শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত এক কৌশলগত সংযোগ
আঙ্কারা ও নয়াদিল্লির ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা বিস্ময়কর মনে হতে পারে। তবে এই সম্পর্কের ঐতিহাসিক শিকড় পাঁচ শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দীর্ঘদিনের এই সংযোগকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের বর্ণনায়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একটি নব্য-অটোমান পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন, যার লক্ষ্য ইসলামি বিশ্বজুড়ে, বিশেষত একসময় অটোমান শক্তির প্রভাব থাকা অঞ্চলগুলোতে, তুরস্কের প্রভাব বিস্তার করা।
সূচিপত্র
২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারতীয় তদন্তকারীরা ইঙ্গিত দেন, দিল্লির ঐতিহাসিক লাল কেল্লায় বিস্ফোরণের সমন্বয়ে একজন তুর্কি হ্যান্ডলারের ভূমিকা ছিল। ওই বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের সামরিক সংঘাতের সময় তুরস্ক ইসলামাবাদকে সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তুরস্কের নতুন করে উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যা আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সতর্ক নজর রাখতে বাধ্য করছে।
এই সম্পৃক্ততার ঐতিহাসিক ভিত্তি সুদৃঢ়। অটোমানদের উত্থানের অনেক আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে রোমান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। ওই সাম্রাজ্যগুলোর রাজধানী কনস্টান্টিনোপলই পরে ইস্তাম্বুল হয়। আরব বিজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে এলেও, তুর্কি গোষ্ঠীগুলো আনাতোলিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে নতুন রূপে যোগাযোগ ফিরে আসে।
ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে অটোমান সাম্রাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রসারিত হয়ে ভারত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছায়। তাদের সামনে ছিল শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী—ইরানের শিয়া সাফাভি সাম্রাজ্য এবং পর্তুগিজরা। পর্তুগিজরা সামুদ্রিক বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত উপকূলীয় ঘাঁটি গড়ে তুলছিল।
মিসর জয়ের পর অটোমান সুলতান সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা বা খলিফা উপাধি দাবি করেন। মধ্য আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত দূরবর্তী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করাও ছিল তাঁর লক্ষ্য।
ধর্মীয় কর্তৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে টিকে থাকতে মিত্রেরও প্রয়োজন ছিল। পারস্য, রাশিয়া এবং পর্তুগাল ও হাবসবুর্গদের মতো ইউরোপীয় শক্তির হুমকি মোকাবিলায় অটোমানরা ফ্রান্স, বুখারার উজবেক খানাত, বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার আচেহ এবং ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
মুঘল সংযোগ
মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অটোমান প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। উপমহাদেশে তখন বারুদচালিত অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক ছিল না। অটোমানদের কামান ভারতীয় যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন আনে। সুলতান প্রথম সেলিম কাবুলের শাসক বাবরের কাছে সেনাপতি, সৈন্য, কামান ও ম্যাচলক আগ্নেয়াস্ত্র পাঠান।
এই সহায়তা নিয়ে বাবর ভারতে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পারস্পরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির প্রভাবে মুঘল ও অটোমানদের সম্পর্ক পরে কখনো সহযোগিতা, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে এগিয়েছে। দিল্লি সালতানাত ও মুঘল সাম্রাজ্যসহ ভারতের অনেক বড় মুসলিম রাষ্ট্র তুর্কি বংশোদ্ভূত শাসকেরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
অষ্টাদশ শতকে মুঘল শক্তির পতনের সময় অটোমানরা আবার দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় উপনিবেশায়ন এড়াতে সক্ষম একমাত্র বড় মুসলিম সাম্রাজ্য হিসেবে তারা খিলাফতের দাবিও বজায় রাখে। মহীশূরসহ ভারতের ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো বৈধতা ও সুরক্ষার জন্য ইস্তাম্বুলের দিকে তাকাত।
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় মুসলমানদের কাছে অটোমান সুলতানের প্রতীকী গুরুত্ব ছিল। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের খিলাফত আন্দোলনে এই আবেগ চূড়ান্ত রূপ পায়। তখন অটোমান খলিফাকে রক্ষা এবং সাম্রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ব্রিটিশ পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে ভারতীয় মুসলমানেরা সংগঠিত হন।
মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক খিলাফত বিলুপ্ত করার পরও সেই ধারণা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। হায়দরাবাদের দেশীয় রাজ্য ভারতীয় ভূখণ্ডে খিলাফত পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে। নিজামের ছেলেরা অটোমান রাজকন্যাদের বিয়ে করেন। ইতিহাসবিদ স্যাম ডালরিম্পল উল্লেখ করেছেন, ১৯৩১ সালে নিজাম “শেষ খলিফার কাছ থেকে একটি দলিল আদায় করেন, যাতে তাঁর নাতি-নাতনিদের ইসলামের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়।” ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটে।
তিন ভাই: আধুনিক কৌশলগত ঐক্য
বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি তুরস্কের নতুন করে মনোযোগকে অনেকে নব্য-অটোমান পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে দেখেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান অটোমান ও মুঘল—উভয় সাম্রাজ্যের পতনকে ঐতিহাসিক ক্ষতি হিসেবে দেখেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক দৃঢ় করেছে; পাকিস্তান নিজেকে মুঘল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী বলে মনে করে।
বর্তমানে পাকিস্তান, তুরস্ক ও আজারবাইজান মিলে ‘তিন ভাই’ নামে পরিচিত একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের চুক্তি এবং ক্রমবর্ধমান গোয়েন্দা সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এই জোটের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময়—পহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন হিন্দু পর্যটক নিহত হওয়ার পর যে সংঘাত শুরু হয়—তুরস্ক প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। কাশ্মীরের বিষয়ে “অবিচল সমর্থনের” জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তুরস্কের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সংকটের সময় তুরস্ক পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। তুরস্ক অস্ত্র পাঠানোর কথা অস্বীকার করলেও, উত্তেজনার সময় পাকিস্তানে পৌঁছানো দেশটির সি-১৩০ সামরিক উড়োজাহাজের উপস্থিতি অস্বীকার করতে পারেনি; বৈশ্বিক আকাশ নজরদারি ব্যবস্থায় উড়োজাহাজটি শনাক্ত হয়।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে আলোচনায় বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধরনে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন ঘটেছে। প্রচলিত অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক থেকে তা এখন উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে। পিএন মিলগেম যুদ্ধজাহাজের মতো যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প এবং ড্রোন যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি এই রূপান্তরের উদাহরণ।
সামরিক-শিল্প সহযোগিতা
অভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, দৃঢ় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংযোগের ভিত্তিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে পাকিস্তান-তুরস্ক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করে। দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়।
দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা সক্রিয়ভাবে এগোচ্ছে। তুরস্কের সামরিক বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে উন্নত করতে সহায়তা করছেন। উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে:
- মিলগেম করভেট: ১.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে যৌথভাবে চারটি জাহাজ উৎপাদন
- টি১২৯ আতাক হেলিকপ্টার: পাকিস্তান ৩০টি হেলিকপ্টারের অর্ডার দিয়েছে
- জেএফ-১৭ উড়োজাহাজ সহযোগিতা: তুরস্ক মহাকাশ ও বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতায় আগ্রহ দেখিয়েছে
বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বিভাগের মধ্যে গভীর সহযোগিতা রয়েছে। তুরস্কের এমআইটি এবং পাকিস্তানের আইএসআই পেশাগত তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতায় যুক্ত। সামরিক সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জনসমক্ষে আসে না এবং গোপন রাখা হয়।
গত এক দশকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটি প্রতিরক্ষা রপ্তানি ১০৬ শতাংশ বাড়িয়েছে; ২০২৩ সালে এর পরিমাণ ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। লিবিয়া, নাগর্নো-কারাবাখ ও ইউক্রেনের সংঘাতে আলোচনায় আসা বায়রাকতার ড্রোনের মতো বৈপ্লবিক দেশীয় ব্যবস্থার কারণে এই সাফল্য এসেছে।
পাকিস্তানের তুর্কি সামরিক প্রযুক্তিতে, বিশেষত উন্নত ড্রোন ব্যবস্থায়, আরও বেশি প্রবেশাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। এতে প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষয় হতে পারে। তুরস্কের উন্নত টিবি২ ড্রোন প্রযুক্তি পাকিস্তানে হস্তান্তর করা হলে কাশ্মীরের বিতর্কিত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ইসলামাবাদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও আঞ্চলিক প্রভাব
দুটি বিস্তৃত তাগিদ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রথমত, উপমহাদেশের বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সংযোগ মুসলিম বিশ্বে দেশটির মর্যাদা ও ভূমিকা বাড়ায়। পাকিস্তানে তুর্কি টেলিভিশন, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বয়ান জনপ্রিয়তা পেয়েছে; অনেকেই দেশটিকে অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে দেখেন।
দ্বিতীয় কারণটি কৌশলগত। পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তুরস্ককে তার প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা তুলে ধরতে, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে, আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব ঠেকাতে এবং দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
আঙ্কারার দৃষ্টিতে, এই সম্পর্কগুলো ভারতের প্রতি শত্রুতার চেয়ে আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেওয়ার বিষয় বেশি। তবে পাকিস্তানের কাছে তুরস্ককে নির্ভরযোগ্য অংশীদার বলে মনে হয়, এমন এক সময়ে যখন সৌদি আরব ও ইরান—দুই দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে।
ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগানো, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের মডেল ভারতের জন্য মূল্যবান দৃষ্টান্ত হতে পারে।
তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগতভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের নজর এড়ায়নি। উভয় দেশই এই সমীকরণকে একধরনের কৌশলগত ঘেরাও হিসেবে দেখে এবং সামরিক সমন্বয় ও অর্থনৈতিক সংহতি বাড়িয়ে এর পাল্টা ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্কের বাইরেও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর পরিবর্তন ঘটছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে এবং পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে—যে দেশ থেকে ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে মুক্ত হতে সহায়তা করেছিল।
বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্টে কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের জন্য পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ভিসামুক্ত ভ্রমণ চুক্তি সই করে। ১৩ বছরে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ ইসহাক দারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের ঢাকা সফরের সময় সই হওয়া ছয়টি চুক্তির একটি ছিল এটি।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে যোগাযোগ করছে’। তবে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, পররাষ্ট্রনীতিতে নির্ণায়ক পরিবর্তন আসছে, যা তাঁর পূর্বসূরির ভারতকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে সরে আসার সংকেত দেয়।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যনির্ভরতা কমিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে নতুন কৌশলগত ঐক্য গড়তে চাইছেন ইউনূস। পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো অন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে চান তিনি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক মিত্রতা নতুন করে সাজানোর এই প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে।
খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনা জে১০ ও জেএফ১৭ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে—মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীও এই একই উড়োজাহাজ ব্যবহার করেছিল। এপ্রিলের কাশ্মীরের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছেন ইউনূস। তবে সীমান্তবর্তী আরেকটি দেশ উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করুক, ভারত তা নিশ্চয়ই পছন্দ করবে না।
ভারত-তুরস্ক উত্তেজনা
ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক এখনো অস্বস্তিকর। দুই দেশের বাণিজ্য সীমিত, আর নানা বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতি তুরস্কের সমর্থন থেকে শুরু করে গ্রিস ও আর্মেনিয়ার সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—এসব বিষয় উত্তেজনার কারণ।
দক্ষিণ ককেশাসে এই সমীকরণ বিশেষভাবে স্পষ্ট, যেখানে নাগর্নো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান-আর্মেনিয়া বিরোধে তুরস্ক ও ভারত বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। তুরস্ক আজারবাইজানের কট্টর সমর্থক এবং ২০২৩ সালে বাকুকে প্রায় ১০৬ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করে। অন্যদিকে, আর্মেনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে ভারত দেশটির বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের ভূরাজনৈতিক আচরণ ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের মডেল দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিগুলোর জন্য মূল্যবান শিক্ষা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে নানা বাধার প্রভাবে তুরস্ক ধীরে ধীরে পশ্চিমা মিত্রের প্রচলিত ভূমিকা ছেড়ে কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন বিশ্বব্যবস্থায়, যখন পশ্চিমা শক্তিগুলো অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জের মুখে, তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান ও ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তা সুফল বয়ে এনেছে। ইউরোপে প্রবেশের পূর্বদ্বার এবং এশিয়ায় প্রবেশের পশ্চিমদ্বার হিসেবে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক তার ভূরাজনৈতিক শক্তি সুদৃঢ় করেছে।
অর্থনৈতিক দিক ও জ্বালানি সহযোগিতা
তুরস্ক-পাকিস্তান সহযোগিতার অর্থনৈতিক দিক প্রচলিত বাণিজ্য সম্পর্কের অনেক বাইরে বিস্তৃত; এতে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ কৌশলগত খাত। জ্বালানি সহযোগিতা এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অন্যতম ভিত্তি।
পাকিস্তানের জলসীমায় গ্যাসের মজুত উত্তোলন ও বাজারজাতকরণে তুরস্কের সম্ভাব্য অবদান, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অফশোর জ্বালানি সম্পদ থেকে আয় করার পথ খুলে দিতে পারে। তুরস্কের জন্য পাকিস্তানের জ্বালানি উন্নয়নে অংশ নেওয়া এশীয় সম্পদকে ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রধান জ্বালানি কেন্দ্র হয়ে ওঠার বৃহত্তর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্থগিত হয়ে থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে এই জ্বালানি অংশীদারত্বের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তুরস্কের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার দিকে পাকিস্তানের ঝোঁক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমীকরণে পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়, যার ফলে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গত এক দশকে তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় উৎপাদক হিসেবে কাতারের অবস্থান জ্বালানি বাজারে দেশটিকে বিপুল প্রভাব দেয়। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে কাতারের সম্পৃক্ততার কেন্দ্রে রয়েছে এই আর্থিক সমীকরণ।
২০১৮-২০১৯ সালে পাকিস্তানের অর্থনীতি যখন বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জে পড়ে, তখন কাতার আমানত ও সরাসরি বিনিয়োগ মিলিয়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ দিয়ে সহায়তা করে। একইভাবে, কাতারের সহায়তায় তুরস্কের চলতি হিসাবের ঘাটতি মোকাবিলা করা হয়; ২০১৮ সালে দোহা তুরস্কের অর্থনীতিতে সরাসরি ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
ভবিষ্যৎ গতিপথ ও সীমাবদ্ধতা
কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও তুরস্ক-পাকিস্তান অংশীদারত্বের সামনে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা এর ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা সম্ভবত সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তার ওপর পাকিস্তানের অব্যাহত নির্ভরতা দেশটির কূটনৈতিক নমনীয়তা সীমিত করে।
একইভাবে, মুদ্রার অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির চাপসহ তুরস্কের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উচ্চাভিলাষী ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য উপলভ্য সম্পদ সীমিত করে। এসব অর্থনৈতিক বাস্তবতা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য এমন কিছু প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে, যা অংশীদারত্বের সবচেয়ে বিঘ্নসৃষ্টিকারী সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও এই অংশীদারত্বের গতিপথকে প্রভাবিত করে। ন্যাটোর সদস্যপদ তুরস্কের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে কিছু সীমা আরোপ করে, বিশেষত ন্যাটোর বাইরের অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে। একইভাবে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের জটিল সম্পর্ক দেশটির ওপর পরস্পরবিরোধী চাপ তৈরি করে।
কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভিন্নতাও সম্ভাব্য আরেকটি সীমাবদ্ধতা। তুরস্কের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ পূর্ব ভূমধ্যসাগর, সিরিয়া ও কুর্দি প্রশ্নকে ঘিরে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের মনোযোগ প্রধানত ভারত ও আফগানিস্তানের দিকে।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, নানা ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে তুরস্ক-পাকিস্তান অংশীদারত্বের বিকাশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। গভীরতর সম্পৃক্ততার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে জ্বালানি সহযোগিতা। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতারও বিকাশের সুযোগ আছে; নৌযান থেকে মহাকাশ ও বিমান চলাচল, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা পর্যন্ত এর পরিসর বাড়তে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি তুরস্কের ঐতিহাসিক আগ্রহ অটোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে; সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থানে সহায়তা করেছিল অটোমানরা
- প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্ক ইসলামি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ‘নব্য-অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে
- পাকিস্তান, তুরস্ক ও আজারবাইজান ‘তিন ভাই’ জোট গঠন করেছে; এটি সামরিক সহযোগিতা জোরদার করা একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে মিলগেম করভেট ও টি১২৯ হেলিকপ্টারের যৌথ উৎপাদন এবং সম্ভাব্য ড্রোন প্রযুক্তি হস্তান্তর
বাংলাদেশ ভারত থেকে সরে এসে পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে
দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম বিশ্বে মর্যাদা বাড়ানো এবং ইরানি ও আরব প্রভাব মোকাবিলা করা তুরস্কের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে
অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যার লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা
দুই দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তুরস্কের দায়বদ্ধতাসহ নানা সীমাবদ্ধতা এই অংশীদারত্বের সামনে রয়েছে
কাশ্মীর, আর্মেনিয়া ও আঞ্চলিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ভারত-তুরস্ক সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ






