অর্থনৈতিক মন্দায় রূপান্তরিত হচ্ছে থাইল্যান্ডের শ্রমবাজার
দীর্ঘস্থায়ী শিল্পমন্দার কারণে শ্রমিকেরা তুলনামূলক বেশি বেতনের উৎপাদন খাতের কাজ ছেড়ে কম বেতনের সেবামূলক খাতে যাওয়ায় থাইল্যান্ড অর্থনীতির এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। আয়ের এই দুর্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করেছে থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের মতে, কাঠামোগত এই পরিবর্তন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। করোনা মহামারির পর ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত দেশটির গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪ শতাংশ। এই মন্থর প্রবৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করছে সেবামূলক খাতের ওপর, যা এখন মোট দেশজ উৎপাদনের ৬০ থেকে ৬১ শতাংশের জোগান দেয়।
সূচিপত্র
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক প্রানি সুথাস্রি সম্প্রতি এক মুদ্রানীতিবিষয়ক ফোরামে শ্রমবাজারের এই পরিবর্তনের গুরুতর দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্রমিকেরা শিল্প ও কৃষি খাত ছেড়ে সেবামূলক খাতে যাওয়ায় উৎপাদন খাতের অবদান ক্রমেই কমেছে।
শ্রমিকদের বেশির ভাগই প্রথাগত সেবামূলক খাতে গেছেন, যেখানে গড় মজুরি ঘণ্টায় প্রায় ১১৪ বাথ। কোভিডের সময়কার ঘণ্টায় ১১০ বাথের তুলনায় এটি সামান্য বেশি।
এই মজুরি আধুনিক সেবামূলক খাতের তুলনায় অনেক কম। আধুনিক সেবামূলক খাতে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি মহামারির সময়কার ৫৫৮ বাথ থেকে বেড়ে ৭০৩ বাথে দাঁড়িয়েছে। এদিকে উৎপাদন খাতে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ১৮৩ বাথ, যা ১৭৩ বাথ থেকে সামান্য বেড়েছে। তথ্য-উপাত্তে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: অর্থনীতির প্রসারমান খাতগুলো পরিবারের ভোগব্যয় টেকসই রাখার মতো আয় বাড়াতে পারছে না।
এক দশকের স্থবিরতা ও মধ্যম আয়ের ফাঁদ
বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে থাই অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসময় কম উৎপাদনশীল কৃষি থেকে বেশি উৎপাদনশীল উৎপাদনশিল্পে শ্রমিকেরা যাওয়ায় থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু সেই গতিশীলতা থেমে গেছে। শ্রম ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণও উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়েছে। বস্ত্র ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মতো শ্রমনিবিড় অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা কম মজুরি ও প্রচুর আধা-দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায় এমন প্রতিবেশী দেশ লাওস ও কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
শিল্প খাতের এই “ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া” পরিস্থিতি সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়। থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে সমস্যাটি দেখা দিচ্ছে দেশটি এখনো মধ্যম আয়ের দেশ থাকা অবস্থায়; ফলে ধনী হওয়ার আগেই দেশটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। জন্মহার অত্যন্ত কম হওয়ায় দেশটি দ্রুত বার্ধক্যজনিত সমাজে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদনশীলতার বিশাল ব্যবধান থাই অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা তুলে ধরে। রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্পকে কেন্দ্র করে নেওয়া নীতিগুলো কৃষি ও সেবামূলক খাতকে পিছিয়ে রেখেছে। ফলে কর্মশক্তির বেশির ভাগই অর্থনীতির কম উন্নত অংশে আটকে রয়েছে, যা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকে সীমিত করছে।
এই সমস্যার অন্যতম বড় বাধা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা খাতে সরকারি বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ বরাদ্দ সত্ত্বেও ফলাফল খারাপ। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় থাই শিক্ষার্থীরা গণিত, পঠন ও বিজ্ঞানে নিচের দিকে রয়েছে। দক্ষতার এই অসামঞ্জস্য জ্ঞানভিত্তিক বা ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে ভালো মজুরির উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে কর্মশক্তির প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে
থাইল্যান্ড যখন কাঠামোগত মন্থরতার সঙ্গে লড়ছে, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলো আরও গতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এই ব্যবধান স্পষ্ট। এক বছর আগের তুলনায় থাইল্যান্ডের অর্থনীতি বেড়েছে মাত্র ১.২ শতাংশ, যা চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে মন্থর। বিপরীতে, শিল্প উৎপাদন ও সেবামূলক খাতের জোরালো প্রবৃদ্ধির সুবাদে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখযোগ্য ৮.২২ শতাংশ। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও রপ্তানি পুনরুদ্ধারের সহায়তায় মালয়েশিয়ার প্রবৃদ্ধিও ছিল ৫.২ শতাংশ।
প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবধানটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এই খাতে থাইল্যান্ডের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১৭.২ শতাংশ, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম। ৭৩.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অঞ্চলটির শীর্ষে ছিল তাইওয়ান। এরপর রয়েছে ফিলিপাইন ৫৩.৫ শতাংশ, মালয়েশিয়া ৪৩.৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া ৩৮.৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ৩৪.৮ শতাংশ। এই ব্যবধান উৎপাদন খাতে থাইল্যান্ডের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে রপ্তানি ১২.৩ শতাংশ বাড়লেও এই বৃদ্ধি মূলত সীমিত কয়েকটি পণ্যে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস পণ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। এটি বৈচিত্র্যের অভাব তুলে ধরে। এর বিপরীতে, আগের বছরগুলোতে পণ্যের বিস্তৃত পরিসরে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ সম্প্রসারণ দেখা গিয়েছিল।
এ ছাড়া, বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি বাড়ছেই। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার কম; অর্থাৎ থাইল্যান্ডের উৎপাদনশিল্প সংযোজনের কাজে বিদেশি যন্ত্রাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এতে দেশীয় অর্থনীতির সর্বস্তরে সুফল তৈরি হয় না। বাণিজ্য কাঠামো ইঙ্গিত দেয়, থাইল্যান্ড সংযোজনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করলেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ অন্যত্র হয়। ফলে মজুরি ও দেশীয় ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব সীমিত থাকে।
পর্যটনে পতনে সেবামূলক খাতের প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত
শিল্প খাত দুর্বল হওয়ায় কর্মসংস্থানের ভার বহন করছে সেবামূলক খাত। তবে সেবামূলক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন খাতে ক্লান্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত বছর থাইল্যান্ডে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কমে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখে নেমেছে, ২০২৪ সালে যা ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ। এই ৭ শতাংশ পতন উদ্বেগজনক, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলো যখন মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার অব্যাহত রেখেছে, তখনই এটি ঘটেছে।
২০২৫ সালে জাপানে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৯০ লাখ, আগের বছর যা ছিল ৩ কোটি ৭০ লাখ। দক্ষিণ কোরিয়ায় পর্যটকের আগমন ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৯০ লাখ হয়েছে। আর ভিয়েতনামে পর্যটকের সংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে পর্যটকের সংখ্যা কমেছে, এমন অঞ্চলের একমাত্র দেশ থাইল্যান্ড।
“মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের সময় পর্যটকের সংখ্যা কমেছে, এমন অঞ্চলের একমাত্র দেশ থাইল্যান্ড,” বলেন ব্যাংক অব থাইল্যান্ডের ওই কর্মকর্তা।
প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় আতিথেয়তা খাতও বড় ধাক্কা খাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো থাইল্যান্ডের হোটেলশিল্প সংকুচিত হতে পারে। ২০২৫ সালে এ খাতের আয় ৪.৫ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। পর্যটক কমে যাওয়া, হোটেলে কক্ষ ব্যবহারের হার হ্রাস এবং সভা ও সেমিনারের মতো আনুষঙ্গিক সেবা থেকে আয় কমে যাওয়া এর কারণ। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ফলে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে এবং মুনাফার মার্জিনে চাপ পড়ছে। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে হোটেল পরিচালকেরা এই ব্যয় গ্রাহকদের ওপর চাপাতে পারছেন না। কারখানা ছেড়ে আসা কর্মশক্তিকে কাজ দেওয়ার কথা যে খাতের, তার জন্য পরিস্থিতি তাই কঠিন হয়ে উঠছে।
ভোগব্যয়ে দুর্বলতা ও কঠোর সতর্কবার্তা
শিল্প খাতের পতন, কম মজুরি এবং পর্যটন খাতের দুরবস্থার সম্মিলিত প্রভাব থাই পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। আয়ের মন্থর প্রবৃদ্ধি সামনে ভোগব্যয় কমিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ভোগব্যয় ২০২৬ সালে মাত্র ১.৯ শতাংশ বাড়তে পারে; ২০২৪ সালে যা ছিল ৪.৪ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ২.৪ শতাংশ। পরিবারগুলো ব্যয়ের ক্ষেত্রে ক্রমেই সতর্ক হচ্ছে। এতে কম চাহিদা ও স্থবির প্রবৃদ্ধির দুষ্টচক্র তৈরি হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকেরা অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিতে শুরু করেছেন। থাইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ও থাইল্যান্ডের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ড. ভিরাথাই সান্তিপ্রভব পরিস্থিতির গুরুতর দিক তুলে ধরতে উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ড. একনিতি নিথিতানপ্রাপাসের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, থাইল্যান্ডের অর্থনীতি “স্থবির হয়ে পড়েছে, অথবা খাদের কিনারা থেকে পড়ে যেতে পারে”।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণকারী উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এত সরাসরি সত্য স্বীকারের কথা আমরা সচরাচর শুনি না,” বলেন ড. ভিরাথাই। “এতে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন অবহেলিত সমস্যাগুলো কতটা গুরুতর হয়ে উঠেছে। এর ফলে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি স্থবির, আটকে পড়েছে, অথবা খাদের কিনারায় পৌঁছেছে।
সতর্কবার্তা শুধু স্থবিরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় প্রতিটি খাতের সূচকেই দেখা যাচ্ছে, তুলনীয় দেশগুলোর তুলনায় থাইল্যান্ডের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় প্রতিযোগিতার সক্ষমতার স্থবিরতা, শিক্ষার নিম্নমান, কৃষিতে কম উৎপাদনশীলতা, সরকারি খাতের অদক্ষতা, পরিবারের উচ্চ ঋণ এবং বড় পুঁজিগোষ্ঠীর বাজার আধিপত্য। দেশ যত বেশি সময় আটকে থাকবে, ঘুরে দাঁড়ানো তত কঠিন হবে; কারণ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের তুলনায় সম্পদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
কাঠামোগত বাধায় অগ্রগতি আটকে
গভীরভাবে প্রোথিত কয়েকটি বাধা থাইল্যান্ডকে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে দিচ্ছে না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এর অন্যতম। গত ২০ বছরে থাই প্রধানমন্ত্রীরা গড়ে এক বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। স্বল্প মেয়াদের কারণে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার প্রয়োজন এমন কাঠামোগত সমস্যা সমাধানও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নেতৃত্বে ঘনঘন পরিবর্তনের ফলে ব্যাপক সংস্কারের বদলে স্বল্পমেয়াদি “দ্রুত সুফল” পাওয়ার নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সেবামূলক খাতের বাণিজ্যে বিধিনিষেধের দিক থেকে থাইল্যান্ডের অবস্থান ওপরের দিকে। এসব বিধিনিষেধ টেলিযোগাযোগের মতো খাতে প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে এবং প্রায়ই জবাবদিহিহীন নামমাত্র মালিকানার ব্যবস্থাকে প্রশ্রয় দেয়। এ ছাড়া, বিদেশি ব্যবসা আইন অনেক খাতে বিদেশি মালিকানার ওপর কঠোর সীমা আরোপ করেছে, যা সেবামূলক খাতকে আধুনিক করতে প্রয়োজনীয় পুঁজি ও দক্ষতা আসার পথে বাধা হতে পারে। পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডর উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে বৃহত্তর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
দুর্নীতি এখনো একটি স্থায়ী সমস্যা। দুর্নীতি ধারণা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে থাইল্যান্ডকে ১০৮তম স্থানে রেখেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ঘুষ এবং কর্মকর্তাদের খেয়ালখুশিমতো ক্ষমতা প্রয়োগ ব্যবসা পরিচালনার দক্ষ পথে বাধা তৈরি করে। বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও শ্রমিকসংকটের পাশাপাশি এসব সমস্যা মিলে জটিল এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা শুধু মুদ্রানীতিতে সামান্য পরিবর্তন এনে সমাধান করা সম্ভব নয়।
নতুন উন্নয়ন মডেলের জরুরি আহ্বান
ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক না হলেও অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, বড় ধরনের পরিবর্তন আনা গেলে ভিন্ন পথে এগোনো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জনগণের কাছে সুফল পৌঁছাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত না করে শুধু বিদেশি পুঁজি আকৃষ্ট করতে করছাড়নির্ভর পুরোনো উন্নয়ন মডেল থেকে থাইল্যান্ডকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন শিল্পনীতি হতে হবে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন এবং দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল থাই নাগরিকদের কাছে আরও বেশি পৌঁছানো নিশ্চিত করার ওপর ভিত্তি করে।
প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পেছনে না ছুটে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সহায়তা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো। এর জন্য ডিজিটাল অর্থনীতির চাহিদা পূরণে কর্মশক্তির দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিতে হবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিও উদার করা প্রয়োজন। যেমন, সেবামূলক খাতে বিদেশিদের ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং জ্ঞান হস্তান্তর সহজ করতে শ্রমিকসংকটে থাকা খাতে বিদেশি পেশাজীবীদের কাজের অনুমতি দেওয়া।
নির্দিষ্ট কিছু খাতে আশার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি প্রণোদনার সহায়তায় মোটরগাড়ি শিল্প বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে এগোচ্ছে। ডিজিটাল সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিও আরেকটি সুযোগ, কারণ সরকার পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অগ্রগতিতে প্রায়ই বাধা সৃষ্টি করা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ইচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানোর সদিচ্ছা প্রয়োজন।
ড. ভিরাথাই জোর দিয়ে বলেন, স্থবিরতা থেকে বেরোতে সম্পূর্ণ নতুন উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন শিল্পনীতি, উদ্ভাবন কৌশল, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা না দিয়ে গতি জোগায় এমন সরকারি ভূমিকা। এ ধরনের সমন্বিত সংস্কার ছাড়া থাইল্যান্ড আরও গভীর অর্থনৈতিক স্থবিরতায় পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
মূল কথা
- থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকেরা উৎপাদন খাত ছেড়ে কম বেতনের প্রথাগত সেবামূলক কাজে যাচ্ছেন। প্রথাগত সেবামূলক খাতে গড় মজুরি ঘণ্টায় ১১৪ বাথ।
- ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত থাইল্যান্ডের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৪ শতাংশ; এ সময় উৎপাদন খাতের অবদান কমেছে।
- ২০২৫ সালে পর্যটকের সংখ্যা ৭ শতাংশ কমে ৩ কোটি ৩০ লাখে নেমেছে। মহামারি-পরবর্তী সময়ে পর্যটকের আগমন কমেছে, এমন অঞ্চলের একমাত্র দেশ থাইল্যান্ড।
- আয় বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় ব্যক্তিগত ভোগব্যয় ২০২৬ সালে ১.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে; ২০২৪ সালে যা ছিল ৪.৪ শতাংশ।
- থাইল্যান্ডে প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১৭.২ শতাংশ, যা তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম।
- দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অর্থনীতি “আটকে আছে” বা “খাদের কিনারায়”, সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।






