বনে ফিরল এক প্রেতছায়া
প্রায় তিন দশক ধরে থাইল্যান্ডের সীমানার ভেতরে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের অস্তিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। বৈজ্ঞানিক নথিতে দেখা যায়, দেশটিতে এই প্রজাতির সর্বশেষ উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ১৯৯৫ সালে। ফলে সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ একে থাইল্যান্ডে সম্ভবত বিলুপ্ত বলে শ্রেণিবদ্ধ করে। জলাভূমিতে বসবাসকারী ছোট এই বিড়াল যেন প্রেতছায়ায় পরিণত হয়েছিল—সব জরিপেই তার অনুপস্থিতি ধরা পড়ে, যদিও স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক এই বিড়াল আটকে পড়ার কথা শোনা যেত। এখন থাইল্যান্ডের দুর্গম দক্ষিণাঞ্চলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি ক্যামেরা-ট্র্যাপ প্রকল্পের সুবাদে সেই প্রেতছায়া আবার দৃশ্যমান হয়েছে।
সূচিপত্র
বন্য বিড়াল সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা প্যানথেরা এবং থাইল্যান্ডের জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিজ্ঞানীরা প্রিন্সেস সিরিন্ধর্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের ২৯টি উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে ১৩টি নথিভুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালে, আর ২০২৫ সালে আরও ১৬টি। এসব পর্যবেক্ষণের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সম্ভবত একটি বাচ্চাসহ স্ত্রী চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের ছবি—যা প্রমাণ করে, প্রজাতিটি শুধু থাইল্যান্ডে টিকে নেই, সফলভাবে বংশবিস্তারও করছে।
থাইল্যান্ডের বার্ষিক বন্যপ্রাণী সুরক্ষা দিবসে এ ঘোষণা আসে, যা আবিষ্কারটিকে প্রতীকী গুরুত্বও দিয়েছে। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশমন্ত্রী সুচার্ট চোমক্লিন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ খবর উদ্যাপন করেন।
কয়েক দশক ধরে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে ‘সম্ভবত বিলুপ্ত’ বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক সুরক্ষা, শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক অংশীদারত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানের পর, এ জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবসে আমরা এখন থাইল্যান্ডে এর প্রত্যাবর্তন উদ্যাপন করতে পারি।
এই পুনরাবিষ্কার কেবল একটি বিরল প্রাণীর ফিরে আসার ঘটনা নয়। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বিপন্ন বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটিতে বছরের পর বছর ধরে চলা সংরক্ষণ প্রচেষ্টার সাফল্য নিশ্চিত করে এবং হারিয়ে গেছে বলে ধারণা করা অন্যান্য প্রজাতির জন্যও আশা জোগায়। বিশ্বের বিরলতম বন্য বিড়ালগুলোর একটি চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে ১৯৯৫ সালের সর্বশেষ নিশ্চিত উপস্থিতির পর থেকে থাইল্যান্ডে বিলুপ্ত বলে মনে করা হচ্ছিল। ২০১৪ সাল নাগাদ কোনো প্রমাণ না মেলায় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেন, বিরল এই প্রজাতি দেশটির সীমানার ভেতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল।
জলাভূমির বিশেষজ্ঞের শারীরিক বৈশিষ্ট্য
মাথার স্বতন্ত্র গঠনের কারণে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের এই নাম—এর খুলি অস্বাভাবিকভাবে চ্যাপ্টা এবং ছোট, গোলাকার কান দুটি বেশ দূরে অবস্থিত। গড়ে মাত্র ১.৫ থেকে ২ কিলোগ্রাম ওজনের এই ছোটখাটো বিড়ালটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের অর্ধেকেরও কম ওজনের। আকারের কারণে এটি শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে ছোট বিড়াল নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট বিড়ালজাতীয় প্রাণীগুলোরও একটি। এই ক্ষুদ্র আকৃতি একে পছন্দের আবাসস্থলের ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর সহজে চলাচল করতে সাহায্য করে।
চ্যাপ্টা মাথার পাশাপাশি জলজ জীবনযাপনের উপযোগী আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অভিযোজন রয়েছে এদের। বন্য বিড়ালদের মধ্যে বিরল বৈশিষ্ট্য জালিকার মতো যুক্ত পায়ের আঙুল এদের জলাবদ্ধ পিট-জলাভূমির বনে সহজে চলাচলে সাহায্য করে। এদের চোখ অস্বাভাবিক বড় এবং সামনের দিকে স্থাপিত, যা পানির নিচে শিকার ধরার জন্য চমৎকার দূরত্ববোধ দেয়। পানির ভেতরে ও আশপাশে কাটানো জীবনের উপযোগী হয়েই এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন ঘটেছে। এরা প্রায় একচেটিয়াভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলাভূমিতে—পিট-জলাভূমি ও মিঠাপানির ম্যানগ্রোভে—বসবাস করে, যেগুলো কৃষি সম্প্রসারণ ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে প্রিওনাইলুরাস গণের অন্তর্ভুক্ত করেছেন; অর্থাৎ পরিচিত মেছোবাঘ ও চিতাবিড়ালের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এদের তুলনায় চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের ভৌগোলিক বিস্তৃতি অত্যন্ত সীমিত। প্রাকৃতিকভাবে এ প্রজাতি কেবল বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে, মালয় উপদ্বীপ বরাবর এবং থাইল্যান্ডের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে পাওয়া যায়, যেখানে এখন এদের পুনরাবিষ্কার হয়েছে। শ্রেণিবিন্যাস জানা থাকলেও প্রজাতিটির জীববিজ্ঞান ও আচরণ সম্পর্কে আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম তথ্য আছে। এদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কখনো পদ্ধতিগত গবেষণা হয়নি, তবে গবেষকদের ধারণা, চ্যাপ্টামাথা বিড়াল মূলত মাছ, ব্যাঙ ও চিংড়ি খেয়ে বেঁচে থাকে।
অন্যান্য ছোট বিড়ালের মতো এরা সম্ভবত মূলত একাকী থাকে; স্ত্রী বিড়ালগুলো পুরুষের কোনো ভূমিকা ছাড়াই বাচ্চা বড় করে। সাধারণত একবারে মাত্র একটি বাচ্চা জন্ম দেয় এরা, ফলে জনসংখ্যা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ধীর ও কঠিন হয়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বর্তমানে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে; বিশ্বজুড়ে পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ২,৫০০। এই নাজুক অবস্থার কারণে থাইল্যান্ডে এদের পুনরাবিষ্কার প্রজাতিটির সামগ্রিক টিকে থাকার সম্ভাবনার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিড়ালের খোঁজে জলাভূমির সঙ্গে লড়াই
গত বছর প্যানথেরা এবং থাইল্যান্ডের জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগ যে পরিবেশগত জরিপ শুরু করে, সেখান থেকেই এ পুনরাবিষ্কারের সূত্রপাত। গবেষক দলটি থাইল্যান্ডের সুদূর দক্ষিণের সংরক্ষিত এলাকা প্রিন্সেস সিরিন্ধর্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়, যেখানে উপযুক্ত আবাসস্থল তখনো টিকে ছিল। এই অভয়ারণ্যে রয়েছে পিট-জলাভূমির বন ও জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র, যা তাত্ত্বিকভাবে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের বসবাসের উপযোগী। বিড়ালগুলোর আবাসস্থলে পৌঁছাতে গবেষকদের পিট-জলাভূমির বনের বিপজ্জনক ভূখণ্ড পাড়ি দিতে হয়েছে; বুকসমান পানি ও জট পাকানো ম্যানগ্রোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সম্ভাব্য আবাসস্থলে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। অভয়ারণ্যের জলাভূমির বনাঞ্চলে খোলা পানি ও স্থলভাগের ছোট ছোট অংশ মিলিয়ে জটিল ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে। বুকসমান পানি ও জট পাকানো ম্যানগ্রোভের মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে বনরক্ষী ও গবেষকেরা দিনে মাত্র ১ থেকে ২ কিলোমিটার এগোতে পারতেন। আগের জরিপগুলো বনের প্রান্তেই সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ ভেতরে যেতে হলে এসব দুর্ভেদ্য প্রাকৃতিক বাধা পেরোতে হতো। খোলা পানি ও স্থলভাগের ছোট ছোট অংশ নিয়ে গঠিত জলাভূমির বনের এই জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে প্রচলিত জরিপপদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।
থাইল্যান্ডে প্যানথেরার সংরক্ষণ কর্মসূচির ব্যবস্থাপক রত্তাপান পাত্তানারাংসান এ কাজের অসুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করেন।
অভয়ারণ্যে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালগুলোর অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহে দুটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো জলাভূমির বনের ভূপ্রকৃতি—খোলা পানি ও স্থলভাগের ছোট ছোট অংশ নিয়ে গঠিত জটিল আবাসস্থলে বনরক্ষীরা দিনে মাত্র ১–২ কিলোমিটার এগোতে পারেন।
এসব বাধা সত্ত্বেও গবেষক দলটি অভয়ারণ্যের দুর্গম এলাকাজুড়ে সফলভাবে ক্যামেরা-ট্র্যাপ বসায়। নড়াচড়ায় সক্রিয় হওয়া এসব ক্যামেরা একটানা চলত এবং পাশ দিয়ে যাওয়া যেকোনো বন্যপ্রাণীর ছবি তুলত। কী পাওয়া যাবে তা নিয়ে অনিশ্চিত থাকায় ফুটেজ পর্যালোচনার আগে দলটিকে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ক্যামেরা-ট্র্যাপের ছবি পরীক্ষা করে দেখা যায়, আবিষ্কারটি প্রত্যাশার চেয়েও বড়। ক্যামেরায় শুধু চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের ছবিই ধরা পড়েনি, বারবার তাদের উপস্থিতির প্রমাণও মিলেছে। বিড়ালগুলোকে একই এলাকায় বারবার ফিরতে দেখা গেছে, যা ওই অঞ্চলে তুলনামূলক ঘন একটি স্থানীয় জনসংখ্যার ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণার বিশেষ চ্যালেঞ্জ
বিড়ালগুলোর আবিষ্কার উদ্যাপনের কারণ হলেও থাইল্যান্ডে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের জনসংখ্যা সম্পর্কে আরও জানতে গবেষকদের সামনে বড় বাধা রয়েছে। দুটি প্রধান জটিলতা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে কঠিন করে তুলেছে: দুর্গম আবাসস্থল এবং বিড়ালগুলোর শারীরিক বৈশিষ্ট্য। এ পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা জনসংখ্যার আকার অনুমান করতে পারছেন না, কারণ এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রাণীকে আলাদা করে শনাক্ত করা বা তাদের সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জটি চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের চেহারা থেকেই তৈরি হয়েছে। বাঘ, চিতাবাঘ বা মেঘলা চিতাবাঘের মতো অনেক বন্য বিড়ালের বিপরীতে, গায়ের নকশা দেখে আলাদা চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে শনাক্ত করা যায় না। এদের শরীরে এমন স্বতন্ত্র দাগ বা নকশা নেই, যা দেখে ছবিতে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা সম্ভব।
গবেষণার এই সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন রত্তাপান পাত্তানারাংসান।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো প্রাণীগুলোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। গায়ের নকশা দেখে আলাদা চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে শনাক্ত করা যায় না, ফলে ছবি দিয়ে ধরা-ছাড়া পদ্ধতি ব্যবহার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
প্রতিটি প্রাণীকে শনাক্ত করতে না পারায় ছবি দিয়ে ধরা-ছাড়া পদ্ধতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না; প্রাণীর জনসংখ্যা অনুমানে এটি একটি প্রচলিত কৌশল। ক্যামেরা-ট্র্যাপের বারবার তোলা ছবিতে একই বিড়াল একাধিকবার দেখা গেছে, নাকি প্রতিবারই ভিন্ন বিড়াল ধরা পড়েছে—তা না জানলে বিজ্ঞানীরা জনসংখ্যার ঘনত্ব বা মোট সংখ্যা নির্ভরযোগ্যভাবে হিসাব করতে পারেন না। গবেষণার এই সীমাবদ্ধতার কারণে ২৯টি উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রিন্সেস সিরিন্ধর্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের প্রকৃত সংখ্যা অজানা রয়ে গেছে। সেখানে বিড়ালের সংখ্যা কয়েকটিও হতে পারে, আবার কয়েক ডজনও হতে পারে। এই মৌলিক তথ্য ছাড়া সংরক্ষণবিদদের পক্ষে জনসংখ্যাটি টিকে থাকার মতো অবস্থায় আছে কি না, তা মূল্যায়ন করা বা লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল তৈরি করা কঠিন।
থাইল্যান্ডে প্যানথেরার দলকে উৎসাহিত করছে যে বিষয়টি, তা হলো এই নতুন আবিষ্কৃত জনসংখ্যা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য জনসংখ্যার তুলনায় বেশি ঘন বলে মনে হচ্ছে। এই বেশি ঘনত্ব এলাকাটিকে নিবিড় গবেষণার জন্য আরও উপযোগী করে তুলেছে; ফলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ও আচরণবিষয়ক গবেষণার সম্ভাবনাও এখানে বেশি। থাইল্যান্ডে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের জনসংখ্যা ঘন বলে মনে হওয়ায়, এই এলাকা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
প্রজননরত জনসংখ্যা ও ভবিষ্যতের আশা
চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের প্রতিটি দেখা পাওয়ারই বৈজ্ঞানিক মূল্য রয়েছে, তবে বাচ্চাসহ একটি স্ত্রী বিড়ালের ছবিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি ছবিই জনসংখ্যাটির অবস্থা সম্পর্কে গবেষকদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানায়। প্রথমত, এটি নিশ্চিত করে যে থাইল্যান্ডে পুনরাবিষ্কৃত চ্যাপ্টামাথা বিড়ালগুলো কেবল মালয়েশিয়ার প্রতিবেশী জনসংখ্যা থেকে ঘুরে বেড়াতে আসা প্রাণী নয়। বাচ্চার উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, পূর্ণবয়স্ক বিড়ালগুলো শুধু বেঁচেই নেই, অভয়ারণ্যের ভেতর সফলভাবে বংশবিস্তারও করছে। এর ফলে মাঝে মাঝে আসা প্রাণীর বদলে এখানে স্থায়ী প্রজননরত জনসংখ্যার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্যানথেরার ছোট বিড়াল সংরক্ষণবিষয়ক বিজ্ঞান পরিচালক ওয়াই মিং ওং মঙ্গাবে নিউজকে ইমেইলে এ মুহূর্তের তাৎপর্য বর্ণনা করেন।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের পুনরাবিষ্কার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ মুহূর্ত। এর মাধ্যমে দেখা যায়, জলাভূমি ও নদীব্যবস্থা অক্ষত থাকলে সবচেয়ে দুর্লভ ও বিপন্ন মাংসাশী প্রাণীরাও টিকে থাকতে পারে।
পুনরাবিষ্কারের পরপরই বিড়ালগুলোর সন্ধান থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে তাদের সুরক্ষার দিকে গেছে। সংরক্ষণবিদেরা জানেন, দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপের ওপরই এই জনসংখ্যার টিকে থাকা নির্ভর করছে। বিড়ালগুলোর উপস্থিতির ঘোষণা একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার জন্য সতর্ক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক উদ্বেগের একটি বিষয় হলো বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের সম্ভাব্য হুমকি। পুনরাবিষ্কারের খবর প্রকাশ হলে এই বিরল ও মূল্যবান প্রজাতির অবস্থান অনিবার্যভাবে তাদের কাছে পৌঁছে যাবে, যারা অবৈধভাবে প্রাণীগুলো ধরার চেষ্টা করতে পারে। খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সুরক্ষার কাজ জোরদার করতে হবে।
আইইউসিএনের বিড়ালবিশেষজ্ঞ দলের সহসভাপতি এবং ২০১৪ সালের সেই মূল্যায়নের অন্যতম পর্যালোচক উর্স ব্রাইটেনমোজার, যেখানে প্রজাতিটিকে থাইল্যান্ডে সম্ভবত বিলুপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, আবিষ্কারটির তাৎপর্য তুলে ধরেন।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের পুনরাবিষ্কার এক অসাধারণ আবিষ্কার। বছর শেষের জন্য এটি দারুণ খবর!
কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই দলটিই থাইল্যান্ডে টিকে থাকা সর্বশেষ জনসংখ্যা হতে পারে। প্রজাতিটিকে আগে সম্ভবত বিলুপ্ত বলে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল; বিশ্বজুড়ে এর মোট জনসংখ্যা আনুমানিক মাত্র ২,৫০০। বনাঞ্চলের আবাসস্থল সুরক্ষায় অবিলম্বে কঠোর সংরক্ষণব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, পরিকল্পনাটি পরে নয়, এখনই বাস্তবায়ন করা দরকার। খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণী পাচারকারীরাও বিড়ালগুলোর অবস্থান জেনে যাবে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে নতুন আবিষ্কৃত এই জনসংখ্যার জন্য হুমকি মূল্যায়ন করছেন।
সারকথা
- প্রায় ৩০ বছর নিশ্চিতভাবে দেখা না যাওয়ার পর থাইল্যান্ডে চ্যাপ্টামাথা বিড়ালের পুনরাবিষ্কার হয়েছে।
- ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রিন্সেস সিরিন্ধর্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ক্যামেরা-ট্র্যাপে ২৯ বার এদের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
- একটি স্ত্রী চ্যাপ্টামাথা বিড়ালকে বাচ্চাসহ ছবিতে দেখা গেছে, যা সফল প্রজনন নিশ্চিত করে।
- এ প্রজাতির ওজন মাত্র ১.৫ থেকে ২ কিলোগ্রাম; এটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বিড়ালগুলোর একটি।
- বিশ্বজুড়ে পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর সংখ্যা আনুমানিক ২,৫০০।
- চ্যাপ্টামাথা বিড়াল জলাভূমিতে শিকারে বিশেষভাবে অভিযোজিত; এদের পায়ের আঙুল জালিকার মতো যুক্ত এবং খুলি চ্যাপ্টা।
- দুর্গম ভূখণ্ড এবং গায়ে স্বতন্ত্র নকশার অভাবের কারণে গবেষণা কঠিন।
- এই জনসংখ্যাই থাইল্যান্ডে টিকে থাকা সর্বশেষ চ্যাপ্টামাথা বিড়াল হতে পারে।
- সংরক্ষণবিদেরা হুমকি মূল্যায়ন করছেন এবং সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা করছেন।
- বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণে সংরক্ষিত এলাকার গুরুত্ব এই আবিষ্কার নিশ্চিত করে।






