও একই পদক্ষেপ নিতে পারে। কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, কারণ আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে ঋণমান অবনমন এড়াতে বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত সিদ্ধান্ত অত্যাবশ্যক।
মিরায়ে অ্যাসেট সেকুরিতাস ইন্দোনেশিয়ার বাজার বিশ্লেষক রুলি আর্য উইসনুব্রোতো ইন্দোনেশিয়ার সম্পদের ওপর যুক্ত হওয়া বাড়তি ঝুঁকি প্রিমিয়ামের সম্ভাব্য বাজার প্রভাব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও বড় ব্যাংকগুলো বিশেষ চাপের মুখে পড়বে। রুপিয়া এবং মূলধন প্রবাহের ওপরও প্রভাব পড়বে।
CIMB-এর অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার সুযোগ সীমিত করবে। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার পাবে। প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর সুদের হার কমাবে না বলে তাঁদের ধারণা। রুপিয়ার দুর্বলতা এবং এর কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি মুদ্রানীতি কঠোর রাখবে, যদিও সরকার দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য চাপ দিচ্ছে।
আপাতত ইন্দোনেশিয়ার Baa2 ঋণমান বহাল আছে, যা বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের সীমার এক ধাপ ওপরে। তবে নেতিবাচক পূর্বাভাসের অর্থ, সরকার টেকসই রাজস্ব শৃঙ্খলা দেখাতে, বাহ্যিক দুর্বলতা দূর করতে অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন জোরদার করতে ব্যর্থ হলে মুডিসের পরবর্তী পদক্ষেপ সরাসরি ঋণমান অবনমন হতে পারে। চলতি বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যে শেয়ারবাজার থেকে ১ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। ভুলের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
মূল তথ্য
- নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ার ঋণমানের পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে মুডিস; তবে বিনিয়োগযোগ্য Baa2 ঋণমান বহাল রেখেছে
- শুক্রবার জাকার্তা কম্পোজিট সূচক ২ শতাংশের বেশি কমেছে; রুপিয়ার দর প্রতি ডলারে ১৬,৮৮০-এ নেমেছে, যা ২২ জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন
- ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছেন; এর মধ্যে গত বুধবার থেকে বিক্রি করেছেন ৮৬০ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার
- অর্থনৈতিক বিষয়ক প্রধান মন্ত্রী এয়ারলাংগা হার্তার্তো সরকারের বাজেট পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, দানান্তারা ও সামাজিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক নতুন প্রবৃদ্ধির কৌশল রেটিং সংস্থাগুলো বুঝতে পারছে না
- অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া পূর্বাভাস পরিবর্তনকে কেবল একটি প্রক্ষেপণ বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছেন; তাঁর মতে, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায় এর তাৎক্ষণিক প্রভাব নেই
- মুডিস ছয়টি মূল উদ্বেগ চিহ্নিত করেছে: নীতির অনিশ্চিত গতিপথ, সুশাসনের দুর্বল সূচক, সামাজিক ব্যয়জনিত রাজস্ব ঝুঁকি, দানান্তারা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিতর্কিত নীতিগত আলোচনা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি
- বিশ্লেষকদের সতর্কতা, ঋণমান ‘জাঙ্ক’ পর্যায়ে নামার ঝুঁকি এড়াতে সরকারের হাতে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য ১২ থেকে ১৮ মাস সময় রয়েছে






