এনার্জি ড্রিংক থেকে ইভি ব্যাটারি: হংকংয়ের তালিকাভুক্তির নতুন চেহারা
এ ফেব্রুয়ারিতে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে দেখা যাচ্ছে এক অস্বাভাবিক জুটি। চীনের বৃহত্তম এনার্জি ড্রিংক প্রস্তুতকারকদের একটি ইস্টরক বেভারেজ ৩ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ১.৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ শূকর উৎপাদনকারী মুইয়ুয়ান ফুডস্টাফ একই ধরনের লেনদেনে ১.৪ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতের এই পরপর দুটি চুক্তি এশিয়ার আর্থিক বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- এনার্জি ড্রিংক থেকে ইভি ব্যাটারি: হংকংয়ের তালিকাভুক্তির নতুন চেহারা
- রেকর্ডসংখ্যক লেনদেন ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
- ভূরাজনৈতিক মোড়: কেন চীনা কোম্পানিগুলো দেশে ফিরছে
- এ প্লাস এইচ কৌশল বুঝে নেওয়া
- প্রযুক্তি জায়ান্টের বাইরে: হার্ড টেকের বিপ্লব
- নিয়ন্ত্রক সুবিধা: বেইজিং ও হংকংয়ের সমন্বয়
- দিগন্তে বড় অঙ্কের চুক্তি
- বিনিয়োগকারীদের পালাবদল: পশ্চিম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে
- মূল্যায়নের ব্যবধান ও বাজারের কার্যপ্রণালি
- মূল বিষয়গুলো
এই তালিকাভুক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন করপোরেট সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি কিছু। কয়েক বছরের মন্দার পর হংকংয়ের আর্থিক গুরুত্ব ফিরে আসার চিহ্ন এগুলো। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মহামারির পর দীর্ঘ মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই এক্সচেঞ্জে প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) সবচেয়ে সক্রিয় সময় চলছে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে মার্কিন বাজার থেকে সরে গিয়ে দ্বৈত তালিকাভুক্তির জন্য মূল ভূখণ্ডের চীনা কোম্পানিগুলোর আগ্রহের ঢেউ এই পুনরুত্থানকে ত্বরান্বিত করছে।
২০২৫ সালের জুনে এই পুনরুত্থানের ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড (সিএটিএল) ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রস্তাব সম্পন্ন করে। প্রথম দিনে শেয়ারের দাম ১৬% বাড়া এই চুক্তিটি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বের বৃহত্তম আইপিও এবং চার বছরের মধ্যে হংকংয়ের সবচেয়ে বড় তালিকাভুক্তি। ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের আধিপত্যে থাকা আগের সময়ের বিপরীতে, এখনকার তালিকাভুক্তির পাইপলাইনে রয়েছে জ্বালানি সঞ্চয় থেকে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
রেকর্ডসংখ্যক লেনদেন ঐতিহাসিক ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধারের চিত্র। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে ৪২টি আইপিও হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট ১০৭ বিলিয়ন হংকং ডলার (১৩.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সংগ্রহ করা হয়েছে। এই অঙ্ক ২০২৪ সালের পুরো বছরের মোট সংগ্রহকে ছাড়িয়ে গেছে এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০০% বেশি। প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের (পিডব্লিউসি) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো আইপিওর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে হংকং। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর এই অবস্থানে ছিল শহরটি।
এই গতি প্রচলিত শেয়ার বিক্রির বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি ও রূপান্তরযোগ্য বন্ডসহ ইকুইটি পুঁজিবাজারে মোট ইস্যুর পরিমাণ বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫২% বেশি। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জানুয়ারিতেই নতুন তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা ওই মাসের জন্য রেকর্ড সর্বোচ্চ।
বছরের পর বছর কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পর এই ত্বরণ এসেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের প্রযুক্তি খাতে দমনমূলক ব্যবস্থা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিনিয়োগকারীদের দুর্বল মনোভাবের চাপে হংকং বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ আইপিও বাজারের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে। ২০২৫ সালের জোয়ার গত বছর এক্সচেঞ্জটিকে বার্ষিক তালিকায় চতুর্থ স্থানে নিয়ে আসে। ৭১টি নতুন তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ১১.২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৮.৯% বেশি। বর্তমান পূর্বাভাস বলছে, পুরো বছরের মোট আয় ২০০ বিলিয়ন হংকং ডলার (২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০১৯ সালের পর দেখা যায়নি এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ভূরাজনৈতিক মোড়: কেন চীনা কোম্পানিগুলো দেশে ফিরছে
