ঐতিহাসিক ফাটলের সূচনা
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় ছিল, যা এশিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৩৩ সালের মৈত্রী ও বাণিজ্য চুক্তির সময় থেকে এই সম্পর্কের সূচনা, যখন থাইল্যান্ডের পরিচিতি ছিল সিয়াম নামে। শীতল যুদ্ধের সময়ে ১৯৫৪ সালের ম্যানিলা চুক্তির মাধ্যমে জোটটি আরও সুদৃঢ় হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থাইল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র ও মার্কিন অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। ২০০৩ সালে দেশটি মেজর নন-ন্যাটো মিত্রের মর্যাদা পায়। তবে আজ বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, একসময়কার এই অটুট অংশীদারত্বের অবনতি ঘটছে। ব্যাংকক দ্রুত বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ায় শক্তিশালী নিরাপত্তার ভিত্তি থেকে সম্পর্কটি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যাকে কেউ কেউ ‘কাগুজে বাঘ’ বলে বর্ণনা করছেন।
সূচিপত্র
- ঐতিহাসিক ফাটলের সূচনা
- ২০১৪ সালের অভ্যুত্থান ও কৌশলগত শূন্যতা
- হুমকি সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা
- সামরিক সরঞ্জামে পরিবর্তন ও এফ-৩৫ প্রত্যাখ্যান
- প্রবেশাধিকার ও ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
- ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া কৌশলগত অগ্রাধিকার
- থাইল্যান্ডের ভারসাম্য রক্ষা ও আঞ্চলিক ঝুঁকি সামলানোর কৌশল
- জোটের ভবিষ্যৎ
- মূল কথা
এই কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের পেছনের কারণগুলো জটিল; এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত, থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা। বার্ষিক কোবরা গোল্ড সামরিক মহড়া প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে চললেও ওয়াশিংটন ও ব্যাংককের মধ্যে অন্তর্নিহিত কৌশলগত সংহতি ক্ষয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো প্রবেশাধিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শীতল যুদ্ধের সময় জোটটিকে সংজ্ঞায়িত করা পারস্পরিক আস্থা সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে বাস্তববাদী, লেনদেননির্ভর সম্পর্ককে, যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য থাইল্যান্ড ক্রমেই চীনের দিকে তাকাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক-নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক এমা চানলেট-অ্যাভেরি এই পরিবর্তনের তীব্রতা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ডের মাধ্যাকর্ষণকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের দিকে ঝুঁকে আছে। এই ঝোঁক সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে থাইল্যান্ডকে হারানোর সামরিক ও কৌশলগত পরিণতি গুরুতর।
২০১৪ সালের অভ্যুত্থান ও কৌশলগত শূন্যতা
যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড জোটের আধুনিক ইতিহাসে মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে থাইল্যান্ডের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। জেনারেল প্রায়ুত চান-ওচার ক্ষমতা দখলের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে পিছু হটে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সামরিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেয়। সামরিক জান্তাকে শাস্তি দেওয়া ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই প্রত্যাহার অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করে, যা বেইজিং দ্রুত পূরণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে, নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন রাজনৈতিক সংস্কার বা মানবাধিকারের শর্ত জুড়ে দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লেনদেনে প্রায়ই থাকা উপদেশ ও বিধিনিষেধ ছাড়া অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিয়ে বেইজিং অস্ত্র বিক্রি ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে আসে। লোয়ি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীন থাইল্যান্ডের কাছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে, যা একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রির প্রায় দ্বিগুণ। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও ট্যাংক। এতে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত মেলে, যা এক দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। ওয়াশিংটন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দিতে নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাতে চেয়েছিল, আর বেইজিং কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেয়। থাইল্যান্ডের সামরিক অভিজাতদের কাছে, যাঁরা বহিঃশত্রুর চেয়ে শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন, চীনের প্রস্তাবটি অনেক বেশি আকর্ষণীয় প্রমাণিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা শুধু কূটনৈতিক অবজ্ঞা ছিল না; এটি ছিল কৌশলগত ভুল, যা দীর্ঘদিনের এক মিত্রকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে ঠেলে দেয়।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জ্যাক কুপার উল্লেখ করেন, এই সময়ে দুই দেশের মধ্যে ‘বিচ্ছিন্নতা’র ঝুঁকি ছিল খুব বেশি। ওয়াশিংটন ও ব্যাংককের স্বার্থ আর এক রেখায় ছিল না। যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া কমা, অস্ত্র চুক্তির সংখ্যা হ্রাস এবং থাইল্যান্ডের ঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছিল।
হুমকি সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা
যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের মধ্যে টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে চীন সম্পর্কে তাদের মৌলিকভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। ওয়াশিংটন বেইজিংকে স্থিতাবস্থা বদলাতে চাওয়া শক্তি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে স্পষ্টভাবে চীনকে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দুর্বল করতে চায়। তবে থাইল্যান্ড এই হুমকির ধারণা ভাগ করে না।
এই ভিন্নতার ক্ষেত্রে ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নয়, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের কোনো ভূখণ্ডগত বিরোধ নেই। চীনের সম্প্রসারণবাদকে ব্যাংকক নিজেদের সার্বভৌমত্বের অস্তিত্বগত হুমকি বলে মনে করে না। বরং থাইল্যান্ড চীনকে তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে এমন এক নিরীহ প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে দেখে। অভিন্ন হুমকির ধারণার এই অভাব জোটের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে, যা ঐতিহাসিকভাবে পারস্পরিক নিরাপত্তা-উদ্বেগের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) উল্লেখ করে, চীনের দিকে থাইল্যান্ডের ঝোঁক এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনে থাইল্যান্ডের সম্মতি দেওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। ব্যাংককের এই অনীহার কারণ, বিশাল প্রতিবেশীকে উসকে দেওয়া এড়ানোর চেষ্টা এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে তাকে বিরোধিতায় জড়ানোর চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বেশি সহায়ক মনে করা।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই কৌশলগত দূরত্বকে আরও বাড়িয়েছে। থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী ও রাজতন্ত্রঘনিষ্ঠ অভিজাতরা যুক্তরাষ্ট্রকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের আশঙ্কা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপর ওয়াশিংটনের জোর তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি। অন্যদিকে, চীনকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, যে শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তাকে সম্মান করে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নজরদারি প্রযুক্তির মতো সরঞ্জাম দেয়। ফলে থাই সামরিক বাহিনী বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে ক্রমেই স্বচ্ছন্দ হয়েছে, যা ওয়াশিংটনকে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছে।
সামরিক সরঞ্জামে পরিবর্তন ও এফ-৩৫ প্রত্যাখ্যান
থাইল্যান্ডের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের প্রত্যক্ষ প্রমাণ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্তে। ঐতিহাসিকভাবে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এফ-১৬ যুদ্ধবিমান থেকে এম-৪১ ট্যাংক—থাই সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সরঞ্জামে সজ্জিত ছিল। ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে এই প্রবণতা নাটকীয়ভাবে উল্টে গেছে। চীন এখন থাইল্যান্ডের অস্ত্রের প্রধান উৎস; তারা ভিটি-৪ প্রধান যুদ্ধট্যাংক, ভিএন-১ সাঁজোয়া যান এবং বিতর্কিত ইউয়ান-শ্রেণির সাবমেরিনসহ নানা ধরনের বড় অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহ করছে।
এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সাবমেরিন চুক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ এর মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ড প্রথমবারের মতো সাবমেরিন যুদ্ধ সক্ষমতা অর্জনের পথে পা বাড়ায়। চুক্তিতে নাবিকদের প্রশিক্ষণ ও ১০ বছরের কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি সাত্তাহিপ নৌঘাঁটিতে সাবমেরিন স্থাপনা নির্মাণের কথাও ছিল। এখন এই স্থাপনায় পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির জাহাজ সফর করে, ফলে এমন একটি স্থানে চীন কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির অবস্থান গড়ে তুলতে পারছে, যা আগে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের যাত্রাবিরতির বন্দর ছিল।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থাইল্যান্ডের সর্বোচ্চ আটটি এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান কেনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের অবনতির একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত আসে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্টেলথ বিমানের অন্যতম এফ-৩৫ মার্কিন মহাকাশ প্রযুক্তির শীর্ষ নিদর্শন। এই প্রত্যাখ্যান দুই দেশের মধ্যে আস্থার অবনতির স্পষ্ট বার্তা দেয়। সে সময় থাই বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে স্বীকার করেন, সিদ্ধান্তটিতে চীনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের সম্পর্ক সম্ভবত ভূমিকা রেখেছে।
প্রত্যাখ্যানের পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করেন কুপার। তিনি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এমন উন্নত প্রযুক্তির সংবেদনশীল তথ্য থাই নেতাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন, যাঁরা নিজেদের স্বার্থকে চীনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন। উন্নত মার্কিন প্রযুক্তি হস্তান্তর বা উল্টো প্রকৌশলের মাধ্যমে চীনের হাতে চলে যেতে পারে—এ নিয়ে প্রকৃত আশঙ্কা রয়েছে। আস্থার এই ঘাটতি ভবিষ্যতে সামরিক সহযোগিতার গভীরতা এবং উচ্চ সক্ষমতার সরঞ্জাম বিক্রিকে গুরুতরভাবে সীমিত করে।
প্রবেশাধিকার ও ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
সম্পর্কের টানাপোড়েনের সবচেয়ে কৌশলগত পরিণতিগুলোর একটি হলো থাইল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটিতে সম্ভাব্য প্রবেশাধিকার হারানো, বিশেষ করে উ-তাপাও রয়্যাল থাই নেভি এয়ারফিল্ডে। থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে অবস্থিত উ-তাপাও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রসদকেন্দ্র। এই অবস্থান থেকে অঞ্চলের আরও উত্তরে অভিযান পরিচালনা করা যায় এবং মধ্যপ্রাচ্য ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধে থাইল্যান্ড রসদ সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উ-তাপাও ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। তবে বিশ্লেষকেরা এখন নিশ্চিত যে, তাইওয়ান প্রণালিতে সংঘাত হলে থাইল্যান্ড একই রকম প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানাবে। চানলেট-অ্যাভেরি বলেন, থাইল্যান্ডের চীনের দিকে ঝোঁক আরও দৃঢ় হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশ্বাস পোক্ত হয়েছে যে, এমন পরিস্থিতিতে দেশটি মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে না।
“যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় থাইল্যান্ড জোরালোভাবে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে... এর মানে, যুক্তরাষ্ট্র আর নিজেদের সামরিক বাহিনীর জন্য আগের মতো প্রবেশাধিকারের ওপর নির্ভর করতে পারে না,” বলেন চানলেট-অ্যাভেরি।
এতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য তৈরি হওয়া রসদসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের ওপর জোর দেন কুপার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনার মতো জায়গা খুব বেশি নেই। উ-তাপাও ব্যবহারের সম্ভাবনা হারালে বিশ্বজুড়ে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার রসদসংক্রান্ত দিকগুলো জটিল হয়ে উঠবে, বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালিতে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করার সময়। সিঙ্গাপুরের মতো অন্য অংশীদারদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নির্ভর করতে পারলেও আরও উত্তরে থাইল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান কিছু অনন্য সুবিধা দেয়, যা এখন কার্যত আর কাজে লাগানোর সুযোগ নেই।
ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া কৌশলগত অগ্রাধিকার
থাইল্যান্ড চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও এ অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত অগ্রাধিকার বদলেছে। ২০১১ সালে ওবামা প্রশাসন যখন ‘এশিয়ায় অভিমুখ পরিবর্তন’ ঘোষণা করে, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছিল কৌশলটির কেন্দ্রীয় অংশ। তবে পরে মনোযোগ সরে গেছে পূর্বদিকে, ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’ নামে পরিচিত অঞ্চলের দিকে। জাপান থেকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত এই সামুদ্রিক সীমানার এলাকাগুলোতে চীনের হুমকিকে সবচেয়ে তীব্র বলে মনে করা হয়।
কুপার বলেন, মার্কিন সরকারের সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে অনেক বেশি সীমিত কিছু লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্ব আগের চেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের মতো অংশীদারদের সঙ্গে ‘ক্ষুদ্র বহুপক্ষীয়’ ও ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কোয়াড ও অকাসের মতো এসব জোটে মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রায় নেই বললেই চলে। এর প্রধান ব্যতিক্রম ফিলিপাইন, কারণ দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সঙ্গে দেশটির মুখোমুখি সংঘাত রয়েছে।
মূল ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই আংশিক পিছু হটা একটি প্রতিক্রিয়াচক্র তৈরি করেছে। প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের সামুদ্রিক বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বাড়ায় থাইল্যান্ডের মনে হচ্ছে, তাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; ফলে মার্কিন অগ্রাধিকারের সঙ্গে তাল মেলানোর তাগিদও কমছে। বিপরীতে, থাইল্যান্ড চীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় জোটে বড় বিনিয়োগের মূল্য কম দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলাফল, সম্পর্কটি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং আগের কৌশলগত গতি হারিয়েছে।
থাইল্যান্ডের ভারসাম্য রক্ষা ও আঞ্চলিক ঝুঁকি সামলানোর কৌশল
