ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের উচ্চাভিলাষী সবুজ কৌশল
নগর পরিবহন নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে হো চি মিন সিটি। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে পেট্রোলচালিত যান নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। রাজধানী হ্যানয়েও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বায়ুদূষণের গুরুতর সমস্যা মোকাবিলা এবং পরিবহন অবকাঠামো আধুনিকায়নে ভিয়েতনামের বৃহত্তম মহানগরীর এটি একটি বড় উদ্যোগ।
সূচিপত্র
বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যসহ একটি রূপরেখা তৈরি করেছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৭ সালের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও রাইড-হেইলিং চালকদের ব্যবহৃত মোটরবাইকের ৫০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য রয়েছে শহরটির; ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নির্ধারিত স্বল্প-নির্গমন এলাকায় ব্যস্ত সময়ে পেট্রোলচালিত যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। শহর-সমর্থিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জুলাইয়ে এসব পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং ২০২৮ সালে বিধিনিষেধ আরও কঠোর করার সুপারিশ করেছিল।
শহরের দক্ষিণাংশের ক্যান জিও জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এসব এলাকা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ট্রাক চলাচল বেশি হওয়ায় এলাকাটি বেছে নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ের পর ২০২৭ সালে বিধিনিষেধ শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় সম্প্রসারিত হবে। নতুন নিয়ম কার্যকর করতে মহানগর কর্তৃপক্ষ সড়কের ক্যামেরা ব্যবহার করে নিষিদ্ধ এলাকায় অবৈধভাবে প্রবেশকারী চালকদের শনাক্ত ও জরিমানা করার পরিকল্পনা করেছে।
এই পরিবর্তনে সহায়তার জন্য ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। শপিং মলের মতো কৌশলগত স্থানে ১,৩৩৮টি চার্জিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে শহর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, অফিস, হাসপাতাল, পার্কিং লট ও বাসস্টেশনের ১০০ শতাংশে চার্জ দেওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমাতে এবং প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের যান থেকে বৈদ্যুতিক বিকল্পে যেতে বাসিন্দাদের উৎসাহিত করতে এই অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
পেট্রোলচালিত মোটরবাইক বদলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ
ভিয়েতনামে পেট্রোলচালিত যান নিষিদ্ধ করা এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ। দেশটিতে মোটরবাইকের মালিকানার হার বিশ্বের সর্বোচ্চগুলোর মধ্যে একটি; জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশের একটি করে মোটরবাইক রয়েছে। এসব দুই চাকার যানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই পেট্রোলচালিত। হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য লাখ লাখ মানুষ মোটরবাইকের ওপর নির্ভর করেন। ফলে এগুলোর ব্যবহার সীমিত করা অত্যন্ত সংবেদনশীল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়।
নতুন কঠোর বিধিনিষেধের অন্যতম প্রধান কারণ ভিয়েতনামের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের অবনতি। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়েছে যে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণকারী সুইস প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির শুরুতে জরিপ করা ১২৬টি শহরের মধ্যে দূষণের দিক থেকে হ্যানয়ের অবস্থান ছিল দশম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরের অনাকাঙ্ক্ষিত তকমাও পেয়েছে শহরটি। একই তালিকায় ৩৩তম স্থানে থেকে খুব বেশি ভালো অবস্থানে ছিল না হো চি মিন সিটিও।
এই দূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব ব্যাপক এবং ব্যয়বহুল। শিক্ষাবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বায়ুদূষণজনিত হাঁপানির চিকিৎসায় ভিয়েতনামের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪২২ বিলিয়ন ডং, যা প্রায় ১৬ মিলিয়ন ডলারের সমান। শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার মানবিক মূল্যসহ এই আর্থিক বোঝা যানবাহনের নির্গমন কমাতে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে সরকারকে উৎসাহিত করেছে।
তবে এই পরিবর্তনের পথে বড় বাধাও রয়েছে। হো চি মিন সিটির কিছু আবাসিক ভবনে ব্যাটারিতে আগুন লাগার আশঙ্কায় বৈদ্যুতিক যানবাহন নিষিদ্ধ করা শুরু হয়েছে, যা এক ধরনের পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করার সরকারি নীতির সঙ্গে এর বিরোধ রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের জন্য ২০২৪ সালে তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক যানবাহনে পেট্রোলচালিত যানের তুলনায় আগুন লাগার ঝুঁকি আসলে কম বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই তথ্য থাকা সত্ত্বেও ভয় ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে আছে, ফলে সবুজ উদ্যোগে অংশ নিতে চাওয়া বাসিন্দাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হোয়াং থান তুয়েন ভিএনএক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এই বিরোধ তুলে ধরেন, যেটিতে শত শত মন্তব্য এসেছে। তিনি বলেন, অনেক মানুষ পরস্পরবিরোধী নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছেন। সরকার সড়কে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দিলেও ভবন ব্যবস্থাপকরা পার্কিং এলাকায় সেগুলো নিষিদ্ধ করছেন। তুয়েনের যুক্তি, ব্যবহার বাড়াতে কর্তৃপক্ষের এমন সমন্বিত নীতি দরকার, যা শুধু সড়ক নয়, ভবনও অন্তর্ভুক্ত করবে। তিনি অ্যাপার্টমেন্টে চার্জিং অবকাঠামোর বাধ্যতামূলক মানদণ্ড এবং পুরোনো ভবন উন্নীত করার পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। এসব পরিবর্তন না হলে ভবন ব্যবস্থাপকদের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করাই সবচেয়ে সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি সতর্ক করেন। এতে চালকদের জীবন কঠিন হবে, যারা “সঠিক কাজটি করতে চান, কিন্তু পারেন না”।
জাতীয় নীতি ও হ্যানয়ের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সংযোগ
হো চি মিন সিটির পরিকল্পনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়। প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিনের নেতৃত্বে নেওয়া বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের অংশ এটি। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা ২০ জারি করেন, যা দেশের বাকি অংশের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে হ্যানয়ের রিং রোড ১-এর ভেতরে সব জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত মোটরবাইকের চলাচল নিষিদ্ধ হবে। ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোকে ঘিরে রেখেছে, যার মধ্যে হোয়ান কিয়েম ও বা দিন রয়েছে।
হ্যানয়ের এই নিষেধাজ্ঞার প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ চালক প্রভাবিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত মোটরবাইকের বয়স যা-ই হোক, সেগুলোর জন্য কোনো ছাড়ের পরিকল্পনা নেই। বৈদ্যুতিক বাইক, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন চলাচল করতে পারবে। ভোক্তাদের ওপর প্রভাব কমাতে ৫৯০ ডলারের বেশি দামের বৈদ্যুতিক যানবাহনে ১২০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। হ্যানয়ের সময়সীমা বেশ উচ্চাভিলাষী। ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে নিষেধাজ্ঞা রিং রোড ২-এ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে রিং রোড ৩-এ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা শহরের মেট্রো ব্যবস্থার নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।
বৈদ্যুতিকরণে এই উদ্যোগ ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণে পৌঁছানোর ভিয়েতনামের অঙ্গীকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে সহায়তা করার অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবেও এই পরিবর্তনকে তুলে ধরেছে সরকার। সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, হ্যানয়ের ৬০ শতাংশ চালক বলেছেন, দাম কমলে এবং চার্জিং অবকাঠামো আরও সহজলভ্য হলে তাঁরা বৈদ্যুতিক যানবাহনে যাবেন।
ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী চিন। জাপানি নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, নির্গমন কমানো একটি বৈশ্বিক বিষয়; উপযুক্ত রূপরেখা ধরে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। চীনের গুয়াংজু ২০০৬ সালে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছিল; সেখান থেকে কিছুটা অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে। তবে ভিয়েতনামের কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের শহরের সড়ক পরিষ্কার করার লক্ষ্যেই স্বাধীনভাবে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনাটি বাস্তবায়নযোগ্যতা ও সময়সীমা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত স্বল্প সময়ের মধ্যে শহর এমন ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। সমালোচকেরা গণপরিবহনের সীমিত সুযোগ, বিদ্যুৎ গ্রিডের অসম সক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর অভাবের কথা বলছেন। এ ছাড়া, লাখ লাখ চালককে শহরের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়ার লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো গুয়েন খাক জিয়াং পরিস্থিতিটিকে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “সামগ্রিক চিত্র দেখলে পরিস্থিতি একেবারেই বিশৃঙ্খল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা সত্যিই কঠিন।” ২০২৩ সালের গ্রীষ্মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন হ্যানয় ও আশপাশের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বিদ্যুৎবিভ্রাট দেখা দিয়েছিল, কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। জিয়াং সতর্ক করেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এত দ্রুত সবুজ রূপান্তর ভিয়েতনামের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
শিল্প খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব
পেট্রোলচালিত যানবাহন থেকে সরে আসার এই পরিবর্তনে গাড়ি শিল্পে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে ভিয়েতনামের বাজারে দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখা নির্মাতাদের জন্য। জাপানি প্রতিষ্ঠান হোন্ডার হাতে বর্তমানে ভিয়েতনামের ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের মোটরবাইক বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ। ২০২৪ সালে দেশটিতে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ লাখ ইউনিট বিক্রি করেছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার পর আগস্টে ভিয়েতনামে হোন্ডার বিক্রি আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায়; আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পতন ছিল ১৩ শতাংশ।
নীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে প্রচলিত নির্মাতারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। হোন্ডা ও ইয়ামাহা এবং সুজুকিসহ অন্যান্য মোটরবাইক নির্মাতারা পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত বলে সমালোচনা করে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। বিদেশি নির্মাতাদের আধিপত্য থাকা শিল্প সংগঠন ভিয়েতনাম অ্যাসোসিয়েশন অব মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারার্সের যুক্তি, প্রস্তুতির জন্য বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় দরকার। তারা ধাপে ধাপে এগোনোর সুপারিশ করেছে: পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে পুরোনো ও বেশি নির্গমনকারী যানবাহনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। সংগঠনটি সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত দ্রুত এগোলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারাতে পারে এবং বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি হঠাৎ তলানিতে নেমে যেতে পারে।
ভিয়েতনামে কারখানা, ডিলার ও সরবরাহকারীদের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানে সহায়তা করে হোন্ডা। আইকন ই:র মতো নিজেদের বৈদ্যুতিক মডেল বাজারে আনলেও দেশটিতে তাদের বিক্রির ৯৯ শতাংশই এখনো পেট্রোলচালিত যান। কারখানা বন্ধ না করার অঙ্গীকার করে পণ্যের সারি বৈদ্যুতিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি; তবে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তাদের স্পষ্টতই লড়াই করতে হচ্ছে। জাপানের দূতাবাসও এ বিষয়ে মত দিয়েছে। অক্টোবরে তারা সতর্ক করে বলেছে, কারখানা বন্ধ ও দেউলিয়াত্ব এড়াতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জরুরি।
অন্যদিকে, এসব নীতি থেকে দেশীয় নির্মাতাদের উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভিয়েতনামের বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ভিনগ্রুপের গাড়ি নির্মাণ শাখা ভিনফাস্টের বিক্রি বেড়েছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভিনফাস্টের বিক্রি ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৭০ হাজার ইউনিটে দাঁড়ায়। সাশ্রয়ী স্কুটার থেকে উচ্চমূল্যের মডেল পর্যন্ত নানা ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পাশাপাশি, এক্সান এসএম নামের রাইড-হেইলিং প্ল্যাটফর্মে যানবাহন সরবরাহ করে তারা, যেটিতে শুধু ভিনফাস্টের গাড়ি ও মোটরবাইক ব্যবহার করা হয়।
দাত বাইক, পেগা ও সেলেক্স মোটরসের মতো অন্যান্য ভিয়েতনামি কোম্পানিও এগিয়ে আসছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দাত বাইক শুরুতে রোডস্টার-ধাঁচের নকশা দিয়ে তরুণ ক্রেতাদের লক্ষ্য করেছিল; তবে সম্প্রতি মূলধারার স্কুটার বাজারের দিকে ঝুঁকেছে। সেলেক্স মোটরস বিশেষভাবে ডেলিভারি ও রাইড-হেইলিং সেবার উপযোগী দুই চাকার যান তৈরি করে। বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাজারে জায়গা করে নেওয়ার কৌশল হিসেবে এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই বৈদ্যুতিক যান তৈরি করেছে।
অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ
সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হলেও লাখ লাখ বৈদ্যুতিক যানবাহন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব অবকাঠামো এখনো গড়ে তোলা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে চার্জিং স্টেশনের সহজলভ্যতা ও বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতার ওপর। ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তর ঘটলে বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়বে, বর্তমান অবকাঠামো তা সামাল দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক হান নগুয়েন বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “প্রতিদিন ৬০ লাখ যানবাহনে চার্জ দেওয়ার কথা ভাবলে যথেষ্ট উদ্বেগ হয়। এতে ভিয়েতনামের বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বড় চাপ পড়তে পারে; বিশেষ করে গরমের মাসগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়মিত থাকে না।” উত্তর ভিয়েতনামে বিদ্যুৎ সরবরাহের অস্থিতিশীলতা সুপরিচিত সমস্যা। ফলে লাখ লাখ যানবাহনে একই সময়ে চার্জ দেওয়ার সম্ভাবনা একটি কঠিন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে, বিপুলসংখ্যক চার্জিং স্টেশনের প্রয়োজনও বড় বিষয়। হো চি মিন সিটি ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ২০২৮ সালের মধ্যে ৩,০০০টি পাবলিক চার্জিং ও ব্যাটারি বদলানোর স্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে চার্জিং অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতাও থাকবে। তবে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ ও সমন্বয় প্রয়োজন।
এই অবকাঠামো নির্মাণেও নিয়ন্ত্রক ও বাস্তব নানা বাধা রয়েছে। স্থাপনার জন্য জমি ও অনুমতি পাওয়া জটিল প্রক্রিয়া। গ্রিডের সক্ষমতা ব্যবস্থাপনা এবং চার্জিংয়ের মানসম্মত পদ্ধতি নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, যেগুলোর সমাধান জরুরি। চার্জিং স্টেশন ব্যবসায় বিনিয়োগকারীদেরও লাভজনকতা নিশ্চিত করতে হবে, যা নির্ভর করে ব্যবহার, বিদ্যুতের খরচ ও মূল্য নির্ধারণের কৌশলের ওপর। নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য চার্জিং নেটওয়ার্ক না থাকলে বৈদ্যুতিক যানবাহন গ্রহণে ভোক্তাদের আগ্রহ থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গড় নাগরিকের জন্য বৈদ্যুতিক যানবাহনে পরিবর্তনের খরচও আরেকটি বড় বাধা। নিবন্ধন ফি মওকুফ এবং আনুমানিক ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং ভর্তুকির মতো আর্থিক সহায়তা প্রস্তাব করেছে সরকার। তবু প্রাথমিক খরচ অনেক বেশি। একটি বৈদ্যুতিক বাইকের দাম সাধারণত প্রায় ১,০০০ ডলার; এমন একটি দেশে এটি বড় অঙ্ক, যেখানে মাসিক গড় আয় প্রায় ২৫০ ডলার। রাইড-হেইলিং ও ডেলিভারি সেবায় কর্মরত কয়েক হাজার মানুষসহ স্বল্প আয়ের ব্যক্তিদের জন্য আরও উল্লেখযোগ্য সহায়তা না থাকলে এই খরচ বহন করা কঠিন।
এই আর্থিক চাপের কারণে নিষেধাজ্ঞায় দরিদ্র মানুষ অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হ্যানয়ের এক গ্র্যাব চালক গিগ অর্থনীতির অনেক কর্মীর মনোভাব তুলে ধরে বলেন, সংসারের খরচ চালানো এমনিতেই কঠিন। ওই চালকের ভাষ্য, কিছু চালক মৌলিক খাবারের খরচ মেটাতে বা পরিবার চালাতেও যথেষ্ট আয় করতে পারেন না। নতুন যানবাহন কেনার সম্ভাবনা তাঁদের আগে থেকেই অনিশ্চিত আর্থিক অবস্থায় আরও উদ্বেগ যোগ করছে।
নগর পরিবহনের ভবিষ্যৎ পথ
হ্যানয়ের জন্য ২০২৬ সালের সময়সীমা এগিয়ে আসছে এবং হো চি মিন সিটির জন্য ২০২৭ সাল ঘনিয়ে আসছে। এ অবস্থায় সরকারকে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। দূষণ কমানোর জরুরি প্রয়োজনের পাশাপাশি সাশ্রয়ী ও নমনীয় পরিবহনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে কর্মকর্তাদের। অবকাঠামো, ব্যয় ও জনসমর্থনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতার ওপরই এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।
শহরের নির্দেশনা ও ভবনের নিয়মের মধ্যে বিরোধ থেকে যে নিয়ন্ত্রক ঘাটতি সামনে এসেছে, তা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করেছেন। এইচপিএল অ্যান্ড পার্টনার্স আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক দাং থি থুই হুয়েন বলেন, বর্তমান আইনে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ব্যবস্থাপনাকে বৈদ্যুতিক যানবাহন নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেওয়ার কোনো বিধান নেই। তাঁর যুক্তি, এ ধরনের চর্চা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরকে সমর্থন করার জাতীয় প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। অগ্নিনিরাপত্তার উদ্বেগ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের মালিকদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে নিয়ম স্পষ্ট করার আহ্বান জানাচ্ছেন আইনজীবী ও বাসিন্দারা।
নতুন নিয়মের আশঙ্কায় গাড়ির বাজারে ইতিমধ্যেই পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, নিষিদ্ধ এলাকায় থাকা মালিকেরা যানবাহনের মূল্য কমে যাওয়ার বা সেগুলো ব্যবহার অবৈধ হয়ে পড়ার আগেই বিক্রি করতে চাইবেন; ফলে ব্যবহৃত পেট্রোলচালিত মোটরবাইকের বিক্রি বাড়তে পারে। একই সময়ে বৈদ্যুতিক মোটরবাইকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যদিও খরচ ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় ব্যবহার এখনো কম।
ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেড ম্যাগাজিনের কারটাইমস বিভাগের প্রধান এবং গাড়ি শিল্প বিশ্লেষক দাত বিশ্বাস করেন, বাজার কয়েকটি ধাপে বদলাবে। স্বল্প মেয়াদে ভিনফাস্টের মতো নির্মাতারা লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, আর প্রচলিত পেট্রোলচালিত যান নির্মাতাদের বাড়তি মজুত সামলাতে দ্রুত মানিয়ে নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা বাইরের রিং রোডগুলোতে সম্প্রসারিত হলে বৈদ্যুতিক পরিবহনে রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকতে না পারা পরিবেশকেরা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন; অন্যদিকে, শহরের ভোক্তারা ক্রমেই বৈদ্যুতিক যানবাহনকে স্বাভাবিক পছন্দ হিসেবে দেখবেন।
শেষ পর্যন্ত, ভিয়েতনামে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তর কেবল ইঞ্জিন বদলের বিষয় নয়। এটি নগর পরিবেশ ও অর্থনীতির গভীর পুনর্গঠন। নির্মল বায়ু ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে সবাই একমত হলেও সেখানে পৌঁছানোর পথ জটিলতায় ভরা। আগামী মাস ও বছরগুলোতে ভিয়েতনামের অবকাঠামোর সক্ষমতা, শিল্পের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং নাগরিকদের ধৈর্যের পরীক্ষা হবে।
মূল বিষয়গুলো
- বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৭ সালের মধ্যে হো চি মিন সিটির কেন্দ্রীয় এলাকায় পেট্রোলচালিত যান নিষিদ্ধের পরিকল্পনা রয়েছে।
- সরকারি কর্মকর্তা ও রাইড-হেইলিং সেবায় ব্যবহৃত মোটরবাইকের ৫০ শতাংশ ২০২৭ সালের মধ্যে এবং ১০০ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য রয়েছে।
- ক্যান জিও জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প-নির্গমন এলাকা চালুর পর তা শহরের কেন্দ্রে সম্প্রসারিত হবে।
নিষিদ্ধ এলাকায় অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের জরিমানা করতে সড়কের ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
বায়ুদূষণ এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি; সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ছিল হ্যানয়।
বর্তমান বাজারে হোন্ডার আধিপত্য থাকলেও বৈদ্যুতিক মডেলের দিকে ঝোঁক বাড়ায় তাদের বিক্রি কমছে।
সরকারি নীতির প্রতিক্রিয়ায় ভিনফাস্টের মতো দেশীয় ব্র্যান্ড দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
অগ্নিনিরাপত্তার আশঙ্কায় কিছু অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বৈদ্যুতিক যান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা সরকারি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই উদ্যোগ ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণে পৌঁছানোর ভিয়েতনামের বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ।






