ঐতিহাসিক পতন
একসময় দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির সাফল্যের স্বর্ণমান হিসেবে বিবেচিত ভিয়েতনামের ড্রাগন ফল শিল্প ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত দশকের শীর্ষে থাকা শতকোটি ডলারের আয় থেকে এই নাটকীয় পতন কৃষক ও রপ্তানিকারকদের সামনে কঠিন এক নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ভিয়েতনাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরের প্রথম ১১ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে মাত্র ৪৮৫.২ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় এই অঙ্ক ০.৮% কম এবং ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের সময়ের সঙ্গে এই পতনের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে; ওই সময় শিল্পটি নিয়মিত বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করত, ২০১৮ সালে যা সর্বোচ্চ ১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ভাগ্যের এই পরিবর্তন বৈশ্বিক কৃষিপণ্যের বাজারে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে ভিয়েতনাম আর আগের মতো নিরঙ্কুশ আধিপত্য ধরে রাখতে পারছে না।
সূচিপত্র
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ
ভিয়েতনামের ড্রাগন ফলের একক বৃহত্তম গন্তব্য এখনো চীন। মোট রপ্তানির প্রায় ৬২% যায় দেশটিতে, যার মূল্য ৩০১.৭ মিলিয়ন ডলার। তবে এই বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ধরনের দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী চীন নিজস্ব উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোয় দেশটিতে ভিয়েতনামের রপ্তানি বছরওয়ারি ৪.৫% কমেছে। চীনা কৃষকেরা এখন বছরে আনুমানিক ১.৬ মিলিয়ন টন ড্রাগন ফল উৎপাদন করেন, যা ভিয়েতনামের উৎপাদনের চেয়ে বেশি এবং চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বেশির ভাগ মেটানোর জন্য যথেষ্ট। স্থানীয় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় আমদানির প্রয়োজন ব্যাপকভাবে কমেছে এবং দামও নেমেছে। চীনা বাজারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাল শাঁসের ড্রাগন ফলের দাম কেজিপ্রতি ০.৪২ ডলারে নেমে এসেছে। অতিরিক্ত সরবরাহ ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদারই প্রতিফলন এটি। চীন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠায় ভিয়েতনামের পণ্যের প্রধান বাজার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
উত্তর আমেরিকার বাজার হারানো
চীনে চাহিদা কমার পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার তীব্র প্রতিযোগিতায় পশ্চিমা বাজারেও অবস্থান হারাচ্ছে ভিয়েতনাম। মেক্সিকো সফলভাবে ড্রাগন ফলের চাষ বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভৌগোলিক নৈকট্য কাজে লাগিয়ে এসব লাভজনক বাজারে ভিয়েতনামের পণ্যকে অনেকটাই হটিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ভাষ্য, ২০১০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম থেকে উত্তর আমেরিকায় সাদা শাঁসের ড্রাগন ফল সহজেই রপ্তানি করা যেত। তবে ২০১৯ সাল থেকে মেক্সিকো উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সাদা শাঁসের ড্রাগন ফল রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করেছে ভিয়েতনাম; লাল শাঁসের জাতের জন্য কেবল ছোট একটি বিশেষায়িত বাজার ধরে রেখেছে। কম পরিবহন ব্যয় ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কতটা কঠিন, এই বাজার হারানো তা স্পষ্ট করে।
ভারতের বাজারে সম্ভাবনা
বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকেরা ভারতের দিকে নজর দিয়েছেন। এই বাজারে রপ্তানি ৬.৪% বেড়ে প্রায় ৪১.৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডেও আমদানি ৭১.১% বেড়েছে। তবে শিল্প বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, চীনের চাহিদায় বড় পতনের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার মতো বড় নয় এই উদীয়মান বাজারগুলো। ভারতের বাজারেও রয়েছে নিজস্ব কিছু জটিলতা। অ্যাঞ্জেল ফাইন ফুডস কোম্পানি লিমিটেডের বিজনেস হেড বিবেক আগরওয়াল বলেন, ভিয়েতনাম এখনো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হলেও মুনাফার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্য।
“ভারতে মুনাফার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্য। ক্রেতারা নিয়মিত আমদানি চালিয়ে গেলেও তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে লাভের নিশ্চয়তা নেই,” বলেন আগরওয়াল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রতিযোগিতা শুধু অন্য রপ্তানিকারকদের কাছ থেকেই আসছে না; ভারতের নিজস্ব ড্রাগন ফল উৎপাদনও বাড়ছে। ফসল তোলার মৌসুমে উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি মাসে ২০০ কনটেইনার থেকে দ্রুত কমে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টিতে নেমে আসে।
পরিবহন ও দামের চাপ
সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে ভারতের প্রধান বন্দরগুলোতে পণ্য পৌঁছাতে এখন প্রায় ৯ থেকে ১৩ দিন লাগে, আগে পরোক্ষ পথে লাগত ২৫ দিন। এতে ফলের সতেজতা ও মান বজায় রাখা সহজ হয়। পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি সত্ত্বেও দাম এখনো বড় বাধা। আগের বছরের তুলনায় আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে সিআইএফ নাভা শেভার দাম ২৫% কমেছে। আগরওয়ালের মতে, আমদানিকারকদের মুনাফা ধরে রাখতে ভারতে খুচরা দাম সমন্বয় করা জরুরি। বর্তমানে ভারতে খুচরা দাম প্রতি পিস ০.৭ থেকে ১.১ ডলার; অন্যদিকে ভিয়েতনামে কৃষকেরা প্রতি বাক্সে প্রায় ৫.৫ থেকে ৬.৫ ডলার পান। বিদেশে ভোক্তাদের দাম বেশি হলেও কৃষকদের আয় কম থাকার ইঙ্গিত দেয় এই ব্যবধান।
প্রশাসনিক ও মানগত বাধা
বাজারে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ভিয়েতনামের রপ্তানিকারকেরা প্রশাসনিক জটিলতা ও মান নিয়ন্ত্রণের গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। ২০২৫ সালের জুনে আগের মাসের তুলনায় ড্রাগন ফল রপ্তানি ৫৩% কমে যায়। বিন থুয়ান ড্রাগন ফ্রুট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হুইন কান এই পতনের জন্য প্রতিকূল আবহাওয়াকে দায়ী করেন। আবহাওয়ার কারণে ছত্রাকজনিত রোগ ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে, ফলে অনেক চালান মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ ছাড়া সরকারি আমলাতন্ত্রে পরিবর্তনের কারণে ইউরোপগামী চালান ছাড় করাতে জট তৈরি হয়।
“২৫ জুলাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকায় ১০০ টনের বেশি ড্রাগন ফল নষ্ট হয়েছে; আরও ৫০ থেকে ৭০ টন তখনো সনদের অপেক্ষায় ছিল,” প্রশাসনিক বিলম্ব প্রসঙ্গে বলেন কান।
সরকারের নতুন এক পরিপত্র থেকে এই বিলম্বের সূত্রপাত। ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া পরিপত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা সনদ দেওয়ার দায়িত্ব শস্য উৎপাদন বিভাগ থেকে প্রাদেশিক পিপলস কমিটিগুলোর হাতে ন্যস্ত করা হয়। একই সময়ে প্রদেশগুলোর বড় ধরনের একীভবন চলায় সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। রপ্তানিকারকেরা জানান, প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ নতুন দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে চালানগুলোকে ১০ দিন পর্যন্ত হিমাগারে আটকে থাকতে হয়েছে। ইইউর কঠোর উদ্ভিদ-সঙ্গনিরোধ মানদণ্ডের কারণে এই বিলম্বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্ট হয়েছে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই জট নিরসনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ বিঘ্ন বর্তমান রপ্তানি অবকাঠামোর নাজুকতা তুলে ধরেছে।
টিকে থাকার কৌশলগত পরিবর্তন
শিল্প খাতের নেতারা একমত যে ব্যাপক উৎপাদনের পুরোনো মডেল আর কার্যকর নয়। ভিয়েতনাম ফল ও সবজি সমিতির মহাসচিব ডাং ফুক নগুয়েনের মতে, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাজার এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে নতুন করে মৌলিক মূল্যায়ন করতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে পরিমাণের বদলে পণ্যের মূল্যে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো আবহাওয়াজনিত ঘাটতির মুখে পড়লে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মৌসুমের বাইরের সময়ে উৎপাদনের অংশ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বেশি দাম পাওয়া যায় এবং সাদা শাঁসের ফলের তুলনায় প্রতিযোগিতার ধরন ভিন্ন—এমন লাল শাঁসের জাতের প্রচারও আরেকটি সুপারিশ। পাশাপাশি জুস, ওয়াইন ও শুকনো নাশতার মতো পণ্য তৈরির জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুললে তাজা ফলের বাজারের ওপর চাপ কমবে এবং অপচয়ও হ্রাস পাবে।
টেকসই উৎপাদনের পথে
দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য টেকসই কৃষিচর্চার প্রতিশ্রুতিও প্রয়োজন হতে পারে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং ভিয়েতনামের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয় কম-কার্বন নির্গমনকারী, জলবায়ু সহনশীল কৃষির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খামার ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং কৃষক, সমবায় ও পরিবেশকদের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলা। স্বচ্ছতা ও পণ্যের উৎস অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে ভিয়েতনামের উৎপাদকেরা টেকসই খাদ্যের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন। এতে পরিবেশবান্ধব পণ্যের সনদ পাওয়া পণ্যের জন্য বেশি দাম দিতে আগ্রহী বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।
সারকথা
ভিয়েতনামের ড্রাগন ফল শিল্প এখন সন্ধিক্ষণে। একটি মাত্র বাজারনির্ভর সহজ প্রবৃদ্ধি ও শতকোটি ডলারের আয়ের দিন শেষ। পুনরুদ্ধারের জন্য এই খাতকে চীন ও মেক্সিকোর মতো দেশের তীব্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার বাধাগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।
- সাম্প্রতিক বছরের প্রথম ১১ মাসে ভিয়েতনামের ড্রাগন ফল রপ্তানি কমে ৪৮৫.২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন।
- বৃহত্তম বাজার চীন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ১.৬ মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর পর আমদানি ৪.৫% কমিয়েছে।
- ভৌগোলিক নৈকট্যের সুবিধায় সাদা শাঁসের ড্রাগন ফলের উত্তর আমেরিকার বাজারে ভিয়েতনামকে হটিয়ে দিয়েছে মেক্সিকো।
- ভারতে রপ্তানি ৬.৪% বেড়েছে, তবে প্রতিযোগিতা ও সিআইএফ দামের পতনে মুনাফার ওপর চাপ রয়ে গেছে।
- খাদ্যনিরাপত্তা সনদের প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে ইইউতে রপ্তানির অনুমতির অপেক্ষায় হিমাগারে ১০০ টনের বেশি ফল নষ্ট হয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য মান, মৌসুমের বাইরের সময়ে উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা।






