সন্ধিক্ষণ: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ৩ লাখের নিচে
দক্ষিণ কোরিয়া এমন এক জনমিতিক সীমা অতিক্রম করেছে, যা দেশটির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, এ বছরের মার্চে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৩ লাখের নিচে নামবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হবে মাত্র ২,৯৮,১৭৮ জন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যানগত একটি মাইলফলক নয়। এটি সেই মুহূর্ত, যখন দেশের বহু আলোচিত কম জন্মহার অনেক বড় জনসংখ্যার জন্য গড়ে তোলা শিক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।
সূচিপত্র
প্রতিষ্ঠানগুলোর আসনসংখ্যা ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও দুই বছর মেয়াদি কলেজগুলোতে সম্মিলিতভাবে বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির আসন রয়েছে। কিন্তু সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর জোগান দ্রুত কমে আসছে। নারীপ্রতি সন্তান জন্মদানের হার ০.৭-এ নেমে আসা দেশটিতে বছরে জন্ম হচ্ছে মাত্র প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শিশুর। ফলে কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার হিসাব আর মিলছে না।
কোরিয়া পেনিনসুলা পপুলেশন ইনস্টিটিউট ফর ফিউচারের সভাপতি ই ইন-শিল সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও গভীর সংকোচনের কেবল সূচনা। তিনি বলেন, “এখন আমরা যা দেখছি, তা কেবল শুরু।” পতন স্থিতিশীল হওয়ার বদলে দ্রুততর হচ্ছে। পূর্বাভাস বলছে, এখন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া শিশুর সংখ্যা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় আরও দ্রুত কমবে।
ভিন্ন এক সময়ের জন্য গড়া ব্যবস্থা
দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে ৩৩১টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে। কয়েক দশকের দ্রুত শিক্ষাবিস্তারকালে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ২০০০ সাল থেকে এরই মধ্যে ২২টি প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দশকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কোরিয়া কাউন্সিল ফর ইউনিভার্সিটি এডুকেশনের সাধারণ সভায় পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি মনে করেন, আগামী ১০ বছরে চার বছর মেয়াদি ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।
বর্তমান ঝুঁকির কারণ বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ায় “শিক্ষার উন্মাদনা” দেখা দেয়। শিক্ষাগত সনদের প্রতি সমাজের এই প্রবল আসক্তি উচ্চশিক্ষায় আসনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে। সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের মতো সম্পদ সরকারের না থাকায় বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিতে উৎসাহ দেওয়া হয়। বর্তমানে ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার অন্যতম সর্বোচ্চ। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এই প্রাচুর্যই এখন দায় হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কোরিয়া কাউন্সিল ফর ইউনিভার্সিটি এডুকেশনের রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব হায়ার এডুকেশনের গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৪০ সাল নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৯.১ শতাংশ কমে যাবে। ২০২০ সালের ৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে তা নেমে আসবে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজারে। ভর্তির আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলে দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ আসন খালি থাকবে। গত নভেম্বরে শিক্ষা উপমন্ত্রী জাং সাং-ইয়ুন আরও সতর্ক হিসাব দিয়ে বলেন, সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারে দাঁড়াতে পারে; আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীসহ সংখ্যাটি হবে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার।
পতনের ভৌগোলিক চিত্র: সিউল বনাম অঞ্চলগুলো
জনসংখ্যাগত পতনের প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়ার সব অঞ্চলে সমানভাবে পড়বে না। রাজধানী অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বৃহত্তর সিউল অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে। দেশজুড়ে বছরে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার শিশুর জন্ম হওয়ায় সহজ হিসাবেই বোঝা যায়, কলেজে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশ যদি সিউল এলাকার প্রতিষ্ঠান বেছে নেয়, তাহলে আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলোতে ভর্তির ঘাটতি বিপর্যয়কর হবে।
