সীমান্ত পেরিয়ে ছড়াচ্ছে দূষণ কেলেঙ্কারি
শিশুখাদ্যে দূষণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা আতঙ্ক আরও তীব্র হয়েছে। শুরুতে সুইস জায়ান্ট নেসলেকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকটে এবার বড় দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক ডানোন ও গ্রুপ ল্যাকটালিসও জড়িয়ে পড়েছে। সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সেরিউলাইড—ব্যাকটেরিয়ার তৈরি এক শক্তিশালী বিষ, যা শিশুর মারাত্মক বমি বমি ভাব ও বমির কারণ হতে পারে। নেসলের ধারাবাহিক সতর্কতামূলক পণ্য প্রত্যাহার দিয়ে শুরু হওয়া ঘটনা এখন জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সম্ভাব্য শিশুমৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে, আর বাজারমূল্য থেকে কয়েক শ কোটি ডলার উধাও হয়েছে। দূষণের পরিধি বাড়তে থাকায় সন্তানদের পুষ্টির জন্য যেসব পণ্যের ওপর নির্ভর করেন, সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে।
সূচিপত্র
- সীমান্ত পেরিয়ে ছড়াচ্ছে দূষণ কেলেঙ্কারি
- সেরিউলাইডের অদৃশ্য বিপদ
- তীব্র নজরদারির মুখে নেসলে
- ডমিনো প্রভাব: ডানোন ও ল্যাকটালিস
- ডানোনের সতর্কতামূলক প্রত্যাহার
- বিশ্বব্যাপী প্রত্যাহারে যোগ দিল ল্যাকটালিস
- উৎস অনুসন্ধান: চীনের যোগসূত্র?
- নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি ও শিল্পে পরিবর্তন
- অভিভাবক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল কথা
- মূল বিষয়গুলো
সিঙ্গাপুরের খাদ্য সংস্থা (এসএফএ) ডানোনের একটি পণ্য বাজার থেকে সরানোর নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়ে সেরিউলাইড শনাক্ত হওয়ায় সংস্থাটি ডানোনের মালিকানাধীন ব্র্যান্ড ডুমেক্স ডুলাক ১ ফর্মুলার একটি নির্দিষ্ট ব্যাচ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। এতে সংকট নতুন মোড় নেয়: দূষণটি একটি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অভিন্ন সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। আর্থিক বাজারে দ্রুত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্যারিসে দিনের শুরুতে ডানোনের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়, যা কোম্পানিটির ৩৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন।
“নেসলের নতুন নেতৃত্বের জন্য এই ঘটনা দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। এ পর্যায়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে হচ্ছে, আর প্রায় প্রতিদিনই নেতিবাচক খবর আসছে,” বলেন ভন্টোবেলের বিশ্লেষক জ্যঁ-ফিলিপ বেরশি।
সেরিউলাইডের অদৃশ্য বিপদ
পরিস্থিতির গুরুতরতা বুঝতে হলে দূষকের ধরন সম্পর্কে জানা জরুরি। সেরিউলাইড Bacillus cereus নামের ব্যাকটেরিয়ার তৈরি একটি বিষ। এই ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে সাধারণত পাওয়া যায়। উৎপাদনপ্রক্রিয়া বা ফুটন্ত পানিতে অনেক ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষক ধ্বংস হলেও সেরিউলাইড তাপেও স্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ ফর্মুলা জীবাণুমুক্ত ও নিরাপদ করতে অনেক অভিভাবক যে ফুটন্ত পানি ব্যবহার করেন, প্রচলিত প্রস্তুতপ্রণালিতেও এই বিষ টিকে থাকতে পারে। শিশুখাদ্যে এ বৈশিষ্ট্য একে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তোলে, কারণ অনেক সময় অসহায় নবজাতকের পুষ্টির একমাত্র উৎসই হলো এই পণ্য।
এই বিষে তীব্র খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে প্রচণ্ড বমি ও ডায়রিয়া। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ অস্বস্তিকর হলেও সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু শিশুদের শরীরের ওজন কম এবং শারীরিক ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় বারবার বমির ফলে দ্রুত পানিশূন্যতা প্রাণঘাতী হতে পারে। সংকটের সূত্র মিলেছে একটি নির্দিষ্ট উপাদানে: অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (এআরএ) তেল। মস্তিষ্ক ও দৃষ্টিশক্তির বিকাশে সহায়তার জন্য শিশুখাদ্যে নিয়মিত ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড এআরএ যোগ করা হয়। উন্নত মানের ফর্মুলার পণ্যে এটি একটি প্রচলিত উপাদান। তবে এই তেলের দূষণ থেকে বোঝা যায়, চূড়ান্ত পণ্য কৌটাজাত করার কারখানায় নয়, বরং সরবরাহকারীর পর্যায়ে নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল।
সেরিউলাইড শনাক্ত করা খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও প্রস্তুতকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি গণনার মতো, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে, শিশুখাদ্যে সেরিউলাইডের গ্রহণযোগ্য মাত্রার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সীমা নেই। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার এই ঘাটতি সংকট মোকাবিলাকে জটিল করেছে। তাছাড়া, বিষটি শনাক্তের পরীক্ষা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন এবং সর্বত্র পাওয়া যায় না। খবরে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে সেরিউলাইড পরীক্ষার অনুমতি আছে এমন নির্দিষ্ট পরীক্ষাগার মাত্র একটি, ফলে ঘটনা নিশ্চিত করতে দেরি হচ্ছে। এ বৈজ্ঞানিক বাধার কারণেই নেসলের মতো কোম্পানি বলে আসছে, “কোনো নিশ্চিত ঘটনা নেই।” সমালোচকদের মতে, বর্তমান পরীক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় কারণ-সম্পর্ক প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব—তাই বক্তব্যটি কারিগরিভাবে সঠিক হলেও বিভ্রান্তিকর।
তীব্র নজরদারির মুখে নেসলে
চলমান বিপর্যয়ের কেন্দ্রে রয়েছে নেসলে। কোম্পানিটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সতর্কতামূলক প্রত্যাহার শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। ৬০টিরও বেশি দেশের বাজার থেকে পণ্য সরানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় বেবা, এসএমএ, আলফামিনো ও গুইগোজ। প্রত্যাহারের পরিধি বিশাল: ইউরোপের বিভিন্ন উৎপাদনকেন্দ্র ও বিশ্বজুড়ে বিতরণ নেটওয়ার্ক এতে প্রভাবিত হয়েছে। প্রত্যাহার শুরুর পর নেসলের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে কোম্পানিটির জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুনামের ক্ষতির ঝুঁকি আরও বড়।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তথ্য গোপন ও জরুরি পদক্ষেপের অভাবের অভিযোগ উঠেছে নেসলের বিরুদ্ধে। রেডিও ফ্রান্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সমস্যার কথা ডাচ কর্তৃপক্ষকে ৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই জানানো হয়েছিল। আর ২৬ ডিসেম্বর নেসলে তাদের ফরাসি কারখানায় সেরিউলাইডের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। কিন্তু ৫ ও ৬ জানুয়ারির আগে জনসমক্ষে পণ্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়নি—অর্থাৎ দশ দিনেরও বেশি দেরি হয়। এই সময়ে বড়দিনের ছুটিতে “নীরব প্রত্যাহার” চলেছে বলে জানিয়েছে অস্ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষ। এ পদক্ষেপে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো ক্ষুব্ধ হয়েছে। ফুডওয়াচ নেদারল্যান্ডস বিশেষভাবে সরব হয়ে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে স্বচ্ছতায় “গুরুতর ভাঙন”-এর অভিযোগ তুলেছে।
“ডিসেম্বরে যখন মাত্র নয়টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, তখন আমরা কেন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জানতে পারলাম যে শেষ পর্যন্ত ৬০টি দেশ আক্রান্ত হয়েছে?” বলেন ফুডওয়াচ নেদারল্যান্ডসের পরিচালক নিকোল ভান খেমার্ট।
এই বিলম্বের মানবিক মূল্য এখন তদন্ত করা হচ্ছে। নেসলের গুইগোজ ফর্মুলা খাওয়া এক শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে দূষণের কোনো যোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। সরাসরি কোনো যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে তদন্তে পুরো শিল্পে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এ ছাড়া, ফ্রান্সের বিষতথ্যকেন্দ্রগুলোতে বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের কাছ থেকে বহু ফোন এসেছে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ প্রত্যাহার করা নেসলের পণ্য খাওয়ার পর দুই শিশুর অসুস্থ হওয়ার ঘটনা নিশ্চিত করেছে। সিঙ্গাপুরের একটি ঘটনাকেও “সেরিউলাইডের সংস্পর্শের সঙ্গে সম্ভাব্যভাবে সম্পর্কিত” বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। নেসলের প্রধান নির্বাহী ফিলিপ নাভ্রাতিল ভিডিওবার্তায় অনিশ্চয়তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং নিরাপত্তার প্রতি কোম্পানির অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। তবে অনেক অভিভাবকের কাছে এই আশ্বাস আসতে দেরি হয়ে গেছে।
ডমিনো প্রভাব: ডানোন ও ল্যাকটালিস
সরবরাহব্যবস্থার তদন্ত যত গভীর হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে ঝুঁকিতে শুধু নেসলে নয়। এআরএ তেলের দূষণ একই ধরনের উপাদান ব্যবহারকারী অন্য প্রস্তুতকারকদেরও তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করে। সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে; প্রত্যাহারের আওতায় এসেছে বিশ্বের বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের দুটি প্রতিষ্ঠান—ডানোন ও ল্যাকটালিস। এই কোম্পানিগুলোর জড়িয়ে পড়া বিশ্লেষকদের সেই সতর্কবার্তাকেই সত্য বলে প্রমাণ করে যে সমস্যাটি একটি বিচ্ছিন্ন উৎপাদনত্রুটির চেয়ে বরং ব্যবস্থাগত।
ডানোনের সতর্কতামূলক প্রত্যাহার
সিঙ্গাপুরের খাদ্য সংস্থার হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে সংকটে যুক্ত হয় ডানোন। থাই উৎসের ডুমেক্স ডুলাক ১ ফর্মুলার একটি ব্যাচে সেরিউলাইড শনাক্ত হওয়ার পর সংস্থাটি তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। একই কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রস্তুতকারক এসএমসি নিউট্রিশনকেও নির্দেশ দেওয়া হয়। ডানোন জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তারা চালান আটকে দিয়েছে। কোম্পানিটি আরও বলেছে, তাদের নিজস্ব পরীক্ষায় ব্র্যান্ডগুলোর কোনো পণ্যে সেরিউলাইড পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, পণ্যগুলো কঠোর খাদ্যনিরাপত্তার মান মেনে তৈরি হয় এবং নিবিড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়।
এসব আশ্বাস সত্ত্বেও বাজারে আতঙ্ক ছড়ায়। শেয়ারের দাম ১২ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা প্রতিফলিত হয়েছে যে ডুমেক্স প্রত্যাহার হয়তো বড় সমস্যার কেবল শুরু। বিশ্লেষকদের মতে, ডুমেক্স ডানোনের তুলনায় ছোট ব্র্যান্ড হলেও এর তাৎপর্য হলো, দূষিত এআরএ তেলের প্রধান সরবরাহকারী সম্ভবত একাধিক গ্রাহককে পণ্য দিয়েছে। এর ফলে বর্তমানে প্রত্যাহার করা নির্দিষ্ট পণ্যের বাইরেও সুনামের ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি সামাল দিতে কোম্পানিটি এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, তবে সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রত্যাহারে যোগ দিল ল্যাকটালিস
সিঙ্গাপুরের খবর প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরাসি দুগ্ধজাত পণ্য জায়ান্ট গ্রুপ ল্যাকটালিসও বড় ধরনের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি তাদের পিকো ব্র্যান্ডের শিশুখাদ্যের ছয়টি ব্যাচ বাজার থেকে সরাচ্ছে। ফ্রান্স, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর মতো বড় বাজারসহ ১৮টি দেশে এই প্রত্যাহার চলছে। অন্যদের মতো ল্যাকটালিসও বাইরের এক সরবরাহকারীর উপাদানে সেরিউলাইড শনাক্ত হওয়ার পর সমস্যাটির সূত্র খুঁজে পায়। সরবরাহকারীর তদন্তের ফলের অপেক্ষা না করে ভোক্তার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে।
নিরাপত্তা কেলেঙ্কারির সঙ্গে ল্যাকটালিসের অতীতও জড়িত। ২০১৮ সালে বড় ধরনের সালমোনেলা সংক্রমণের কেন্দ্রে ছিল কোম্পানিটি, যার জেরে ১ কোটি ২০ লাখ কৌটা শিশুখাদ্য প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তখন দূষণের মাত্রা আড়াল করার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছিল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এ ইতিহাসের কারণে ল্যাকটালিসের পণ্য নিয়ে নতুন কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে ভোক্তা ও নিয়ন্ত্রকেরা বিশেষভাবে সতর্ক। এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই নির্দিষ্ট ব্যাচগুলো খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ জানায়নি বলে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে কোম্পানিটি। তবে পিকো পণ্য প্রত্যাহারের ভৌগোলিক বিস্তার সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতার বৈশ্বিক চরিত্র স্পষ্ট করে।
উৎস অনুসন্ধান: চীনের যোগসূত্র?
প্রত্যাহারের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূষিত উপাদানের উৎসের দিকে নজর পড়েছে। নেসলে প্রথমে শুধু “শীর্ষস্থানীয় এক সরবরাহকারীর” কথা বলেছিল। তবে রেডিও ফ্রান্স ও চীনা সংবাদমাধ্যম ইচাই গ্লোবালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বাজারের নানা সূচক ও প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দূষিত এআরএ তেল এসেছে চীনের উহানভিত্তিক সরবরাহকারী কাবিও বায়োটেকের কাছ থেকে। সম্ভাব্য এ যোগসূত্রের ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক তাৎপর্য রয়েছে; চীনা প্রস্তুতকারকদের ঘিরে অতীতের খাদ্যনিরাপত্তা কেলেঙ্কারির কথাও এতে মনে পড়ে।
অণুজীব থেকে তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেওয়া কাবিও বায়োটেক তাদের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, তারা “নেসলের মতো বড় গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে।” কোম্পানির এক প্রতিনিধি জানান, পণ্য পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ফল প্রকাশ্যে জানানো হবে। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সরকার খাদ্যনিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং ভোক্তাদের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় এক ধরনের তথ্যশূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করছে।
সরবরাহকারীর উৎস জানলে প্রস্তুতকারকের দায়িত্ব কমে না—এ বিষয়ে অনড় ফুডওয়াচ ফ্রান্স। সংগঠনটির যুক্তি, নেসলে, ডানোন ও ল্যাকটালিসের মতো বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সম্পদ এবং দায়িত্ব দুটোই আছে। ফুডওয়াচ ফ্রান্সের তথ্যবিষয়ক পরিচালক ইনগ্রিড ক্রাগল জোর দিয়ে বলেছেন, সরবরাহের উৎস শনাক্তযোগ্য রাখা নিয়ন্ত্রক শর্ত। তাঁর ভাষায়, সরবরাহকারী চীনা হওয়ার কারণে সমস্যা দেখা দিলে স্বচ্ছভাবে ও তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য দেওয়ার প্রস্তুতকারকদের দায়িত্ব কমে যায় না। বিশ্বজুড়ে খাদ্যশিল্পে জবাবদিহির দাবি বাড়ছে—এই বক্তব্য তারই প্রতিফলন। চূড়ান্ত পণ্যে পৌঁছানোর আগে উপাদানগুলো একাধিক সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি ও শিল্পে পরিবর্তন
এই সংকট শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকারী বর্তমান কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরও অনেক অঞ্চলে সেরিউলাইডের কোনো নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য সীমা নেই, যা স্পষ্ট ঘাটতি। ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) Bacillus cereus ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে রাখার পরামর্শ দিলেও বিষটির জন্য কোনো সীমা নেই। ফলে কারিগরিভাবে কোনো পণ্যে সেরিউলাইডের মাত্রা বেশি থাকলেও বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়ার মাত্রাসংক্রান্ত মানদণ্ড মেনে চলা সম্ভব, যা বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি করে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই কেলেঙ্কারির পর এআরএ তেলের শ্রেণিবিন্যাস নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তা প্রটোকল পরিচালনাকারী হ্যাজার্ড অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্টস (এইচএসিসিপি) ব্যবস্থায় এআরএ-কে প্রায়ই “কম ঝুঁকির” উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এই শ্রেণির কারণে উচ্চ ঝুঁকির উপাদানের তুলনায় এর ওপর নিয়মিত হলেও কম নিবিড় নজরদারি চলে। শিশুর বিকাশে সহায়তার জন্যই যেহেতু উপাদানটি যোগ করা হয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার নজরদারি থাকা উচিত। কম ঝুঁকি থেকে উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে নেওয়া হলে সরবরাহব্যবস্থাজুড়ে আরও ঘন ঘন পরীক্ষা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক হবে।
কিছু দেশ ইতিমধ্যে নিজেদের উদ্যোগে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনাম ব্যাচ নম্বর নির্বিশেষে নেসলের বেবা ও আলফামিনো ব্র্যান্ডের সব বিক্রি বন্ধ করেছে। এই চরম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তার মাত্রা তুলে ধরে। আস্থা ফেরাতে শিল্প যখন কাজ করছে, তখন নতুন নিরাপত্তা প্রটোকলের ঢেউ দেখা যেতে পারে। এতে ফ্যাটি অ্যাসিড ও তেলের মতো বিশেষায়িত উপাদানের উৎস শনাক্ত করার দিকে জোর দেওয়া হবে। এসব অতিরিক্ত ব্যবস্থার খরচ সম্ভবত ভোক্তাদের ওপর পড়বে, তবে সংকট কাটিয়ে টিকে থাকতে শিল্পের কাছে এটিকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বলে মনে হতে পারে।
অভিভাবক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল কথা
তদন্ত চলার সময় শিশুর নিরাপত্তাই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। ঘরে থাকা ফর্মুলার ব্যাচ নম্বর স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা সংস্থার প্রকাশিত প্রত্যাহার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেরিউলাইডে বিষক্রিয়ার লক্ষণের মধ্যে রয়েছে বারবার বমি ও ডায়রিয়া। ফর্মুলা খাওয়ার পর কোনো শিশুর এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসা নিতে হবে। কোম্পানিগুলো ঝুঁকি কম এবং প্রত্যাহার সতর্কতামূলক বলে দাবি করলেও, অসুস্থতার খবর এবং ফ্রান্সে তদন্তাধীন শিশুমৃত্যুর ঘটনা থেকে বোঝা যায়, হুমকিটি বাস্তব।
সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী ও করপোরেট নেতাদের জন্য আগামী কয়েক মাস হবে সংকট মোকাবিলার পরীক্ষা। ভন্টোবেলের জ্যঁ-ফিলিপ বেরশির মতে, নেসলে “কোণঠাসা” অবস্থায় আছে এবং খরচ কমানোর বছরগুলোতে মাননিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই প্রশ্ন এখন ডানোন ও ল্যাকটালিসের দিকেও উঠছে। আর্থিক ক্ষতি ইতিমধ্যে কয়েক শ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড-ক্ষতি পরিমাপ করা আরও কঠিন। শিশুপুষ্টির বাজারে আস্থাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, আর একবার তা নষ্ট হলে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।
আধুনিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা এই কেলেঙ্কারি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এক সরবরাহকারীর একটি দূষিত উপাদান বিশ্বজুড়ে প্রত্যাহারের ধারাবাহিকতা শুরু করতে পারে, যার প্রভাব পড়ে লাখ লাখ পরিবারের ওপর এবং বিশ্বের বৃহত্তম করপোরেশনগুলোর কয়েকটির ওপরও। পরিস্থিতি থিতিয়ে এলে শিল্পকে গোড়া থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আশা করা যায়, এই বেদনাদায়ক শিক্ষা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভোক্তাদের জন্য আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়তে সহায়তা করবে। তত দিন অনিশ্চয়তা কাটবে না, আর দূষিত ফর্মুলা নিয়ে এই সংকটের ঢেউ কত দূর ছড়ায়, তা দেখবে বিশ্ব।
মূল বিষয়গুলো
- শিশুখাদ্যের বৈশ্বিক প্রত্যাহার নেসলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডানোন ও ল্যাকটালিসকেও অন্তর্ভুক্ত করছে।
- দূষকটি সেরিউলাইড—তাপে স্থিতিশীল এক বিষ, যা বমি ও ডায়রিয়ার কারণ হয়।
- সাধারণ শিশুখাদ্যের একটি উপাদান অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (এআরএ) তেলে বিষটি শনাক্ত হয়েছে।
- খবরে বলা হয়েছে, দূষিত তেলটি চীনের কোনো সরবরাহকারীর কাছ থেকে এসে থাকতে পারে।
- নেসলে ৬০টিরও বেশি দেশে পণ্য প্রত্যাহার করেছে, যা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রত্যাহার।
- বিষটির সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকা এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
- সিঙ্গাপুরে ডুমেক্স ব্র্যান্ড প্রত্যাহারের পর ডানোনের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশ কমেছে।
- ১৮টি দেশে পিকো ফর্মুলার ছয়টি ব্যাচ প্রত্যাহার করেছে ল্যাকটালিস।
- সেরিউলাইডের জন্য বর্তমানে ইইউতে কোনো আনুষ্ঠানিক নিরাপদ মাত্রা নির্ধারিত নেই।
- বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উপাদান সরবরাহকারীদের পরীক্ষা ও নজরদারি আরও কঠোর করবে শিল্প।