পরিসংখ্যানগত পুনরুদ্ধারের পেছনে রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলো কোথায় মূলধন সংগ্রহ করবে, সে বিষয়ে মৌলিক পরিবর্তন। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মূল ভূখণ্ডের কোম্পানিগুলোর জন্য মার্কিন এক্সচেঞ্জগুলোকে ক্রমশ সমস্যাপূর্ণ করে তুলেছে। তালিকাচ্যুত হওয়ার হুমকি, হোল্ডিং ফরেন কোম্পানিজ অ্যাকাউন্টেবল অ্যাক্টের আওতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং বৃহত্তর বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা কোম্পানিগুলোকে ঘরের কাছাকাছি বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করেছে।
এই পুনর্বিন্যাসে হংকং প্রধান সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে। হংকং এক্সচেঞ্জেস অ্যান্ড ক্লিয়ারিংয়ের প্রধান নির্বাহী বনি চ্যানের মতে, এ-শেয়ারে তালিকাভুক্ত ৪০টিরও বেশি কোম্পানি বর্তমানে শহরটিতে দ্বিতীয় তালিকাভুক্তির কথা বিবেচনা করছে। এসব কোম্পানি হংকংকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অফশোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে, যা মার্কিন বাজারের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়িয়ে আন্তর্জাতিক মূলধনে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
এবিআরডিএনের এশীয় ইকুইটি দলের বিনিয়োগ পরিচালক সিন ইয়াও এনজি বলেন, কাঠামোগত ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে চীনে বৈশ্বিক আগ্রহ মহামারির আগের স্তরের নিচে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারণে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর জন্য হংকংয়ের প্রস্তাব অনন্য। উদাহরণস্বরূপ, সিএটিএল তাদের ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের সংগ্রহ করা অর্থের ৯০% হাঙ্গেরিতে উৎপাদন কারখানা স্থাপনে বরাদ্দ করেছে। সম্ভাব্য বাণিজ্য বাধা এড়িয়ে ইউরোপে সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য তারা এই তালিকাভুক্তি কাজে লাগিয়েছে।
আইপিওগুলো সাধারণত সফল হলেও বেশির ভাগই বড় ছাড়ে এসেছে। ফলে উদ্বেগ রয়ে গেলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল্যায়ন অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
এ প্লাস এইচ কৌশল বুঝে নেওয়া
হংকংয়ের পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দিচ্ছে এ-শেয়ার ও এইচ-শেয়ারভিত্তিক দ্বৈত তালিকাভুক্তির কাঠামো। চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে, যেমন সাংহাই বা শেনঝেনের এক্সচেঞ্জে আগে থেকেই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারী ও অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এ ধরনের আটটি কোম্পানি ৭৮ বিলিয়ন হংকং ডলার (১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সংগ্রহ করেছে, যা ওই সময়ে আইপিও থেকে মোট সংগ্রহের প্রায় ৭২%।
এই কৌশলে কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। সাউথবাউন্ড স্টক কানেক্ট কর্মসূচির আওতায় মূল ভূখণ্ডের চীনা বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বিদ্যমান দেশীয় ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে হংকংয়ে তালিকাভুক্ত শেয়ার কিনতে পারেন, যা স্বাভাবিকভাবেই চাহিদার ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে হংকংয়ের তালিকাভুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানো এবং মুদ্রার বৈচিত্র্য আনার সুযোগ মেলে। এ-শেয়ার ও এইচ-শ্রেণির শেয়ারের দামের ব্যবধান থেকে সম্ভাব্য মুনাফার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের কাছে এই কাঠামো বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তালিকাভুক্তির পাইপলাইনে রয়েছে নানা ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ সরঞ্জাম নির্মাতা উশি লিড ইন্টেলিজেন্ট ইকুইপমেন্ট তাদের ব্যাটারি ও সৌরকোষ উৎপাদনব্যবস্থার বৈশ্বিক সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য ৫৪৯ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সংগ্রহের চেষ্টা করছে। হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের সমর্থনপুষ্ট বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা সেরেস গ্রুপ ১.৫ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি বাইদুর মালিকানাধীন নেটফ্লিক্স-ধাঁচের স্ট্রিমিং সেবা আইকিউইও মার্কিন পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় তালিকাভুক্তির কথা ভাবছে।
