বিশ্বের নগর তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন
জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশ্বের নগরচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা এখন টোকিওকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরে পরিণত হয়েছে, যা বৈশ্বিক নগর শ্রেণিবিন্যাসে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। এই পালাবদল বিশ্বের জনমিতিক প্রবণতার বৃহত্তর পরিবর্তনকে তুলে ধরেছে। তালিকায় এশিয়ার শহরগুলোর আধিপত্য দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোর ঐতিহ্যবাহী মেগাসিটিগুলোতে জনসংখ্যা স্থবির হয়ে পড়ছে বা কমছে।
সূচিপত্র
- বিশ্বের নগর তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন
- নতুন পদ্ধতিতে বদলে গেল শহরের অবস্থান
- বিশ্বের নগরায়ণে এশিয়ার আধিপত্য
- বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মেগাসিটি
- ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে বদলাবে নগরচিত্র
- দ্রুত নগর প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
- ছোট শহরের গুরুত্ব
- গ্রামীণ রূপান্তর ও বৈশ্বিক জনবসতির ধরন
- বিশ্লেষণে নতুন পদ্ধতির ব্যবহার
- টেকসই উন্নয়নে প্রভাব
- মূল কথা
প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ বাসিন্দা নিয়ে জাকার্তা এখন তালিকার শীর্ষে। এরপর রয়েছে বাংলাদেশের ঢাকা, ৩ কোটি ৭০ লাখ এবং জাপানের টোকিও, ৩ কোটি ৩০ লাখ বাসিন্দা নিয়ে। এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার হেরফের নয়। এটি দেখায়, উন্নয়নশীল অঞ্চলের শহরগুলো কত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সুযোগের খোঁজে লাখো মানুষ এসব শহরে আসছেন; অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত মহানগরগুলোকে বয়স্ক জনসংখ্যা এবং সীমিত প্রবৃদ্ধির সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা) এই বিস্তৃত প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের ধরন পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ২০৫০ সাল পর্যন্ত ভবিষ্যৎ প্রবণতার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ফলাফলে দেখা যায়, নগর প্রবৃদ্ধি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে, বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে; অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য অংশে নগরায়ণ স্থবির হচ্ছে বা কমছে।
নতুন পদ্ধতিতে বদলে গেল শহরের অবস্থান
তালিকায় এই বড় পরিবর্তনের পেছনে আংশিকভাবে রয়েছে জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত নতুন পদ্ধতি। আগের মূল্যায়নগুলোতে শহরের সীমানা নির্ধারণে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞার তথ্য ব্যবহার করা হতো। ফলে বিভিন্ন দেশের শহরগুলোর তুলনায় অসংগতি দেখা দিত। এবার গবেষকেরা স্যাটেলাইট মানচিত্র এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূস্থানিক মানদণ্ড ব্যবহার করে আরও প্রমিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
জাতিসংঘের এই বিভাগের জনসংখ্যা-প্রাক্কলন ও পূর্বাভাস শাখার প্রধান প্যাট্রিক গারল্যান্ড এ পরিবর্তনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন দেশের ব্যাপকভাবে ভিন্ন সংজ্ঞার ভিত্তিতে তৈরি আগের মূল্যায়নগুলোতে টোকিওকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা ছিল। নতুন মূল্যায়নে একই ধরনের জনসংখ্যা ও ভূস্থানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে নগর এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য।
জাতিসংঘের নতুন সংজ্ঞায়, প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১,৫০০ জন বাসিন্দা রয়েছে এমন গ্রিড সেল নিয়ে গঠিত এবং মোট জনসংখ্যা অন্তত ৫০,০০০—এমন সংলগ্ন এলাকাকে শহর বলা হয়েছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক এই পদ্ধতিতে প্রশাসনিক সীমানার বদলে নগরের বিস্তৃতি বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে মহানগর এলাকায় মানুষ কীভাবে বসবাস করেন ও যাতায়াত করেন, তার আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া যায়।
পদ্ধতির এই পরিমার্জন টোকিওর অবস্থান তালিকায় নিচে নেমে যাওয়ার একটি কারণ। জাপানের রাজধানী বিশাল শহর হলেও, একাধিক প্রিফেকচারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এর জনসংখ্যা এখন ভিন্নভাবে হিসাব করা হচ্ছে। জাতিসংঘের গবেষণায় টোকিও অঞ্চল বলতে আশপাশের সাইতামা, চিবা ও কানাগাওয়া প্রিফেকচারকেও বোঝানো হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত বিস্তৃত এলাকার মধ্যে ইয়োকোহামাও রয়েছে, যার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ।
