অবৈধ ঘটকালি কার্যক্রমের তদন্ত শুরু করেছে নেপাল
চীনা নাগরিকদের জন্য নেপালি নারীদের সম্ভাব্য কনে হিসেবে প্রচার করছে দালাল ও অনলাইন মধ্যস্থতাকারীরা—এমন ঘটনা কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর অবৈধ সীমান্তপারের ঘটকালির ওপর নজরদারি জোরদার করেছে নেপাল। এর ফলে আইন প্রয়োগের তৎপরতা বেড়েছে এবং নেপালি ও চীনা, উভয় কর্তৃপক্ষই আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দিয়েছে। সম্প্রতি চীনা দূতাবাস নতুন বছরের ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে দেশটিতে কথিত “কনে কেনাবেচা” থেকে নাগরিকদের সাবধান করেছে। ঘটকালি সংস্থা ও দালালদের অন্ধভাবে বিশ্বাস না করারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সূচিপত্র
- অবৈধ ঘটকালি কার্যক্রমের তদন্ত শুরু করেছে নেপাল
- অভিযান জোরদারের পেছনের কারণ
- অবৈধ ঘটকালি সংস্থার কার্যপদ্ধতি
- চীনের নারী-পুরুষের অনুপাতহীনতা চাহিদা বাড়াচ্ছে
- নেপালের বাইরেও সতর্কবার্তা
- আঞ্চলিক মানব পাচারের প্রবণতা
- অবৈধ ঘটকালির মানবিক মূল্য
- বিচার ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ
- সরকারি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
- কর্মী ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
- সামনের পথ: সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা
- আইনি কাঠামো ও প্রয়োগ জোরদার
- মূল কথা
চীনা দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতারণামূলক বা মুনাফাকেন্দ্রিক সীমান্তপারের ঘটকালি চীনের আইনে অবৈধ। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, “সীমান্তপারের বিয়েতে জড়িত আইনি, সাংস্কৃতিক, সম্পত্তি বণ্টন ও সন্তানের অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলো পুরোপুরি বুঝুন। সহজে সীমান্তপারের ঘটকালিতে বিশ্বাস করবেন না... অবৈধ বিয়ের দালালদের এড়িয়ে চলুন।” শুক্রবার প্রকাশিত এই সতর্কবার্তার আগে নেপালে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামনে আসে, যেখানে চীনা নাগরিকদের জড়িত থাকার সন্দেহে অবৈধ ঘটকালির তৎপরতা নজরে আসে। পাশাপাশি অনলাইন দালালদের দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার বৃহত্তর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
অভিযান জোরদারের পেছনের কারণ
নেপালের অভিবাসন কর্মকর্তারা নভেম্বরে রাজধানী কাঠমান্ডুতে ভাড়া বাসায় চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বসবাসরত বহু তরুণী নেপালি নারীকে খুঁজে পাওয়ার পর “কনে কেনাবেচা”বিরোধী অভিযান জোরদার হয়। চীনা পুরুষেরা স্বীকার করেন, তাঁরা ওই নারীদের ভিডিও ধারণ করে দেশে পরিচিতজনদের কাছে পাঠিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শেয়ার করেছেন। তবে ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য তাঁরা স্পষ্ট করে জানাননি।
ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ চার চীনা নাগরিককে বহিষ্কার করলেও, নারীদের চীনে বিয়েতে বাধ্য করা হচ্ছিল—এমন অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানায়। পরিস্থিতিটি মানব পাচারের ঘটনা প্রমাণে নেপালি কর্তৃপক্ষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছে। বিশেষ করে ভয় বা জবরদস্তির কারণে সংশ্লিষ্ট নারীরা সামনে না এলে এসব ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন হয়।
অবৈধ ঘটকালি সংস্থার কার্যপদ্ধতি
তদন্তে দেখা গেছে, অবৈধ ঘটকালি সংস্থাগুলো সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছিল এবং সেবার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ নিচ্ছিল। কিছু সংস্থা ৫,০০০ ইউয়ান (৭১৩ মার্কিন ডলার) থেকে ১,৮৮,০০০ ইউয়ান (২৬,৮৩০ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত ফি নিচ্ছিল এবং প্রক্রিয়াটিকে “সহজ ও সরল” বলে প্রচার করছিল। এসব সংস্থা প্রায়ই বিয়েকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তুলে ধরত, অথচ সংশ্লিষ্ট নারীদের আইনি, আর্থিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির বিষয়গুলো আড়াল করত।
দালালরা সাধারণত দরিদ্র পরিবারের অসহায় তরুণীদের লক্ষ্য করে বিদেশে ভালো জীবনের প্রতিশ্রুতি দিত। এসব কার্যক্রমের অনেকগুলো প্রচলিত পদ্ধতি ছেড়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নেপাল ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সম্ভাব্য কনের সঙ্গে চীনা পুরুষদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। এই ডিজিটাল পরিবর্তনের ফলে কর্তৃপক্ষের পক্ষে এসব নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে ফেলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
চীনের নারী-পুরুষের অনুপাতহীনতা চাহিদা বাড়াচ্ছে
বিদেশি কনের চাহিদার সঙ্গে চীনের নারী-পুরুষের অসম অনুপাতের যোগসূত্র রয়েছে বলে গবেষকেরা প্রায়ই উল্লেখ করেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে সেখানে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১০৪। কয়েক দশকের জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতি ও পুত্রসন্তানের প্রতি সাংস্কৃতিক পক্ষপাতের ফলে তৈরি এই ভারসাম্যহীনতায় লাখ লাখ পুরুষ সঙ্গী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ বিদেশে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি করা অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত ঘটকালি সেবার দ্বারস্থ হন।
২০২০ সালে চীনের সপ্তম জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী, দেশটিতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ বেশি। এখন পরিত্যক্ত এক-সন্তান নীতি ও পুত্রসন্তানের প্রতি ঐতিহ্যগত পছন্দের সরাসরি ফল এই জনমিতিক চ্যালেঞ্জের কারণে সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায় “শেংনান শিদাই” বা “অবিবাহিত থেকে যাওয়া পুরুষদের যুগ” তৈরি হয়েছে। চীনের গ্রামাঞ্চলে নারী-পুরুষের এই ভারসাম্যহীনতা বিশেষভাবে প্রকট। উন্নত সুযোগের আশায় অধিকাংশ শিক্ষিত নারী শহরে চলে গেছেন।
এই জনমিতিক সংকটের কারণে বিয়ের নিবন্ধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬১ লাখে নেমে আসে, যা ১৯৮০ সালের পর সর্বনিম্ন। সম্ভাব্য কনের ঘাটতিতে কিছু মরিয়া পুরুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে সঙ্গী খুঁজতে শুরু করেছেন, আর অবৈধ দালালরা এই বাজারের সুযোগ নিতে তৎপর।
নেপালের বাইরেও সতর্কবার্তা
এ সমস্যার মুখোমুখি শুধু নেপাল নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসও একই ধরনের একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে সীমান্তপারের বিয়ে-সংক্রান্ত আইন মেনে চলতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ডেটিং বিষয়ক কনটেন্ট ও অবৈধ ঘটকালি সংস্থা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে চীনা নাগরিকদের আহ্বান জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে “বিদেশি স্ত্রী কেনা”র ধারণা থেকেও সতর্ক করা হয় এবং বাংলাদেশে বিয়ের সিদ্ধান্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে চীনা নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি “অর্থ ও মানুষ—দুটিই হারানো” এড়াতে বলা হয়।
দূতাবাস আরও স্মরণ করিয়ে দেয়, অবৈধ সীমান্তপারের বিয়েতে জড়িত চীনা নাগরিকেরা মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। চীনের সুপ্রিম প্রসিকিউটর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানব পাচার ও প্রতারণামূলক ঘটকালি পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ১,৫৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
আঞ্চলিক মানব পাচারের প্রবণতা
লাওস, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে নারী ও মেয়েদের আগে চীনে পাচার করে স্ত্রী হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। ২০২৪ সালে খবর প্রকাশিত হয়, বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশি নারীদের—বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীদের—চীনে পাচার ও বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁদের চীন-তিব্বতি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর চেহারার মিল থাকাও এর একটি কারণ।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এর মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পর পাকিস্তানেও একই ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনা বেড়েছে। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রতারণামূলক বিয়ের ফাঁদে পড়া অন্তত ২০ পাকিস্তানি মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁদের অনেকেই জানান, শোষণের প্রতিবাদ করায় তাঁদের জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং অঙ্গ পাচারের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের মে মাসের অভিযানের পর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬০০ পাকিস্তানি মেয়েকে চীনা পুরুষদের কাছে কনে হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খ্রিষ্টান নারীরা বিশেষভাবে এদের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।
অবৈধ ঘটকালির মানবিক মূল্য
এই অবৈধ ঘটকালি কার্যক্রমের পরিণতি আইনি লঙ্ঘনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাচার হওয়া নারীরা প্রায়ই গুরুতর শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে চীনে নারীর তুলনায় কয়েক কোটি বেশি পুরুষের অবিবাহিত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অসহায় নারীদের শোষণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে এই পরিস্থিতি।
বেঁচে ফেরা নারীদের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সীমান্ত পেরিয়ে বিক্রি করা হয়; সেখানে তাঁদের আটকে রাখা, যৌন সহিংসতা ও জোরপূর্বক সন্তান জন্মদানের শিকার হতে হয়। চীনে পৌঁছানোর পর অনেকের কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয় এবং চলাফেরা সীমিত করে দেওয়া হয়। প্রত্যন্ত গ্রামের পুরুষদের কাছে তাঁদের হাজার হাজার ডলারে “বিক্রি” করা হয়। এসব নারীকে প্রায়ই সন্তান জন্মদানের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় এবং পালানোর সামান্য আশাও না রেখে বারবার নির্যাতন করা হয়।
“সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবৈধ ঘটকালি সংস্থার মাধ্যমে স্ত্রী খুঁজতে নেপালে আসা বেশ কয়েকজন চীনা নাগরিককে মানব পাচার, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে,” বিবৃতিতে বলেছে চীনা দূতাবাস।
বিচার ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ
আইনে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর করা কঠিন। চীন ব্যক্তি বা সংস্থাকে বিদেশি বিয়ের দালাল হিসেবে কাজ করা নিষিদ্ধ করেছে। তবু অনেকেই দৌইন ও শিয়াওহংশুর মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটকালি সেবা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কার্যক্রমের ডিজিটাল ধরন এবং সীমান্তপারের বিচারিক এখতিয়ার-সংক্রান্ত জটিলতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য বড় বাধা তৈরি করছে।
এ ছাড়া, সংশ্লিষ্ট নারীদের সাহায্য চাইতেও অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, উভয় দেশের কর্তৃপক্ষকে ভয় এবং এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত সামাজিক কলঙ্কের কারণে বহু ভুক্তভোগী সামনে আসেন না। সামনে এলেও মানব পাচারের ঘটনা প্রমাণ করতে প্রচুর সাক্ষ্যপ্রমাণ দরকার হয়, যা প্রায়ই সংগ্রহ করা কঠিন।
সরকারি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
উদ্বেগ বাড়তে থাকায় নেপালি ও চীনা, উভয় কর্তৃপক্ষই সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিয়েছে। অবৈধ ঘটকালি ও কনে কেনাবেচার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নেপাল পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা চালাচ্ছে; তাঁদের মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। অসহায় নারীদের শোষণ এবং অবৈধ সীমান্তপারের বিয়েতে জড়িত নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলাই এই অভিযানের লক্ষ্য।
পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (FIA) ভুয়া বিয়ে ও মানব পাচারের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ২০১৯ সালের মে মাসে লাহোরে ১১ চীনা নাগরিক ও তাঁদের দুই পাকিস্তানি সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে সহযোগিতার জন্য চীন সরকারও একটি বিশেষ দল পাঠায়। ২০২৫ সালের মার্চে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে FIA। বিয়ের অজুহাতে পাকিস্তানি নারীদের চীনে পাঠানো মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য বলে তাঁদের সন্দেহ করা হয়।
কর্মী ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
সরকারগুলো সমস্যা মোকাবিলায় হিমশিম খেলেও কর্মী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ভুক্তভোগীদের উদ্ধার এবং সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নারী অধিকার সংগঠনগুলো অবৈধ ঘটকালি পরিকল্পনার ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণকে জানাচ্ছে এবং বেঁচে ফেরা নারীদের সহায়তা দিচ্ছে। প্রতিরোধে তৃণমূল পর্যায়ের এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আগেই তারা প্রায়ই অসহায় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে।
অবৈধ ঘটকালির ফাঁদে পড়ে চীনে গিয়ে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন তরুণীদের উদ্ধারে নেপালি কর্মীরাও কাজ করছেন। তাঁদের কাজ নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর মধ্যে সীমান্তপারের সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে প্রায়ই একাধিক বিচারব্যবস্থা ও দেশের মধ্যে সমন্বয় দরকার হয়।
সামনের পথ: সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধানে চীনের জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা এবং প্রতিবেশী দেশের নারীদের মানব পাচারের ঝুঁকিতে ফেলে এমন অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ মূল কারণগুলো মোকাবিলা করতে হবে। নারী-পুরুষের ব্যবধান কমাতে চীন সরকার এক-সন্তান নীতি শিথিল করা ও লিঙ্গসমতা প্রচারের মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে জনমিতিক প্রবণতা উল্টে দিতে এসব পদক্ষেপের ফল পেতে কয়েক দশক লাগবে।
নেপাল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নও নারীদের পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা আর্থিক অসহায়ত্ব কমাতে পারে। দেশে পরিবারের সামনে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সুযোগ থাকলে বিদেশে ভালো জীবনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে তাঁদের প্রলুব্ধ হওয়ার আশঙ্কা কমে।
আইনি কাঠামো ও প্রয়োগ জোরদার
সীমান্তপারের এসব অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। বিভিন্ন দেশের আইন সমন্বয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করলে মানব পাচারবিরোধী প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি, উৎস ও গন্তব্য—উভয় দেশেই অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনলে জোরালো বার্তা যায় যে এসব অপরাধ বরদাশত করা হবে না।
অবৈধ ঘটকালির কার্যক্রমের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এমন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণও জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানব পাচার ও অবৈধ ঘটকালির পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট নজরদারি ও অপসারণের দায়িত্ব নিতে হবে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
মূল কথা
নেপালের অভিযান অবৈধ সীমান্তপারের ঘটকালি ও মানব পাচার মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই বাণিজ্যের পেছনে থাকা জটিল কারণগুলোও সামনে এনেছে এটি—চীনের জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং একাধিক বিচারিক এখতিয়ারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ।
নেপালি ও চীনা কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলতে থাকলেও, অসহায় নারীদের শোষণ থেকে রক্ষা করা এবং তাঁদের দুর্দশা থেকে লাভবান হওয়া নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলাই এখন মূল লক্ষ্য। মানবাধিকারের এই সমস্যা সামগ্রিকভাবে মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে কাজ করতে হবে।
- দালালদের চীনা নাগরিকদের কাছে নেপালি নারীকে কনে হিসেবে প্রচারের ঘটনা সামনে আসার পর অবৈধ সীমান্তপারের ঘটকালির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে নেপাল।
- নেপালে চীনা দূতাবাস “কনে কেনাবেচা” ও অবৈধ ঘটকালি সম্পর্কে নাগরিকদের সতর্ক করে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে।
- ঘটকালি সংস্থাগুলো সেবার জন্য ৫,০০০ ইউয়ান (৭১৩ মার্কিন ডলার) থেকে ১,৮৮,০০০ ইউয়ান (২৬,৮৩০ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত ফি নিত।
- চীনে প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে প্রায় ১০৪ পুরুষের নারী-পুরুষ অনুপাতহীনতা বিদেশি কনের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
- পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে একই ধরনের মানব পাচারের প্রবণতার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
- ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মানব পাচার ও প্রতারণামূলক ঘটকালি পরিকল্পনার অভিযোগে চীনা কর্তৃপক্ষ ১,৫৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
- ঘটকালির সন্দেহজনক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ভিসা লঙ্ঘনের কারণে নেপাল থেকে চার চীনা নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে।
- চীনে পাচারের পর ভুক্তভোগীরা প্রায়ই আটকে রাখা, যৌন নির্যাতন ও জোরপূর্বক সন্তান জন্মদানের শিকার হন।
- সীমান্তপারের বিচারিক এখতিয়ার-সংক্রান্ত জটিলতা এবং ভুক্তভোগীদের সামনে আসতে অনীহা আইন প্রয়োগের পথে বাধা।
- বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ, অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ সমস্যার মূল কারণগুলো মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।






