অস্পৃশ্য জেনারেলের পতন
জেনারেল ঝাং ইউশিয়াকে পদ থেকে সরিয়ে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের আওতায় নেওয়ার আকস্মিক ঘোষণার পর চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে জানায়, কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ঝাংয়ের পাশাপাশি যৌথ স্টাফ বিভাগের প্রধান জেনারেল লিউ ঝেনলিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৭৫ বছর বয়সী ঝাং সামরিক নেতৃত্বের এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন; গত তিন বছরে দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও কয়েক ডজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া একাধিক শুদ্ধি অভিযানেও তিনি টিকে গিয়েছিলেন। তাঁর আকস্মিক পতন সশস্ত্র বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অভিযানের নাটকীয় তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। কমিউনিস্ট পার্টির অভিজাত নেতৃত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত এক কর্মকর্তাকেও এবার সরিয়ে দেওয়া হলো।
সূচিপত্র
সরকারি ঘোষণায় কথিত অসদাচরণের নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি। এ ধরনের তদন্তে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততা বোঝাতে প্রচলিত পরোক্ষ ভাষাই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পিপলস লিবারেশন আর্মি ডেইলি প্রথম পাতার সম্পাদকীয়তে ঝাং ও লিউকে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আস্থার সঙ্গে গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতা এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের কর্তৃত্ব পদদলিত করার জন্য অভিযুক্ত করলে পদক্ষেপটির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এ ধরনের ভাষা সাধারণত ফৌজদারি বিচার ও দীর্ঘ কারাদণ্ডের পূর্বাভাস দেয়; এ ধরনের তদন্তে অভিযুক্তদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার ঘটনা প্রায় কখনোই ঘটে না। পদচ্যুতির দ্রুততাও পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে। মাত্র এক মাস আগেও ঝাং সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন, তখন আসন্ন বিপদের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। এত জ্যেষ্ঠ এক ব্যক্তিত্বের পতন ইঙ্গিত দেয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন আরও কঠোর ও আগ্রাসী পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বিপর্যয়
এই শুদ্ধি অভিযান কার্যত কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের নেতৃত্বকাঠামো ভেঙে দিয়েছে। চীনের ২০ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্যের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে এই শক্তিশালী দলীয় সংস্থাটি। ২০২২ সালের পার্টি কংগ্রেসে বর্তমান কমিশন গঠনের সময় এর সদস্য ছিলেন সাতজন; তাঁদের দায়িত্ব ছিল সামরিক কৌশল, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং সামরিক অভিযান তদারক করা। এখন সক্রিয়ভাবে দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র দুজন: চেয়ারম্যান শি জিনপিং নিজে এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন, পেশাজীবনে একজন রাজনৈতিক কমিশার, যিনি আগে সামরিক বাহিনীর দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত পরিচালনা করতেন। এই সংকোচন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে গুরুতর দুর্বলতা। ১৯৭১ সালে মার্শাল লিন বিয়াওয়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর কমিশনটি কার্যত কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
অতি অল্প কয়েকজনের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। ১৯৮০-এর দশকে দেং শিয়াওপিং কেবল কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেই দেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। এতে চীনের রাজনৈতিক কাঠামোতে এই সংস্থার সর্বোচ্চ ক্ষমতা স্পষ্ট হয়েছিল। এখনকার প্রেসিডেন্ট মাত্র একজন ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্যকে নিয়ে সামরিক বাহিনী পরিচালনা করছেন, আর সেই সদস্যেরও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। এটি নজিরবিহীন এক কমান্ড কাঠামো তৈরি করেছে। পিপলস লিবারেশন আর্মি ডেইলির সম্পাদকীয় স্পষ্ট করেছে, এই শুদ্ধি অভিযান শুধু দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে জেনারেলদের বিরুদ্ধে এমন রাজনৈতিক সমস্যা তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে, যা সামরিক বাহিনীর ওপর পার্টির নিরঙ্কুশ নেতৃত্বকে দুর্বল করেছে। এই ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, তদন্তে শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, আনুগত্য ও রাজনৈতিক নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নও রয়েছে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লাইল মরিস সশস্ত্র বাহিনীর স্থিতিশীলতা নিয়ে পরিস্থিতিটিকে কঠোর ভাষায় বর্ণনা করেছেন।
পিএলএ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। চীনের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে এখন বড় ধরনের শূন্যতা। চীনা সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে এ পদক্ষেপ নজিরবিহীন এবং এটি শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার শামিল।
‘প্রিন্সলিং’ পরিচয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা
ঝাং ইউশিয়া কমিউনিস্ট পার্টির অভিজাতদের একটি শ্রেণির সদস্য ছিলেন, যাঁদের ‘প্রিন্সলিং’ বলা হয়। তাঁরা সেই বিপ্লবী বীরদের সন্তান, যাঁরা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠায় মাও সে তুংয়ের সঙ্গে লড়েছিলেন। ঝাংয়ের বাবা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন এবং ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের গৃহযুদ্ধের সময় শি জিনপিংয়ের বাবা শি ঝংশুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। এই সম্পর্ক দুই পরিবারের মধ্যে প্রজন্মজুড়ে এক বন্ধন তৈরি করে; ধারণা করা হয়, ঝাং ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট একে অপরকে শৈশব থেকেই চিনতেন। চীনা রাজনীতিতে এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত শক্ত সুরক্ষা দেয়, কারণ বিপ্লবী উত্তরাধিকারের প্রতি আনুগত্যকে সেখানে বিপুল গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শি ঝাংয়ের প্রতি আস্থার পরিচয় দিয়েছিলেন বলে মনে হয়। ৭০ বছর বয়সে প্রচলিত অবসরের সীমা পেরিয়েও তাঁকে দায়িত্বে রেখেছিলেন এবং বয়স বেশি হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সালে তাঁর ভাইস চেয়ারম্যানের মেয়াদ নবায়ন করেছিলেন। তখন অনেক বিশ্লেষক ঝাংকে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র বলে মনে করতেন; তিনি ছিলেন একজন দক্ষ পেশাদার, যিনি সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরামর্শ দিতে পারতেন। আগামী পার্টি কংগ্রেসে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে অবসর নেওয়ার সুযোগ দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু এখন তাঁকে শুদ্ধি অভিযানের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত সামরিক বাহিনীর সর্বস্তরে ভীতিকর বার্তা পাঠাচ্ছে। চীনের অভিজাত রাজনীতি নিয়ে কাজ করা সিআইএর সাবেক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোনাথন জিনের মতে, এই ঘটনা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ঝাংকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ, নেতৃত্বের কেউই এখন সত্যিকার অর্থে নিরাপদ নন। ঘটনাটি প্রায় শেক্সপিয়রীয় নাটকের মতো। শির সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্ক রয়েছে এমন একজনকে সরানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের মধ্যে বার্তাটি স্পষ্ট: ব্যক্তিগত ইতিহাস ও পারিবারিক সম্পর্ক আর প্রেসিডেন্টের নজরদারি থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। এই উপলব্ধি জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে; তাঁরা এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, নিজেদের পদও নিরাপদ কি না। এ ঘটনা প্রেসিডেন্টের অন্য পতিত মিত্রদের কথাও মনে করিয়ে দেয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিন গ্যাং এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট লিউ শাওছির ছেলে লিউ ইউয়ান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে উদ্যোগে প্রথম দিকে সমর্থন দিলেও শৈশবের বন্ধু লিউ ইউয়ানকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ও কৌশলগত মতবিরোধ
বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ ঝাংয়ের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। তবে গোয়েন্দা সংস্থার ব্রিফিং ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো শুদ্ধি অভিযানের কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ২০২৪ সালে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভানের সঙ্গে এক বৈঠকের সময় মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির গোপন তথ্য ফাঁস করার অভিযোগ রয়েছে ঝাংয়ের বিরুদ্ধে। অন্য অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহব্যবস্থায় কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠ পদে উন্নীত করার বিনিময়ে বিপুল ঘুষ নেওয়া। সাম্প্রতিক তদন্তগুলোতে এ ব্যবস্থাটি বিশেষ নজরে এসেছে; এসব তদন্তে কয়েক লাখ কর্মকর্তা জড়িত হয়েছেন।
দুর্নীতি বা গুপ্তচরবৃত্তির প্রশ্নের বাইরে বিশ্লেষকদের ধারণা, সামরিক কৌশল নিয়ে মৌলিক মতবিরোধ থেকেও এই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্যাসিফিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি অর্জনের শি জিনপিংয়ের লক্ষ্যকে অবাস্তব ও বিপজ্জনক বলে মনে করতেন ঝাং। জেনারেলটির কথিত পরামর্শ ছিল, আধুনিকায়ন ও যৌথ সামরিক অভিযানের প্রশিক্ষণের জন্য আরও সময় দিতে লক্ষ্যপূরণের সময়সীমা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হোক। এ তথ্য সঠিক হলে, এমন মতবিরোধ এমন এক ক্ষেত্রে শির প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হবে, যেখানে তাঁর দাবি নিরঙ্কুশ আনুগত্য। ঝাংয়ের মূল্যায়ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করত, কারণ তিনি ছিলেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যিনি যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা সরাসরি বুঝতেন। বর্তমান অধিকাংশ কমান্ডারের বিপরীতে তিনি শুধু কাল্পনিক সংঘাতের প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় শূন্যতা