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলেও থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। পর্যবেক্ষকদের ভাষায় ব্যাংকক এখনো ‘বাঁশ-কূটনীতি’ অনুসরণ করছে—বাতাসের সঙ্গে বেঁকে টিকে থাকার নীতি। একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতাকে থাইল্যান্ড গুরুত্ব দেয়। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কও ধরে রাখতে চায়।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মতে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের তুলনায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা সম্পর্ক এখনো শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত। দুই দেশ এখনো যৌথভাবে কোবরা গোল্ড আয়োজন করে, যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়া। থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। তবে ব্যাংকক কঠোর সমদূরত্বের নীতি মেনে চলে; এমন কোনো শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকতে চায় না, যে তার স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে।
এই ভারসাম্য রক্ষা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এ অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিপুল। বেইজিং থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দেশটির বড় বিনিয়োগকারী। ব্যাংকককে চীনের সঙ্গে যুক্ত করা দ্রুতগতির রেলপথ এবং হুয়াওয়ের ৫জি নেটওয়ার্ক চালুর মতো উচ্চপর্যায়ের প্রকল্পগুলো থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে চীনের সঙ্গে বেঁধে ফেলছে। মেকং নদীতে বাঁধ নির্মাণ বা বাণিজ্য ঘাটতির মতো সাম্প্রতিক টানাপোড়েনও ঘনিষ্ঠতর সংহতির পথে ব্যাংকককে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি।
এ ছাড়া অস্ত্র বিক্রির বাইরেও চীন তার নিরাপত্তা ভূমিকা বিস্তৃত করছে। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘাতের মতো আঞ্চলিক বিরোধে বেইজিং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে এবং দায়িত্বশীল বৃহৎ শক্তির ভাবমূর্তি তুলে ধরে চীন এই অঞ্চলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
জোটের ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড জোটের গতিপথ বলছে, সম্পর্কের শীতলতা অব্যাহত থাকবে। কোনো পক্ষই প্রকাশ্যে বিশৃঙ্খল বিচ্ছেদ চায় না, তবে অংশীদারত্বের কৌশলগত সারবস্তু ফাঁপা হয়ে গেছে। উপস্থিতি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ন্যূনতম পর্যায়ে সম্পর্ক পরিচালনা করবে, তবে চীনের আগ্রাসন মোকাবিলায় থাইল্যান্ডের আগ্রহ সম্পর্কে প্রত্যাশা কমাবে।
থাইল্যান্ডের সামনে এখন ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তাসম্পন্ন চীনের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক সামলে এগোনোর চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাবে; সম্ভবত ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মধ্যম শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিরাপত্তা অংশীদারদের বৈচিত্র্য বাড়ানোরও চেষ্টা করবে। তবে চীনের অর্থনীতির প্রবল আকর্ষণ এবং এই অঞ্চলে মার্কিন অর্থনৈতিক কূটনীতির অভাবের কারণে বেইজিংয়ের বলয় থেকে বেরিয়ে থাকা থাইল্যান্ডের জন্য কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত। তারা হয় দুর্যোগ মোকাবিলা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মতো সীমিত পর্যায়ের সহযোগিতার উপযোগী একটি সীমিত কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে জোটটিকে মেনে নিতে পারে, নয়তো থাইল্যান্ডকে ফেরাতে অনেক বেশি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারে। প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান মনোযোগ এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় প্রথম বিকল্পটিই বেশি সম্ভাব্য। নামমাত্র জোটটি টিকে থাকতে পারে, কিন্তু মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন শক্তির প্রতিরক্ষা-প্রাচীর হিসেবে এর কার্যকারিতা কার্যত শেষ হয়েছে।
মূল কথা
- ১৮৩৩ ও ১৯৫৪ সাল থেকে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড জোট কৌশলগত স্বার্থের অমিল এবং চীনের দিকে থাইল্যান্ডের ঝোঁকের কারণে অবনতির মুখে পড়েছে।
- ২০১৪ সালে থাইল্যান্ডের সামরিক অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে তৈরি হওয়া শূন্যতা চীন অস্ত্র বিক্রি ও নিঃশর্ত সহায়তার মাধ্যমে পূরণ করে।
- চীন এখন থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তারা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে, যার মধ্যে ট্যাংক ও সাবমেরিন রয়েছে।
- প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঝুঁকি এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে ২০২৩ সালে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করে।
- তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত হলে উ-তাপাওয়ের মতো কৌশলগত ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার সম্ভাবনা থাইল্যান্ডের কম, যা মার্কিন রসদ সরবরাহের বিকল্প সীমিত করে।
- যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগ সরে গেছে ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল’—জাপান, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের দিকে। ফলে মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
- কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে থাইল্যান্ড; এ নীতিই ‘বাঁশ-কূটনীতি’ নামে পরিচিত।