এই নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২০১০ সালের দিকে জাকার্তার কাছে শীর্ষস্থান হারানোর আগ পর্যন্ত টোকিও ছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর। জাতিসংঘের গবেষণায় ব্যবহৃত টোকিও অঞ্চলের জনসংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানের বাকি অংশের মতো কমেছে। তবে শহরটি নিজেই বিপরীত পথে এগোচ্ছে। টোকিও মহানগর সরকারের তথ্য অনুযায়ী, টোকিওর মূল এলাকার ২৩টি বিশেষ ওয়ার্ড এবং ২৬টি ছোট শহরের বর্তমান জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখের সামান্য বেশি। এক দশক আগে তা ছিল ১ কোটি ৩২ লাখ।
বিশ্বের নগরায়ণে এশিয়ার আধিপত্য
২০২৫ সালের প্রতিবেদনটি এশিয়ায় নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপক কেন্দ্রীভবন তুলে ধরেছে। সবচেয়ে জনবহুল ১০টি শহরের ৯টিই এখন এশিয়া মহাদেশে। জাকার্তা, ঢাকা ও টোকিওর পর শীর্ষ ১০ শহরের তালিকায় রয়েছে ভারতের নয়াদিল্লি (৩ কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার), চীনের সাংহাই (২ কোটি ৯৬ লাখ), চীনের গুয়াংজু (২ কোটি ৭৬ লাখ), মিসরের কায়রো (২ কোটি ৫৬ লাখ), ফিলিপাইনের ম্যানিলা (২ কোটি ৪৭ লাখ), ভারতের কলকাতা (২ কোটি ২৬ লাখ) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল (২ কোটি ২৫ লাখ)।
শীর্ষ ১০-এ এশিয়ার বাইরে একমাত্র শহর কায়রো, যা আফ্রিকায় নগরায়ণের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। মিসরের রাজধানী দেখায়, উন্নয়নশীল অঞ্চলের শহরগুলো কত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর জনসংখ্যা নিউইয়র্ক শহরের দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্ব তালিকায় ২২তম স্থানে থাকা নিউইয়র্কের বাসিন্দা ১ কোটি ৩৯ লাখ।
এশীয় শহরগুলোর আধিপত্য বৃহত্তর জনমিতিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। শীর্ষ ৩০ শহরের উল্লেখযোগ্য অংশই চীন ও ভারতের। এর মধ্যে রয়েছে সাংহাই, গুয়াংজু, নয়াদিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাই। বিপুল অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীভবন এবং আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে এসব মেগাসিটি গ্রামীণ এলাকা থেকে অভিবাসীদের আকর্ষণ করে।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল লি জুনহুয়া এই প্রবণতার বৃহত্তর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য, নগরায়ণ আমাদের সময়ের একটি নির্ধারক শক্তি। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৌশলগতভাবে পরিচালিত হলে এটি জলবায়ু কার্যক্রম, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে রূপান্তরমূলক পথ খুলে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মেগাসিটি
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে মেগাসিটির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। ১ কোটি বা তার বেশি বাসিন্দার নগর এলাকাকে মেগাসিটি বলা হয়। ১৯৭৫ সালে বিশ্বে এমন শহর ছিল মাত্র আটটি। ২০২৫ সালে তা চার গুণ বেড়ে ৩৩টিতে দাঁড়িয়েছে, যার ১৯টি এশিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে মেগাসিটি মাত্র দুটি—লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক। অন্যান্য অঞ্চলে নগর জনসংখ্যার কেন্দ্রীভবনের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন।
মেগাসিটির এই বিস্তার মানব ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য জনমিতিক পরিবর্তন। ১৯৫০ সাল থেকে শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। সে সময় বিশ্বের ২৫০ কোটি মানুষের মাত্র ২০ শতাংশ নগর এলাকায় বাস করতেন। বর্তমানে ৮২০ কোটি মানুষের বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশের আবাস শহর।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মেগাসিটির সংখ্যা আরও বাড়বে। ২০৫০ সালে বিশ্বে মেগাসিটির সংখ্যা ৩৭টিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা, তানজানিয়ার দার এস সালাম, ভারতের হাজিপুর এবং মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আগামী কয়েক দশকে ১ কোটি বাসিন্দার মাইলফলক পেরিয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে বদলাবে নগরচিত্র
আগামী ২৫ বছরে বিশ্বের শহরগুলোর অবস্থান কীভাবে বদলাবে, সে বিষয়ে আগ্রহজাগানিয়া পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের প্রতিবেদন। বর্তমানে শীর্ষে থাকলেও, শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্বের বৃহত্তম শহরে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ, যা জাকার্তার ৫ কোটি ১৮ লাখের চেয়ে সামান্য বেশি।
ঢাকার এই সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক নগরায়ণের চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের রাজধানী ইতিমধ্যেই দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। সাংহাইয়ের মতো এশিয়ার অন্যান্য শহরেও একই ধরনের প্রবৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে। এসব শহরে গ্রামীণ এলাকা থেকে বাসিন্দারা আসতে থাকবেন।
অন্যদিকে, ২০৫০ সালে টোকিওর জনসংখ্যা কমে প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক তালিকায় শহরটির অবস্থান নেমে আসবে সপ্তম স্থানে। জনসংখ্যায় এই পতন জাপানের বৃহত্তর জনমিতিক সংকটের প্রতিফলন: বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জন্মহার কমে যাওয়া এবং সীমিত অভিবাসন। অর্থনৈতিক ও জনমিতিকভাবে পরিণত হওয়ার পর বর্তমানে প্রবৃদ্ধিশীল অন্যান্য শহরও জাপানের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবৃদ্ধির ভিন্ন ভিন্ন ধারাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অনেক নগর এলাকা সম্প্রসারিত হলেও কিছু শহরের জনসংখ্যা কমছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, কোনো কোনো শহরের জনসংখ্যা কমছে, যদিও সংশ্লিষ্ট দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে; আবার অন্য শহরের জনসংখ্যা বাড়ছে, যদিও সেই দেশের মোট জনসংখ্যা কমছে। চীনের মেক্সিকো সিটি ও চেংদু—দুটিরই বিশাল আকার সত্ত্বেও জনসংখ্যা কমেছে।
দ্রুত নগর প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ
মেগাসিটির দ্রুত সম্প্রসারণ নগর পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পরিবেশ ও অবকাঠামোর গুরুতর সমস্যার মুখে থাকা সত্ত্বেও জাকার্তা শীর্ষে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী ভূমিকম্প ও বন্যাপ্রবণ, তীব্র দূষণে ভুগছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে দ্রুত দেবে যাচ্ছে।
এসব চ্যালেঞ্জের কারণে ইন্দোনেশিয়া সরকার রাজধানী বোর্নিও দ্বীপের নুসান্তারায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। জাকার্তা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১,২০০ মাইল। প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আরও উপযুক্ত স্থানে নতুন রাজধানী গড়ে তোলা। ২০২৪ সালে উদ্বোধনের পরিকল্পনা থাকলেও, কর্তৃপক্ষ এখন ২০২৮ সালের দিকে নুসান্তারাকে রাজনৈতিক রাজধানী হিসেবে চালু করতে চায়। এর বিস্তৃত উন্নয়নকাজ চলবে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত।
নির্মাণকাজে বিলম্ব, বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা এবং জমিসংক্রান্ত সমস্যাসহ নানা বাধার মুখে পড়েছে এ উদ্যোগ। নতুন নগরকেন্দ্র গড়ে তোলা এবং দ্রুত নগর প্রবৃদ্ধি সামলানোর জটিল চ্যালেঞ্জগুলো এ সমস্যায় স্পষ্ট হয়েছে।
দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকা ঢাকাকেও একই ধরনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোর অন্যতম ঢাকা অবকাঠামোগত সংকট, পরিবেশের অবক্ষয় এবং লাখো নতুন বাসিন্দাকে মৌলিক সেবা দেওয়ার সমস্যায় জর্জরিত। প্রবৃদ্ধির গতি এত বেশি যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে।
লি জুনহুয়া তাঁর বক্তব্যে এসব চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশগুলোকে সমন্বিত জাতীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে। এসব নীতির মাধ্যমে নগর ও গ্রামাঞ্চলের আবাসন, ভূমির ব্যবহার, যাতায়াত এবং জনসেবা খাতের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হবে। শহর যত বড় ও জটিল হচ্ছে, এই সমন্বিত পদ্ধতির গুরুত্বও তত বাড়ছে।
ছোট শহরের গুরুত্ব
সংবাদ শিরোনামে প্রায়ই মেগাসিটির প্রাধান্য দেখা গেলেও, জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, ছোট ও মাঝারি শহরগুলোতে মেগাসিটির চেয়ে বেশি মানুষ বাস করেন এবং এসব শহর আরও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষত আফ্রিকা ও এশিয়ার এই নগরকেন্দ্রগুলো আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং গ্রামাঞ্চল ও বড় মহানগরের মধ্যে অপরিহার্য সংযোগ তৈরি করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্লেষণ করা ১২,০০০ শহরের ৯৬ শতাংশের জনসংখ্যা ১০ লাখের কম এবং ৮১ শতাংশের জনসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের কম। এসব ছোট নগর এলাকায় উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে সহজে পরিচালনা করা যায়। পাশাপাশি এগুলো অর্থনৈতিক সুযোগ ও সেবা দেয়, যা গ্রামীণ এলাকার মানুষকে আকর্ষণ করে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে শহরের সংখ্যা ১৫,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর অধিকাংশের জনসংখ্যা হবে ২ লাখ ৫০ হাজারের কম। ছোট নগরকেন্দ্রের এই বিস্তার ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতের নগরায়ণ শুধু অল্প কয়েকটি বিশাল মেগাসিটির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না; বরং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা হাজারো ক্রমবর্ধমান মাঝারি আকারের শহরও এর বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে।
প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৩০০ জন ঘনত্বসহ কমপক্ষে ৫,০০০ বাসিন্দার জনবসতিকে ছোট শহর বলা হয়। জার্মানি, ভারত, উগান্ডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈচিত্র্যময় ৭১টি দেশে এ ধরনের বসতিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। গ্রামাঞ্চল ও শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, জরুরি সেবা দেওয়া এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গ্রামীণ রূপান্তর ও বৈশ্বিক জনবসতির ধরন
নগর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার চলমান রূপান্তরও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে ৬২টি দেশে গ্রামীণ জনবসতিই সবচেয়ে প্রচলিত বসতির ধরন, ১৯৭৫ সালে যা ছিল ১১৬টি দেশে। ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা আরও কমে ৪৪টি দেশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এটি নগরজীবনের দিকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।
তবে অনেক অঞ্চলে গ্রামীণ জনসংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখনো রয়েছে। ইউরোপের অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড ও রোমানিয়াসহ কিছু দেশে এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, চাদ, এসওয়াতিনি, মোজাম্বিক ও জাম্বিয়ার মতো সাব-সাহারান আফ্রিকার বহু দেশে এখনো গ্রামীণ জনবসতিই প্রধান।
সাব-সাহারান আফ্রিকা একমাত্র অঞ্চল, যেখানে গ্রামীণ জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থেকেছে। ভবিষ্যতে গ্রামীণ জনসংখ্যার প্রায় সব প্রবৃদ্ধিই এ অঞ্চলে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে দেশগুলোকে গ্রামীণ উন্নয়নের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দ্রুত নগর সম্প্রসারণ সামলাতে হবে, যা অনন্য উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সাব-সাহারান আফ্রিকায় গ্রামীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর সম্প্রসারণের এই যুগপৎ প্রবণতা নীতিনির্ধারণে জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বসতির এই দুই ধরনের মধ্যে পরিবর্তন সামলানোর পাশাপাশি সরকারগুলোকে গ্রাম ও শহরের মানুষের চাহিদা পূরণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্লেষণে নতুন পদ্ধতির ব্যবহার
‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনের ২০২৫ সালের সংস্করণে বিশ্লেষণ সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের পদ্ধতিগত উদ্ভাবন যুক্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো প্রতিবেদনে ‘ডিগ্রি অব আরবানাইজেশন’ নামে একটি সমন্বিত ভূস্থানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে তিন ধরনের বসতির জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে: শহর, ছোট শহর এবং গ্রামীণ এলাকা।
নতুন এ পদ্ধতি আন্তর্জাতিক তুলনাযোগ্যতা বাড়ায় এবং নগরায়ণের প্রবণতাকে আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। প্রশাসনিক সীমানার বদলে জনঘনত্ব ও সংলগ্নতার ভিত্তিতে প্রমিত সংজ্ঞা ব্যবহার করে গবেষকেরা বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের নগর উন্নয়নের আরও নির্ভুল তুলনা করতে পারবেন।
২০২৫ সালের সংশোধিত সংস্করণে ভৌগোলিক পরিসরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। শহরের সর্বনিম্ন জনসংখ্যার সীমা ৩ লাখ থেকে কমিয়ে ৫০,০০০ করা হয়েছে। ফলে বিশ্লেষিত শহরের সংখ্যা বেড়ে ১২,০০০-এর বেশি হয়েছে। এই বিস্তৃত পরিসর বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেয়।
জনসংখ্যার প্রাক্কলনের পাশাপাশি, গ্রিডভিত্তিক এই নতুন পদ্ধতিতে প্রতিটি ধরনের বসতির ভূমির পরিমাণ এবং নির্মিত এলাকার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। তথ্যের এই অতিরিক্ত স্তর গবেষক ও পরিকল্পনাবিদদের নগর উন্নয়নের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে সহায়তা করে এবং ঘনত্ব, অপরিকল্পিত বিস্তার ও ভূমি ব্যবহারের ধরন আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়।
পদ্ধতিগত এই উন্নয়ন নগরসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশ্বজুড়ে শহরের গুরুত্ব বাড়তে থাকায় কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনার জন্য নির্ভুল ও তুলনাযোগ্য তথ্য পাওয়াও ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে।
টেকসই উন্নয়নে প্রভাব
‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনের ফলাফল বিশ্বজুড়ে টেকসই উন্নয়নের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক জলবায়ু অঙ্গীকার এগিয়ে নিতে সরকারগুলো যখন কপ৩০ সম্মেলনে মিলিত হচ্ছে, তখন জাতিসংঘ সব ধরনের বসতিতে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে নগরায়ণের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্বের সম্পদের ব্যবহার ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অসমানুপাতিক বড় অংশ নগরকেন্দ্রগুলো থেকে আসে। তাই জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য শহরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সঙ্গে যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা থাকলে শহরগুলো আরও দক্ষতার সঙ্গে সেবা প্রদান, অর্থনৈতিক উদ্ভাবন এবং টেকসই জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরায়ণ কীভাবে এগোবে, তার ওপর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার গভীর প্রভাব পড়বে। সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত শহর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাতে, দারিদ্র্য কমাতে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি করতে এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব এগিয়ে নিতে পারে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বৈষম্য, পরিবেশের অবক্ষয় ও সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
লি জুনহুয়া তাঁর বক্তব্যে এ সংযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৌশলগতভাবে পরিচালিত হলে নগরায়ণ জলবায়ু কার্যক্রম, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে রূপান্তরমূলক পথ খুলে দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে চলমান নগরায়ণ যে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—দুই-ই তৈরি করছে, এ দৃষ্টিভঙ্গিতে তার ভারসাম্যপূর্ণ স্বীকৃতি রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল নগর ভবিষ্যৎ গড়তে কাজ করা নীতিনির্ধারক, পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তি দেবে। বর্তমান প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস বুঝতে পারলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নগর উন্নয়নের জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর নীতি তৈরি করতে পারবেন।
মূল কথা
- প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ বাসিন্দা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর
- ৩ কোটি ৭০ লাখ বাসিন্দা নিয়ে বাংলাদেশের ঢাকা দ্বিতীয়; এরপর রয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ বাসিন্দার জাপানের টোকিও
- বিশ্বজুড়ে শহরের পরিমাপে আরও সামঞ্জস্য আনতে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্যাটেলাইটভিত্তিক নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে
- বিশ্বের বৃহত্তম ১০ শহরের ৯টি এশিয়া মহাদেশে; বৈশ্বিক মেগাসিটি তালিকায় এশিয়ার আধিপত্য
- মেগাসিটির সংখ্যা ১৯৭৫ সালের ৮টি থেকে চার গুণ বেড়ে ২০২৫ সালে ৩৩টিতে দাঁড়িয়েছে
- পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে ৫ কোটি ২১ লাখ বাসিন্দা নিয়ে ঢাকা হবে বিশ্বের বৃহত্তম শহর
- ২০৫০ সালে টোকিওর জনসংখ্যা কমে ৩ কোটি ৭ লাখে দাঁড়াবে এবং বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম স্থানে নেমে যাবে
- বিশ্বজুড়ে ছোট ও মাঝারি শহরে মেগাসিটির তুলনায় বেশি মানুষ বাস করেন এবং এসব শহর দ্রুত বাড়ছে
- বর্তমান ৩৩টির তুলনায় ২০৫০ সালে বিশ্বে মেগাসিটির সংখ্যা বেড়ে ৩৭টিতে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস
- আদ্দিস আবাবা, দার এস সালাম, হাজিপুর ও কুয়ালালামপুরের মতো শহর মেগাসিটির তালিকায় যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে






