দশকের পর দশক ধরে চলা একটি প্রথার অবসান
দক্ষিণ কোরিয়া ঘোষণা করেছে, দেশটিতে ভালুকের পিত্ত চাষের শিল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হবে। দেশটির প্রাণীকল্যাণের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ভালুক প্রজনন, পোষা এবং তাদের পিত্ত সংগ্রহ নিষিদ্ধ হবে। সংশোধিত প্রাণী অধিকার সুরক্ষা আইনের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, যা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সরকারের অঙ্গীকারের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
- দশকের পর দশক ধরে চলা একটি প্রথার অবসান
- ভালুকের পিত্ত চাষ সম্পর্কে জানা
- নিষেধাজ্ঞার পথে
- তিন পক্ষের চুক্তি
- বন্দি ভালুক উদ্ধার করার চ্যালেঞ্জ
- উদ্ধারে ধীরগতি
- অভয়ারণ্য সংকট
- খামারিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
- বিশ্ব পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক তুলনা
- ভিয়েতনামের বিকল্প পদ্ধতি
- ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা বনাম প্রাণীকল্যাণ
- সামনে কী: বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
- জটিল উত্তরণ
- সারকথা
এ সিদ্ধান্ত এমন একটি প্রথার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে, যা কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ছিল। ভালুকের পিত্ত সংগ্রহের জন্য চাষের অনুমতি দেওয়া হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। মূলত এশীয় কালো ভালুক, যা মুন বেয়ার নামেও পরিচিত, চাষ করা হতো। পিত্ত সংগ্রহের জন্য এসব প্রাণীকে বন্দি করে রাখা হতো। পিত্ত হলো যকৃতে তৈরি ও পিত্তথলিতে জমা হওয়া একধরনের পরিপাকরস, যা ঐতিহ্যবাহী ওষুধে বা প্রাণশক্তি ও সহনশীলতা বাড়ায় বলে বিশ্বাস করা খাবারে ব্যবহৃত হতো।
নিষেধাজ্ঞাটি প্রাণী অধিকারকর্মীদের জন্য বড় জয় হলেও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সারা দেশে খাঁচায় এখনো প্রায় ২০০টি ভালুক রাখা হয়েছে, যেগুলো বিশেষভাবে পিত্তথলির জন্য লালন-পালন করা হয়েছে। বৈধ শিল্প থেকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞায় উত্তরণে সতর্ক পরিকল্পনা, বিপুল অর্থায়ন এবং সরকারি কর্মকর্তা, খামারি ও প্রাণীকল্যাণ সংস্থাগুলোর সহযোগিতা দরকার।
ভালুকের পিত্ত চাষ সম্পর্কে জানা
দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালুকের পিত্ত চাষ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের গোড়ায়। তখন খামারিরা কার্যক্রম গড়ে তুলতে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ভালুক আমদানি করেন। শুরুতে বন্য ভালুকের ওপর চাপ কমিয়ে পিত্তের চাহিদা মেটানোর উপায় হিসেবে এ চাষকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে এ শিল্পের সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন খামারে প্রায় ১,০০০ ভালুক লালন-পালন করা হতো।
পিত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় সাধারণত ভালুকদের ছোট খাঁচায় রাখা হতো, যেখানে চলাফেরার সুযোগ ছিল সীমিত। খামারিরা সিরিঞ্জ বা পিত্তথলিতে প্রবেশ করানো ক্যাথেটারসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে পিত্ত সংগ্রহ করতেন। এতে প্রাণীদের প্রায়ই উল্লেখযোগ্য ব্যথা ও কষ্ট হতো। বন্দিদশার কারণে তাদের অনেকেই শারীরিক ও মানসিক আঘাতের শিকার হতো।
কোরিয়া অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মী কিম সু-জিন এসব খামারের পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, "অনেক ভালুক ছোট খাঁচায় একে অপরকে আক্রমণ করতে গিয়ে অঙ্গ হারায়, এমনকি মারাও যায়। আর আহত ভালুকেরা কখনোই পর্যাপ্ত সেবা পায় না।" গাদাগাদি করে রাখার কারণে ভালুকদের মধ্যে লড়াই হতো, যার ফলে আঘাত ও মৃত্যু ঘটত; যথাযথ ব্যবস্থাপনা থাকলে এসব এড়ানো যেত।
মুন বেয়ার নামে পরিচিত এশীয় কালো ভালুককে ১৯৮২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। সুরক্ষিত মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও সরকার আগে থেকে চালু থাকা খামারগুলোকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এমনকি পিত্ত সংগ্রহের জন্য দশ বছর বা তার বেশি বয়সী খাঁচাবন্দি ভালুক হত্যারও অনুমতি ছিল। এ পরস্পরবিরোধী নীতির কারণে সংরক্ষণ প্রচেষ্টা ও ভালুকের পিত্তশিল্পের মধ্যে কয়েক দশক ধরে টানাপোড়েন চলেছে।
নিষেধাজ্ঞার পথে
ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করার পথটি সরল বা সংক্ষিপ্ত ছিল না। দক্ষিণ কোরিয়ায় বন্দি ভালুকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে নীতিগত অচলাবস্থা চলেছে। কয়েকটি কারণ শেষ পর্যন্ত এ প্রথা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
গত দুই দশকে জনমত নাটকীয়ভাবে বদলেছে। পিত্তের ওষুধি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, সস্তা বিকল্প চিকিৎসার প্রচলন এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে বাড়তি সচেতনতার কারণে এ প্রথার জনপ্রিয়তা দ্রুত কমে যায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম প্রাণীর কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া ঐতিহ্যবাহী ওষুধের প্রতি কম আগ্রহ দেখিয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপও ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বজুড়ে প্রাণীকল্যাণ সংস্থাগুলোর কাছ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশনের মতো সংস্থাগুলো প্রতিবেদন ও প্রচারণার মাধ্যমে ভালুকের খামারের অমানবিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। এ প্রথা চালু রাখার অনুমতি দেশটির আধুনিক ও উন্নত ভাবমূর্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক ছিল।
তিন পক্ষের চুক্তি
২০২২ সালে কর্মকর্তা, খামারি ও প্রাণী অধিকারকর্মীরা ২০২৬ সাল থেকে ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করার ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছালে অগ্রগতির পথ খুলে যায়। কয়েক বছরের আলোচনার পর এ যৌথ ঘোষণা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা। চুক্তি অনুযায়ী, খামারিদের কাছ থেকে ভালুক কিনে নেওয়ার দায়িত্ব নেয় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো, আর উদ্ধার করা প্রাণীদের রাখার জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়ার অঙ্গীকার করে সরকার।
পরিবেশমন্ত্রী কিম সুং-হোয়ান আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নীতিগত এ পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "ভালুকের খামার বন্ধের পরিকল্পনা বন্যপ্রাণীর কল্যাণ উন্নত করা এবং এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনে আমাদের দেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ।" তিনি আরও বলেন, "শেষ ভালুকটি পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।" এ বক্তব্যে প্রাণীকল্যাণের বিষয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি—দুই বিষয়েই সরকারের সচেতনতা প্রতিফলিত হয়েছে।
বন্দি ভালুক উদ্ধার করার চ্যালেঞ্জ
আইনগত নিষেধাজ্ঞা অগ্রগতির সূচনা করলেও শত শত বন্দি ভালুক উদ্ধারের বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন খামারে প্রায় ২৪০টি ভালুক রয়েছে। কিছু ভালুক স্বাভাবিকভাবে মারা যাওয়া বা উদ্ধার হওয়ায় এ সংখ্যা ওঠানামা করে। এসব প্রাণী পুরো জীবন বন্দিদশায় কাটিয়েছে; তাই তাদের সরাসরি বনে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভালুকের খামার নিয়ে গবেষণা করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ভূগোল বিভাগের পিএইচডি গবেষক জশুয়া পাওয়েল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন ভালুকগুলোকে বনে ছাড়া যাবে না। তাঁর ভাষায়, "মানুষের কাছ থেকে খাবার পেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় এ ভালুকগুলোকে কখনোই বনে ছাড়া যাবে না।" তিনি আরও বলেন, "দক্ষিণ কোরিয়ার খামারগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির ভালুক আমদানি করা হয়েছিল বলে কিছু ভালুক আদৌ স্থানীয় এশীয় কালো ভালুক কি না, তা নিয়েও সংশয় থাকতে পারে।" এ জিনগত মিশ্রণ ও মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে এসব প্রাণীর ভবিষ্যতের একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা হলো অভয়ারণ্যে রাখা।
বন্দিদশার মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিও উদ্ধার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলেছে। বছরের পর বছর ছোট খাঁচায় কাটানো ভালুকদের মধ্যে প্রায়ই অস্বাভাবিক পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ দেখা যায়, যা স্টেরিওটাইপি নামে পরিচিত দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের লক্ষণ। অপর্যাপ্ত খাবার, ব্যায়ামের অভাব এবং পিত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পাওয়া আঘাতের কারণে তাদের নানা স্বাস্থ্য সমস্যাও থাকতে পারে।
উদ্ধারে ধীরগতি
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা এলেও উদ্ধার কার্যক্রম এগিয়েছে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত মাত্র ২১টি ভালুক কিনে দক্ষিণের জল্লা প্রদেশে সরকার পরিচালিত একটি অভয়ারণ্যে নেওয়া হয়েছে। প্রাণীগুলো ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে খামারিদের কত টাকা দেওয়া হবে, তা নিয়ে চলমান বিরোধের কারণে এ ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
আরও সাম্প্রতিক এক ঘটনায়, কোরিয়া অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনসহ চারটি নাগরিক সংগঠন আগস্টে কিয়ংগি প্রদেশের ইয়নচনের একটি খামার থেকে ১২টি ভালুক নেওয়ার চুক্তি সই করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালুক চাষের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর এ ধরনের এটিই প্রথম উদ্যোগ। এতে অগ্রগতির সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতাও স্পষ্ট হয়েছে। খামারে থাকা ২৪০টি ভালুকের প্রায় অর্ধেকের যাওয়ার জায়গা না থাকায় উদ্ধার ত্বরান্বিত করতে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন প্রাণীকল্যাণকর্মীরা।
অভয়ারণ্য সংকট
দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ সম্ভবত উদ্ধার করা প্রাণীদের রাখার মতো পর্যাপ্ত স্থানের অভাব। উদ্ধার হওয়া সব ভালুককে রাখার জন্য সরকারের বর্তমান অভয়ারণ্য অবকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই অপর্যাপ্ত।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জল্লা প্রদেশের তাদের অভয়ারণ্যে সর্বোচ্চ ৪৯টি ভালুক রাখা যাবে। তবে কোরিয়া অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মী কাং জে-ওন বলেছেন, যথাযথ কল্যাণ নিশ্চিত করতে ভালুকের সংখ্যা ৩০টির বেশি হওয়া উচিত নয়। ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ করা এবং প্রতিটি প্রাণীকে পর্যাপ্ত জায়গা ও সেবা দেওয়ার মধ্যে যে টানাপোড়েন রয়েছে, এ ব্যবধান তা তুলে ধরে।
সরকারের দ্বিতীয় একটি স্থাপনা এপ্রিল মাসে চালুর কথা ছিল, কিন্তু বন্যার কারণে তা পিছিয়ে ২০২৭ সালে নেওয়া হয়েছে। এতে স্বল্প মেয়াদে উদ্ধার কার্যক্রমের বিকল্প আরও কমে গেছে। দক্ষিণ চুংচং প্রদেশের সেচন এবং দক্ষিণ জল্লা প্রদেশের গুরিয়ে নতুন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কাজ শেষ হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রায় ১২০টি ভালুককে রাখার মতো উদ্ধারকেন্দ্র পাওয়া যাবে না।
কাং জানান, কর্মীরা এখন বিকল্প সমাধান খুঁজছেন। এর মধ্যে কিছু উদ্ধার করা ভালুককে বিদেশে পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে বিদেশি চিড়িয়াখানাগুলোর সঙ্গে আলোচনা রয়েছে। সিউলে কোরিয়া অ্যানিমেল রাইটস অ্যাডভোকেটসের প্রধান চন জিন-কিয়ং বলেন, "(সরকারের) ভালুকের পিত্তশিল্পের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া সত্যিই ভালো, তবে ভালুক রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাটা দুঃখজনক।" তিনি আরও বলেন, "এসব ভালুকের থাকার কোনো জায়গা নেই।" পর্যাপ্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছাড়া নিষেধাজ্ঞাকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করেন অনেক প্রাণীকল্যাণকর্মী; তাঁদের হতাশাই এ বক্তব্যে ফুটে উঠেছে।
খামারিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ভালুকের পিত্ত চাষ থেকে সরে আসার প্রক্রিয়া বিতর্ক ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ছাড়া ঘটেনি। এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক খামারি কয়েক দশকে তাদের কার্যক্রমে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এখন ব্যবসা কার্যত নিষিদ্ধ হওয়ায় তাঁরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
দক্ষিণের শহর দাংজিনে ৭৮টি ভালুক লালন-পালনকারী খামারি কিম কুয়াং-সু নতুন নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, "এটি খুবই খারাপ নীতি।" তবে অসুবিধা এড়াতে আইন মেনে চলবেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। কিমের পরিস্থিতিতে অনেক খামারির আর্থিক চাপের চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৪ সালে দাংজিনের খামারে তাঁর প্রায় ২৭০টি ভালুক ছিল। তবে বাকি প্রাণীগুলোর পরিচর্যার খরচে তাঁর কয়েক লাখ ডলারের ঋণ জমেছে।
কিমের ভাষ্য, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অন্য খামারিরা অত্যন্ত কম দামে তাদের ভালুক বিক্রি করেছেন। আগে অনেকেই তাদের ভালুকের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করার বিনিময়ে সরকারের ক্ষতিপূরণ নিয়েছিলেন, কারণ তাঁদের ধারণা ছিল এ শিল্প অনির্দিষ্টকাল চলবে। নীতির আকস্মিক পরিবর্তনে তাঁরা এমন প্রাণীগুলোর দায়ে পড়েছেন, যেগুলোর আর প্রজনন বা বাণিজ্যিক ব্যবহার করা যাবে না; বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগও সীমিত।
উত্তরণ সহজ করতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ভালুক পালনকারী খামারিদের জন্য ছয় মাসের ছাড়ের সময় দিয়েছে এবং প্রাণী বিক্রি ও সরিয়ে নেওয়া পর্যন্ত যারা সেগুলো রাখবেন, তাঁদের আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে বিরোধের কারণে প্রাণী কেনার দায়িত্বে থাকা খামারি ও প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর আলোচনা এখনো থমকে আছে।
২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক ভালুক খামারি আসলে এ চাষ বন্ধ দেখতে চেয়েছিলেন। এতে ইঙ্গিত মেলে, আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার অনেক আগেই এ শিল্পের পতনের কারণে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। আইনগত নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত ক্রমশ সংকুচিত ও বিতর্কিত ব্যবসায় আটকে পড়া খামারিদের জন্য সমাপ্তি এবং আর্থিকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুলে দিতে পারে।
বিশ্ব পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক তুলনা
ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এমন এক ক্রমবর্ধমান দেশের তালিকায় যুক্ত হলো, যারা এ প্রথার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভিয়েতনাম ২০০৫ সালে পিত্ত সংগ্রহ নিষিদ্ধ করে, যদিও আইন কার্যকরের প্রচেষ্টা চলার মধ্যে দেশটিতে প্রায় ৩০০টি ভালুক এখনো বন্দি রয়েছে। চীনে রয়েছে সবচেয়ে বড় ভালুকের পিত্তশিল্প; কিছু প্রতিবেদনের হিসাবে, সেখানে বৈধ কার্যক্রমেই প্রায় ২০,০০০ ভালুক রয়েছে এবং বাজারটির মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
দেশভেদে নেওয়া ভিন্ন পদক্ষেপ ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও প্রাণীকল্যাণ নিয়ে নানা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তুলে ধরে। দক্ষিণ কোরিয়া পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিলেও অন্য দেশগুলো ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে। অ্যানিমেলস এশিয়ার ভিয়েতনাম পরিচালক ড. তুয়ান বেন্ডিক্সেন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে থেকে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, তাঁর সংস্থা "সমালোচনা না করে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়ার মাধ্যমে" কর্মীসমাজের বাইরেও ভালুক চাষ বন্ধের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে পেরেছে।
ভিয়েতনামের বিকল্প পদ্ধতি
দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তরণে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা মূল্যবান শিক্ষা দিতে পারে। ২০০৫ সালে পিত্ত সংগ্রহ নিষিদ্ধ করার পর ভিয়েতনাম বন্দি অবস্থায় থাকা বাকি ভালুকগুলোকে অভয়ারণ্যে সরানোর কাজ করছে। ২০১৭ সালে দেশটির সরকার অ্যানিমেলস এশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যাতে অঙ্গীকার করা হয় যে দেশের অবশিষ্ট পিত্তের জন্য রাখা ভালুকগুলোকে উপযুক্ত স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হবে।
ভিয়েতনামের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভালুকের পিত্তের ভেষজ বিকল্পের প্রসার। অ্যানিমেলস এশিয়ার তথ্যমতে, ৩২টির বেশি ভেষজ বিকল্প রয়েছে। ভালুক চাষের জন্য পরিচিত এলাকায় এসব বিকল্প ফলানো ও জনপ্রিয় করতে সংস্থাটি স্কুল ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করছে। কিছু গ্রামে বিকল্পের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ায় অবশিষ্ট ভালুকের এক-তৃতীয়াংশের বেশি উদ্ধার করা হয়েছে।
সংস্থাটি ভিয়েতনাম ও চীন—দুই দেশেই অভয়ারণ্য পরিচালনা করে। এসব কার্যক্রমে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শত শত স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ মডেল দেখায়, ভালুক চাষ বন্ধ করলে অর্থনৈতিক সুযোগ বিলুপ্ত না হয়ে বরং তৈরি হতে পারে। অভয়ারণ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার সময় দক্ষিণ কোরিয়াও এ পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা বনাম প্রাণীকল্যাণ
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতি ও আধুনিক প্রাণীকল্যাণ মানদণ্ডের মধ্যে টানাপোড়েনই ভালুকের পিত্ত নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পূর্ব এশীয় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ভালুকের পিত্ত ব্যবহৃত হয়ে আসছে; অষ্টম শতকের একটি চীনা চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থে এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এর সক্রিয় উপাদান উরসোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড কিছু যকৃতের রোগ ও পিত্তপাথরের চিকিৎসায় এবং যকৃতের কার্যকারিতা উন্নত করতে কার্যকর বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
তবে কৃত্রিম বিকল্পের সহজলভ্যতার কারণে চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে ভালুকের পিত্তের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই ফুরিয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে প্রথম সংশ্লেষিত উরসোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড বা উরসোডিওল বিশ্বজুড়ে পিত্তপাথর ও যকৃতের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এই কৃত্রিম বিকল্প এবং বহু ভেষজ উপায় প্রাণীর কষ্ট ছাড়াই কার্যকর চিকিৎসা দেয়।
চিকিৎসার বিকল্প থাকা সত্ত্বেও প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করা পিত্তের কার্যকারিতা ও শক্তি সম্পর্কে সাংস্কৃতিক বিশ্বাস টিকে আছে। কিছু ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসক ও ভোক্তা মনে করেন, ভালুকের পিত্তে এমন গুণ রয়েছে, যা কৃত্রিম বিকল্পে পাওয়া যায় না। বিকল্প থাকা এবং প্রাণীকল্যাণ নিয়ে সচেতনতা বাড়া সত্ত্বেও এ বিশ্বাস চাহিদা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
গত দুই দশকে ভালুকের পিত্তের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া থেকে বোঝা যায়, এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। বিশেষ করে সস্তা ও সহজলভ্য বিকল্পের তুলনায় এর ওষুধি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অনেক ভোক্তা পণ্যটি ব্যবহার ছেড়েছেন। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিত হয়ে এ পরিবর্তিত মনোভাব দক্ষিণ কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
সামনে কী: বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু শত শত ভালুক উদ্ধার করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি উপযুক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে বিপুল সম্পদ, দক্ষতা ও সমন্বয় দরকার।
জশুয়া পাওয়েলের গবেষণায় অগ্রগতি ও চলমান উদ্বেগ—দুই দিকই উঠে এসেছে। তিনি গাংওন প্রদেশের একটি খামার পরিদর্শন করেন, যেখানে প্রজেক্ট মুন বেয়ার ও কোরিয়া অ্যানিমেল রাইটস অ্যাডভোকেটসের স্বেচ্ছাসেবকেরা বাইরে একটি নতুন ঘের তৈরি করেছেন। সেখানে ছিল একটি পুকুর এবং মধু ও বাদাম মাখানো ফাঁপা গুঁড়ির মতো প্রাণীদের ব্যস্ত রাখার উপকরণ। বিশেষজ্ঞ প্রাণী প্রশিক্ষকেরা ভালুকগুলোকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যাতে তারা পশুচিকিৎসকদের হাতে টিকা নেওয়া মেনে নেয়; এতে চিকিৎসার সময় তাদের মানসিক চাপ কমে।
এ উন্নয়নগুলো দেখায়, সারা দেশের খামার থেকে শত শত ভালুককে সফলভাবে নতুন আবাসে রাখতে বন্দি ভালুক ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হবে। তবে পাওয়েল আরও উল্লেখ করেন, আইনগত ও বাজেটসংক্রান্ত বাধা রয়ে গেছে এবং পরিকল্পিত সরকারি অভয়ারণ্যগুলোতে পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
কিছু হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার ২০টি খামারে ৩২২টি বন্দি ভালুক রয়েছে; আর সরকারি অভয়ারণ্যে আপাতত মাত্র ১২০টি প্রাণী রাখার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ঘাটতি পূরণে প্রজেক্ট মুন বেয়ার ও কোরিয়া অ্যানিমেল রাইটস অ্যাডভোকেটস একটি বেসরকারি অভয়ারণ্য নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যার ব্যয় হতে পারে ২.২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। এর বাইরে খামার থেকে প্রাণী কিনতে এনজিওগুলো সহায়তা করবে বলে সরকারের বর্তমান প্রত্যাশা রয়েছে।
জটিল উত্তরণ
ভালুক চাষ বন্ধের উত্তরণে একাধিক পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এবং জটিল ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রয়োজন। প্রাণী ছেড়ে দিতে খামারিদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দরকার, ভালুকের উপযুক্ত আবাস ও পরিচর্যা দরকার, আর করদাতাদের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে—এ নিশ্চয়তা জনগণের দরকার। একই সঙ্গে সময়সীমায় জরুরিতা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
২০২২ সালের চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাওয়ায় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে, তবে আরও বড় সুরক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আহ্বানও জানিয়ে আসছে। দ্বিতীয় সরকারি স্থাপনার চালু হওয়া ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ায় বিদ্যমান অভয়ারণ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এ ঘাটতি পূরণে বেসরকারি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন হতে পারে।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দি ভালুকগুলোর ভবিষ্যৎ কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন অনেক উজ্জ্বল। আইনগত নিষেধাজ্ঞা, অভয়ারণ্য গড়ে তোলা এবং জনমতের পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এমন গতি তৈরি হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালুকের পিত্ত চাষ সত্যিই একদিন অতীত হয়ে যাবে।
সারকথা
- দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ভালুকের পিত্ত চাষ নিষিদ্ধ করেছে; প্রজনন, পোষা ও পিত্ত সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞা ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে
- নতুন আইন লঙ্ঘনকারীদের দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে
- সারা দেশের খামারে প্রায় ২০০-২৪০টি ভালুক রয়ে গেছে; দীর্ঘদিন বন্দি থাকায় তাদের বনে ছাড়া যাবে না
- সরকারি অভয়ারণ্যের বর্তমান ধারণক্ষমতা অপর্যাপ্ত; শত শত ভালুকের জন্য প্রয়োজন হলেও জায়গা রয়েছে মাত্র ৪৯-১২০টির
- বন্যার কারণে দ্বিতীয় সরকারি অভয়ারণ্য চালুর সময় ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়েছে
- দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালুক চাষ শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের গোড়ায়; একসময় সারা দেশে প্রায় ১,০০০ ভালুক এ চাষের আওতায় ছিল
- সরকারি কর্মকর্তা, খামারি ও প্রাণী অধিকারকর্মীদের মধ্যে ২০২২ সালের একটি চুক্তির ফল এ নিষেধাজ্ঞা
- খামারিদের কাছ থেকে ভালুক কেনার দায়িত্ব প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর; সরকার আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে
- এ পর্যন্ত মাত্র ২১-৩৩টি ভালুক উদ্ধার হয়েছে; ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা থমকে আছে
- ভালুকের পিত্তের কৃত্রিম ও ভেষজ বিকল্প রয়েছে, যেগুলো চিকিৎসায় কার্যকর এবং প্রাণীর কষ্টের প্রয়োজন হয় না