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পপুলেশন পলিসি রিসার্চ সেন্টারের জনমিতি বিশেষজ্ঞ ই সাং-রিম প্রাদেশিক শিক্ষাব্যবস্থায় ধ্বংসাত্মক পরিণতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যদি ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী কলেজে যায় এবং তারা সবাই রাজধানী অঞ্চলে ভিড় করে, তাহলে আর কিছুই বাকি থাকবে না। আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যত হারিয়ে যাবে।” তাঁর পূর্বাভাস, কিছু প্রদেশে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকতে পারে। এতে বিদ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্য আরও গভীর হবে এবং রাজধানীর বাইরের এলাকায় জনসংখ্যা হ্রাস দ্রুততর হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও এই আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রমাণ মেলে। সিউলে কোনো স্কুল বন্ধের মুখে না থাকলেও গ্রামীণ এলাকাগুলোই এই সংকোচনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালেই ১৭টি শহর ও প্রদেশের ৪৯টি স্কুল বন্ধ হবে, যার ৮৮ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায়। উত্তর জিওল্লা প্রদেশে বন্ধ হবে ১৬টি স্কুল, এরপর দক্ষিণ জিওল্লা প্রদেশে ১৫টি। প্রাথমিক স্তরে পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংকটজনক। মার্চে উত্তর গিয়ংসাং প্রদেশের ৪২টি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি; দক্ষিণ জিওল্লা প্রদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা ৩২টি।
‘জম্বি বিশ্ববিদ্যালয়’ ও আইনি বাধা
ভর্তি কমতে থাকায় আরও বেশি প্রতিষ্ঠান কার্যত স্থবির অবস্থায় পড়েছে। দেউলিয়া হওয়া সত্ত্বেও সরকারি ভর্তুকিতে সেগুলো চালু রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এসব প্রতিষ্ঠানকে “জম্বি বিশ্ববিদ্যালয়” বলেন। প্রকৃতপক্ষে টিকে থাকার সক্ষমতা না থাকলেও সরকারি অর্থের জোগানে এগুলো বেঁচে আছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এই শ্রেণিতে পড়ে। পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করতে না পারলেও আইনি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলো বন্ধ করা যাচ্ছে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি হওয়ায় সেগুলো পুনর্গঠনের বাধা বিশেষভাবে তীব্র। প্রতিষ্ঠাতাদের আর্থিক অনিয়ম ঠেকাতে কয়েক দশক আগে প্রণীত বেসরকারি বিদ্যালয় আইন এখন কার্যত স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথ রুদ্ধ করেছে, এমনকি যখন সেগুলো অসম্ভব আর্থিক পরিস্থিতির মুখে পড়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে জমি ও ভবনসহ এর সম্পদ সরকারের মালিকানায় চলে যায়। ফলে পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশনগুলো প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত হয়।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ফাউন্ডেশনের সম্পদ [প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে] সরকারের মালিকানায় চলে যায়।
হিয়পসুং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম সাং-কি এই আইনি কাঠামোকে সংস্কারের প্রধান বাধা বলে চিহ্নিত করেছেন। কোরিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট স্কুল ফাউন্ডেশনসের মহাসচিব চোই গিউ-বংয়ের যুক্তি, এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতার পেছনে থাকা জনমিতিক বাহ্যিক কারণগুলোকে উপেক্ষা করে। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারছে না জনসংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে, আর এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরা দায়ী নয়।”
পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা বিভিন্ন পক্ষের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ছে। শিক্ষক ও কর্মীরা ভর্তির আসন কমানো এবং ক্যাম্পাস একীভূত করার বিরোধিতা করছেন, কারণ এসব পদক্ষেপ সরাসরি কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি। শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন যে সংকুচিত হতে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়লে তাদের ডিগ্রির মূল্য কমবে এবং ভবিষ্যতে কর্মজীবনের সুযোগ সীমিত হবে। এসব উদ্বেগ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে, যার ফলে সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যর্থ সমাধান ও সাময়িক উপায়
জনমিতিক বাস্তবতার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারকেরা টিকে থাকার নানা কৌশল নিয়েছেন, তবে সেগুলোর ফল মিশ্র। সবচেয়ে বিতর্কিত কৌশলটি হলো আগ্রাসীভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা। বিশ্বজুড়ে কোরীয় সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা এবং সরকারের “গ্লোকাল বিশ্ববিদ্যালয়” উদ্যোগের জেরে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ই ইন-শিল এই প্রবণতাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রকৃত সুযোগ বলে মনে করেন। তবে তাঁর সতর্কতা, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ধরনের টিকে থাকার কৌশল নিতে বাধ্য না করে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ হতে দেওয়া উচিত।
তবে অন্যরা এই কৌশলের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ই সাং-রিমের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যা মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে সেগুলোকে পিছিয়ে দেয়। এই কৌশলে আরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এ ছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত কোরীয় বা ইংরেজি ভাষাজ্ঞান নেই এমন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। এতে শিক্ষাদানে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন হয়েছে।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। ২০১২ সালে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের বিক্ষোভের পর দক্ষিণ কোরিয়ায় টিউশন ফি বাড়ানো বন্ধ করা হয়, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মোটামুটি বহাল রয়েছে। এই নীতি শিক্ষাব্যয়ের সামর্থ্য নিয়ে উদ্বেগের জবাব দিলেও, বিশেষ করে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়নে চাপ তৈরি করেছে। ই-এর যুক্তি, প্রয়োজনীয় ফি সমন্বয়ের সুযোগ দিতে এসব নিয়ম শিথিল করা উচিত। পাশাপাশি সব প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি একযোগে আটকে না রেখে নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বাড়ানো দরকার।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিতে মানবিক ও ভাষা বিভাগ বন্ধ করে পাঠ্যক্রমে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছে। অন্যরা শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতে শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে ক্যাম্পাসগুলো শিক্ষার্থীশূন্য, সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক জনমিতিক হিসাবকে এসব পরিবর্তন অতিক্রম করতে পারবে না।
মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবের বাইরেও উচ্চশিক্ষার এই সংকোচন বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার হুমকি তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অন্য আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনা নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। নতুন জায়গায় চলে যাওয়া বা নতুন শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বদলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গোটা পরিবেশজুড়েই কর্মসংস্থানের প্রভাব পড়বে। ক্যাম্পাস বন্ধ হলে শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মী ও সেবাকর্মীরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান নিয়োগদাতার ভূমিকা পালন করে এমন ছোট শহরগুলোতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া স্থানীয় অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জিসুন জং বলেন, ছোট বিশ্ববিদ্যালয় শহরগুলো থেকে শিক্ষার্থী চলে গেলে অর্থনৈতিক প্রভাব ক্যাম্পাসের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়ে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাপনা নিয়ে আরও সমস্যা তৈরি হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে ছাত্রাবাস, শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারসহ বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি প্রায়ই অব্যবহৃত পড়ে থাকে। ১৯৮০ সাল থেকে বন্ধ হওয়া ৪,০০৮টি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ৩৭৬টি এখনো অব্যবহৃত। এর ২৬৬টি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত। এসব সম্পদ কীভাবে নতুন কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতি না থাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী পরিত্যক্ত স্থাপনার দুরবস্থা ও সরকারি সম্পদের অপচয়ের মুখে পড়ে।
শিক্ষার সুযোগ সিউলকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় আঞ্চলিক বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ই-এর পূর্বাভাস সত্যি হলে এবং প্রদেশগুলোতে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকলে, গ্রামীণ তরুণদের রাজধানীতে চলে যাওয়ার চাপ বাড়বে। এর ফলে বয়স্ক জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতায় আগে থেকেই ভুগতে থাকা মহানগরের বাইরের এলাকাগুলো আরও জনশূন্য হয়ে পড়বে।
একটি মডেলের খোঁজে: জাপানের শিক্ষা
একই ধরনের জনমিতিক গতিপথের মুখে জাপান উচ্চশিক্ষা পুনর্গঠনের কাঠামো তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা ক্রমেই এগুলোকে সম্ভাব্য মডেল হিসেবে উল্লেখ করছেন। জাপানের “২০৪০ সাল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার গ্র্যান্ড ডিজাইন”-এ সংকটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের স্পষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় তিন বছর ধরে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া এবং পুনরুজ্জীবন অসম্ভব প্রমাণিত হলে বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ করা।
ইনহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম জং-হো মনে করেন, দুই দেশের জনমিতিক চ্যালেঞ্জ একই হওয়ায় জাপানের পদ্ধতি কোরিয়ার জন্য প্রাসঙ্গিক। জাপানের কৌশলে সংকটে থাকা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই ব্যবস্থা না নিয়ে, মানিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার ভিত্তিতে আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি রিসার্চ সার্ভিসের গবেষক ই দক-নান ধারাবাহিক নীতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর সাড়া দেওয়ার মাত্রা অনুযায়ী ধাপে ধাপে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
কিছু বিশেষজ্ঞ আরও আমূল পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব পুসানের শিন সাং-উকের পরামর্শ, স্বেচ্ছায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা বিশ্ববিদ্যালয় ফাউন্ডেশনগুলোকে সরাসরি আর্থিক অনুদান দেওয়া হোক। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পথে বাধা হয়ে থাকা সম্পদ হারানোর উদ্বেগ দূর হতে পারে। অন্যরা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য স্থাপনা বিক্রি করেছে বা অন্য কাজে লাগিয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের রূপান্তরের অনুমতি দিতে আইনি কাঠামো সংশোধন করতে হবে।
ইনহা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নাম দু-উ বলেন, টিকে থাকার সক্ষমতা আছে এমন ও নেই এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জোরালো বিভাজন দরকার। তিনি বলেন, “মৃদু পুনর্গঠনমূলক পদক্ষেপের বদলে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ সম্ভব সেগুলোকে যেগুলো বন্ধ হওয়া উচিত সেগুলো থেকে আলাদা করে একটি শক্তিশালী পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।” এই পদ্ধতিতে ব্যর্থ ক্যাম্পাসগুলোতে সীমিত তহবিল সামান্য করে ছড়িয়ে দেওয়ার বদলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূত করা যাবে এবং অন্যগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে বন্ধ করা যাবে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ায় এ বছরের মার্চে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখের নিচে নামবে। দেশজুড়ে প্রথম শ্রেণিতে ২,৯৮,১৭৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির আসন রয়েছে। কিন্তু নারীপ্রতি সন্তান জন্মদানের হার ০.৭, বিশ্বের সর্বনিম্ন, এমন দেশে বছরে জন্ম হচ্ছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার শিশুর।
- ৬০ শতাংশের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির ধারণা, আগামী দশকে চার বছর মেয়াদি ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে।
- আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, শিক্ষার্থীরা সিউল অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় কিছু প্রদেশে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে।
- আইনি বাধায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বেচ্ছায় বন্ধ হতে পারে না। বর্তমান আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সব সম্পদ সরকারের হাতে চলে যায়। ফলে সরকারি অর্থায়নে টিকে থাকা “জম্বি বিশ্ববিদ্যালয়” তৈরি হচ্ছে।
- ১৯৮০ সাল থেকে ৪ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল বন্ধ হয়েছে। ২০২৫ সালে আরও ৪৯টি বন্ধ হওয়ার কথা, যার বেশির ভাগই গ্রামীণ অঞ্চলে।
- আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি সাময়িক স্বস্তি দিলেও এই খাতের সামনে থাকা মৌলিক জনমিতিক চ্যালেঞ্জের সমাধান করে না।