প্রযুক্তি জায়ান্টের বাইরে: হার্ড টেকের বিপ্লব
হংকংয়ের আইপিও বাজারের খাতভিত্তিক গঠনে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের উত্থানে ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম ও ভোক্তাপ্রযুক্তি প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু এবারের ঢেউয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে চীনা নীতিনির্ধারকদের ভাষায় ‘নতুন উৎপাদনশীল শক্তি’। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা উদ্ভাবন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মোট আইপিও আয় বিবেচনায় শিল্প খাত অন্য সব খাতকে ছাড়িয়ে গেছে। এর পরেই ছিল স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি। হংকংয়ের চ্যাপ্টার ১৮এ কাঠামোর সহায়তায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে ইকুইটি পুঁজিবাজারে ইস্যুর পরিমাণ ৫.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ। এই কাঠামোর আওতায় এখনো আয় করতে না পারা বায়োটেক কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্ত হতে পারে। জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও ডিপ টেকনোলজির প্রয়োগে আগ্রহের কারণে প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও টেলিযোগাযোগ খাতে ১৩.৭ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
গাও ফেং অ্যাডভাইজরি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এডওয়ার্ড সে মনে করেন, গুণগত দিক থেকে বর্তমান পুনরুদ্ধার আগের চক্রগুলোর থেকে আলাদা। এখন বাজারে আসা কোম্পানিগুলো সাধারণত জাতীয় নীতির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলগত খাতের। এগুলো অনুমাননির্ভর স্টার্টআপের বদলে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যা বাজারের পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন বেইজিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্য প্রতিফলিত করার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের কর্মকাণ্ডের জন্য হংকংকে আরও টেকসই ভিত্তি দিচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সুবিধা: বেইজিং ও হংকংয়ের সমন্বয়
মূলধনের এই প্রবাহ সহজ করতে সীমান্তের দুই পাশের নীতিনির্ধারকেরা সংস্কার বাস্তবায়ন করেছেন। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন সীমান্তপেরিয়ে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের কোম্পানিগুলোর অনুমোদন দ্রুত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ ঘোষণা করে। কয়েক বছর কঠোর তদারকির কারণে বাজারে উৎসাহ কমে যাওয়ার পর এসব পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রক নীতিতে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
হংকংয়ের নিয়ন্ত্রকেরাও এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। এক্সচেঞ্জটি চ্যাপ্টার ১৮এ-এর আওতায় বায়োটেক তালিকাভুক্তির নিয়মে উন্নয়ন চূড়ান্ত করেছে এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে চ্যাপ্টার ১৮সি-এর আওতায় নতুন উদ্যোগ চালু করেছে। পর্যালোচনার সময়সীমাও কমেছে। বড় মূল ভূখণ্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে পর্যালোচনা শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এক্সচেঞ্জটি।
২০২৫ সালের আগস্টে আরও পরিবর্তন কার্যকর হয়। দ্বিতীয় তালিকাভুক্তির জন্য আগ্রহী মূল ভূখণ্ডের চীনা কোম্পানিগুলোর ন্যূনতম পাবলিক ফ্লোটের শর্ত মোট শেয়ারের ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। তালিকাভুক্তির পর এই হার ৫%-এ নামিয়ে আনা যায় কি না, তা নিয়ে পরামর্শও চলছে। এ ছাড়া জনপ্রিয় আইপিওতে খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ ৫০% থেকে কমিয়ে ৩৫% করা হয়েছে। শেয়ারের দামের ওঠানামা কমানো এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের যথেষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য।
ব্রোকার পেপারস্টোনের গবেষণা কৌশলবিদ দিলিন উ বলেন, সমন্বিত এসব উদ্যোগ চীনের কৌশলগত খাতগুলোর জন্য হংকংকে প্রধান অফশোর তহবিল সংগ্রহকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুচিন্তিত কৌশলের প্রতিফলন। মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের নিয়ন্ত্রকদের এই সমন্বয় আগে বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়া ইস্যুকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।
দিগন্তে বড় অঙ্কের চুক্তি
বর্তমান তৎপরতা হয়তো আরও বড় একটি ঢেউয়ের সূচনা মাত্র। চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সিনোকেমের মালিকানাধীন সুইস কৃষি রাসায়নিক ও বীজ উৎপাদনকারী সংস্থা সিনজেন্টা গ্রুপ হংকংয়ে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ৫ বিলিয়ন থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হতে পারে। এই সীমার সর্বোচ্চ অঙ্কে চুক্তিটি সম্পন্ন হলে গত পাঁচ বছরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তালিকাভুক্তি হবে এটি। এর আগে ছিল ২০২১ সালে রিভিয়ান অটোমোটিভ এবং ২০২২ সালে এলজি এনার্জি সলিউশনের তালিকাভুক্তি।
আকারের বাইরেও সিনজেন্টার চুক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নোভার্টিস ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার কৃষিব্যবসা একীভূত করে গঠিত কোম্পানিটি পরে ৪৩ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় কেমচায়না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান কর্টেভা এবং জার্মান কোম্পানি বিএএসএফ ও বায়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। নিউইয়র্ক বা লন্ডনের বদলে হংকংয়ে তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্তে কৌশলগত অবস্থান এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর আকাঙ্ক্ষা, দুটোই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রস্তাবটি রেগুলেশন এস-এর আওতায় হবে। অর্থাৎ, শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিবন্ধিত হবে না। এতে এসইসির তদারকি এড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের কাছে শেয়ার বিক্রি কার্যত নিষিদ্ধ থাকবে।
পাইপলাইনে আরও উল্লেখযোগ্য লেনদেন এগোচ্ছে। ই-কমার্স জায়ান্ট জেডি ডটকমের সরবরাহ শৃঙ্খল প্রযুক্তি ইউনিট জেডি ইন্ডাস্ট্রিয়ালস ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতির কারণে আগের আবেদনগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে আবেদন করেছে। কোম্পানিটি ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পারে। আগে আবেদন প্রত্যাহার করা আরেক কোম্পানি ইউনিসাউন্ড এআই টেকনোলজিও আবার তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় ফিরেছে। চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের সাফল্যের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নতুন করে তৈরি হওয়া আশাবাদের ওপর বাজি ধরছে কোম্পানিটি।
বিনিয়োগকারীদের পালাবদল: পশ্চিম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে
লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে গেলেও এসব চুক্তিতে বিনিয়োগকারীদের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালে কার্যকর হওয়া জাতীয় নিরাপত্তা আইন, তথ্য সুরক্ষা এবং ভূখণ্ডটির স্বায়ত্তশাসন ও আইনি নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন ও ইউরোপীয় সম্পদ ব্যবস্থাপকরা হংকংয়ের বাজারে সতর্কতার সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন।
তবে পশ্চিমা অংশগ্রহণ কমলেও অন্য অঞ্চল থেকে আগ্রহ বেড়েছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো হংকংয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছে। সৌদি পিআইএফ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সীমান্তপেরিয়ে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে যৌথ হংকং-সৌদি তহবিলে সর্বোচ্চ ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিএটিএল ও বিমা কোম্পানি এফডব্লিউডি গ্রুপের মতো বড় তালিকাভুক্তিতে এসব তহবিল প্রধান বিনিয়োগকারীর ভূমিকা নিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশগ্রহণও বেড়েছে। সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল টেমাসেক হোল্ডিংস ও জিআইসি হংকংয়ের আইপিওতে আরও সক্রিয় হয়েছে। থাইল্যান্ডের নারকেলের পানি প্রস্তুতকারক আইএফবিএইচ সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জের বদলে হংকংকে বেছে নিয়েছে, বিশেষ করে বৃহত্তর চীনে সেখানে বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী ভিত্তির কারণে। মালয়েশিয়ার স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা ক্যাপিটাল এ ২০২৬ সালে শহরটিতে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর রয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি কোম্পানি এক্সচেঞ্জে আবেদন জমা দিয়েছে, যা আগের বছর ১০০টিরও কম ছিল। এসব আবেদনের মধ্যে মূল ভূখণ্ডের চীনের বাইরের কোম্পানির অনুপাতও বাড়ছে।
মূল্যায়নের ব্যবধান ও বাজারের কার্যপ্রণালি
নতুন তালিকাভুক্তিগুলো সাড়া ফেললেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মূল ভূখণ্ডের এ-শেয়ারের মূল্যায়নের তুলনায় অনেক প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য ছাড়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় প্রবেশমূল্য তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দাম ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হংকংয়ে তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর শেয়ার বর্তমানে আনুমানিক ১১ গুণ সম্ভাব্য আয়ে লেনদেন হচ্ছে, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর মূল্যায়ন অনুপাতের প্রায় অর্ধেক।
বাজারের অংশীজনেরা তারল্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাজারের তহবিল না বাড়লেও বিপুলসংখ্যক নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি আসায় কিছু বিশ্লেষক অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কা করছেন। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের বৃহত্তর চীন অঞ্চলের আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত পরামর্শক সেবার প্রধান লরেন্স লাউ বলেছেন, কিছু শেয়ারে পর্যাপ্ত লেনদেন না হলে কোম্পানির মূল্যায়ন ও শেয়ারের দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে তালিকাভুক্তির গতি মূলধনের প্রবাহকে ছাড়িয়ে গেলে।
খুচরা বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দসংক্রান্ত সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনগুলো এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। সর্বোচ্চ খুচরা বরাদ্দ ৫০% থেকে ৩৫%-এ কমানো এবং মিক্সু গ্রুপের উত্তেজনাপূর্ণ প্রথম দিনের লেনদেনের পর মার্জিন ঋণের সীমা আরোপের লক্ষ্য হলো অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ ও পরবর্তী দরপতন ঠেকানো, যা কিছু জনপ্রিয় আইপিওতে দেখা গেছে। এসব পদক্ষেপ খুচরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঠিক দাম নির্ধারণকে অগ্রাধিকার দেয়। এতে বাজার আরও স্থিতিশীল হতে পারে, তবে নতুন তালিকাভুক্তিতে একসময় ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা লটারির মতো লাভের সম্ভাবনা কমতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ৪২টি আইপিওর মাধ্যমে হংকং ১৩.৬৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। বছরে ৭০০% প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইপিও থেকে মূলধন সংগ্রহে শহরটি বিশ্বে প্রথম হয়েছে।
- কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি কোম্পানি (সিএটিএল) ২০২৫ সালের বিশ্বের বৃহত্তম আইপিও সম্পন্ন করেছে। ইউরোপে সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য হংকংয়ে দ্বিতীয় তালিকাভুক্তির মাধ্যমে তারা ৪.৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।
- মার্কিন-চীন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকির কারণে মূল ভূখণ্ডের চীনের ৪০টিরও বেশি এ-শেয়ার কোম্পানি হংকংয়ে দ্বৈত তালিকাভুক্তির কথা ভাবছে।
- মূল ভূখণ্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যূনতম পাবলিক ফ্লোটের শর্ত ১৫% থেকে ১০%-এ নামিয়েছে এক্সচেঞ্জটি। দামের স্থিতিশীলতা বাড়াতে খুচরা বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দসীমাও ৫০% থেকে ৩৫%-এ কমানো হয়েছে।
- সিনজেন্টা গ্রুপ সম্ভাব্য ১০ বিলিয়ন ডলারের আইপিওর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বৃহত্তম হতে পারে। সেরেস গ্রুপ ও জেডি ইন্ডাস্ট্রিয়ালসও কয়েক বিলিয়ন ডলারের তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে।
- বড় হংকং চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই পশ্চিমা মূলধনের জায়গা নিচ্ছে এবং প্রধান বিনিয়োগকারী হচ্ছে।
- খাতের প্রাধান্য ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম থেকে হার্ড টেকনোলজিতে সরে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবা, যা চীনের কৌশলগত শিল্প অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।






