ডিপসিকের ধাক্কার রেশ এখনো রয়ে গেছে
হাংজৌ থেকে ডিপসিকের মোবাইল অ্যাপ বেরিয়ে সিলিকন ভ্যালিকে নাড়িয়ে দেওয়ার এক বছর পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়া দুটি সমান্তরাল জগতে ভাগ হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনা স্টার্টআপটি দেখায়, কম উন্নত চিপ এবং বাজেটের সামান্য অংশ ব্যবহার করেও বড় ভাষা মডেল কার্যক্ষমতায় চ্যাটজিপিটির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। প্রযুক্তি মহলে এখন শুধু “ডিপসিক মুহূর্ত” নামে পরিচিত এই ঘটনা মার্কিন এআই আধিপত্যের দুর্বলতাগুলো উন্মোচন করেছে, যা ২০২৬ সালের শুরুতেও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতাকে নতুন আকার দিচ্ছে।
সূচিপত্র
এই ধাক্কা শুধু প্রযুক্তিগত ছিল না, ছিল মানসিকও। চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এআই খাতে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ঢেলেছে, যা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ করা ৬০০ কোটি ডলারের প্রায় ৩০ গুণ। তবু ডিপসিক প্রমাণ করেছে, সম্পদের সীমাবদ্ধতা উদ্ভাবনকে দমিয়ে না রেখে বরং তা উসকে দিতে পারে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ফেলো স্কট সিঙ্গারের পর্যবেক্ষণ, এই ঘটনা কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তিনি বলেন, “চীন স্পষ্টতই বাগ্মিতার মাধ্যমে নিজেকে বহুপক্ষীয়, উন্মুক্ত ও উন্নয়নমুখী বৈশ্বিক নেতা হিসেবে তুলে ধরছে। এআই নিয়ে চীনের ভূরাজনৈতিক অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের আগেই গড়ে উঠেছে, তবে তা ক্রমেই বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।”
ওয়াশিংটনের বাজি চিপে, বেইজিংয়ের পাল্টা জবাব কোডে
ডিপসিকের চ্যালেঞ্জের জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের মাঝামাঝি “দৌড়ে জয়: আমেরিকার এআই কর্মপরিকল্পনা” শিরোনামে একটি কৌশলপত্র প্রকাশ করে। পরিকল্পনায় প্রতিযোগিতাকে স্পষ্টভাবে জয়-পরাজয়ের লড়াই হিসেবে তুলে ধরে ঘোষণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বৈশ্বিক আধিপত্যের” প্রতিযোগিতায় নেমেছে। প্রশাসন নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো এবং হার্ডওয়্যার, মডেল, সফটওয়্যার ও মানদণ্ডসহ “এআই প্রযুক্তির সম্পূর্ণ কাঠামো” মিত্রদের কাছে রপ্তানির মাধ্যমে মার্কিন প্রযুক্তিগত আধিপত্য কাজে লাগানোর আহ্বান জানায়। লক্ষ্যটি স্পষ্ট করে বলা না হলেও তা ছিল চীন, যাকে বৈশ্বিক এআই সরবরাহব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় ওয়াশিংটন।
ওয়াশিংটনের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা: বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নিয়ন্ত্রণ। সিলিকন ভ্যালিতে সদর দপ্তর থাকা এনভিডিয়া গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট তৈরি করে, যা সর্বাধুনিক এআই মডেল চালায়। উচ্চক্ষমতার চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সরঞ্জামে কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে অত্যাধুনিক সক্ষমতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে সাত মাস এগিয়ে। হুয়াওয়ের অ্যাসেন্ড সিরিজ চীনের সেরা দেশীয় বিকল্প। অ্যাসেন্ড ৯১০ টেক্সট তৈরির মতো মৌলিক কাজে এনভিডিয়ার পুরোনো এইচ১০০ চিপের সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ দিতে পারে, যদিও জটিল মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবধান আরও বাড়ে।
তবে এই প্রযুক্তিগত সুবিধা অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন বিতর্কিতভাবে অবস্থান বদলে যাচাই করা চীনা ক্রেতাদের কাছে এনভিডিয়ার এইচ২০০ সিরিজের চিপ বিক্রির অনুমতি দেয়, বিনিময়ে বিক্রয়লব্ধ অর্থের একটি অংশ নেওয়ার শর্তে। সবচেয়ে উন্নত ব্ল্যাকওয়েল ও রুবিন চিপের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে প্রশাসনের বাজি ছিল, চীন দেশীয় বিকল্প দ্রুত তৈরি করার বদলে পুরোনো মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, আলিবাবা, টেনসেন্ট ও বাইটড্যান্সসহ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে ৫০০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ২০ লাখেরও বেশি এইচ২০০ চিপের অর্ডার দিয়েছে। গত সপ্তাহে রয়টার্স জানায়, চীনা শুল্ক কর্মকর্তারা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চালান প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, বেইজিং ফাঁদটি বুঝতে পেরেছে এবং নির্ভরশীল হতে রাজি নয়।
ওপেন-সোর্সের আক্রমণ
যুক্তরাষ্ট্র হার্ডওয়্যার স্তর নিয়ন্ত্রণ করলেও চীন ওপেন-সোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সফটওয়্যার স্তরে জোরালো আক্রমণ চালিয়েছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের নিয়ন্ত্রিত, মালিকানাধীন মডেলের বিপরীতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো “ওপেন-ওয়েট” মডেল প্রকাশ করেছে, যা ডেভেলপারদের বিনা বাধায় এআই ব্যবস্থা ডাউনলোড, পরিবর্তন ও কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়। ডিপসিকের আর১, আলিবাবার কুয়েন পরিবারের মডেল এবং মুনশট এআইয়ের পণ্যসহ এসব মডেল বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
আলিবাবার কুয়েন মডেল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ওপেন-ওয়েট এআই ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। হাগিং ফেস প্ল্যাটফর্মের হিসাবে, এগুলো প্রায় ৭০ কোটি বার ডাউনলোড করা হয়েছে। কুয়েন ইকোসিস্টেমে প্রায় ৪০০টি স্বতন্ত্র মডেল রয়েছে, যেগুলো থেকে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে মানিয়ে নেওয়া ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি সংস্করণ তৈরি হয়েছে। এই কৌশল ঠিক সেই বাজারগুলোকে লক্ষ্য করে, যেগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে চায় ওয়াশিংটন: পশ্চিমা রপ্তানি বিধিনিষেধ বা লাইসেন্স ফি ছাড়াই এআই সক্ষমতা খুঁজছে এমন মূল্য-সচেতন উন্নয়নশীল অর্থনীতি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৬ সালের নববর্ষের ভাষণে প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে জাতীয় পুনর্জাগরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন। দেশীয় চিপ উন্নয়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি ঘোষণা দেন, চীনা প্রযুক্তি “নতুন উচ্চতায়” পৌঁছেছে। এই বক্তব্য সমসাময়িক এআই প্রতিযোগিতাকে চীনের “শতাব্দীর অপমান”-এর সঙ্গে যুক্ত করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি আফিম যুদ্ধ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত এই সময়ে প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার কারণে চীন বিদেশি শক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিল। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সেই নির্ণায়ক প্রযুক্তি, যা ঠিক করবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি তার উল্টোটা ঘটবে।
দুই পক্ষের কৌশলগত পার্থক্য স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে, আরও বড় ডেটা সেন্টার তৈরি করছে এবং অভূতপূর্ব কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন এমন বিশাল মডেল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চীনের লক্ষ্য বিস্তার: “এআই প্লাস” উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন, রোবোটিকস ও ভৌত অবকাঠামোয় “যথেষ্ট ভালো” এআই সংযুক্ত করা। ২০৩৫ সালের মধ্যে শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও শাসনব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করে বেইজিংয়ের ভাষায় “সম্পূর্ণ এআই-চালিত” সমাজ গড়াই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।
অবকাঠামোর বাধা
দুই পরাশক্তিই ২০২৬ সালজুড়ে এআই উন্নয়নের গতি নির্ধারণ করবে এমন গুরুতর সীমাবদ্ধতার মুখে, তবে তাদের বাধার ধরন মৌলিকভাবে আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে। সর্বাধুনিক এআই মডেল প্রশিক্ষণে বিশাল ডেটা সেন্টার লাগে, যা আগে থেকেই প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে মার্কিন ক্লাউড সেবাদাতারা এআই অবকাঠামোয় ৬০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করবে, যা ২০২৪ সালের ব্যয়ের দ্বিগুণ। কিন্তু বিদ্যুতের প্রাপ্যতা ও নির্মাণের সময়সীমা সম্প্রসারণে কঠিন সীমা টেনে দিচ্ছে।
চীনের সমস্যা ঠিক উল্টো। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাসহ বিপুল জ্বালানি সম্পদ থাকলেও এআই প্রশিক্ষণে সেই শক্তি কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চিপ চীনের নেই। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে বক্তব্য দিতে গিয়ে হুয়াং বলেন, মার্কিন চিপ প্রযুক্তি “কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে” থাকলেও নির্মাণ সক্ষমতায় চীন মার্কিন দক্ষতাকে অনেক পেছনে ফেলেছে। হুয়াং বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে একটি ডেটা সেন্টার তৈরি করতে চাইলে, নির্মাণকাজ শুরু থেকে এআই সুপারকম্পিউটার চালু করা পর্যন্ত সম্ভবত প্রায় তিন বছর লাগে। তারা এক সপ্তাহান্তেই একটি হাসপাতাল তৈরি করতে পারে।” তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, অবকাঠামো দ্রুত গড়ে তোলার সক্ষমতা কীভাবে প্রযুক্তিগত ব্যবধান পুষিয়ে দিতে পারে।
এই পার্থক্যকে বিশ্লেষকেরা “অসম প্রতিযোগিতা” বলেন। তাত্ত্বিক সক্ষমতা ও অত্যাধুনিক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে, আর বাস্তবায়নের গতি ও বাস্তব জগতের প্রয়োগে চীন প্রভাবশালী। স্কট সিঙ্গারের পর্যবেক্ষণ, চীনের প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোতে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত সাফল্যের চেয়ে “বর্তমানে এআইকে কাজে লাগানোর বিষয়ে অনেক বেশি উদ্দীপনা ও তৎপরতা” দেখা যায়। বাস্তব প্রয়োগে এই মনোযোগ এআইচালিত রোবোটিকস, স্মার্ট উৎপাদন এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হচ্ছে, যেখানে পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে চীন।
সামরিক দিক ও বিস্তারের প্রতিযোগিতা
প্রতিযোগিতা বাণিজ্যিক বাজার ছাড়িয়ে সামরিক প্রয়োগেও বিস্তৃত হয়েছে। এখানে প্রযুক্তির উৎকর্ষের চেয়ে ব্যবহারের গতি বেশি নির্ধারক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর “এআই-ফার্স্ট” কৌশল চালু করেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধ, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও দাপ্তরিক কাজে এআইয়ের ব্যবহার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সাতটি “গতি-নির্ধারক প্রকল্প”। “সোয়ার্ম ফোর্জ” ও “এজেন্ট নেটওয়ার্ক”-এর মতো প্রকল্পের লক্ষ্য যুদ্ধ পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা ব্যবস্থায় এআই যুক্ত করা। অন্যদিকে, “এন্ডার’স ফাউন্ড্রি” এআই-সক্ষম সামরিক সিমুলেশন নিয়ে কাজ করছে।
তবে পেন্টাগনকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে, যা চীনের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় ব্যবস্থায় এড়ানো যায়। এই ব্যবস্থায় বেসামরিক এআইয়ের অগ্রগতি সহজেই সামরিক কাজে পৌঁছায়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজির গবেষকেরা পিপলস লিবারেশন আর্মির ২,৮০০টিরও বেশি চুক্তি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দেশটির প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও ক্রমে বেসরকারি খাতের উদ্ভাবকদের কাছ থেকেও সহায়তা নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও তথ্যের বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে, তখন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা সামরিক ও বেসামরিক খাতে একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে পারে।