নীতি এক সন্ধিক্ষণে
মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে শিশুদের ভাষা শেখার পদ্ধতি নতুন করে সাজানোর দ্বারপ্রান্তে হংকং। শিক্ষা ব্যুরো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মাধ্যমসংক্রান্ত নীতির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। ২০১০ সালে বিতর্কিত পরিবর্তন আনার পর এটিই হবে প্রথম বড় মূল্যায়ন। ২০২৮-২৯ থেকে ২০৩৩-৩৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই পর্যালোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা ইংরেজিতে দক্ষতা কমে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক এশীয় পরিমণ্ডলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সূচিপত্র
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের (এইচকেইউ) তিন বছরব্যাপী একটি বিস্তৃত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শেষ হওয়ার পর এই পর্যালোচনা শুরু হচ্ছে। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে তিনটি প্রতিনিধিত্বশীল বিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান বাস্তবায়নের বিষয়টি গবেষণায় অনুসরণ করা হয়েছে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় একই বিষয় বা অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে একাধিক শিক্ষাচক্রে বারবার তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন ও প্রবণতা চিহ্নিত করা হয় এবং বিভিন্ন চলকের মধ্যে সম্ভাব্য কারণ-সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়। ব্যুরোর এক মুখপাত্র জানান, টানা তিনটি পূর্ণ শিক্ষাবর্ষের তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে। গবেষকেরা এখন বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছেন, এরপর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন। মুখপাত্র বলেন, “এইচকেইউ তিন শিক্ষাবর্ষের তথ্য সংগ্রহ শেষ করেছে এবং বর্তমানে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছে। এরপর তারা শিক্ষা ব্যুরোর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষা ব্যুরো নীতিটি পর্যালোচনা করবে এবং যথাসময়ে গবেষণার ফল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেবে।”
বর্তমানে হংকংয়ে দুই ভাগে বিভক্ত একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে আলাদা মর্যাদার দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। আগের পরিকল্পনা চক্রে শহরজুড়ে ফর্ম ওয়ানের অন্তত ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ফলাফলের দিক থেকে শীর্ষ ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি গ্রহণ করতে পারে। সরকার পরিচালিত ও ভর্তুকিপ্রাপ্ত এমন ১১৪টি বিদ্যালয়ের মর্যাদা বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে বাড়তি সুবিধা হবে—এমন ধারণা থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এসব বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। অভিভাবকেরা প্রায়ই মনে করেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ শিক্ষার সুযোগের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের (ইএমআই) এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অপরিহার্য। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক বণ্টনব্যবস্থা শুরু হয়। এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া বিদ্যালয়গুলোকে চীনা ভাষায় পড়াতে হয়। তবে তারা ইংরেজিতে বাড়তি শেখার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে বা সর্বোচ্চ দুটি বিষয় ইংরেজিতে পড়াতে পারে। অনেক শিক্ষাবিদের মতে, এসব বিধিনিষেধ উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে প্রস্তুত করার সক্ষমতা সীমিত করে।
মাতৃভাষানীতির উত্তরাধিকার
বর্তমান বিতর্ক বুঝতে হলে ১৯৯৭ সালে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের পরের নীতিগত পরিবর্তনগুলো দেখা প্রয়োজন। চীনের সঙ্গে পুনর্মিলনের পর ১৯৯৮ সালে হংকং কঠোর মাতৃভাষানীতি চালু করে। এতে অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ক্যান্টনিজ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা ছিল। শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং অকার্যকর ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে সমালোচকদের মতে সংশ্লিষ্ট মুখস্থনির্ভরতা ও ভাষা বদলের প্রবণতা কমানো ছিল এ নীতির লক্ষ্য। সমর্থকদের যুক্তি ছিল, মাতৃভাষায় শেখা ধারণার গভীর উপলব্ধি ও ভালো শিক্ষাগত ফল এনে দেয়। তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ইংরেজিতে দক্ষতাকে অপরিহার্য মনে করা অভিভাবকদের মধ্যে নীতিটি শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। গবেষকেরা বলেন, সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের পর থেকে ভাষানীতির বিবর্তনে তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায় দেখা গেছে।
১৯৯৮ সালের নীতির ফলে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান (ইএমআই) এবং চীনা মাধ্যমে পাঠদান (সিএমআই) বিদ্যালয়ের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়, যা এখনো রয়েছে। সমালোচকদের মতে, কৈশোরে ভাষা শেখার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইংরেজির সংস্পর্শ সীমিত করায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদে ভাষা শেখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দ্বিস্তরবিশিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। হস্তান্তরের পর হংকংয়ের ভাষানীতি নিয়ে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণায় বিষয়টিকে “দ্বিভাষিক সাক্ষরতা ও ত্রিভাষিকতার দীর্ঘ যাত্রা” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নীতিনির্ধারকেরা চীনা ও ইংরেজি পড়তে-লিখতে এবং ক্যান্টনিজ, পুতংহুয়া ও ইংরেজিতে কথা বলতে পারার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু কখনো কখনো এসব লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নীতি বাস্তবায়ন করেছেন; বিশেষ করে জ্ঞানীয় বিকাশের জন্য যখন শিক্ষার্থীদের ইংরেজির সংস্পর্শ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই তা সীমিত করা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ মোকাবিলায় সরকার ২০১০ সালে “নীতির নমনীয় প্রয়োগ” ব্যবস্থা চালু করে, যার আওতায় সিএমআই বিদ্যালয়গুলো নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ইংরেজিতে পড়ানোর বেশি সুযোগ পায়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চীনাভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা বিদ্যালয়গুলো ইংরেজিতে বাড়তি শেখার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে অথবা সর্বোচ্চ দুটি বিষয় ইংরেজিতে পড়াতে পারে। তবে এসব পরিবর্তনে শিক্ষাবিদদের সন্তুষ্ট করা যায়নি। তাঁদের মতে, উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে ব্যবস্থাটি এখনো ব্যর্থ; কারণ সেখানে পাঠদান, গবেষণা প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ইংরেজির প্রাধান্য। নীতিতে নমনীয়তা আনার পরও ইএমআই ও সিএমআই বিদ্যালয়ের মর্যাদাগত ব্যবধান ঘোচেনি। ফলে তীব্র প্রতিযোগিতা ও শিক্ষাগত বৈষম্য অব্যাহত রয়েছে।
দক্ষতা কমছে, উদ্বেগ বাড়ছে
সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে উঠেছে, কারণ পুরো অঞ্চলে ইংরেজিতে দক্ষতা পরিমাপযোগ্যভাবে কমছে, যা হংকংয়ের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। গ্লোবাল ইংলিশ প্রফিশিয়েন্সি ইনডেক্স অনুযায়ী, টানা চার বছর পিছিয়ে এখন হংকংয়ের অবস্থান বিশ্বে ৩৯তম এবং এশিয়ায় মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের পর তৃতীয়। ভাষানীতির আঞ্চলিক মানদণ্ড হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা সিঙ্গাপুরকে মাতৃভাষা হিসেবে ইংরেজিভাষী দেশ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে তুলনার জন্য দেশটি আর সূচকে নেই। কাগজে-কলমে সাক্ষরতার হার বেশি থাকলেও স্নাতকদের কথ্য ইংরেজির দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। এতে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রস্তুতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার চাহিদার মধ্যে সমস্যাজনক ফাঁক তৈরি হয়েছে।
ভর্তুকিপ্রাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর কাউন্সিল কর্তৃপক্ষকে ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদানের অনুমতি বাড়ানোর জন্য স্পষ্টভাবে আহ্বান জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, বর্তমান নীতিতে শিক্ষার্থীরা প্রায় সম্পূর্ণ ইংরেজিতে পরিচালিত উচ্চশিক্ষার কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে না। কিছু শিক্ষাবিদের মতে, এই অসংগতি নীতির মৌলিক ব্যর্থতার পরিচয়: শিক্ষার্থীদের ছয় বছর প্রধানত চীনা ভাষায় পড়তে বলা হয়, এরপর ইংরেজিপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নির্বিঘ্নে খাপ খাওয়ানোর প্রত্যাশা করা হয়; সেখানে বক্তৃতা, পাঠ্যবই ও পরীক্ষায় ইংরেজি প্রায় মাতৃভাষার মতো বোঝার সক্ষমতা ধরে নেওয়া হয়। সিএমআই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই আকস্মিক পরিবর্তনে হিমশিম খায়। প্রথম বর্ষের গুরুত্বপূর্ণ কোর্সে এই শিক্ষাগত ধাক্কা তাদের আত্মবিশ্বাস ও ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
বিদ্যালয়গুলো যখন নীতির বাধ্যবাধকতায় চীনা ভাষায় পড়াতে বাধ্য, তখন শহরকে শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা যে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করছি না, তা স্পষ্ট। আমাদের নীতিতে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে, আর তা এখানেই প্রকাশ পাচ্ছে।
বিদেশি প্রতিভা এবং এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করে আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে হংকংয়ের জন্য এসব উদ্বেগের যথেষ্ট অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। প্রধান নির্বাহী জন লি কা-চিউ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিকে ভিত্তি করে অঞ্চলটিকে আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষার গন্তব্যে পরিণত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তবে এই মর্যাদা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজিতে পড়াশোনা করতে সক্ষম স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সরবরাহ প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাও শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে ইংরেজি মাধ্যমের পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। ইএমআই ও সিএমআই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কঠোর বিভাজন থাকা বর্তমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত ইংরেজি প্রস্তুতিসহ স্নাতক তৈরি করে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে সন্তানদের জন্য ধারাবাহিক ইংরেজি শিক্ষার পরিবেশ খোঁজা আন্তর্জাতিক পরিবারের কাছে শহরটির আকর্ষণও কমতে পারে।
শিক্ষাদানের জটিলতা ও বহুভাষিক প্রয়োগ
শুধু কোন ভাষায় পড়ানো হবে—এ প্রশ্নের বাইরে গিয়ে পর্যালোচনায় সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে আসা জটিল শিক্ষাদানসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে হবে। একাডেমিক সংজ্ঞায় ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান (ইএমআই) বলতে এমন অঞ্চলে ইংরেজিতে একাডেমিক বিষয় পড়ানো বোঝায়, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রথম ভাষা ইংরেজি নয়। এর জন্য সাধারণ ইংরেজি দক্ষতার বাইরেও বিশেষ শিক্ষাদান সক্ষমতা প্রয়োজন। হংকংয়ের ইএমআই পরিবেশ নিয়ে একাডেমিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ইংরেজি ব্যবহারের কঠোর ধারণা শিক্ষাদানে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যেমন, একভাষাভিত্তিক পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত ভাষাদক্ষতা না থাকায় শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে এবং কার্যকর ইএমআই পদ্ধতি পরিচালনা ও বাস্তবায়নে শিক্ষকদের অসুবিধা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট ইংরেজি ভাষা-সহায়তা এবং ইএমআই শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভাব থাকে। ফলে ভাষার বাধায় বিষয়বস্তু শেখা ব্যাহত হয়।
এসব চ্যালেঞ্জের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে সাম্প্রতিক গবেষণায় “বহুভাষিক প্রয়োগ”ভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই পদ্ধতি স্বীকার করে যে বহুভাষী শিক্ষার্থীদের ভাষাগত সম্পদ নমনীয় এবং ভাষাগুলোকে আলাদা, সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থায় আবদ্ধ করে রাখার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ইএমআই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ক্যান্টনিজ ও পুতংহুয়াসহ সব ভাষাগত সম্পদ কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে জটিল একাডেমিক বিষয়বস্তু বুঝতে সহায়তা করতে পারেন, একই সঙ্গে ইংরেজিতে দক্ষতাও বাড়াতে পারেন। হংকংয়ের ইএমআই পরিবেশে বহুভাষিক প্রয়োগ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এ ধরনের পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানীয় চাপ কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে কারিগরি পরিভাষা শেখাতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের (এসটিইএম) বিষয়ে ঘন পরিভাষা ও জটিল ধারণা শুধু ইংরেজিতে পড়ানো হলে তা বোঝায় উল্লেখযোগ্য বাধা তৈরি করে।
তবে কার্যকর বহুভাষিক প্রয়োগের জন্য ব্যাপক শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং সুস্পষ্ট নীতিগত সমর্থন প্রয়োজন, যা এখনো ধারাবাহিক নয়। এইচকেইউর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সম্ভবত দেখা হয়েছে, ইএমআই শ্রেণিকক্ষের জটিল চাহিদা সামলাতে শিক্ষকেরা কীভাবে কাজ করেন; বিশেষ করে বোঝাপড়া বাড়াতে কখন ও কীভাবে ভাষা বদলান, অথচ ইংরেজি শেখার বিকাশ ব্যাহত হতে দেন না। শিক্ষকরা দ্বিতীয় ভাষায় কার্যকরভাবে বিষয়বস্তু পড়ানোর শিক্ষাগত দক্ষতা না রাখলে, অথবা ১৯৯৮ সালের আগের ইংরেজি শিক্ষায় প্রচলিত অকার্যকর মুখস্থনির্ভর কৌশলে ফিরে গেলে, ইংরেজিতে পড়ানো বিষয়ের সংখ্যা বাড়ানো উল্টো ফল দেবে। শিক্ষা ব্যুরো জোর দিয়ে বলেছে, যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনে শিক্ষকের মানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চাহিদাও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, শিক্ষক-সক্ষমতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা।
জাতীয় সংহতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য
শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে বিতর্কটি হংকংয়ের হস্তান্তর-পরবর্তী পরিচয় নির্ধারণকারী পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের সংযোগস্থলে রয়েছে: একদিকে জাতীয় পরিচয় ও চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংহতি জোরদার করা, অন্যদিকে অঞ্চলটির অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা। ১৯৯৭ সালের পর মাতৃভাষায় শেখার প্রসার ও জাতীয় সংহতি এগিয়ে নিতে চীনা ভাষাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার মাধ্যম করা হয়। তবে একই সঙ্গে অঞ্চলটি “দ্বিভাষিক সাক্ষরতা ও ত্রিভাষিকতা”কে মূল দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরে। জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশের মাতৃভাষা ক্যান্টনিজ—এটি স্বীকার করার পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংহতির জন্য পুতংহুয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভাষাসংক্রান্ত এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন নীতিতে স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা তৈরি করে, যা বর্তমান পর্যালোচনায় সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে। ইংরেজি মাধ্যমের পাঠদান বাড়ালে চীনা ভাষাশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংযোগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষত, ঐতিহাসিকভাবে ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বদলে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে যাওয়ার পথ হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে, ইংরেজির সংস্পর্শ সীমিত করলে বৈশ্বিক একাডেমিক সম্পদ, আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার এবং বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কে অংশ নেওয়ার সুযোগও কমে যায়। কেমব্রিজের গবেষণায় বলা হয়েছে, হংকংয়ের নীতিনির্ধারকেরা ঐতিহাসিকভাবে এমন নীতি নিয়েছেন, যা “কিছু ক্ষেত্রে” ঘোষিত দ্বিভাষিক সাক্ষরতা ও ত্রিভাষিকতার লক্ষ্যের বিপরীত। তাই বর্তমান পর্যালোচনা তথ্যভিত্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব অসংগতি দূর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।
পর্যালোচনার সময়সীমা ২০২৮-২৯ থেকে ২০৩৩-৩৪ পর্যন্ত। এতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে, যাতে বর্তমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত কমে এবং বিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এইচকেইউর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল এবং শিক্ষাক্ষেত্রের বিভিন্ন অংশের মতামত মিলিয়ে বর্তমান মানদণ্ডে নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে তিনটি বিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণাটি এমন সিদ্ধান্তের জন্য অভিজ্ঞতালব্ধ ভিত্তি দেবে, যা অতীতে শ্রেণিকক্ষে বাস্তবে কোন পদ্ধতি কার্যকর—সে বিষয়ে শিক্ষাগত প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক চাপ ও অভিভাবকদের চাহিদায় বেশি পরিচালিত হয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- হংকংয়ের শিক্ষা ব্যুরো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমসংক্রান্ত নীতি পর্যালোচনা করছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বছরব্যাপী গবেষণার পর ২০২৮-২৯ থেকে ২০৩৩-৩৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে পরিবর্তন কার্যকর হবে।
- বর্তমানে ফর্ম ওয়ানের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শহরজুড়ে শিক্ষাগত ফলাফলে শীর্ষ ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকলে ১১৪টি বিদ্যালয় ইংরেজিতে পড়ানোর যোগ্যতা পায়। অন্য বিদ্যালয়গুলোকে সীমিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রধানত চীনা ভাষায় পড়াতে হয়।
- ইংলিশ প্রফিশিয়েন্সি ইনডেক্স অনুযায়ী, টানা চার বছর পিছিয়ে হংকংয়ের অবস্থান এখন বিশ্বে ৩৯তম। এতে স্নাতকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
- শহরটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার (প্রধানত চীনা মাধ্যমে) সঙ্গে উচ্চশিক্ষার (প্রধানত ইংরেজি মাধ্যমে) ব্যবধান দূর করাই পর্যালোচনার লক্ষ্য।
- গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, “বহুভাষিক প্রয়োগ”ভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে ক্যান্টনিজ ও পুতংহুয়াসহ শিক্ষার্থীদের সব ভাষাগত সম্পদ কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে ইংরেজি শেখার বিকাশ বিসর্জন না দিয়েও ইএমআইয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো যেতে পারে।
- নীতিগত পরিবর্তনে শিক্ষকতার উচ্চ মান বজায় রেখে দ্বিভাষিক সাক্ষরতার (চীনা ও ইংরেজি) এবং ত্রিভাষিকতার (ক্যান্টনিজ, পুতংহুয়া ও ইংরেজি) লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।