ঝাং ও লিউকে সরিয়ে দেওয়ায় চীনা সামরিক বাহিনীর শেষ জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদেরও বিদায় হলো, যাঁদের প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ছিল। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সীমান্তযুদ্ধের সময় কমিশন পান ঝাং। সংক্ষিপ্ত হলেও তীব্র ওই অভিযানে চীনের ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের আরও কয়েকটি সংঘর্ষেও তিনি নিজেকে দক্ষ প্রমাণ করেন; কৌশলগত দক্ষতার কারণে দ্রুত পদোন্নতি পান। আধুনিক পিএলএতে এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পিএলএ কোনো বড় যুদ্ধে অংশ নেয়নি; বাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তাই আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পথে পদোন্নতি পেয়েছেন।
সাবেক বিশেষ অভিযান বাহিনীর কমান্ডার ও পিএলএর স্থলবাহিনীর প্রধান লিউ ঝেনলিরও বাস্তব সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল। যৌথ স্টাফ বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর সর্বশেষ দায়িত্বে তিনি আধুনিক যুদ্ধের মূল ভিত্তি—কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, কম্পিউটার, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও অনুসন্ধানব্যবস্থা—তদারক করতেন। তাঁকে সরিয়ে দেওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জটিল অভিযান সমন্বয়ের জন্য অত্যাবশ্যক কারিগরি দক্ষতা থেকে সামরিক বাহিনী বঞ্চিত হলো। সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও বর্তমানে চায়না স্ট্র্যাটেজিস গ্রুপ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ক্রিস্টোফার জনসনের মতে, প্রেসিডেন্টের মনে হয়েছে সামরিক বাহিনীর সমস্যা এত গভীরে প্রোথিত যে বিদ্যমান নেতৃত্বকে দিয়ে সেগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।
এই শুদ্ধি অভিযানের ফলে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনে এখন প্রধানত রাজনৈতিক কমিশাররাই রয়েছেন; সামরিক কৃতিত্বের চেয়ে প্রেসিডেন্টের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে তাঁরা নিজেদের কর্মজীবন গড়েছেন। একমাত্র অবশিষ্ট ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিনের বিশেষত্ব ছিল শৃঙ্খলা তদারকি ও রাজনৈতিক কাজ, যুদ্ধ পরিচালনা নয়। পেশাগত দক্ষতার বদলে রাজনৈতিক নির্ভরযোগ্যতার ওপর এই জোর পিএলএর জটিল সামরিক অভিযান পরিকল্পনা ও পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে—এমন অভিযানে।
ভয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিকভাবে সরিয়ে দেওয়ায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অচল করে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করছে। কমান্ডাররা যখন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও পতন হতে দেখেন, তখন তাঁরা নিজে থেকে উদ্যোগ না নিয়ে ওপর থেকে স্পষ্ট অনুমোদনের অপেক্ষা করতে শেখেন। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের চীন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেসান্দ্রো আরদুইনো বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রাধিকার সম্পর্কে এই শুদ্ধি অভিযান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
এটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরাসরি পাঠানো এক স্মারক, যেখানে বলা হচ্ছে—যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের ভেতরে রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততা গুরুতর অপরাধ। বার্তাটি পরিষ্কার: কেউই নিরাপদ নয়।
এই পরিবেশে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়। তদন্তের ভয়ে কর্মকর্তারা ঝুঁকি নিতে চান না; এমন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলেন, যা পরে ভুল বা অবিশ্বস্ততার প্রমাণ হিসেবে দেখা হতে পারে। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে জটিল অভিযান সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সম্পর্কও এই শুদ্ধি অভিযানে ব্যাহত হচ্ছে। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ফেলো নিল থমাসের ধারণা, কঠোর আনুগত্যের মানদণ্ড পূরণ করেন এমন কর্মকর্তাদের দিয়ে কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা চলায় কয়েক বছর ধরে এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
তাইওয়ান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব
তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধের ঝুঁকিতে এই শুদ্ধি অভিযানের পরস্পরবিরোধী প্রভাব পড়ছে। তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমলেও দীর্ঘমেয়াদি বিপদ বাড়তে পারে। নিকট ভবিষ্যতে বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বশূন্যতার কারণে দ্বীপটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান কম সম্ভাব্য। কমান্ড কাঠামো নতুন করে গড়ে তুলতে এবং কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক আনুগত্য রয়েছে এমন কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে প্রেসিডেন্টের যথেষ্ট সময় লাগবে। চলমান তদন্তের কারণে সাংগঠনিক জটিলতা অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত ধীর করে দিচ্ছে এবং প্রশিক্ষণের সময়সূচি ব্যাহত করছে। তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক মিং-শি শেনের মতে, ২০২৭ সালের আগে চীনের তাইওয়ানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা কম, কারণ নেতৃত্বের সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার জন্য সময় দরকার।
তবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। তাইওয়ান নিয়ে সময়সীমা নির্ধারণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা যায় ঝাং ইউশিয়া। তিনি মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে পারতেন। তাঁকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট এমন কজনের একজনের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করলেন, যিনি বেপরোয়া সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিতে পারতেন। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাঙ সতর্ক করেছেন, এই শুদ্ধি অভিযানে তাইওয়ান নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিপ্রকৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাবে।
ঝাংয়ের মতো জেনারেলদের সরিয়ে দিলে, সময় এলে শির সামরিক দুঃসাহসিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করার সাহস কোনো জেনারেলের থাকবে না, ফলে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়বে। জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে শি আক্রমণের নির্দেশ দেবেন না। কিন্তু পিএলএ চীনকে আরও গৌরবান্বিত করতে তাইওয়ানকে ‘মুক্ত’ করতে প্রস্তুত কি না, শি যখন তা জানতে চাইবেন, তখন কোনো জেনারেলই আর সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়ার সাহস করবেন না।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলাকেও জটিল করে তুলছে। ভুল হিসাবের ঝুঁকি কমাতে বিদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে ঝাং তুলনামূলক খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাহীন, কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের তাঁকে দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে ভবিষ্যতে তাইওয়ান প্রণালি বা দক্ষিণ চীন সাগরে সংকটের সময় অনিচ্ছাকৃত উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং একই সঙ্গে চীনকে প্রতিহত করতে হবে এমন শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
মূল কথা
- চীনের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার সামরিক কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র জেনারেল ঝাং ইউশিয়াকে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন থেকে সরিয়ে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে জেনারেল লিউ ঝেনলিকেও তদন্ত করা হচ্ছে।
- এই তদন্তে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্যসংখ্যা সাত থেকে কমে দুজনে দাঁড়িয়েছে: শি জিনপিং এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন। দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ঝাং শেংমিনের সামরিক অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা সীমিত।
- যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক গোপন তথ্য ফাঁস, পদোন্নতির বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান নিয়ে সামরিক প্রস্তুতি অর্জনে শি জিনপিংয়ের আগ্রাসী সময়সীমার বিরোধিতার অভিযোগ রয়েছে ঝাংয়ের বিরুদ্ধে।
- তাঁদের সরিয়ে দেওয়ায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার প্রকৃত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শেষ জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররাও বিদায় নিয়েছেন। পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্বে এখন আধিপত্য রাজনৈতিক কমিশারদের, যাঁরা সামরিক কৃতিত্বের বদলে আনুগত্যের মাধ্যমে পদে উঠেছেন।
- নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা ও কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনের কারণে তাইওয়ান নিয়ে তাৎক্ষণিক যুদ্ধের ঝুঁকি সম্ভবত কমেছে। তবে শি এমন কর্মকর্তাদের ঘিরে থাকায়, যাঁরা তাঁর কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করবেন না, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়ছে।
- এই শুদ্ধি অভিযান ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীনের সশস্ত্র বাহিনীতে সামরিক দক্ষতার চেয়ে নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অচল করে দেবে এবং ভবিষ্যতে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়াবে।






