ইন্দোনেশীয় প্রবাসীদের জন্য নতুন পথ
ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়া (GCI) কর্মসূচি চালু করেছে। সাবেক নাগরিক ও ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিতে নেওয়া এই যুগান্তকারী উদ্যোগে সম্প্রতি আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ায় এর বিকল্প হিসেবে কর্মসূচিটি অনির্দিষ্টকালের বসবাসের অনুমতি দিচ্ছে। এই পদক্ষেপ ইন্দোনেশিয়ার অভিবাসন নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এর লক্ষ্য, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এবং মেধাপাচারের প্রভাব কমানো।
সূচিপত্র
- ইন্দোনেশীয় প্রবাসীদের জন্য নতুন পথ
- গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে জানুন
- কারা আবেদন করতে পারবেন?
- আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় শর্ত
- ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপের সঙ্গে GCI-এর তুলনা
- ধারকদের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
- প্রবাসী সম্প্রদায়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
- অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মেধাপাচার রোধের কৌশল
- সামনে কী: বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তন
- মূল বিষয়গুলো
GCI-এর আওতায় যোগ্য বিদেশি নাগরিকেরা নির্দিষ্ট সময় পরপর ভিসা নবায়ন ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল ইন্দোনেশিয়ায় বসবাস ও কাজ করতে পারবেন। স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি মর্যাদা দিয়ে সরকার আশা করছে, বিদেশে থাকা ইন্দোনেশীয়রা দেশে ফিরবেন, বিনিয়োগ করবেন এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখবেন। কর্মসূচিটি ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (OCI) প্রকল্পের আদলে তৈরি। ওই প্রকল্পে ভারতীয় বংশোদ্ভূত লাখ লাখ মানুষকে আজীবন ভিসা দেওয়া হয়েছে।
অভিবাসন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিল সমস্যার কৌশলগত সমাধান হিসেবে কাজ করবে GCI। প্রাপ্তবয়স্কদের দুটি পাসপোর্ট রাখার বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার কঠোর আইন থাকলেও, এই নতুন পথ সেই আইনকে সম্মান জানিয়ে প্রবাসীদের মাতৃভূমির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার একটি অর্থবহ উপায় দিচ্ছে। কর্মসূচিটি শুধু বসবাসের অনুমতির বিষয় নয়; বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ ইন্দোনেশীয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগও এটি।
গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে জানুন
গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনির্দিষ্টকালের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ইন্দোনেশীয় ভাষায় একে বলা হয় KITAP Tanpa Batas Waktu। নামটি দেখে ভুল বোঝার সুযোগ থাকলেও স্পষ্ট করে বলা দরকার, GCI ইন্দোনেশীয় নাগরিকত্ব দেয় না। এর ধারকেরা নিজেদের বিদেশি নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট বজায় রাখেন। এই মর্যাদা দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার দেয়, তবে ভোট দেওয়া বা সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার মতো রাজনৈতিক অধিকার দেয় না।
স্থায়ী বসবাসের এই মর্যাদা সীমিত মেয়াদের ভিসা (ITAS) বা সাধারণ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (ITAP)-এর মতো অন্য ভিসা শ্রেণি থেকে আলাদা। ওই অনুমতিগুলো প্রায়ই চাকরি, বিনিয়োগ বা ইন্দোনেশীয় নাগরিককে বিয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু GCI মূলত বংশপরিচয়, রক্তের সম্পর্ক এবং দ্বীপপুঞ্জটির সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগসূত্রের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। বংশপরিচয়ের ওপর এই গুরুত্ব ইন্দোনেশিয়ার অভিবাসন কাঠামোয় একে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
GCI-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর মেয়াদ। অনুমতিটির মেয়াদ শেষ হয় না, ফলে কয়েক বছর পরপর বসবাসের মর্যাদা নবায়নের আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা থাকে না। ধারকেরা অনির্দিষ্টকালের জন্য একাধিকবার প্রবেশ ও পুনঃপ্রবেশের অনুমতিও (MERP) পান, যার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় অবাধে যাতায়াত করা যায়। MERP নিজে প্রতি পাঁচ বছর পর নবায়ন করতে হলেও মূল বসবাসের মর্যাদা আজীবন বহাল থাকে। ইন্দোনেশীয় শিকড় রয়েছে এমন বিদেশি নাগরিকদের জন্য এটি নজিরবিহীন স্থিতিশীলতা এনে দিচ্ছে।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
GCI-এর যোগ্যতার শর্ত নির্দিষ্ট; ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রকৃত পারিবারিক বা ঐতিহাসিক যোগসূত্র প্রমাণ করতে পারবেন, এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত শ্রেণির বিদেশি নাগরিকদের জন্যই এটি সংরক্ষিত। প্রধান আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ইন্দোনেশীয় নাগরিকেরা, যাঁরা অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার কারণে নিজেদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বা হারিয়েছেন।
সাবেক নাগরিকদের পাশাপাশি তাঁদের বংশধরেরাও এই কর্মসূচির আওতায় পড়েন। এর মধ্যে সাবেক ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা রয়েছেন; সর্বোচ্চ দ্বিতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত এই সুযোগ প্রযোজ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিদেশে বসবাস করলেও যেসব পরিবার নিজেদের ইন্দোনেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মনে করে, তাদের জন্য এই বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ইন্দোনেশীয় নাগরিক ও বিদেশির বিবাহে জন্ম নেওয়া সন্তানেরাও যোগ্য। এতে মিশ্র নাগরিকত্বের পরিবারগুলোর জটিলতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এই নীতিতে স্বামী বা স্ত্রীর জন্যও সুযোগ রাখা হয়েছে। ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের আইনগত স্বামী বা স্ত্রীরা GCI-এর জন্য আবেদন করতে পারেন। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সাবেক ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রীরাও যোগ্য হবেন। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের লক্ষ্য পরিবারগুলোকে একসঙ্গে রাখা, যাতে ইন্দোনেশীয় নন এমন স্বামী বা স্ত্রীরাও তাঁদের ইন্দোনেশীয় সঙ্গী বা বংশধরদের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সুবিধা পান।
তবে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার স্পষ্ট কিছু ব্যতিক্রম রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে ইন্দোনেশীয় ভূখণ্ডের অংশ ছিল, এমন দেশ বা অঞ্চলের বিদেশিরা GCI-এর সুযোগ পাবেন না। বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত বা ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে বিবেচিত কোনো কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও অযোগ্য হবেন। এ ছাড়া বিদেশি দেশে সরকারি কর্মচারী, গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা সামরিক সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন বা করছেন, এমন ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারবেন না।
আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় শর্ত
গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়ার আবেদন অভিবাসন মহাপরিদপ্তর পরিচালিত আনুষ্ঠানিক ই-ভিসা পোর্টালের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। বিশ্বের যেকোনো স্থানে বসবাসরত ইন্দোনেশীয়দের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজলভ্য করাই এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য। ভিসা প্রদান, অনুমতির ধরন পরিবর্তন এবং পুনঃপ্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কাজ এক জায়গায় সম্পন্ন করার জন্য ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে।
যোগ্যতা প্রমাণের জন্য সম্ভাব্য আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট কিছু নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। অন্তত ছয় মাস মেয়াদ অবশিষ্ট আছে, এমন বৈধ পাসপোর্ট প্রয়োজন। সাম্প্রতিক পাসপোর্ট আকারের ছবি এবং জীবনবৃত্তান্তও (CV) দিতে হবে। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যোগসূত্র প্রমাণে সংশ্লিষ্ট নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক নাগরিকদের ক্ষেত্রে পুরোনো ইন্দোনেশীয় পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র (KTP) দেওয়া যেতে পারে। বংশধরদের ক্ষেত্রে বংশপরিচয় প্রমাণে পারিবারিক কার্ড (KK), জন্মসনদ ও বিবাহসনদ দেওয়া যেতে পারে।
আর্থিক সামর্থ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ইন্দোনেশিয়ায় বসবাসের সময় নিজেদের ভরণপোষণের সামর্থ্য আছে, তা আবেদনকারীদের দেখাতে হবে। সাধারণত ন্যূনতম জমার পরিমাণ উল্লেখ করে ব্যাংক বিবরণী অথবা বার্ষিক আয়ের প্রমাণ দিতে হয়। আবেদনকারী সাবেক নাগরিক, নাকি দ্বিতীয় প্রজন্মের বংশধর, তার ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা ভিন্ন হয়।
আবেদনের সঙ্গে আর্থিক দায়ও রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের সরকার নির্ধারিত প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ইন্দোনেশীয় রুপিয়া ফি দিতে হবে। এ ছাড়া দেশের সঙ্গে যোগসূত্রের মাত্রা অনুযায়ী আবেদনকারীদের ইন্দোনেশিয়ায় আর্থিক বিনিয়োগ রাখতে হতে পারে, যেমন বন্ড, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা আমানত। উদাহরণস্বরূপ, সাবেক নাগরিকদের প্রায় ৫ হাজার ডলারের বিনিয়োগ রাখতে হতে পারে, আর দ্বিতীয় প্রজন্মের বংশধরদের ক্ষেত্রে এই সীমা আরও বেশি হতে পারে।
ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপের সঙ্গে GCI-এর তুলনা
ইন্দোনেশীয় সরকার প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে যে GCI ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (OCI) কর্মসূচি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। ২০০৬ সালে চালু হওয়া OCI প্রকল্পটি বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গড়ার কার্যকর উপায় হয়েছে। এটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের আজীবন একাধিকবার প্রবেশের ভিসা দেয়, যার মাধ্যমে তাঁরা অনির্দিষ্টকাল ভারতে যাতায়াত, কাজ ও বসবাস করতে পারেন।
OCI কার্ডধারীরা নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ভারতীয় নাগরিকদের মতোই অধিকার ভোগ করেন। তাঁরা নির্বাচনে ভোট দিতে, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হতে বা কৃষিজমি কিনতে পারেন না। তবে আবাসিক সম্পত্তির মালিক হতে, ব্যাংক হিসাব খুলতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ নিতে পারেন। এ পর্যন্ত ৪০ লাখের বেশি কার্ড দেওয়া হয়েছে, যা ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা তাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধ গড়ে তুলেছে।
GCI-এর ধারণাগত ভিত্তি একই হলেও বিস্তারিত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সমালোচক ও বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ব্যয় ও নির্দিষ্ট কিছু অধিকারের ক্ষেত্রে ভারতীয় মডেলটি প্রায়ই বেশি উদার। উদাহরণস্বরূপ, GCI-এর ফি ও বিনিয়োগের শর্তের তুলনায় OCI আবেদনের খরচ বেশ কম। এ ছাড়া OCI কার্ড ভারতের নাগরিকত্ব আইনের আওতাভুক্ত, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার GCI অভিবাসন বিধিমালার মধ্যে রয়েছে। সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক অধিকারের ক্ষেত্রে এর ফলে আইনি অবস্থানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইন্দোনেশীয় সরকার OCI-কে মানদণ্ড হিসেবে দেখে। কর্মকর্তারা বলেছেন, সময়ের সঙ্গে GCI-কে আরও উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে এর সেবার মান ভারতীয় প্রকল্পের সমান বা তার চেয়েও ভালো হয়। এতে বোঝা যায়, বর্তমান চালু হওয়া কর্মসূচিটি পরিবর্তনশীল নীতির প্রথম ধাপ হতে পারে।
ধারকদের সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য GCI-তে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধা হলো আজীবন বসবাসের নিশ্চয়তা। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ভয় বা স্থানীয় স্পনসর খোঁজার প্রয়োজন ছাড়াই ধারকেরা ইন্দোনেশিয়ায় থাকতে পারবেন। KITAS-এর মতো অন্য ধরনের বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে প্রায়ই স্থানীয় স্পনসর প্রয়োজন হয়। স্বাধীনতার এই সুযোগ দেশে ফিরতে বা দীর্ঘ সময় কাটাতে ইচ্ছুক প্রবাসীদের জন্য বড় আকর্ষণ।
কাজ ও ব্যবসা করার অধিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। GCI ধারকেরা অতিরিক্ত অভিবাসনসংক্রান্ত ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন। এতে পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁরা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ পরিচালনা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হয়ে দূর থেকে কাজ এবং ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।
তবে কর্মসূচিটির কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা সম্ভাব্য আবেদনকারীদের বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। আগেই বলা হয়েছে, GCI ধারকেরা ইন্দোনেশীয় নাগরিকত্ব পান না, তাই ভোট দিতে বা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। চাকরির ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি বেতন পাওয়া যায়, এমন চুক্তিভিত্তিক চাকরি GCI ধারকদের জন্য সীমিত। এর পরিবর্তে তাঁদের চুক্তিবহির্ভূত কাজ, পরামর্শকতা বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা হয়।
সম্পত্তির মালিকানার বিষয়টি জটিল। ইন্দোনেশিয়ার আইন অনুযায়ী, কেবল নাগরিকেরাই হাক মিলিক (Hak Milik) নামে পরিচিত পূর্ণ মালিকানার স্বত্ব রাখতে পারেন। GCI এই মৌলিক নিয়মে পরিবর্তন আনে না। সম্পত্তি আইনের আওতায় ধারকেরা বিদেশি নাগরিক হিসেবেই থাকেন এবং প্রচলিত বিধি মেনে চলতে হয়। সাধারণত তাঁরা হাক পাকাই (Hak Pakai) নামে পরিচিত ইজারাভিত্তিক অধিকার নিতে বা স্তরভিত্তিক মালিকানার অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হতে পারেন। তাঁরা পূর্ণ মালিকানায় জমির মালিক হতে পারেন না। পারিবারিক জমি ফিরে পাওয়ার আশা করা প্রবাসীদের কারও কারও কাছে বিষয়টি বিতর্কের কারণ হয়েছে।
প্রবাসী সম্প্রদায়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
GCI ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে ইন্দোনেশীয় প্রবাসীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কারও কারও কাছে এটি দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক সমস্যার সমাধান এনে দেওয়া একটি স্বাগত উদ্যোগ। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতে ইন্দোনেশীয় নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়েছিল, এমন অলিম্পিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সেতিয়ানা মাপাসা এই কর্মসূচি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, অনির্দিষ্টকালের বসবাসের অনুমতি পেলে পরিবারকে দেখতে যাওয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে আগে যে বাধার মুখে পড়তেন, তা দূর হবে।
অন্যরা এই নীতিকে প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি একধরনের স্বীকৃতি এবং দেশে ফিরতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করেছে। বিদেশে জীবন গড়ে তুললেও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অনুভব করেন, এমন অনেকের কাছে পূর্বপুরুষের দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বড় আকর্ষণ।
অন্যদিকে, প্রবাসীদের একাংশ কর্মসূচিটি নিয়ে সন্দিহান। কিছু সমালোচকের যুক্তি, এর আর্থিক ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য সুযোগটিকে কম সহজলভ্য করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন ইন্দোনেশীয় ফি ও বিনিয়োগের শর্তকে অতিরিক্ত বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, এটি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর উদ্যোগের বদলে রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল।
মিশ্র-বিবাহের পরিবার ও প্রবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। গবেষক ও অধিকারকর্মী নুনিং হ্যালেট কর্মসূচিটির সমালোচনা করে বলেছেন, এটি যথেষ্ট দূর এগোয়নি। তাঁর যুক্তি, বিশেষ করে ব্যয় ও সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে GCI ভারতের OCI-এর সমান সুবিধা দেয় না। হ্যালেটের মতে, প্রকৃত সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সহায়তার বদলে বন্ড ও আমানতের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের ওপর নীতিটিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মেধাপাচার রোধের কৌশল
GCI চালুর পেছনে অর্থনৈতিক কৌশলের গভীর যোগ রয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো ইন্দোনেশিয়াও মেধাপাচারের চ্যালেঞ্জের মুখে। ভালো সুযোগের আশায় দক্ষ পেশাজীবীরা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ থেকে ২০২২ সালেই প্রায় ৪ হাজার ইন্দোনেশীয় সিঙ্গাপুরের নাগরিক হয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে শুরু করে শিল্পকলা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে এই মেধা হারানোর প্রভাব পড়ে।
সরকারি কর্মকর্তারা GCI-কে এই চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করার উপায় হিসেবে তুলে ধরেছেন। মর্যাদাপূর্ণ ও সুবিধাজনক বসবাসের মর্যাদা দিয়ে ইন্দোনেশিয়া দক্ষ পেশাজীবী, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। প্রবাসীরা সশরীরে দেশে ফিরে বা বিদেশ থেকে ইন্দোনেশীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ করে জাতীয় উন্নয়নে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাবেন, এটাই লক্ষ্য।
ইন্দোনেশিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গে এই নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশটিকে বিদেশিদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকার সক্রিয়ভাবে ডিজিটাল সেবা উন্নত করছে এবং নতুন ভিসার শ্রেণি চালু করছে। ধনী অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও ডিজিটাল যাযাবরদের লক্ষ্য করে চালু করা বিনিয়োগকারী ভিসা ও সেকেন্ড হোম ভিসার মতো বিদ্যমান সুযোগের পরিপূরক GCI। সব মিলিয়ে এই উদ্যোগগুলো বিশ্বজুড়ে দক্ষ জনশক্তির কাছে আরও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হয়ে ওঠার ইন্দোনেশিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করছে বিস্তারিত শর্তের ওপর। উচ্চ ব্যয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরকার যেসব পেশাজীবীকে আকৃষ্ট করতে চায়, তাঁদেরই নিরুৎসাহিত করতে পারে। এ ছাড়া অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান বা সম্পত্তির অধিকার আরও স্পষ্ট না করলে, দেশের প্রয়োজনীয় বৃহত্তর দক্ষ কর্মীসমাজের বদলে GCI মূলত ধনী ব্যক্তিদেরই আকৃষ্ট করতে পারে।
সামনে কী: বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তন
GCI কর্মসূচিটি এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন গ্রহণ করা হলেও আইন ও মানবাধিকার মন্ত্রণালয় এবং অভিবাসন মহাপরিদপ্তর কারিগরি বিধি ও বিস্তারিত বাস্তবায়ন নীতিমালা চূড়ান্ত করছে। তাই দৈনন্দিন প্রয়োগে কর্মসূচিটি কীভাবে চলবে, তা সরকার স্পষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রক্রিয়া ও অধিকার পরিবর্তিত হতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচিটি পরিমার্জনে সরকার আগ্রহী। প্রবাসীদের মতামত ও কর্মসূচির প্রাথমিক বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পর কর্মকর্তারা আর্থিক শর্ত সমন্বয়, সম্পত্তির অধিকার স্পষ্ট করা বা আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নিতে পারেন। সরকার বলেছে, শেষ পর্যন্ত GCI-এর মান যেন অন্য দেশের অনুরূপ কর্মসূচির সমান বা তার চেয়ে উন্নত হয়, তা নিশ্চিত করতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
সম্ভাব্য আবেদনকারীদের জন্য আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, হালনাগাদ তথ্যের খোঁজ রাখা এবং নথিপত্র সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুত করা। বিধিমালা পরিবর্তনশীল হওয়ায় অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা বা ই-ভিসা পোর্টালের মতো সরকারি মাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করা জরুরি। ব্যবস্থা পরিপক্ব হলে GCI আসলে কী কী সুবিধা দেয়, তা আরও স্পষ্ট হবে।
গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়া চালুর মধ্য দিয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সূচনা হয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্বের কঠোর নীতির সঙ্গে বিশ্বায়িত বিশ্বের বাস্তবতার ভারসাম্য আনার সাহসী প্রচেষ্টা এটি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইন্দোনেশীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনতে কর্মসূচিটি সফল হবে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নিজ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দেশের সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে নতুন অধ্যায় খুলেছে এটি।
মূল বিষয়গুলো
- ইন্দোনেশিয়া গ্লোবাল সিটিজেনশিপ অব ইন্দোনেশিয়া (GCI) চালু করেছে। এর আওতায় সাবেক নাগরিক ও ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা আজীবন বসবাসের সুযোগ পাবেন।
- ইন্দোনেশিয়ার আইনে প্রাপ্তবয়স্কদের দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত নয়; এই কর্মসূচি তার বিকল্প।
- যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ইন্দোনেশীয় নাগরিক, তাঁদের সন্তান ও নাতি-নাতনি, মিশ্র-বিবাহে জন্ম নেওয়া সন্তান এবং ইন্দোনেশীয় নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রী।
- আবেদনকারীদের সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হবে এবং ইন্দোনেশিয়ায় আর্থিক বিনিয়োগ রাখতে হতে পারে।
- GCI অনির্দিষ্টকাল বসবাস ও কাজের অধিকার দেয়, তবে ইন্দোনেশীয় নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার বা পূর্ণ মালিকানায় সম্পত্তির অধিকার দেয় না।
- কর্মসূচিটি ভারতের ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (OCI) প্রকল্পের আদলে তৈরি, তবে এতে আর্থিক শর্ত আরও কঠোর।
- মেধাপাচার রোধ এবং প্রবাসীদের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও দক্ষতা আকর্ষণে কর্মসূচিটি কাজে লাগাতে চায় সরকার।
- প্রবাসীদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র: কেউ এর দেওয়া স্থিতিশীলতার প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন।






