নগর জিডিপিতে এগিয়ে টোকিও
২০২৫ সালের বৈশ্বিক নগর অর্থনীতির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে টোকিও। শহরটির আনুমানিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২.৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নিউইয়র্ক মহানগর এলাকা এবং ১.৬২ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে তৃতীয় স্থানে বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেস। তালিকায় ৩০০টি মহানগর অর্থনীতি রয়েছে এবং বিশ্ব উৎপাদনে তাদের অংশের ভিত্তিতে শহরগুলোকে সাজানো হয়েছে। এতে বড় নগরকেন্দ্রগুলোতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন স্পষ্ট হয়েছে, যেখানে অর্থায়ন, শিল্প, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল খাত একত্র হয়ে বিস্তৃত হচ্ছে।
সূচিপত্র
- নগর জিডিপিতে এগিয়ে টোকিও
- টোকিওর ২.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চালিকাশক্তি
- যুক্তরাষ্ট্রের নগর অর্থনীতিকে চালায় যেভাবে নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস
- এশিয়ার উত্থানে বদলে যাচ্ছে নগর অর্থনীতির শীর্ষ তালিকা
- নগর জিডিপি কীভাবে হিসাব করা হয়, আর কী বাদ পড়ে
- মহানগর এলাকা বনাম মূল শহর
- নামমাত্র জিডিপি বনাম জীবনযাত্রার ব্যয়
- জিডিপি, ব্যক্তিগত সম্পদ ও প্রভাব এক বিষয় নয়
- শীর্ষ ১০-এর বাইরের আঞ্চলিক চিত্র
- নগর অর্থনীতির প্রাণশক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
- ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণে এই তালিকার গুরুত্ব
- জেনে রাখুন
টোকিও ও নিউইয়র্কের ব্যবধান সামান্য, তবে এর তাৎপর্য অনেক। এই দুই মহানগর এলাকার প্রতিটিই জি২০-এর অনেক দেশের সমপরিমাণ উৎপাদন করে। টোকিও ও নিউইয়র্ক থেকে সাংহাই পর্যন্ত শীর্ষ ১০ শহর একাই বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। পরিসংখ্যানগুলো মার্কিন ডলারে দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি মহানগর অর্থনীতিতে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার আনুমানিক মূল্য তুলে ধরে।
২০২৫ সালে জিডিপির হিসাবে শীর্ষ ১০ ধনী নগর অর্থনীতি (নামমাত্র):
- টোকিও, জাপান: ২,৫৫৩.৬৯ বিলিয়ন ডলার
- নিউইয়র্ক মহানগর এলাকা, যুক্তরাষ্ট্র: ২,৪৮৯.৭৭ বিলিয়ন ডলার
- লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকা, যুক্তরাষ্ট্র: ১,৬১৯.৬৮ বিলিয়ন ডলার
- লন্ডন, যুক্তরাজ্য: ১,৪৭২.৪০ বিলিয়ন ডলার
- সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া: ১,৪১৯.৭৯ বিলিয়ন ডলার
- প্যারিস মহানগর এলাকা, ফ্রান্স: ১,৩৯৪.৫২ বিলিয়ন ডলার
- শিকাগো এলাকা, যুক্তরাষ্ট্র: ১,২৫১.৫৮ বিলিয়ন ডলার
- ওসাকা কোবে, জাপান: ১,১৮৫.৪৭ বিলিয়ন ডলার
- সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র: ১,১৫৩.৬৭ বিলিয়ন ডলার
- সাংহাই, চীন: ১,১৪৫.৮৭ বিলিয়ন ডলার
শীর্ষ ১০-এর বাইরে তালিকাটি নগর উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ব্যাপ্তি তুলে ধরে। বৃহত্তর ওয়াশিংটন ১২তম, ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ ১৩তম, হিউস্টন ১৪তম, বোস্টন ১৫তম, সিয়াটল ১৮তম, ফিলাডেলফিয়া ১৯তম, আটলান্টা ২০তম এবং সিলিকন ভ্যালি ২৪তম স্থানে রয়েছে। এশিয়ার নগর উত্থানও স্পষ্ট। বেইজিং শীর্ষ ১০-এর ঠিক বাইরে ১১তম স্থানে, আর ৮৬৭.৮৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তাইপে ২৫তম স্থানে রয়েছে।
টোকিওর ২.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির চালিকাশক্তি
টোকিওর এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের শিল্পভিত্তি, সঙ্গে আর্থিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা। রাজধানীটি ইলেকট্রনিকস, গাড়ি প্রকৌশল ও সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশসহ উন্নত উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র। নির্ভরযোগ্যতা ও মান নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলও এখান থেকে পরিচালিত হয়। ব্যাংকিং ও বিমা থেকে শুরু করে পেশাগত সেবা, বাণিজ্য এবং উচ্চমূল্যের খুচরা বিক্রি পর্যন্ত শক্তিশালী সেবা খাতও রয়েছে এই অঞ্চলে।
অবকাঠামোও টোকিওর বাড়তি সুবিধার একটি অংশ। শহরটির রেল নেটওয়ার্ক, বন্দর ও সমন্বিত পণ্য পরিবহন করিডর মানুষ ও পণ্যকে দক্ষতার সঙ্গে চলাচল করায়। এতে উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের ব্যয় ও বাধা কমে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট গবেষণাগারের শক্ত ভিতও মহানগর অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও নতুন পণ্যের ধারাকে সচল রাখে। কাইজেনের মতো চর্চায় প্রকাশিত ক্রমাগত উন্নতির সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার, জনসংখ্যার বার্ধক্যের মধ্যেও উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
শক্তির আরেকটি স্তম্ভ অর্থায়ন। এশিয়াজুড়ে ব্যাংকিং, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট ট্রেজারি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টোকিও। আঞ্চলিক পুঁজিবাজার ও মুদ্রা লেনদেনে শহরটির ভূমিকা এর শিল্পভিত্তির পরিপূরক। এর ফলে বিনিয়োগ ও সীমান্তপারের লেনদেন বাড়ে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও কর রাজস্বেও অবদান রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের নগর অর্থনীতিকে চালায় যেভাবে নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস
নিউইয়র্ক মহানগর অর্থনীতি একটি আর্থিক পরাশক্তি। এখানে রয়েছে বিনিয়োগ ব্যাংক, প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান, হেজ ফান্ড ও বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ, যেগুলো প্রতিদিনের লেনদেনে বৈশ্বিক পুঁজিপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি, বায়োটেক, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও উন্নত সেবার মতো বৈচিত্র্যময় খাত যুক্ত হয়েছে। এতে চক্রাকার উত্থান-পতনের প্রভাব কমে এবং দক্ষ জনবলের জোগান শক্তিশালী থাকে। পরিচালন ব্যয়ের উচ্চতা বাধা তৈরি করলেও বিশেষজ্ঞ, নেটওয়ার্ক ও বিনিয়োগ-চুক্তির প্রবাহের ঘনত্ব বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করে চলেছে।
সাংস্কৃতিক পুঁজি কীভাবে অর্থনৈতিক উৎপাদন বাড়ায়, বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেস তার উদাহরণ। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার মধ্যে এখন রয়েছে স্ট্রিমিং কনটেন্ট নির্মাণ, গেমিং, নকশা এবং সম্প্রসারিত মহাকাশ ও মহাকাশপ্রযুক্তি শিল্পগুচ্ছ। এ অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুযোগ এবং বিপুলসংখ্যক কনটেন্ট নির্মাতা একে দ্বৈত পরিচয় দিয়েছে: একদিকে সৃজনশীলতার কেন্দ্র, অন্যদিকে প্রযুক্তি উৎপাদক। সান পেদ্রো বে বন্দরের মাধ্যমে লজিস্টিক কার্যক্রমও অর্থনীতির পরিসর বাড়ায় এবং পশ্চিম উপকূলের বাণিজ্যকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় সরবরাহশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করে।
এশিয়ার উত্থানে বদলে যাচ্ছে নগর অর্থনীতির শীর্ষ তালিকা
সিউল, সাংহাই, বেইজিং, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে শীর্ষস্থানীয় নগর অর্থনীতিতে এশিয়ার অংশ বেড়েছে। পঞ্চম স্থানে থাকা সিউল সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল সেবায় দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তির পরিচায়ক। দশম স্থানে থাকা সাংহাই উৎপাদনশিল্পের উন্নয়ন ও গবেষণাসক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থায়ন ও লজিস্টিক খাতের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠছে। শীর্ষ ১০-এর ঠিক বাইরে থাকা বেইজিংয়ে রয়েছে নীতিনির্ধারণের নেতৃত্ব, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত শিল্পের জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সমাবেশ।
সিঙ্গাপুর ও হংকংসহ আরও কয়েকটি এশীয় কেন্দ্রও বৃহত্তর তালিকায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। রপ্তানিনির্ভর উৎপাদন, দ্রুত বর্ধনশীল সেবা খাত এবং বন্দর, বিমানবন্দর ও নগর গণপরিবহনে সরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে কয়েকটি মহানগর অঞ্চলে বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠছে।
নগর জিডিপি কীভাবে হিসাব করা হয়, আর কী বাদ পড়ে
অর্থনীতির আকার বোঝাতে নগর জিডিপি একটি ব্যবহারিক সংক্ষিপ্ত মাপকাঠি, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখানে আইনি নগরসীমার বদলে মহানগর এলাকার পরিসংখ্যান দেওয়া হয়, কারণ অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পৌরসীমা পেরিয়ে বিস্তৃত। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ মহানগর অঞ্চল ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে, ফলে দেশগুলোর মধ্যে তুলনা পুরোপুরি নিখুঁত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্লেষকদের সরকারি উপ-জাতীয় হিসাবের বদলে পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করতে হয়, বিশেষ করে ওইসিডির বাইরের দেশগুলোতে। শিরোনামের পরিসংখ্যান অর্থনীতির আকার তুলে ধরে, জীবনযাত্রার মান বা আয়ের বণ্টন নয়।
মহানগর এলাকা বনাম মূল শহর
মহানগর অর্থনীতিতে মূল শহরের পাশাপাশি এর সঙ্গে যাতায়াত ও সরবরাহশৃঙ্খলের মাধ্যমে যুক্ত আশপাশের শহর ও উপশহর অন্তর্ভুক্ত থাকে। মানুষ কোথায় কাজ করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কোথায় কারখানা, গবেষণাগার, গুদাম ও কার্যালয় স্থাপন করে, এই পদ্ধতিতে তা আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়। এ কারণেই এসব তালিকায় লস অ্যাঞ্জেলেস বা প্যারিসের মতো নাম অনেক সময় পৌরসীমার বদলে বৃহত্তর নগর এলাকাকে বোঝায়।
নামমাত্র জিডিপি বনাম জীবনযাত্রার ব্যয়
তালিকায় মার্কিন ডলারে নামমাত্র জিডিপি ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের দামের পার্থক্য বা বিনিময় হারের ওঠানামা এতে সমন্বয় করা হয় না। স্থানীয় উৎপাদনের ধারা স্থিতিশীল থাকলেও কোনো বছরের বিনিময় হার অনুযায়ী দুর্বল বা শক্তিশালী মুদ্রা একটি শহরকে তালিকায় ওপরে বা নিচে নামাতে পারে। মাথাপিছু জিডিপি, মধ্যম মজুরি বা দারিদ্র্যের হার স্থানীয় সমৃদ্ধির ভিন্ন চিত্র দিত।
জিডিপি, ব্যক্তিগত সম্পদ ও প্রভাব এক বিষয় নয়
উৎপাদন বেশি হলেই কোনো শহর কোটিপতিদের প্রধান আকর্ষণ হবে, এমন নয়। আবার সংস্কৃতি, নীতি ও উদ্ভাবনে শহরটির প্রভাব যে সবচেয়ে বেশি, তাও বোঝায় না। কিছু তালিকায় শহরের বাসিন্দা উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তির সংখ্যা বা শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের হিসাব করা হয়, যা ব্যক্তিগত সম্পদের কেন্দ্রীভবন মাপে। এ পদ্ধতিতে প্রায়ই বৈশ্বিক অর্থায়নের কেন্দ্র এবং শক্তিশালী ব্যক্তিগত ব্যাংকিং ও কর-সুবিধাসম্পন্ন স্থানগুলো এগিয়ে থাকে। অন্য সূচকে অর্থায়ন, ফ্যাশন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও শাসনব্যবস্থায় শহরের অর্থনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে স্থান দেওয়া হয়। এসব সূচকে লন্ডন প্রায়ই নিউইয়র্ক ও টোকিওর সঙ্গে শীর্ষস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কারণ পুঁজিবাজার, আইনি সেবা, সংগীত ও চলচ্চিত্রে শহরটির শক্ত ভিত রয়েছে এবং ব্রেক্সিটের পর অঞ্চলগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে এর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, কোনো অর্থনীতি উৎপাদনের আকারে বিশাল হতে পারে, প্রভাবে উল্লেখযোগ্য হতে পারে, কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারে। কিছু শহরের ক্ষেত্রে তিনটিই সত্য। অন্যরা বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে এগিয়ে। টোকিওর আকারের ভিত্তি অতুলনীয় শিল্পভিত্তি, ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও বৈশ্বিক সেবায় নিউইয়র্কের পারদর্শিতা, আর মহাদেশগুলোর মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে লন্ডনের অবস্থান এখনো দৃঢ়।
শীর্ষ ১০-এর বাইরের আঞ্চলিক চিত্র
শীর্ষ ১০-এ জাপানের দুটি মহানগর রয়েছে: প্রথম স্থানে টোকিও এবং অষ্টম স্থানে ওসাকা কোবে। দেশটির শক্তিশালী উৎপাদন ঐতিহ্য ও স্থিতিশীল রপ্তানি খাতের পরিচয় দেয় এই দুই শহর। শীর্ষ ১০-এ যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি মহানগর রয়েছে এবং বড় ও বৈচিত্র্যময় মহানগর অর্থনীতির সুবাদে শীর্ষ ২৫-এ দেশটি প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মধ্যে বৃহত্তর ওয়াশিংটন ১২তম, ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ ১৩তম, হিউস্টন ১৪তম, বোস্টন ১৫তম, সিয়াটল ১৮তম, ফিলাডেলফিয়া ১৯তম, আটলান্টা ২০তম এবং সিলিকন ভ্যালি ২৪তম স্থানে রয়েছে।
ইউরোপের প্রধান শহরগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থায়ন, আইন ও গণমাধ্যমে শক্তিশালী লন্ডন চতুর্থ স্থানে, আর বিলাসপণ্য, উন্নত শিল্প ও গবেষণার সমন্বয়ে প্যারিস ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক চাপ ও আবাসনবাজারের অস্থিরতার সময় পার করলেও এই দুই শহরের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট সদর দপ্তর এখনো পুঁজি ও দক্ষ জনবলকে আকৃষ্ট করে।
পূর্ব এশিয়ায় ৮৬৭.৮৩ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদন নিয়ে তাইপে ২৫তম স্থানে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে উন্নত ইলেকট্রনিকস সরবরাহশৃঙ্খল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদনকারীদের শক্ত ভিত্তি। শীর্ষস্থানীয় চীনা শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে বেইজিং ও সাংহাই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিক সংযোগকারী শহরগুলো তালিকায় এগিয়ে আসছে।
নগর অর্থনীতির প্রাণশক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত
নগর অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয় যখন সেখানে দক্ষ জনবল, পুঁজি ও অবকাঠামোর সমন্বয় ঘটে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় সাশ্রয়ী ও গণপরিবহন দক্ষ থাকে। এ জন্য জনসেবায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তাদের বাধা কমায় ও গবেষণাগারের উদ্ভাবন দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে যেতে সহায়তা করে এমন নীতিকাঠামো প্রয়োজন।
বিভিন্ন নগর সূচক সংকলনকারী একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাবিষয়ক সাময়িকীর প্রধান নির্বাহী ও সম্পাদকীয় পরিচালক অমরেন্দ্র ভূষণ ধীরাজ নগর কর্মদক্ষতা নিয়ে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই ভারসাম্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
সবচেয়ে সফল শহরগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত দিক বদলাতে পারে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থায়িত্ব ও অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রাখে।
শীর্ষ ২৫-এর প্রতিটি মহানগরের ক্ষেত্রেই এই মানদণ্ড প্রযোজ্য। যেসব শহর অবকাঠামো উন্নত করবে, অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করবে, আবাসনের জোগান বাড়াবে, বিদ্যুৎ গ্রিডের চাপ কমাবে এবং পণ্য পরিবহন সহজ করবে, তারাই বাসিন্দাদের প্রবৃদ্ধির প্রতি সমর্থন ধরে রেখে উৎপাদনে পরবর্তী কয়েক শ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারবে।
ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণে এই তালিকার গুরুত্ব
বিনিয়োগকারী ও নির্বাহীদের কাছে বৃহত্তম নগর অর্থনীতির তালিকা হলো বাজারের গভীরতার মানচিত্র। কোথায় বড় পরিসরে ক্রেতা পাওয়া যাবে, কোথায় সরবরাহশৃঙ্খল কার্যকর এবং কোথায় বিশেষায়িত দক্ষতার সমাবেশ প্রকল্পের সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ায়, তা এটি নির্দেশ করে। জিডিপির শিরোনাম পর্যায়ের পরিসংখ্যান থেকে জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো, স্কুল ও গণপরিবহনে ব্যয় করার মতো করভিত্তিরও আভাস মেলে। এসব বিষয় আবার ব্যবসা পরিচালনার সহজতার ওপর প্রভাব ফেলে।
মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য তালিকাটি মনে করিয়ে দেয়, দক্ষ জনবল ও পুঁজির প্রতিযোগিতা চলে মহানগর পর্যায়ে। আবাসনের সাশ্রয়যোগ্যতা, যাতায়াতের সময়, সবুজ স্থান এবং শিশুযত্নের সুযোগ দক্ষ কর্মীরা কোনো শহরে থাকবেন কি না, তা প্রভাবিত করে। বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ও পানিব্যবস্থা কোথায় প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান এবং অনুমোদন ও পণ্য পরিবহনের বাধা দূর করতে পারা শহরগুলো সুবিধা পায়।
ঝুঁকিও রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বন্যা ও তাপপ্রবাহ, পুরোনো অবকাঠামো এবং মুদ্রার ওঠানামার প্রভাব প্রবৃদ্ধিকে হুমকিতে ফেলতে পারে। সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক মহানগর অর্থনীতিগুলো বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থা নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানির নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, সেতু ও সুড়ঙ্গ শক্তিশালী করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের কাজ করছে। এসব বিনিয়োগে শুরুতে ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি ও বিঘ্ন কমে।
জেনে রাখুন
- ২০২৫ সালে ২.৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে বৈশ্বিক নগর অর্থনীতির তালিকায় প্রথম টোকিও। নিউইয়র্ক ২.৪৯ ট্রিলিয়ন এবং বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেস ১.৬২ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে এর পরেই রয়েছে।
- শীর্ষ ১০ মহানগর এলাকা বিশ্ব জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী, যা বড় নগরকেন্দ্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন তুলে ধরে।
- এশিয়ায় উচ্চ উৎপাদনশীল মহানগর অর্থনীতির অংশ বাড়ার প্রতিফলন সিউলের পঞ্চম ও সাংহাইয়ের দশম অবস্থান। বেইজিং ১১তম এবং তাইপে ২৫তম স্থানে রয়েছে।
- তালিকায় ৩০০টি মহানগর এলাকা অন্তর্ভুক্ত এবং এতে মার্কিন ডলারে নামমাত্র জিডিপি ব্যবহার করা হয়েছে; জীবনযাত্রার ব্যয় বা বিনিময় হারের সমন্বয় করা হয়নি।
- নগর জিডিপি অর্থনীতির আকার বোঝায়, ব্যক্তিগত সম্পদের কেন্দ্রীভবন বা সাংস্কৃতিক ও নীতিনির্ধারণী প্রভাব নয়; সেগুলো অন্য সূচকে মাপা হয়।
- প্রযুক্তি ও বায়োটেক খাতের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিসহ নিউইয়র্ক এখনো আর্থিক পরাশক্তি, আর লস অ্যাঞ্জেলেসে বিনোদন, প্রযুক্তি ও মহাকাশ শিল্পের সমন্বয় রয়েছে।
- অর্থায়ন, উন্নত শিল্প ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে লন্ডন ও প্যারিস ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে।
- নেতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিসংখ্যান দেখায়, কোথায় বৃহৎ পরিসর, দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর সমন্বয় রয়েছে এবং নীতিগত উন্নয়নে কোথায় পরবর্তী প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।