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এই প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা ভবিষ্যৎ সংঘাতের ফল নির্ধারণ করতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, ২০২৬ হলো এক নির্ণায়ক পর্যায়। এ সময়ে এআই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম থেকে এমন স্বয়ংক্রিয় এজেন্টে রূপ নিচ্ছে, যা মানুষের সামান্য তত্ত্বাবধানেই জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে। নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, চীনা রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার অভিযানগুলোতে এআই এজেন্ট ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশের পুরো প্রক্রিয়ার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করেছে।
বৈশ্বিক শাসন ও মানদণ্ডের লড়াই
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হলো বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার নিয়ম নির্ধারণ। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৈশ্বিক সংলাপ আয়োজন করছে, যা মানদণ্ড, ঝুঁকি ও নীতিমালা সমন্বয়ের প্রথম সত্যিকারের বৈশ্বিক মঞ্চ। তবে মৌলিক দার্শনিক মতভেদ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বিভক্ত করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যক্তির গোপনীয়তা ও অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়ে অধিকারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ মডেলের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র এমন স্বেচ্ছামূলক মানদণ্ড চায়, যা উদ্ভাবনের স্বাধীনতা বজায় রাখবে। চীন “অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতা”র কথা বললেও তথ্য ও প্রযুক্তির প্রয়োগে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে সম্ভবত “কাঠামোয় বৈশ্বিক শাসন, কিন্তু সারবস্তুতে ভূরাজনীতি” তৈরি হবে। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় কৌশলও পাশাপাশি থাকবে।
চীনের কূটনৈতিক অবস্থান উন্মুক্ততা ও বহুপক্ষীয়তার ওপর জোর দেয়, যা ওয়াশিংটনের “আমেরিকা ফার্স্ট” বক্তব্যের বিপরীত। বেইজিংয়ের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক এআই শাসন কর্মপরিকল্পনায় একাধিক অংশীজনকে যুক্ত করে “বৈচিত্র্যময়, উন্মুক্ত ও উদ্ভাবনী” ইকোসিস্টেম গড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গ্লোবাল সাউথে এই বার্তা বিশেষভাবে সাড়া ফেলছে, কারণ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স ফি এআইয়ের মার্কিন সংস্করণকে অনেকের নাগালের বাইরে রাখে। মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের জরিপে অংশ নেওয়া চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের প্রায় ৮০ শতাংশ মনে করেন, ২০২৬ সালে বেইজিং রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গভীর করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র “প্রযুক্তি কাঠামোভিত্তিক কূটনীতি” চালাচ্ছে। মার্কিন মানদণ্ড গ্রহণে আগ্রহী মিত্রদের এআই অবকাঠামো নির্মাণে অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিচ্ছে তারা। ট্রাম্প প্রশাসন একে নিরাপত্তার অপরিহার্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে এবং সতর্ক করেছে, চীনা প্রযুক্তি এমন নির্ভরতা তৈরি করে, যা প্রতিপক্ষ কাজে লাগাতে পারে। তবে বাণিজ্য বিরোধ এবং ওয়াশিংটনের কঠোর রপ্তানি নীতির সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য মিত্রদের ওপর চাপের কারণে মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাধার মুখে পড়ছে।
বাস্তবতা যাচাই: একাধিক প্রতিযোগিতা, শেষরেখা নেই
একজন নির্দিষ্ট বিজয়ী থাকবে এমন একক “এআই দৌড়”-এর ধারণা বিশ্লেষকেরা ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছেন। বরং প্রতিযোগিতাটি দশ-ইভেন্টের মতো, যেখানে একাধিক পরস্পর-সম্পর্কিত ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ জিততে পারে। সেমিকন্ডাক্টর নকশা, অত্যাধুনিক মডেলের সক্ষমতা এবং ক্লাউড অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র বড় ব্যবধানে এগিয়ে। অন্যদিকে, ওপেন-সোর্সের ব্যবহার, বাস্তব জগতের এআই প্রয়োগ, উৎপাদন খাতে সংযুক্তি এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর জ্বালানি সম্পদে চীন এগিয়ে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভূপ্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক শিয়াওমেং লুর পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে কোনো একটি দেশ সব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের বদলে উভয় দেশই নিজ নিজ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করবে। তিনি বলেন, “এআই চিপে যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিত অগ্রগতি রয়েছে, যদিও এলএলএমে চীন এগিয়ে আসছে এবং এআই শাসনব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।” বিনিয়োগের ধরনেও এই বিভাজন দেখা যায়: মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যার বিস্তার ও জ্ঞানভিত্তিক কাজের স্বয়ংক্রিয়তায় মনোযোগ দিচ্ছে, আর চীনা বিনিয়োগ যাচ্ছে রোবোটিকস ও শিল্পখাতের প্রয়োগে।
এই বিভাজনের বৈশ্বিক উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর নির্ধারক প্রযুক্তি হয়ে উঠলে, এআই গ্রহণে এগিয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে “মহাবিভাজন” শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিভাজনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মার্কিন প্রযুক্তি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পাবে, তবে তাদের উচ্চ ব্যয় ও রাজনৈতিক শর্তের মুখে পড়তে হবে। চীনের ওপেন-সোর্স সরঞ্জাম গ্রহণকারী দেশগুলো সহজলভ্য, নিজেদের প্রয়োজনমতো বদলে নেওয়া যায় এমন প্ল্যাটফর্ম পাবে; তবে ডিপসিকের মতো ব্যবস্থায় থাকা নিরাপত্তা দুর্বলতা ও সেন্সরশিপের কৌশলের ঝুঁকিও তাদের নিতে হতে পারে।
২০২৬ যত এগোবে, মূল প্রশ্ন আর কোন পরাশক্তি জিতবে তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যখন পরস্পরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মানদণ্ডে চলবে, তখন বিভক্ত এআই ইকোসিস্টেমের খরচ বিশ্ব বহন করতে পারবে কি না। ডিপসিক মুহূর্ত প্রমাণ করেছে, এই খাতে প্রবেশের বাধা কমেছে; এখন চ্যালেঞ্জ হলো, বাধা কমার ফলে যেন ডিজিটাল ভবিষ্যৎ বিভক্ত না হয়ে পড়ে তা নিশ্চিত করা।
একনজরে
- ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডিপসিকের প্রকাশিত মডেল দেখায়, সীমিত চিপ ব্যবহার করেও চীনা এআই মডেল অনেক কম খরচে মার্কিন মডেলের সমান সক্ষমতা অর্জন করতে পারে
- ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এআই খাতে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে, যেখানে চীনের বিনিয়োগ ছিল ৬০০ কোটি ডলার; তবু চীনা ওপেন-সোর্স মডেল এখন বিশ্বজুড়ে ডাউনলোডের হিসাবে এগিয়ে
- ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আংশিক শিথিল করে চীনে এনভিডিয়ার এইচ২০০ চিপ বিক্রির অনুমতি দেয়, তবে আরও উন্নত ব্ল্যাকওয়েল ও রুবিন প্রসেসরের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে
- চীনের “এআই প্লাস” উদ্যোগের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা ও শাসনব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্ত করা
- উন্নত এআই চিপের বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে
- আলিবাবার কুয়েন মডেল বিশ্বজুড়ে ৭০ কোটি বার ডাউনলোড হয়েছে, ফলে এগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওপেন-ওয়েট এআই ব্যবস্থা
- রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আংশিক শিথিলের পর চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ৫০০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের এনভিডিয়া এইচ২০০ চিপ অর্ডার করেছে
- ২০২৬ সালে জাতিসংঘের এআই শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৈশ্বিক সংলাপ বিশ্বজুড়ে এআই সমন্বয়ের প্রথম উদ্যোগ, যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিভাজন রয়ে গেছে






