শিশুদের ফর্মুলা দুধের প্রত্যাহার বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত, দুই শিশুর মৃত্যু তদন্তাধীন

পড়তে 8 মিনিট
Nestle infant formula recall widens to China, Brazil | GBAF

বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট

শিশুদের ফর্মুলা দুধশিল্পে বড় ধরনের খাদ্যনিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে। এর জেরে বিশ্বের তিন বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদক—নেসলে, ড্যানোন ও ল্যাকটালিস—কয়েক ডজন দেশে পণ্য প্রত্যাহার শুরু করেছে। উদ্বেগের কারণ সেরিউলাইড, Bacillus cereus ব্যাকটেরিয়ার কয়েকটি প্রজাতির তৈরি একটি বিষাক্ত পদার্থ। এটি বমিভাব, বমি ও পেটে খিঁচুনিসহ গুরুতর পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। নেসলের স্বেচ্ছায় পণ্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে শুরু হওয়া ঘটনা দ্রুত বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলের সংকটে রূপ নিয়েছে। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত পুষ্টিপণ্য তৈরির ক্ষেত্রে দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে।

সূচিপত্র
  1. বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা সংকট
  2. কোম্পানিগুলোর পদক্ষেপ ও প্রত্যাহারের বিস্তার
  3. আর্থিক ও বাজারের প্রভাব
  4. মর্মান্তিক খবর ও তদন্ত
  5. চিকিৎসায় শনাক্তকরণের চ্যালেঞ্জ
  6. স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
  7. নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা সামনে
  8. ভৌগোলিক বিস্তার ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
  9. সংক্ষেপে

দূষণের উৎস হিসেবে শনাক্ত হয়েছে একটিমাত্র সরবরাহকারী, যারা অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (এআরএ) তেল সরবরাহ করে। এআরএ শিশুদের মস্তিষ্ক ও দৃষ্টিশক্তির বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সাধারণত উচ্চমানের শিশুদের ফর্মুলা দুধে যোগ করা হয়। উপাদানটি অপরিহার্য হলেও, সম্ভাব্য দূষিত চালান একাধিক উৎপাদকের উৎপাদন লাইনে পৌঁছানোর পর এর উৎস ও নিরাপত্তা যাচাই নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। ফ্রান্সে শিশুদের অসুস্থতার খবর এবং তদন্তাধীন অন্তত দুটি মৃত্যুর ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে প্রত্যাহার করা পণ্যের সরাসরি সম্পর্ক এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

কোম্পানিগুলোর পদক্ষেপ ও প্রত্যাহারের বিস্তার

নেসলে প্রথম সমস্যাটি শনাক্ত করে। নেদারল্যান্ডসের তাদের একটি কারখানায় নিয়মিত পরীক্ষার সময় দূষণের বিষয়টি ধরা পড়ে। এর পর ৬০টিরও বেশি দেশে বিক্রি হওয়া পণ্য ব্যাপকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে এসএমএ, বেবা, গিগোজ ও আলফামিনোর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড রয়েছে। কোম্পানিটি পদক্ষেপটিকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যদিও প্রত্যাহারের ব্যাপকতা কোম্পানিটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম।

এক বিবৃতিতে নেসলে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে।

খাদ্যনিরাপত্তা এবং সব শিশুর সুস্থতা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা বুঝতে পারছি, এই খবর উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এই প্রক্রিয়াজুড়ে মা-বাবা ও পরিচর্যাকারীদের স্পষ্ট, স্বচ্ছ তথ্য এবং সহায়তা দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নেসলের ঘোষণার পর সংকট ছড়িয়ে পড়ে শিল্পের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানে। ফরাসি দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদক ল্যাকটালিস জানায়, তারা ১৮টি দেশে বিতরণ করা পিকো ব্র্যান্ডের শিশুদের ফর্মুলা দুধের ছয়টি ব্যাচ প্রত্যাহার করছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো। ল্যাকটালিস জানায়, দূষিত এআরএ তেল সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই তারা একটি স্বাধীন পরীক্ষাগারের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু করে। কোম্পানিটি জোর দিয়ে বলেছে, এসব নির্দিষ্ট পণ্য খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অসুস্থতার কোনো খবর তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পায়নি।

বিজ্ঞাপন

বাজারের আরেক বড় প্রতিষ্ঠান ড্যানোনও এর প্রভাবের মুখে পড়ে। সিঙ্গাপুরের খাদ্য সংস্থার অনুরোধে থাইল্যান্ডে উৎপাদিত তাদের ডুমেক্স ডুলাক ১ ফর্মুলা দুধের একটি চালান ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আটকে দিতে হয়। বাড়তি নজরদারিমূলক পরীক্ষায় নেসলে ও ড্যানোন—দুই কোম্পানির চালানেই সেরিউলাইড শনাক্ত করে সংস্থাটি। ড্যানোনের দাবি, তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ মেনে পণ্যটি প্রত্যাহার করে কোম্পানিটি।

আর্থিক ও বাজারের প্রভাব

প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রভাব পড়েছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপর। ড্যানোনের শেয়ারের দাম এক দিনে প্রায় ৯ শতাংশ কমে ২০২৫ সালের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের এই প্রতিক্রিয়ার পেছনে শিশুদের পুষ্টিপণ্যের সঙ্গে জড়িত সুনামের ঝুঁকি কাজ করেছে। এই খাতে ভোক্তাদের আস্থা একান্ত জরুরি। ড্যানোনের মোট আয়ের প্রায় ২১ শতাংশ এবং নেসলের প্রায় ৫ শতাংশ আসে শিশুদের ফর্মুলা দুধ থেকে। ফলে আর্থিক ফলাফলের জন্য এ বাজারের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরবরাহকারীদের ওপরও দূষণের প্রভাব পড়েছে। এআরএ তেলের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বাজার বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে চিহ্নিত চীনা কোম্পানি ক্যাবিও বায়োটেকের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমে যায়। দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো বা কর্তৃপক্ষ কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহকারীর নাম প্রকাশ করেনি। তবে বাজারের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, সরবরাহশৃঙ্খলের সমস্যাটি নির্দিষ্ট কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের সরবরাহকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বড় উপাদান সরবরাহকারী ডিএসএম-ফিরমেনিখ প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তাদের কোনো পণ্যই প্রত্যাহারের আওতায় পড়েনি।

বিজ্ঞাপন

মর্মান্তিক খবর ও তদন্ত

সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বলেছে, তাদের পণ্যের সঙ্গে কোনো অসুস্থতার নিশ্চিত ঘটনা চূড়ান্তভাবে যুক্ত করা যায়নি। তবে কর্তৃপক্ষ কয়েকটি গুরুতর ঘটনা তদন্ত করছে। ফ্রান্সে প্রত্যাহারের আওতায় থাকা ফর্মুলা দুধ খাওয়া দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছেন সরকারি কৌঁসুলিরা। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে মারা যাওয়া শিশুটিকে নেসলের গিগোজ গুঁড়ো দুধ খাওয়ানো হয়েছিল। দ্বিতীয় শিশুটির মৃত্যু হয় পশ্চিম ফ্রান্সে।

ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নেসলে সতর্কতার সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, মৃত্যুর সঙ্গে পণ্যের কোনো কারণগত সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

"কর্তৃপক্ষ যেমন বলেছে, এই পর্যায়ে এসব মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে আমাদের পণ্য খাওয়ার কোনো সম্পর্কের ইঙ্গিত নেই," এক বিবৃতিতে নেসলে জানিয়েছে।

এই আশ্বাস সত্ত্বেও, ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা মা-বাবা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরের খাদ্য সংস্থা সেরিউলাইডের সংস্পর্শের সঙ্গে সম্ভবত সম্পর্কিত মৃদু উপসর্গের একটি ঘটনা নিশ্চিত করেছে, তবে রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রত্যাহার করা নেসলের পণ্য খাওয়ার পর প্রায় এক বছর বয়সী দুই শিশুর দীর্ঘস্থায়ী বমি ও ডায়রিয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা সেরিউলাইড বিষক্রিয়া নিশ্চিত করার জটিলতা তুলে ধরে, কারণ রোগীর নমুনায় বিষাক্ত পদার্থটি শনাক্ত করার মতো নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগারভিত্তিক চিকিৎসা পরীক্ষা নেই।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসায় শনাক্তকরণের চ্যালেঞ্জ

সেরিউলাইডের বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভাব্য অসুস্থতার তদন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং রেডিও ফ্রান্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেরিউলাইড তাপ-স্থিতিশীল একটি বিষাক্ত পদার্থ। অর্থাৎ, পানি ফুটিয়ে তৈরি করার মতো প্রচলিত পদ্ধতিতে এটি নষ্ট হয় না। Bacillus cereus ব্যাকটেরিয়া শুকনো গুঁড়ো দুধে বংশবিস্তার করতে পারে না, তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মিশে গেলে বিষাক্ত পদার্থটি থেকে যেতে পারে।

বিষক্রিয়া শনাক্ত করতে চিকিৎসকদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। খাদ্যনিরাপত্তা আইনজীবী নাথালি গুতালঁ রেডিও ফ্রান্সকে ঝুঁকির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

একটি শিশু প্রতি তিন ঘণ্টায় এক বোতল দুধ খায়। এই বিষাক্ত পদার্থে দূষিত দুধ দীর্ঘ সময় ধরে খেলে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

এ ছাড়া, ফ্রান্সে মাত্র একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষাগারকে এই বিষাক্ত পদার্থ শনাক্তের পরীক্ষা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পরীক্ষায় দেরিও হতে পারে। ব্যাপকভাবে রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা না থাকায় সম্ভাব্য অনেক ঘটনা হয়তো জানানো বা নিশ্চিত করা যায় না। ফলে কোম্পানিগুলোর "নিশ্চিত কোনো ঘটনা নেই" বক্তব্যের সঙ্গে ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফারাক তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

সংকট মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও পণ্য প্রত্যাহারের গতি নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সমালোচনা এসেছে। ভোক্তা অধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা ফুডওয়াচ ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যোগাযোগে "গুরুতর ব্যর্থতার" অভিযোগ তুলেছে। তাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য দূষিত পণ্য বিতরণ চালিয়ে যাওয়ার সময় নেসলে ও ল্যাকটালিস জনসাধারণকে সতর্ক করতে দেরি করেছে।

ফুডওয়াচ নেদারল্যান্ডসের পরিচালক নিকোল ভান গেমের্ট সতর্কবার্তার সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বেসিলাস সেরিয়াসের উপস্থিতির কারণে গুঁড়ো শিশুখাদ্য প্রত্যাহারের আওতায় শেষ পর্যন্ত ৬০টি দেশ পড়েছে—এ কথা আমরা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কেন জানতে পারলাম, যখন ডিসেম্বরে দেশ ছিল মাত্র নয়টি? সংবেদনশীল শিশুদের পণ্যের তাৎক্ষণিকভাবে উৎস শনাক্ত করার কথা যে নেসলের, তারা কীভাবে ধাপে ধাপে তথ্য প্রকাশ এবং অনেক দেশে দেরিতে পণ্য প্রত্যাহারের ব্যাখ্যা দেবে?

রেডিও ফ্রান্সের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই নেদারল্যান্ডসের কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল এবং ২৬ ডিসেম্বর নেসলে তাদের কারখানায় সেরিউলাইডের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। কিন্তু ৫ বা ৬ জানুয়ারির আগে জনসমক্ষে পণ্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। অস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষ এই সময়টিকে বড়দিনের ছুটির মধ্যে পরিচালিত "নীরব প্রত্যাহার" বলে বর্ণনা করেছে। সেই সময় মা-বাবারা হয়তো ফর্মুলা দুধ কিনে মজুত করছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সমালোচনার জবাবে নেসলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফিলিপ নাভ্রাতিল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, কোম্পানিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে এবং তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করেছে। তার দাবি, ধাপে ধাপে পণ্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবে পরিকল্পনা ও সমন্বয় করা হয়েছিল। এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নেসলে ও ল্যাকটালিসের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে ফুডওয়াচ ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির যুক্তি, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানা না থাকলে কোম্পানির দায়িত্ব পালনে এ ধরনের ব্যর্থতা চলতেই থাকবে।

নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা সামনে

শিশুদের ফর্মুলা দুধের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কাঠামোতে বড় ধরনের ঘাটতিও এই সংকটে প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যায়ে বা অধিকাংশ দেশের কাঠামোতে শিশুদের ফর্মুলা দুধে সেরিউলাইডের জন্য খাদ্যনিরাপত্তার কোনো নির্ধারিত সীমা নেই। ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) গুঁড়ো ফর্মুলা দুধে Bacillus cereus ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা প্রতি গ্রামে ১০০ সিএফইউর নিচে রাখার সুপারিশ করলেও, তাপ-স্থিতিশীল বিষাক্ত পদার্থটির জন্য কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সংকটপূর্ণ নিয়ন্ত্রণবিন্দু (এইচএসিসিপি) ব্যবস্থায় এআরএ তেলকে ঐতিহাসিকভাবে "কম ঝুঁকির" উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, উপাদানটির নিয়মিত পরীক্ষা হলেও নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয় না। এই দূষণের ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিল্পে এআরএ তেলকে "উচ্চ ঝুঁকির" উপাদান হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা হতে পারে। তাতে পুরো খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই উপাদানটির আরও ঘন ঘন পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারি বাধ্যতামূলক হবে। জার্মানির ঝুঁকি মূল্যায়নবিষয়ক ফেডারেল ইনস্টিটিউট (বিএফআর) ব্যবহারের ঠিক আগে ফর্মুলা দুধ তৈরি করার গুরুত্ব আবারও তুলে ধরেছে, যাতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমানো যায়। তবে গুঁড়ো দুধে আগে থেকেই থাকা বিষাক্ত পদার্থের ক্ষেত্রে এটি কোনো সমাধান নয়।

বিজ্ঞাপন

ভৌগোলিক বিস্তার ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি

উৎপাদকেরা সরবরাহশৃঙ্খল খতিয়ে দেখায় পণ্য প্রত্যাহারের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। ল্যাকটালিস নিশ্চিত করেছে, তাদের পিকো পণ্য ১৮টি দেশে বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে, নেসলের প্রত্যাহার প্রায় ৬০টি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। সিঙ্গাপুরে আটকে দেওয়া একটি চালানকে ঘিরে ড্যানোনের প্রত্যাহার শুরু হলেও পরে তা আয়ারল্যান্ডে তৈরি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা পণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আয়ারল্যান্ডের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, ড্যানোন অ্যাপটামিল, নিউট্রিলন এবং কাউ অ্যান্ড গেট ফর্মুলা দুধের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাচ প্রত্যাহার করছে। তবে এর কোনো পণ্যই আয়ারল্যান্ডের ভেতরে বিতরণ করা হয়নি।

আধুনিক খাদ্য উৎপাদনের পারস্পরিক সংযোগের কারণে একটি দূষিত উপাদানই বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ব্র্যান্ড ও অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সংকটের প্রভাব সামলাতে শিল্প যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ভিয়েতনাম কঠোর অবস্থান নিয়ে ব্যাচ নম্বর নির্বিশেষে নেসলের নির্দিষ্ট সব ব্র্যান্ডের বিক্রি বন্ধ করেছে। ফ্রান্সের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদন্তের ফল শিগগিরই প্রকাশের কথা। এতে দূষণের উৎস ও সংশ্লিষ্টদের দায় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলতে পারে।

মা-বাবা ও পরিচর্যাকারীদের জন্য পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। শিশুদের পুষ্টির জন্য এসব পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ভোক্তাদের কাছে ফর্মুলা দুধের ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই প্রত্যাহার সেই আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। তদন্ত এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে নিরাপত্তার মান কঠোর করা, পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করা এবং আরও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রত্যাহার কার্যকর করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • এআরএ তেলে সেরিউলাইড দূষণের কারণে নেসলে, ড্যানোন ও ল্যাকটালিস বিশ্বজুড়ে শিশুদের ফর্মুলা দুধ প্রত্যাহার করেছে।
  • চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সরবরাহকারীর কাছ থেকে দূষণের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে; এতে কয়েক ডজন দেশের একাধিক ব্র্যান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • প্রত্যাহার করা ফর্মুলা দুধ খাওয়া দুই শিশুর মৃত্যু তদন্ত করছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ, তবে কোনো কারণগত সম্পর্ক নিশ্চিত হয়নি।
  • জনসাধারণকে সতর্ক করতে দেরি করার সমালোচনা করেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো; উৎপাদকদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
  • শিশুদের ফর্মুলা দুধে সেরিউলাইডের সীমা নিয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ঘাটতি সামনে এসেছে; এর ফলে শিল্পে কঠোর মানদণ্ডের দাবি উঠেছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে