৮০ বিলিয়ন ডলারের ধস
জানুয়ারির শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়। ভয়াবহ দরপতনে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের মূল্য মুছে যায়, আর এক দিনেই জাকার্তা কম্পোজিট ইনডেক্স (জেসিআই) প্রায় ৯ শতাংশ নেমে যায়। ২৮ জানুয়ারি শুরু হওয়া আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কয়েক মাস ধরে জমে ওঠা উদ্বেগ চূড়ান্ত রূপ নেয়। উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল শাসনব্যবস্থার মান, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ক্ষয়। এর এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে নেমেছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ এশীয় আর্থিক সংকটের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ডলারের দাম ১৭ হাজার রুপিয়াহ ছাড়িয়ে যায়, আর বাজারধস সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সূচিপত্র
২৮ জানুয়ারির ব্যাপক দরপতনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহে ট্রিলিয়ন ডলার নির্দেশনা দেওয়া প্রভাবশালী সূচক-প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের সতর্কবার্তা। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইন্দোনেশিয়াকে উদীয়মান বাজারের মর্যাদা থেকে সীমান্তবর্তী বাজারের শ্রেণিতে নামিয়ে দেওয়া হতে পারে। এমনটি হলে প্যাসিভ বিনিয়োগ তহবিলগুলোকে একযোগে ইন্দোনেশীয় শেয়ার বিক্রি করতে হতো। ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা হুড়োহুড়ি করে শেয়ার বিক্রি করেন। শুধু ওই দিনেই ৪৫.৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের শেয়ার বিক্রি হয় এবং লেনদেন শেষে জেসিআই ৭.৪ শতাংশ কমে যায়।
সূচক-প্রস্তুতকারীদের সতর্কবার্তা
এমএসসিআইয়ের হুমকি ইন্দোনেশিয়ার বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের মূলে আঘাত হানে। সূচক-প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে স্থানীয় শেয়ারের “বিনিয়োগযোগ্যতা” নিয়ে উদ্বেগ জানায়, বিশেষ করে ফ্রি-ফ্লোট হিসাবের নির্ভুলতা নিয়ে। ফ্রি-ফ্লোট বলতে কোনো কোম্পানির মোট শেয়ারের যে অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কেনার জন্য প্রকাশ্যে লেনদেন হয়, তা বোঝায়। এর বিপরীতে থাকে অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি, নিয়ন্ত্রণকারী পরিবার বা কৌশলগত অংশীদারদের হাতে থাকা শেয়ার, যাঁরা নিয়মিত তাঁদের শেয়ার লেনদেন করেন না।
বর্তমান নিয়মে ইন্দোনেশিয়ার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মাত্র ৭.৫ শতাংশ ফ্রি-ফ্লোট বজায় রাখতে হয়, যা বড় উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনেক কোম্পানি নামমাত্র মালিকানার ব্যবস্থা ও অস্বচ্ছ মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে এই সীমা বজায় রাখে। ফলে শেয়ারগুলো কাগজে-কলমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে অল্প কয়েকজন ধনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। মালিকানার এই কেন্দ্রীভবন শেয়ারের দাম কারসাজি ও আকস্মিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে—যে ঝুঁকিগুলোকে সম্ভাব্য শ্রেণি পরিবর্তনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এমএসসিআই।
উদীয়মান ও সীমান্তবর্তী বাজারের শ্রেণিবিভাগের আর্থিক প্রভাব বিপুল। উদীয়মান বাজারের মর্যাদা থাকলে এমএসসিআইয়ের বেঞ্চমার্ক সূচক অনুসরণকারী প্যাসিভ মূলধনের বিশাল ভান্ডারে প্রবেশাধিকার মেলে। আর সীমান্তবর্তী বাজারে নামিয়ে দিলে দেশগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও কম তারল্যের শ্রেণিতে রাখা হয়, যেখানে বিশেষায়িত বিনিয়োগকারীরাই প্রাধান্য পান। শ্রেণি অবনমন হলে উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এমন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক পোর্টফোলিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেয়ার বিক্রি করবে। এতে ইন্দোনেশিয়া বছরের পর বছর বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহের বাইরে চলে যেতে পারে।
মারতাবে খনি দখল
বাজারে আতঙ্ক আরও বাড়ে, কারণ এমএসসিআইয়ের সতর্কবার্তার দিনই সম্পদ খাতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় আঘাত হানে। ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা জানায়, পিটি ইউনাইটেড ট্র্যাক্টরসের প্রধান সম্পদ মারতাবে সোনার খনি জোর করে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগ মহল স্তম্ভিত হয়ে যায়। ইউনাইটেড ট্র্যাক্টরস ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম ও সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি পিটি আস্ত্রা ইন্টারন্যাশনালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিদেশি পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপকদের কাছে এর শেয়ার ব্যাপকভাবে রয়েছে এবং এটি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক শেয়ার।
এই সম্পত্তি অধিগ্রহণে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এতে চুক্তি ও সম্পত্তির অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে উদ্বেগের ঘণ্টা বেজে ওঠে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেন এমন জাকার্তাভিত্তিক এক ব্যবসায়িক পরামর্শক বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদক্ষেপটির কঠোর সমালোচনা করেন।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ একতরফা সম্পত্তি অধিগ্রহণ। এটি ইন্দোনেশিয়ার আইনি নিশ্চয়তার সুনাম চূর্ণ করার শামিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দখলের বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া হবে। ডেন্টনস এইচপিআরপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অংশীদার মরিস মাওলানা সিতুমোরাং সতর্ক করে বলেছেন, মারতাবে খনি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ও আন্তর্জাতিক সালিসের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো অধিকার আইনত বাতিল করার আগে সুনির্দিষ্ট চুক্তির শর্ত, আইনি বিধান ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা মেনে চলতে হবে।
মারতাবে ঘটনা কৌশলগত শিল্পে রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের বৃহত্তর ধারার সঙ্গে মিলে যায়। এতে উদ্বেগ বাড়ছে যে ইন্দোনেশিয়া বাজারমুখী নীতি থেকে সরে গিয়ে সম্পদ-জাতীয়তাবাদ ও খেয়ালখুশিমতো প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে এগোচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার খনিটি দখলের ঘটনা কেন্দ্রীভূত মালিকানা কাঠামো এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকির একটি বাস্তব উদাহরণ।
চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা
এমএসসিআইয়ের সতর্কবার্তা ও খনি দখল নিয়ে বাজার যখন অস্থির, তখন ব্যাংক ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক ঘটনাবলি দেশের মুদ্রানীতির প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা আরও কমিয়ে দেয়। ২৭ জানুয়ারি পার্লামেন্ট অর্থ উপমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোর ভাতিজা টমাস জিওয়ান্দোনোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও এই নিয়োগ দেওয়া হয়। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে এবং ২০২৯ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে প্রেসিডেন্টের উচ্চাভিলাষী ৮ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছাতে আগেভাগেই প্রবৃদ্ধিমুখী নীতি নিতে চাপ সৃষ্টি হবে।
জানুয়ারির শুরুতে প্রেসিডেন্ট টমাসের মনোনয়ন এগিয়ে নেওয়ার পর ১৯ থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে রুপিয়াহর দর দ্রুত পড়ে প্রতি ডলারে প্রায় ১৭ হাজারে নেমে আসে। এই ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন দর ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় বাজারের আস্থার ক্ষয়ের সঙ্গে তুলনীয়, তখন ডলারের বিপরীতে রুপিয়াহর দর প্রায় ১৬ হাজার ৮০০-তে উঠেছিল। প্রশাসনের কর্মকর্তারা গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে রুপিয়াহর দর মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হিসাব মুদ্রাটির প্রকৃত দুর্বলতা আড়াল করে।
পরামদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ উইজায়ান্তো সামিরিন উল্লেখ করেন, একই সময়ে প্রধান বৈশ্বিক মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের দরই প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। এর অর্থ, বাণিজ্যিক অংশীদারদের মুদ্রার ঝুড়ির বিপরীতে হিসাব করলে রুপিয়াহর প্রকৃত মূল্য কার্যত প্রায় ১৪ শতাংশ পড়ে গেছে। ড. উইজায়ান্তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার মধ্যে মৌলিক সম্পর্কের ওপর জোর দেন।
রুপিয়াহর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন—কোনোটিই না হলে রুপিয়াহর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হবে।
রাজস্ব চাহিদার কাছে নতি স্বীকার করেছে বলে বিবেচিত সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে সময়ে সুদের হার কমানোর পক্ষে ছিল না, তার আগেই প্রতিষ্ঠানটি হার কমিয়েছে এবং টাকা ছাপিয়ে মুদ্রায় অর্থায়ন করেছে। এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দুই দশকের রক্ষণশীল মুদ্রানীতি থেকে সরে এসেছে তারা।
জনতুষ্টিবাদী প্রতিশ্রুতির চড়া মূল্য
ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক বাজারকে কাঁপিয়ে দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার পেছনে রয়েছে তীব্র আর্থিক চাপ। ২০২৫ সালের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ইন্দোনেশীয় আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা। একই সময়ে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম রয়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতির বড় কারণ প্রেসিডেন্ট প্রবোওর নির্বাচনী প্রচারের প্রধান প্রতিশ্রুতি—শিক্ষার্থী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির প্রথম বছরের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ।
ইন্দোনেশিয়ার ২০ শতাংশেরও বেশি শিশুর খর্বাকৃতির সমস্যা মোকাবিলায় নেওয়া কর্মসূচিটির বাস্তবায়ন শুরু থেকেই সংকটে হোঁচট খেয়েছে। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং স্কুলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার একাধিক ঘটনার জেরে কর্মসূচিটি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশজুড়ে মাত্র ৫০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে খাবার পৌঁছেছিল, যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৭৫ লাখ শিশু। সরকারি সরবরাহ করা খাবার খাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের পেটের অসুখ, ডায়রিয়া ও বমির কথা জানিয়েছে একাধিক স্কুল।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কর্মসূচি পরিচালনা নিয়েও আরও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। সেগুলোতে বলা হয়েছে, খাবার সরবরাহের জন্য মনোনীত কয়েকটি ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের অংশীদাররা নির্বাচনী প্রচারে প্রেসিডেন্ট প্রবোওর সমর্থক ছিলেন, যা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তৈরি করেছে। জাকার্তাভিত্তিক জননীতি বিশেষজ্ঞ আগুস পামবাজিও কর্মসূচিটিকে তড়িঘড়ি করে নেওয়া ও দুর্বলভাবে পরিকল্পিত বলে বর্ণনা করেছেন।
জাপান ও ভারত কয়েক দশক ধরে এটি করে আসছে। কয়েক মাসের মধ্যে তাদের মতো করে করতে চাইলে তা আত্মঘাতী হবে। আমরা প্রাণহানি হতে দিতে পারি না।
খাবার কর্মসূচির বাইরেও বাজেটের ওপর চাপ রয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়নে বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং নতুন রাজধানী নুসান্তারা নির্মাণে অব্যাহত বিপুল বিনিয়োগ সরকারি অর্থায়নে আরও চাপ সৃষ্টি করেছে। পরিকল্পিত নগরীতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য আগ্রহ না থাকলেও এ চাপ কমেনি। সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি, সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং অবকাঠামোর অকার্যকর বিশাল প্রকল্প—সব মিলিয়ে বাজারের ধাক্কা সামাল দিতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও জবাবদিহি
৩০ জানুয়ারি সংকটের প্রথম উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা পদত্যাগ করেন। আর্থিক সেবা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহেন্দ্র সিরেগার, তাঁর ডেপুটি মির্জা আদিত্যসওয়ারা এবং ইন্দোনেশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান ইমান রহমান একই সময়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সমন্বিত এই পদত্যাগগুলো বাজারের সুশৃঙ্খলতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান প্রশাসনের আগেও শাসনব্যবস্থার মান কমছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অবনতি দ্রুত হয়েছে। অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট ২০২৪ সালের “বর্ষসেরা দুর্নীতিবাজ” পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোকে রেখেছিল। সংস্থাটি দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার পরিকল্পিত দুর্বলীকরণ এবং স্বজনপ্রীতিকে স্বাভাবিক করে তোলার কথা উল্লেখ করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত পিপলস ট্রাইব্যুনাল সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, যোগসাজশ এবং দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত খনি-অনুমতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের বাণিজ্যিকীকরণসহ নয়টি অভিযোগ আনে।
দুর্বল তদারকির প্রভাবের তথ্য তুলে ধরেছেন পরিবেশকর্মীরা। ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশবিষয়ক ফোরাম ওয়ালহির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালজুড়ে খনি ও অন্যান্য সম্পদ আহরণকারী ব্যবসার জন্য প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর বন উজাড় হয়েছে, যা জাকার্তার আয়তনের চার গুণ। পরিবেশের এই অবক্ষয়ের সঙ্গে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষয়ের মিল রয়েছে। দুটিই অল্প কিছু স্বার্থগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এবং ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধারার প্রতিফলন।
সরকারি পদক্ষেপ, আস্থা ফেরেনি
বাজারে ধস ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়ে যাওয়ার মুখে অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হার্তার্তো ৩০ জানুয়ারি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে স্থিতিশীলতা ফেরানোর পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি শেয়ারবাজার আরও গভীর করার নতুন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। এর মধ্যে রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ন্যূনতম ফ্রি-ফ্লোটের বাধ্যতামূলক হার ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে মার্চের মধ্যে ১৫ শতাংশ করা। এ ছাড়া পেনশন ও বিমা তহবিলকে পোর্টফোলিওর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শেয়ারে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে; বর্তমানে এ সীমা ৮ শতাংশ। এতে তালিকাভুক্ত শেয়ারে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ থেকে বিলিয়ন ডলার আসতে পারে।
এয়ারলাঙ্গা বলেন, ৩০ জানুয়ারি জেসিআই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং বাজারের স্থিতিশীলতার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। তিনি ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিকে সমর্থন করে বলেন, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় কার্যকর রয়েছে। তবে সংকটের সূত্রপাত ঘটানো শাসনব্যবস্থার মৌলিক ঘাটতি প্রশাসনিক কিছু পরিবর্তনে দূর হবে কি না, তা নিয়ে বাজারের সংশয় রয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বকে পদত্যাগে বাধ্য করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং মারতাবে খনির অমীমাংসিত অবস্থা—সবই ইঙ্গিত দেয়, কাঠামোগত সংস্কার এখনও অধরা।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও আইনের দুর্বল শাসনের মুখে ইন্দোনেশিয়ার বাজার অর্থনীতির ভঙ্গুরতা এই সংকট উন্মোচন করেছে। স্বল্পমেয়াদি কারিগরি পদক্ষেপে সূচক সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে, তবে ৮০ বিলিয়ন ডলারের মূলধন বেরিয়ে যাওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের গভীর মূল্যায়নের প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা এবং সম্পত্তির অধিকারের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার না থাকলে ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘস্থায়ী মূলধন-পলায়নের ঝুঁকিতে পড়বে, যা দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মূল কথা
- ২৮ জানুয়ারি জাকার্তা কম্পোজিট ইনডেক্স প্রায় ৯ শতাংশ পড়ে যায়। উদীয়মান বাজার থেকে সীমান্তবর্তী বাজারে অবনমনের সম্ভাবনা নিয়ে এমএসসিআইয়ের সতর্কবার্তায় এই দরপতন শুরু হয়
- ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পিটি ইউনাইটেড ট্র্যাক্টরসের কাছ থেকে মারতাবে সোনার খনি দখল করে। এতে আইনি নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ ও খেয়ালখুশিমতো সম্পত্তি অধিগ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হয়
- প্রেসিডেন্ট প্রবোওর ভাতিজা টমাস জিওয়ান্দোনো ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার জ্যেষ্ঠ ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত হন। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় এবং রুপিয়াহ ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে নেমে যায়
- সরকারের বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচির বার্ষিক ব্যয় ৫০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ। বাস্তবায়ন ব্যর্থতা, খাদ্যে বিষক্রিয়া ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে কর্মসূচিটি প্রশ্নের মুখে পড়েছে
- সংকটের মধ্যে ৩০ জানুয়ারি আর্থিক সেবা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও ইন্দোনেশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধানসহ আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন
- বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে এমএসসিআইয়ের উদ্বেগ দূর করতে সরকার ন্যূনতম ফ্রি-ফ্লোটের বাধ্যতামূলক হার ৭.৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে
- জনতুষ্টিবাদী ব্যয়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটা ও নতুন রাজধানী নির্মাণের কারণে ২০২৫ সালের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা






