গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ জোরদার, থমকে ভারতের সবুজ জ্বালানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা

পড়তে 8 মিনিট
গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ জোরদার, থমকে ভারতের সবুজ জ্বালানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা

কৌশলগত সংকটের উদ্ভব

রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এবং এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন। রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে তাঁর বিশাল তেল শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করার পর এবার তিনি বেইজিংয়ের কাছ থেকে বড় বাধার মুখে পড়েছেন। প্রযুক্তি হস্তান্তরে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীন। এতে স্বনির্ভর পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সামনে দুরূহ বাধা তৈরি হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. কৌশলগত সংকটের উদ্ভব
  2. রিলায়েন্সের ধাক্কা
  3. প্রযুক্তি হস্তান্তরের অর্থনীতি
  4. সরকারি প্রণোদনার ওপর প্রভাব
  5. চীনের বিস্তৃত নিয়ন্ত্রক অভিযান
  6. দক্ষ জনশক্তির চলাচলে বিধিনিষেধ
  7. বিরল মৃত্তিকা ও কৌশলগত খনিজ
  8. ভারতের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পথ
  9. বিকল্প প্রযুক্তির সন্ধান
  10. মূল কথা

এই ঘটনা ভারতের উৎপাদন কৌশলের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতাকে তুলে ধরছে। প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) প্রকল্পের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। তবে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির নাগাল এখনো অল্প কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের হাতেই রয়েছে। ব্যাটারি ও বিরল মৃত্তিকা খাতে চীনের আধিপত্য কার্যত ভারতের সবুজ রূপান্তরের গতি নির্ধারণের ক্ষমতা দেশটির হাতে তুলে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রিলায়েন্সের ধাক্কা

বৈদ্যুতিক যান ও জ্বালানি সঞ্চয়ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল দেশে উৎপাদনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা করেছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। এ বছরই সেল উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য ছিল শিল্পগোষ্ঠীটির। এ নিয়ে চীনের শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শিয়ামেন হিথিয়াম এনার্জি স্টোরেজ টেকনোলজি কোং-এর সঙ্গে উন্নত পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। জ্বালানি সঞ্চয়ের কাজে সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) সেল প্রযুক্তির লাইসেন্স নেওয়াই ছিল লক্ষ্য।

তবে শিয়ামেন হিথিয়াম অংশীদারত্ব থেকে সরে যাওয়ায় আলোচনা থমকে যায়। কৌশলগত খাতে বিদেশে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সরাসরি যুক্ত। এর ফলে রিলায়েন্সকে সেল উৎপাদনের পরিকল্পনা স্থগিত করে স্বল্পমেয়াদে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) সংযোজনের কাজে মনোযোগ দিতে হয়। কনটেইনারে স্থাপনযোগ্য এসব সঞ্চয় ইউনিট মূলত রিলায়েন্সের নিজস্ব নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য; বৃহত্তর বাণিজ্যিক বিক্রির জন্য নয়।

এই ধাক্কা সত্ত্বেও রিলায়েন্সের এক মুখপাত্র বলেছেন, কোম্পানির বৃহত্তর কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোম্পানির ভাষ্য, বিইএসএস উৎপাদন, ব্যাটারি প্যাক উৎপাদন এবং সেল উৎপাদন—সবই তাদের জ্বালানি সঞ্চয় পরিকল্পনার অংশ এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে। তা সত্ত্বেও, পরীক্ষিত চীনা প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে না পারায় বাস্তবায়নে বড় ঝুঁকি ও ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তি হস্তান্তরের অর্থনীতি

রিলায়েন্সের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠিত চীনা সেল প্রযুক্তি ছাড়া কাজ এগিয়ে নিলে ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। জাপান, ইউরোপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিকল্প প্রযুক্তিগুলোও পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে দাম-সংবেদনশীল ভারতীয় বাজারে বৃহৎ পরিসরে সেগুলো ব্যবহার করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল বলে বিবেচিত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখায়, বিপুল আর্থিক ক্ষতি ছাড়া চীনা সরবরাহব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কতটা কঠিন।

রিলায়েন্সের পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আদানি গ্রুপ ও জেএসডব্লিউ গ্রুপসহ ভারতের অন্যান্য বড় শিল্পগোষ্ঠীও একই ধরনের দ্বিধার মুখে রয়েছে। উভয় কোম্পানিই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছে, তবে আপাতত পূর্ণাঙ্গ সেল উৎপাদনের চেয়ে ব্যাটারি প্যাক ও কনটেইনার সংযোজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে বড় পরিসরে চালানো সম্ভব, এমন প্রযুক্তির সন্ধান করছে তারা; নতুন রপ্তানি বিধিনিষেধে কাজটি আরও কঠিন হয়েছে।

আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাতে চাই যে সেল থেকে কনটেইনারভিত্তিক ইএসএস পর্যন্ত বিশ্বমানের ব্যাটারি সঞ্চয় উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী কাজ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।

সরকারি প্রণোদনার ওপর প্রভাব

উন্নত কেমিস্ট্রি সেল উৎপাদনে ভারতের সরকারের পিএলআই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রকল্পের মাইলফলকের সঙ্গে যুক্ত ভর্তুকি দিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। ২০২২ সালে এই কর্মসূচির দরপত্রে বিজয়ীদের মধ্যে ছিল রিলায়েন্স নিউ এনার্জি। তবে সময়সীমা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এ বছরের শুরুতে কোম্পানিটিকে জরিমানা করা হয়। এই ব্যর্থতা নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রযুক্তির নাগাল পাওয়ার বাস্তবতার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান তুলে ধরে।

বাজারে তুলনামূলক সস্তা চীনা ব্যাটারির সরবরাহ স্থানীয় উৎপাদনের ব্যবসায়িক যুক্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাশ্রয়ী চীনা প্রযুক্তির লাইসেন্স নেওয়া বা ভর্তুকি-সহায়ক উপকরণ পাওয়ার সুযোগ না থাকলে ভারতীয় উৎপাদকদের আমদানি করা তৈরি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খেতে হয়। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, মৌলিক প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলে শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চীনের বিস্তৃত নিয়ন্ত্রক অভিযান

রিলায়েন্সের ওপর প্রভাব ফেলা বিধিনিষেধ বেইজিংয়ের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রক অভিযানের অংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শুল্ক প্রশাসন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিভিন্ন উপাদান এবং সেগুলো উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। তালিকায় রয়েছে লিথিয়াম আয়রন ফসফেট, নিকেল, কোবাল্ট ও ম্যাঙ্গানিজ হাইড্রক্সাইডের মতো ক্যাথোড উপাদানের সংমিশ্রণ, পাশাপাশি গ্রাফাইট অ্যানোড উপাদান ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন প্রযুক্তি।

এই নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বিশেষভাবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবহার। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি কেজিতে ৩০০ ওয়াট-ঘণ্টার সমান বা তার বেশি ওজনভিত্তিক শক্তিঘনত্বের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল বা প্যাকের ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রয়োজন। সাধারণ বৈদ্যুতিক যান ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকসে ব্যবহৃত অধিকাংশ ব্যাটারি, যেগুলোর শক্তিঘনত্ব সাধারণত প্রতি কেজিতে ১০০ থেকে ২৮০ ওয়াট-ঘণ্টার মধ্যে, এই নিয়মের বাইরে। তবে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করা ভারতীয় উৎপাদকরা এখন প্রয়োজনীয় উৎপাদন প্রযুক্তি পাওয়া থেকে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।

২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর থেকে এসব সীমিত প্রযুক্তি হস্তান্তরের আগে চীনা রপ্তানিকারকদের স্টেট কাউন্সিলের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এই আমলাতান্ত্রিক বাধা অনিশ্চয়তা ও বিলম্ব তৈরি করছে এবং আগে শিল্পায়নের দ্রুততম পথ হিসেবে বিবেচিত অংশীদারত্বগুলো কার্যত থামিয়ে দিচ্ছে। উপকরণের পাশাপাশি বিশেষায়িত উৎপাদন সরঞ্জাম—যেমন উইন্ডিং মেশিন, ল্যামিনেশন মেশিন ও তরল ইনজেকশন মেশিনের ক্ষেত্রেও এই নিয়ন্ত্রণ প্রযোজ্য।

দক্ষ জনশক্তির চলাচলে বিধিনিষেধ

প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ শুধু ভৌত উপকরণে সীমাবদ্ধ নয়, এর আওতায় দক্ষ জনশক্তিও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষায়িত কর্মী ও সরঞ্জামের ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তর ঠেকাতে চীনা কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে মৌখিকভাবে উৎসাহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য উচ্চ শুল্কের আশঙ্কায় কোম্পানিগুলো যাতে উৎপাদনকেন্দ্র সরিয়ে নিতে না পারে, এটি তারই একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে এই নীতির বাস্তব প্রভাব পড়েছে। ভারতের ইলেকট্রনিকস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অ্যাপলের সংযোজন অংশীদার ফক্সকন তাদের ভারতীয় কারখানাগুলো থেকে শত শত চীনা প্রকৌশলীকে ফিরিয়ে নিয়েছে। তামিলনাড়ুতে ফক্সকনের যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী ইউনিট ইউঝান টেকনোলজি থেকে কর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়া উচ্চনির্ভুল উৎপাদনে চীনা প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। তাদের বদলে তাইওয়ানের প্রকৌশলীদের আনা শুরু করেছে ফক্সকন। তবে এই বিঘ্ন স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর চলমান প্রচেষ্টার ভঙ্গুরতা তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

বিরল মৃত্তিকা ও কৌশলগত খনিজ

বিরল মৃত্তিকা মৌল (আরইই) ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর চীনের আধিপত্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টার্বিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামসহ সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌলের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে বেইজিং। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যান ও বায়ুকল তৈরিতে এসব উপাদান অপরিহার্য।

বিশ্বে ভারী বিরল মৃত্তিকা প্রক্রিয়াজাতকরণের সিংহভাগই চীনের নিয়ন্ত্রণে। এসব উপাদান রপ্তানিতে নতুন লাইসেন্সের শর্ত আরোপ করায় বৈদ্যুতিক যানের মোটর বা বায়ুকলের স্থায়ী চুম্বক তৈরির চেষ্টা করা ভারতীয় উৎপাদকদের সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশও একই ধরনের দুর্বলতার মুখে রয়েছে। তবে এখনো শিল্পভিত্তি গড়ার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা ভারতের জন্য এর প্রভাব বেশি তীব্র।

লিথিয়াম, গ্যালিয়াম ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ব্যাটারির অ্যানোড তৈরিতে গ্রাফাইট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ দেশটিকে বৈশ্বিক ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল নিশ্চিত করতে চাওয়া ভারতীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এসব বিধিনিষেধ বড় বাধা।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পথ

বহুমুখী এসব চ্যালেঞ্জের মুখে চীনা বিনিয়োগ ও পণ্য সংগ্রহ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে বলে জানা গেছে ভারত সরকার। সূত্রের ইঙ্গিত, ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে—এমন দেশগুলো থেকে আসা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ওপর আরোপিত কিছু কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করতে পারে নয়াদিল্লি। বিনিয়োগকারীর জাতীয়তার বদলে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে আরও সূক্ষ্ম নীতি গ্রহণের দিকে মনোযোগ সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

সরকারের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো উচিত—যদি তা টেলিযোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত অবকাঠামোর মতো সংবেদনশীল খাতের সঙ্গে আপস না করে। ভারতীয় উৎপাদকরা স্থানীয় উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি না পেয়ে যদি তৈরি পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হন, তাহলে দেশ মূল্যবান কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায়—এ বিষয়ে ক্রমশ সচেতনতা বাড়ছে।

শিল্পনেতারাও বিধিনিষেধ শিথিলের ক্ষেত্রে পরিমিত ও খাতভিত্তিক পদ্ধতির আহ্বান জানাচ্ছেন। বস্ত্র ও প্রকৌশলের মতো খাতে যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা বেশি। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে এসব খাতে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রযুক্তি অংশীদারত্বের সুযোগ অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তি হলো, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্বনির্ভরতা হলেও প্রযুক্তিগত ব্যবধান পূরণে স্বল্পমেয়াদি নমনীয়তা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

বিকল্প প্রযুক্তির সন্ধান

বাধা সত্ত্বেও ভারতে খাপ খাইয়ে নেওয়া ও উদ্ভাবনের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু কোম্পানি এমন বিকল্প ব্যাটারি রসায়ন ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যেগুলোতে চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরতা কম। সোডিয়াম-আয়ন ও সলিড-স্টেট ব্যাটারি নিয়ে গবেষণা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে, কারণ এগুলোতে এমন কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় যা দেশে বা বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়।

ওলা ইলেকট্রিকের মতো কোম্পানি দেশেই লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল সফলভাবে উদ্ভাবনের ঘোষণা দিয়েছে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে যানবাহনে এগুলো সংযোজনের পরিকল্পনা করেছে। একইভাবে মহীন্দ্রা পেটেন্ট করা প্রক্রিয়া ব্যবহার করে একটি স্বয়ংক্রিয় সংযোজন লাইন তৈরি করেছে। তবে এসব উদ্যোগের ক্ষেত্রেও স্বল্পমেয়াদে প্রায়ই চীনা সেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই অগ্রগতি প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার দিকে ধীর কিন্তু ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দেয়।

চীনের আরোপিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত ভারতের গবেষণা ও উন্নয়নব্যবস্থার অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে। চীনা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হওয়ায় এসব নীতি ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে অনিশ্চয়তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও স্থানীয় উদ্ভাবনে বিনিয়োগে বাধ্য করছে। ব্যাটারি উৎপাদনের পুরো সরবরাহশৃঙ্খলে ভারতের সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা অংশীদারত্বে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

মূল কথা

ভূরাজনৈতিক কৌশল ও শিল্পোন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতে ভারতের উৎপাদন খাত জটিল বাধার মুখে পড়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের চীনা সিদ্ধান্ত দেশটির বাজার আধিপত্যের স্পষ্ট প্রয়োগ। এতে মুকেশ আম্বানির মতো শিল্পপতি এবং নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক—উভয়েই তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

ভারতের সবুজ জ্বালানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাময়িকভাবে থমকে থাকলেও এই পরিস্থিতি সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। সামনে এগোতে কৌশলগত কূটনীতি, বিনিয়োগের বাধা নির্দিষ্টভাবে শিথিল করা এবং দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়নে নতুন করে মনোযোগ—এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিসর্জন না দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে।

  • চীনের শিয়ামেন হিথিয়াম থেকে প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে না পেরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিথিয়াম-আয়ন সেল উৎপাদন স্থগিত করেছে।
  • লিথিয়াম ব্যাটারির উপাদান ও প্রযুক্তির রপ্তানিতে চীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে; এসব রপ্তানির জন্য সরকারি লাইসেন্স প্রয়োজন।
  • ফক্সকন ভারতীয় কারখানা থেকে চীনা প্রকৌশলীদের ফিরিয়ে নেওয়ায় অ্যাপলের উৎপাদন সম্প্রসারণ প্রভাবিত হয়েছে।
  • প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়াতে চীনের ওপর বিনিয়োগসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিলের কথা ভাবছে ভারত সরকার।
  • রিলায়েন্স নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সংযোজনে নতুন করে মনোযোগ দিয়েছে।
  • প্রতিরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌলের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীন।
  • চীনা উৎপাদন প্রযুক্তি না পাওয়ায় ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়ছে।
  • আদানি গ্রুপ ও জেএসডব্লিউ গ্রুপও সেল উৎপাদনের বদলে ব্যাটারি সংযোজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
  • প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহে সমস্যার কারণে পিএলআই প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা সময়সীমা পিছিয়ে পড়ার মুখে পড়েছেন।
  • দেশীয় কোম্পানিগুলো সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো বিকল্প প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে