সুমাত্রার প্রাণঘাতী বন্যার ক্ষতিপূরণে কোম্পানিগুলোর কাছে শত শত কোটি ডলার দাবি ইন্দোনেশিয়ার

পড়তে 9 মিনিট
সুমাত্রার প্রাণঘাতী বন্যার ক্ষতিপূরণে কোম্পানিগুলোর কাছে শত শত কোটি ডলার দাবি ইন্দোনেশিয়ার

পরিবেশ বিপর্যয়ে ব্যাপক আইনি পদক্ষেপ ইন্দোনেশিয়ার

সুমাত্রায় প্রাণঘাতী বন্যাকে আরও ভয়াবহ করে তোলা পরিবেশের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী বলে মনে করা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক আইনি পদক্ষেপ শুরু করেছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। গত বছরের শেষ দিকে ভয়াবহ বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির পর ছয়টি কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ, প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, আদায়ের দাবিতে দেওয়ানি মামলা করেছে কর্তৃপক্ষ। দ্বীপটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমির ক্ষতি করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এই মামলা পরিবেশগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের অগ্রগতি।

সূচিপত্র
  1. পরিবেশ বিপর্যয়ে ব্যাপক আইনি পদক্ষেপ ইন্দোনেশিয়ার
  2. দুর্যোগের পেছনের বিজ্ঞান
  3. অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকাণ্ড
  4. পরিবেশনীতি বদলের পথে সরকার
  5. নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
  6. মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ও পুনরুদ্ধারের পথ
  7. একনজরে

২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে উত্তর সুমাত্রা, পশ্চিম সুমাত্রা ও আচেহ প্রদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বন্যা ও পরবর্তী ভূমিধসের কারণ ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের প্রভাবে হওয়া অতিবৃষ্টি। তবে তদন্তকারীরা দেখতে পেয়েছেন, এই বিপর্যয়ের মাত্রা কেবল আবহাওয়াজনিত কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রাম ডুবিয়ে দেওয়া এবং সেতু ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া কাদার স্রোত ও কাঠের গুঁড়ির সঙ্গে উজানে বন উজাড় এবং করপোরেট কর্মকাণ্ডের কারণে ভূমির অবক্ষয়ের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

পরিবেশমন্ত্রী হানিফ ফয়সল নুরোফিক মামলাগুলোর ঘোষণা দেন। একই সময়ে জাকার্তা ও উত্তর সুমাত্রার রাজধানী মেদানের আদালতে মামলাগুলো করা হয়। সরকারের দাবিতে ক্ষতিপূরণের হিসাব বিস্তারিতভাবে ভাগ করা হয়েছে: পরিবেশের সরাসরি ক্ষতির জন্য প্রায় ৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ এবং বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের খরচ হিসেবে অতিরিক্ত ১৭৮ বিলিয়ন রুপিয়াহ। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধারেই যেন এই অর্থ ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করাই এই আর্থিক কাঠামোর লক্ষ্য।

দূষণকারীকে মূল্য দিতে হবে—এই নীতি আমরা দৃঢ়ভাবে মেনে চলি। বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে মুনাফা করা যেকোনো করপোরেশনকে তা পুনরুদ্ধারের সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে।

মন্ত্রী নুরোফিকের বক্তব্যে ‘দূষণকারীকে মূল্য দিতে হবে’ নীতির প্রতি নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়েছে। এই নীতিতে বলা হয়, দূষণ সৃষ্টিকারীদেরই তা নিয়ন্ত্রণের খরচ বহন করতে হবে, যাতে মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের ক্ষতি ঠেকানো যায়। এই নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের আর্থিক বোঝা করদাতাদের ওপর থেকে সরিয়ে, যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে ভূমি অস্থিতিশীল হয়েছে বলে অভিযোগ, তাদের ওপর চাপাতে চায় রাষ্ট্র।

বিজ্ঞাপন

দুর্যোগের পেছনের বিজ্ঞান

সরকারের কঠোর অবস্থান বুঝতে হলে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পরিবেশগত প্রক্রিয়াগুলো দেখা দরকার। সুমাত্রার ঘন রেইনফরেস্ট ঐতিহাসিকভাবে প্রাকৃতিক স্পঞ্জের মতো কাজ করে ভারী বৃষ্টির পানি শোষণ করেছে এবং জটিল শিকড়ের মাধ্যমে মাটি স্থিতিশীল রেখেছে। খনি, বাগান বা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এসব বন কেটে ফেলা হলে জমির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের পানি দ্রুত গড়িয়ে নদীতে জমা হয়, নদী ফুলে ওঠে এবং নজিরবিহীন প্রবল বেগে তীর উপচে পড়ে।

এটি কেবল বন্যা ছিল না; ভূমিধস ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের স্রোত মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক জটিল দুর্যোগ। স্যাটেলাইটের ছবি ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পানির স্রোতে বিপুল পরিমাণ কাঠ ভেসে এসেছে। এর বেশির ভাগই অবৈধ গাছ কাটা বা জমি পরিষ্কারের কর্মকাণ্ড থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধ্বংসাবশেষ র‍্যামিংয়ের মতো কাজ করে সেতু ও অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, যেগুলো হয়তো পানির ঢেউয়ের ধাক্কায় টিকে যেত। তাপানুলি অঞ্চলের নদীগুলোতে এত বড় বড় গুঁড়ির উপস্থিতি উজানে বন উজাড়ের অকাট্য ভৌত প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

বন্যার ভয়াবহতার সঙ্গে নির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের যোগসূত্র দেখানো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর সরকারের মামলা নির্ভর করছে। বনভূমিকে বনবহির্ভূত এলাকায় রূপান্তর করে করপোরেশনগুলো ওই অঞ্চলের জলপ্রবাহের ধরন মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। গাছের ছাউনি ও শিকড়ের সুরক্ষা না থাকায় মাটি পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে অস্থিতিশীল হয়েছে, ফলে ভূমিধসে পুরো জনপদ চাপা পড়েছে। করপোরেট ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের যোগসূত্রের এই স্বীকৃতিই মামলাগুলোর কেন্দ্রীয় বিষয়।

সংরক্ষণবিষয়ক স্টার্টআপ দ্য ট্রিম্যাপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই ইন্দোনেশিয়ায় ২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি প্রাথমিক বনভূমি হারিয়ে গেছে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান অঞ্চলটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। প্রাথমিক বনভূমি হারিয়ে যাওয়ায় চরম আবহাওয়ার ঘটনা সামাল দেওয়ার ভূদৃশ্যের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে বন্যার আশঙ্কা বাড়ে এবং বন্যা হলে তার ধ্বংসাত্মক প্রভাবও তীব্র হয়। মামলায় নাম থাকা কোম্পানিগুলো এই সক্ষমতা কমে যাওয়ার জন্য সরাসরি দায়ী বলে সরকারের দাবি।

বিজ্ঞাপন

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকাণ্ড

সরকারের প্রাথমিক বিবৃতিতে বিবাদীদের শুধু আদ্যক্ষরে উল্লেখ করা হলেও, পরবর্তী প্রতিবেদন ও স্থানীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলো সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর পরিচয় প্রকাশ করেছে। জলাধার অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, বিশেষত গারোগা ও বাতাং তোরু নদী অববাহিকায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে মামলা করা হয়েছে। এসব এলাকা পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এবং অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস।

স্থানীয় পরিবেশবাদী গোষ্ঠী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে খনি, জ্বালানি ও বাগান খাতের বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাল্পউড উৎপাদক পিটি তোবা পাল্প লেসতারির বিরুদ্ধে বনভূমিকে শিল্পবাগানে রূপান্তরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মারতাবে সোনার খনির পরিচালনাকারী পিটি আগিনকোর্ট রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে কয়েক শ হেক্টর বনভূমি পরিষ্কারের অভিযোগ রয়েছে। বাতাং তোরু বাস্তুতন্ত্রে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী পিটি নর্থ সুমাত্রা হাইড্রো এনার্জির (এনএসএইচই) কার্যক্রমও বনভূমি ও নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির ওপর প্রভাবের কারণে তদন্তের আওতায় রয়েছে।

বাতাং তোরু বাস্তুতন্ত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিরল বৃহৎ বনমানুষ তাপানুলি ওরাংওটানের আবাসস্থল। পরিবেশবাদীদের যুক্তি, এই বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি শুধু অনন্য বন্যপ্রাণীকেই বিপন্ন করে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষের বসতিকে সুরক্ষিত রাখার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢালও সরিয়ে দেয়। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণের চেষ্টা করতে গিয়ে তারা পরিবেশের স্থিতিশীলতার ক্ষতি করেছে।

উল্লেখ করা জরুরি, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো প্রায়ই দাবি করে যে তারা তাদের অনুমতিপত্রের শর্ত মেনেই কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, পিটি তোবা পাল্প লেসতারি প্রকাশ্যে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কর্মকাণ্ড সব সরকারি বিধি মেনে এবং প্রচলিত কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এই আত্মপক্ষসমর্থন মামলার একটি কেন্দ্রীয় টানাপোড়েন তুলে ধরে: আইন মেনে চলা আর পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার মধ্যে পার্থক্য। সরকারের নতুন অবস্থান থেকে ইঙ্গিত মিলছে, কার্যক্রমের ফলে পরিবেশের ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটলে অনুমতিপত্র আর দায় এড়ানোর ঢাল হিসেবে কাজ নাও করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশনীতি বদলের পথে সরকার

তাৎক্ষণিক মামলাগুলোর বাইরেও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিজেদের ভাষায় ব্যাপক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোতে খনি, জ্বালানি, বাগান ও আবাসন খাতের ১০০টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

বনমন্ত্রী রাজা জুলাই আন্তোনি এই পরিবর্তনের কথা জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য আগের দিকে, অর্থাৎ উন্নয়নের পক্ষে, অনেক বেশি ঝুঁকে পড়েছিল। তার মতে, এই দুর্যোগ জাতীয় নীতিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করেছে। ভারসাম্য ফেরানোর অংশ হিসেবে সারা দেশে ২২টি বনায়ন অনুমতিপত্র বাতিলের পরিকল্পনা করছে সরকার, যার মধ্যে সুমাত্রার এক লাখ হেক্টরের বেশি জমির অনুমতিও রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণমূলক এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে প্রাদেশিক ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের নথি পরিবেশগত মূল্যায়ন ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। কাগজে-কলমে বিধিসম্মত হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান পরিকল্পনা যদি বিপর্যয় ডেকে আনে, তাহলে পরিকল্পনার কাঠামোতেই ত্রুটি আছে বলে সরকার স্বীকার করছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সম্পদ আহরণকে ঐতিহাসিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনো সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের স্বীকারোক্তি বিরল।

নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, তবে বড় মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত এগিয়ে মার্চের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। অনুমোদিত ও অননুমোদিত কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য করা হবে না বলে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে। বার্তা হলো, কোনো কর্মকাণ্ডে পরিবেশ ধ্বংস ও প্রাণহানি ঘটলে কাগজপত্র যা-ই থাকুক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কয়েক দশক ধরে ইন্দোনেশিয়ার সম্পদনির্ভর খাতগুলোতে চালু থাকা গতানুগতিক ব্যবসায়িক মডেলের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা

সরকারের আইনি পদক্ষেপকে অনেকেই সঠিক পথে অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানালেও পরিবেশবাদী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো আরও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। গ্রিনপিস ইন্দোনেশিয়া মামলাগুলোকে ‘নামমাত্র’ পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির বনবিষয়ক প্রচারক আরি রমপাসের বক্তব্য, শুধু পৃথক কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করলেই চলবে না; যে নীতিগুলো ক্ষতি ঘটানোর সুযোগ করে দিয়েছে, সেগুলোও কর্তৃপক্ষকে পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

সমালোচনার মূল বিষয় হলো, যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে এখন মামলা হচ্ছে, তাদের অনুমতিপত্র দিয়েছিল সরকার নিজেই। পরিবেশবাদীদের বক্তব্য, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে রাষ্ট্র আসলে শাসন ও তদারকিতে নিজেদের ব্যর্থতা সংশোধনের চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এই দুর্যোগ ‘আইনসম্মত অনুমোদনপ্রাপ্ত পরিবেশ ধ্বংসের’ ফল, যেখানে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা ও অনুমতিপত্রের আড়ালে ব্যাপক বনভূমি রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশবিষয়ক ফোরাম, যা ওয়ালহি নামে পরিচিত, বিশেষভাবে সরব হয়েছে। উত্তর সুমাত্রায় ক্ষতির জন্য দায়ী বলে তারা সাতটি কোম্পানিকে চিহ্নিত করেছে, যেখানে সরকার বর্তমানে ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বিপর্যয়ের ব্যাপ্তির তুলনায় মামলার পরিধি সীমিত বলে মনে হওয়ার কারণ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে। এ ছাড়া, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ধীরগতির সমালোচনা করে ওয়ালহি জানিয়েছে, ঘটনার ৫০ দিন পরও বড় ধরনের মানবিক সংকট রয়ে গেছে।

এটি বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির অকাট্য প্রমাণ। বনভূমি পরিষ্কারের সুযোগ করে দেওয়া নীতির মাধ্যমে মানুষের হস্তক্ষেপের প্রমাণ এটি, যার পরিণতিতে এই বিপর্যয় ঘটেছে।

ওয়ালহি উত্তর সুমাত্রার নির্বাহী পরিচালক রিয়ান্দা পুরবা জোর দিয়ে বলেন, বন্যা নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল না; এটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল। নাগরিক সমাজের গোষ্ঠীগুলো সরকারের কাছে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় নয়, ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকাতে বাতাং তোরুর মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ও পুনরুদ্ধারের পথ

আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও দুর্যোগে মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা ভয়াবহ রয়ে গেছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (বিএনপিবি) হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১৭৮ জনে দাঁড়িয়েছে; আরও ১৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন; তাদের বাড়িঘর, অবকাঠামো ও জীবিকা ধ্বংস হয়েছে। তিন প্রদেশে সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; কিছু বাড়ির ক্ষতি সামান্য, আবার কিছু পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।

বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন নির্মাণের কাজ এখন দ্রুততর করছে সরকার। কয়েক হাজার নতুন আবাসন ইউনিট নির্মাণের জন্য আচেহ, উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রায় স্থান প্রস্তুত করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এড়িয়ে নিরাপদভাবে নির্মাণকাজ করা পুনর্গঠনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ; এর জন্য সতর্ক পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে চলা প্রয়োজন।

তবে পুনরুদ্ধারের গতি সবখানে এক রকম নয়। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফসলহানি, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে গেছে। মানবিক সংকট কেবল আশ্রয় হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা ও বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা হারানোর বিষয়ও রয়েছে। সমালোচকেরা বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে রাষ্ট্রের দেরি হলেও নদী থেকে গাছের গুঁড়ি উদ্ধারে দ্রুত ভারী যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়েছিল। তাদের মতে, এতে মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থনৈতিক মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

ইন্দোনেশিয়ার সামনে এগোনোর পথে উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার অপরিহার্যতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ‘দূষণকারীকে মূল্য দিতে হবে’ নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং ভবিষ্যতে পরিবেশের অবক্ষয় ঠেকানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটা সক্ষম, তার পরীক্ষা। আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাসী, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের মানুষ, দেখবেন ন্যায়বিচার ও পুনরুদ্ধার সত্যিই সম্ভব হয় কি না।

বিজ্ঞাপন

একনজরে

  • প্রাণঘাতী বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া সরকার ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (২৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার) ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেছে।
  • সুমাত্রার দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ১৭৮ জন নিহত এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
  • কর্তৃপক্ষের মতে, করপোরেট কর্মকাণ্ডের কারণে বন উজাড় ও ভূমির অবক্ষয় বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়েছে।
  • ২০০টিরও বেশি কোম্পানির নিরীক্ষা চলছে; সম্ভাব্য ফৌজদারি অভিযোগের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
  • পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনা, ক্ষতির সুযোগ করে দেওয়া অনুমতিপত্র সরকারই দিয়েছিল।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে