মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির জেরে চীনের পাল্টা প্রস্তাব
বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার নতুন এক পর্যায়ে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে মালয়েশিয়া। অক্টোবরের শেষ দিকে মালয়েশিয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের (আসিয়ান) সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই করে কুয়ালালামপুর। চুক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্কছাড় এবং ডিজিটাল বাণিজ্য, মানদণ্ড ও বিনিয়োগে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কথা রয়েছে। তবে এতে এমন কিছু ধারাও আছে, যা জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নীতিগত সামঞ্জস্যের চাপ তৈরি করে।
সূচিপত্র
- মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির জেরে চীনের পাল্টা প্রস্তাব
- অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তিগুলোতে কী আছে
- শুল্ক ও মানদণ্ড
- অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ধারা
- ‘পয়জন পিল’ ধারা নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ কেন
- বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন আলোচনার কেন্দ্রে
- একই চাপ কীভাবে সামলাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো
- মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগের হিসাব
- কুয়ালালামপুরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
- বাস্তবায়নকালজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমঝোতা বহাল থাকলে কী হবে
- জেনে রাখুন
উদ্বেগের সঙ্গে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং। চীনা কর্মকর্তারা মালয়েশিয়ার কাছে ব্যাখ্যা চান। এরপর দুই পক্ষকে আশ্বস্ত করা এবং দেশটিতে চীনের বিস্তৃত বাণিজ্যিক উপস্থিতি ধরে রাখার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব দেয় তারা। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তেংকু জাফরুল আজিজ বলেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে কৌশলগত খাতগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের ভাষায় এর অর্থ আধুনিক শিল্পকে একসূত্রে বাঁধা সংযোগগুলো, যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খল, সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল মৃত্তিকা উপাদান।
চীনের প্রস্তাব আঞ্চলিক পর্যায়ে বৃহত্তর টানাপোড়েনেরই ইঙ্গিত দেয়। কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই ধরনের বাণিজ্য চুক্তি সই করার পরপরই চীনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া এখনো শর্ত নিয়ে আলোচনা করছে এবং দেশটির জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়িয়ে দেবে—এমন দাবির বিরোধিতা করেছে। প্রতিটি দেশই চীন থেকে বাজারে প্রবেশাধিকার, পুঁজি বা প্রযুক্তি হারানো ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে চাইছে। বাণিজ্য এখন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ায় এই ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তিগুলোতে কী আছে
যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগুলোর কাঠামো সহজ। অংশীদার দেশগুলো থেকে আমদানিতে উচ্চ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। এরপর যোগ্য চুক্তিতে সই করে তা বাস্তবায়নকারী দেশগুলোর জন্য নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত পণ্যে শুল্ক শূন্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। অংশীদার দেশগুলোর সরকার নিজ নিজ বাজার উন্মুক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সহযোগিতার অঙ্গীকার করে।
শুল্ক ও মানদণ্ড
মালয়েশিয়ার বেশির ভাগ রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। তবে নতুন চুক্তিতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে যেসব পণ্যে শুল্ক শূন্য হবে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। মালয়েশিয়া নির্দিষ্ট কিছু মহাকাশ সরঞ্জাম, ওষুধ, পাম তেল, কোকো ও রাবারের ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছে। থাইল্যান্ড প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যের শুল্ক তুলে নিতে এবং টেলিযোগাযোগ খাতের কিছু অংশে বিদেশি মালিকানার দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ শিথিল করতে সম্মত হয়েছে। ভিয়েতনাম ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক মেনে নিয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের ওপর অনেক বাধা তুলে নেবে। কয়েকটি অংশীদার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নির্গমন মান অনুযায়ী তৈরি যানবাহন গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এই পরিবর্তনে অঞ্চলের গাড়িশিল্পের সরবরাহসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে নতুন রূপ আসতে পারে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ধারা
চুক্তিগুলো শুল্কের তালিকার বাইরেও বিস্তৃত। মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়া ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠানো পণ্যে শুল্ক আরোপে স্থায়ী স্থগিতাদেশ সমর্থন, শুল্কবহির্ভূত বাধা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রসাধনী, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার অঙ্গীকার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের রপ্তানি নিষিদ্ধ বা এর ওপর কোটা আরোপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। অংশীদার দেশগুলোর সরকার সংবেদনশীল খাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এবং বিনিয়োগ যাচাই-বাছাইয়ের কিছু দিক যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেও সম্মত হয়েছে। এখন যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তার মূল বিষয় এটিই; কারণ এর প্রভাব পড়ছে চীনের উন্নত শিল্পের বাণিজ্যিক ধমনিতে এবং দুই পরাশক্তির সঙ্গে এই অঞ্চলের সংযোগে।
‘পয়জন পিল’ ধারা নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ কেন
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তির কয়েকটি অংশ, বিশেষ করে যেসব ধারায় বাণিজ্য সুবিধাকে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের শর্তে বাঁধা হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে চীন। বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে এমন একটি ধারা, যেটিকে প্রায়ই ‘পয়জন পিল’ বলা হয়। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কুয়ালালামপুর পরে এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করলে, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য হুমকি বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি শুল্ক ফিরিয়ে আনতে পারে। চুক্তির ভাষ্যে চীনের নাম নেই, তবে অঞ্চলজুড়ে নীতিনির্ধারকদের কাছে লক্ষ্যটি স্পষ্ট।
আইএনজি-র বৃহত্তর চীনবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং সতর্ক করেছেন, এ ধরনের ধারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলোকে নিজেদের নীতিগত নমনীয়তার বিনিময়ে অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের ধারা শুল্কের বাইরেও অংশীদার দেশগুলোর আচরণ প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি।
এ ধরনের ধারা দেশগুলোকে কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।
বেইজিংয়ের জন্য ঝুঁকি দুটি। প্রথমত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নীতির আরও ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য চীনের উন্নত চিপ, উৎপাদন সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার আরও সীমিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই চালু করলে, গত দুই দশকে গভীর সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা ঠিক সেই স্থানগুলোতেই চীনা পুঁজি ও প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাধার মুখে পড়তে পারে।
বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন আলোচনার কেন্দ্রে
এই চুক্তিগুলোর মূল বিষয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যদিও তা নীরবে সামনে এসেছে। মালয়েশিয়ায় বিরল মৃত্তিকা উপাদানের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে; আগের হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ কয়েক কোটি টন। দেশটি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে নিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঁচা বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। তা সত্ত্বেও ২০২৪ সালে মিয়ানমারের পর চীন থেকে বিরল মৃত্তিকা আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হয়ে ওঠে মালয়েশিয়া। এই বাস্তবতা দুই পক্ষের সরবরাহ শৃঙ্খল কৌশলেই মালয়েশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনা এবং বিরল মৃত্তিকা ও চুম্বক উৎপাদনে চীনের প্রাধান্য মোকাবিলায় সহযোগিতার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পাঠানো সীমিত না করার মালয়েশিয়ার প্রতিশ্রুতি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিকসের জন্য অপরিহার্য চুম্বক, ব্যাটারি ও অন্যান্য উপকরণে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা মার্কিন উৎপাদক ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের কিছুটা নিশ্চয়তা দেয়।
আসিয়ান সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তাদের আলোচনায় খনিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সাময়িক সমঝোতাও হয়েছে। কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন থেকে আমদানিতে পরিকল্পিত অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক বাতিল এবং একই সঙ্গে চীনের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এক বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার কাঠামো তৈরি হয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলে কোম্পানিগুলো চুক্তি ও মজুত ব্যবস্থাপনার কৌশল বদলানোর সময় পাবে। এতে কাঠামোগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিটবে না, তবে চুম্বক, অক্সাইড ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের ক্রেতাদের জন্য নিকট ভবিষ্যতের অস্থিরতা কমতে পারে।
একই চাপ কীভাবে সামলাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো আলোচনা করছে ইন্দোনেশিয়া। জাকার্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কিছু দাবি তাদের কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিরোধের একটি বিষয় জাহাজ চলাচল। নির্দিষ্ট কিছু রুটে চীনা জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে চললে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিকারকদের সরবরাহ খরচ বাড়বে। তাঁদের অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবহন সক্ষমতা, সময়সূচি ও ভাড়ার ওপর নির্ভর করেন। জ্বালানির দাম ও বন্দরের জটের কারণে পরিবহন খরচ যেখানে এমনিতেই অনেক ওঠানামা করে, সেখানে জাহাজ চলাচলকারীদের ওপর সামান্য বিধিনিষেধও পণ্য ও শিল্পপণ্যের লাভের মার্জিনে প্রভাব ফেলতে পারে।
ভিয়েতনাম এমন এক কাঠামোতে সই করেছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল থাকবে। এর বিনিময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পণ্যে শুল্ক তুলে নেবে এবং কৃষিপণ্য ও উড়োজাহাজ কেনার বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পাঠানো পণ্যে শুল্ক না আরোপ এবং শুল্কবহির্ভূত বাধার একটি তালিকা সমাধানের বিষয়েও সম্মত হয়েছে হ্যানয়। পাশাপাশি বাণিজ্যের ভারসাম্য ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কেনা বাড়াবে ভিয়েতনাম। দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা এবং উচ্চতর শুল্কের ধাক্কা—দুটিই এই পদক্ষেপের পেছনে কাজ করছে।
থাইল্যান্ড এমন একটি কাঠামোতে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক মেনে নিয়েছে, যাতে দেশটি প্রায় সব পণ্যের শুল্ক তুলে নেবে, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন দ্রুত করবে এবং শ্রম, পরিবেশ, মেধাস্বত্ব ও ডিজিটাল বাণিজ্যের মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করবে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি সমঝোতা স্মারকেও সই করেছে ব্যাংকক। এতে বোঝা যায়, শিরোনামে আসা শুল্কের অঙ্কের পাশাপাশি চুম্বক ও ব্যাটারির উপকরণ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতাও বাণিজ্যের অগ্রাধিকার নতুন করে সাজাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রগামী পোশাক ও জুতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল কম্বোডিয়ার অর্থনীতি প্রায় সব মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যে শুল্ক তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে নির্বাহী আদেশের আওতায় কম্বোডিয়ার শত শত পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমবে বা শুল্ক শূন্য হবে। এই আদেশেই চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর জন্য এমন ছাড় দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহযোগিতায়ও সম্মত হয়েছে নমপেন। মালয়েশিয়ার কাছে করা প্রশ্নের মতোই প্রশ্ন নিয়ে চীন কম্বোডিয়ার কর্মকর্তাদের কাছে গেছে। এতে মনে করিয়ে দেয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করার সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই এই ধারাগুলোকে দেখছে বেইজিং।
মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিনিয়োগের হিসাব
বিশ্বের ইলেকট্রনিকস শিল্পে মালয়েশিয়ার উৎপাদনভিত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর সংযোজন, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ে। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাওয়া চিপ নির্মাতারা দক্ষ শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠিত সরবরাহকারীদের নিয়ে পরিচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কেন্দ্রে কার্যক্রম রেখে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি তাতে নতুন প্রতিশ্রুতির পথ খুলে দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও নিরাপত্তা মানদণ্ড গ্রহণ করলে দেশটিতে নতুন কারখানা বা সম্প্রসারণের কথা ভাবছে—এমন মার্কিন মহাকাশ, চিকিৎসা ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধা কমবে।
তবে এর বিনিময়ও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখলে মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান এবং দেশটিতে কার্যক্রম চালানো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিধি মেনে চলার বাড়তি বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। চীনা নকশা, মালয়েশিয়ায় প্যাকেজিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত বাজারকে যুক্ত করা জটিল নেটওয়ার্কে থাকা কোম্পানিগুলোকে পণ্যের প্রবাহ নিরূপণ, প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং চিপ তৈরির সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারসংক্রান্ত বিধি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে উৎসাহিত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিনিয়োগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন, যাতে ইলেকট্রনিকস, বিদ্যুৎ গ্রিডের সরঞ্জাম ও পরিবহন অবকাঠামোর বৈধ প্রকল্পগুলো নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তায় থমকে না যায়।
কৌশলগত খাতভিত্তিক প্রস্তাবিত চীনা সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য হবে, চীনের শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রে মালয়েশিয়ার অবস্থান ধরে রাখা। মালয়েশিয়ার অনেক কারখানার জন্য চীনা পুঁজি, সরঞ্জাম ও মধ্যবর্তী পণ্যের প্রবেশাধিকার এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিংয়ের সঙ্গে যেকোনো দ্বিপক্ষীয় কাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর না করে; একই সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও নিশ্চিত হতে পারে যে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য মালয়েশিয়া তাদের উপযোগী প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে।
কুয়ালালামপুরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
মালয়েশিয়ার নেতারা দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। বিশ্বজুড়ে এক বছর ধরে শুল্কের ধাক্কা ও কঠোরতর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের পর এই ধারণা এখন আর শুধু স্লোগান নয়। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং প্রকল্প অর্থায়ন ও শিল্প সহযোগিতার বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে মালয়েশিয়া। ২০২৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আঞ্চলিক সফরের সময় মালয়েশিয়া ও চীন কয়েক ডজন চুক্তি এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে নতুন যৌথ সংলাপ কাঠামোর ঘোষণা দেয়। এসব পদক্ষেপে বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি পরিত্যাগ না করেই ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের আগ্রহের ইঙ্গিত ছিল।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এখনো রপ্তানির প্রধান গন্তব্য এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগের উৎস। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য, নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এবং বিনিয়োগ যাচাই-বাছাইয়ের শর্ত রয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও অবকাঠামো খাতে। স্বচ্ছতা ও সতর্কতার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিসরে এসব শর্ত বাস্তবায়ন করলে মালয়েশিয়া উন্মুক্ততা বজায় রেখেই জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে পারবে। তবে নিয়মের পরিসর অতিরিক্ত বিস্তৃত হলে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ গ্রিড, বন্দর ও শিল্প পার্কের উন্নয়ন ধীর হয়ে যেতে পারে।
দেশের ভেতরের বিতর্কে নীতিগত সামঞ্জস্যের বাস্তব পরিসরই সম্ভবত কেন্দ্রীয় বিষয় হবে। মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো জানতে চাইবে, সহযোগী প্রতিষ্ঠান যাচাই এবং তৃতীয় দেশের লেনদেন নজরদারিতে তাদের কত দূর যেতে হবে। চীনা বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক পালাবদল থেকে প্রকল্প সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ খুঁজবে। নীতিনির্ধারকদের সামনে পরীক্ষা হলো, তারা কি এমন স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করতে পারবেন, যাতে দুই পথের সুবিধাই বজায় থাকে—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং চীনের সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগ—অথচ কোনো পক্ষের চুক্তিতে থাকা শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর না হয়।
বাস্তবায়নকালজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সমঝোতা বহাল থাকলে কী হবে
আসিয়ান সম্মেলনের ফাঁকে দুই পক্ষের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, উত্তেজনা বাড়ানো সাময়িকভাবে থামাতে একটি কাঠামোতে তারা একমত হয়েছেন। এই সমঝোতায় নভেম্বরে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা নতুন অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বাতিল, চীনের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এক বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া এবং কৃষিপণ্য কেনা ও ফেন্টানিল তৈরিতে ব্যবহৃত পূর্বসূরি রাসায়নিকের সরবরাহ নিয়ে পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। দুই প্রেসিডেন্টের বৈঠকে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়া এবং পাল্টা পদক্ষেপে ৯০ দিনের বিরতি বাড়ানোর কথা ছিল।
এই কাঠামো বহাল থাকলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য পরিকল্পনাকারীদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমতে পারে। শুল্কের হার স্থিতিশীল থাকা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ পিছিয়ে গেলে প্রতি তিন মাসে শুল্কের ধাক্কার আশঙ্কা না করেই কারখানাগুলো কেনাকাটা ও মজুতের পরিকল্পনা করতে পারবে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে এই অবকাশ কর্মকর্তাদের এমন একটি বাস্তবসম্মত নকশা চূড়ান্ত করতে সহায়তা করবে, যাতে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সমঝোতা স্মারকের আওতায় চীনা বিনিয়োগ ও সহযোগিতার জন্য স্পষ্ট পরিসর রাখা যায়। তবে কাঠামোগত প্রতিযোগিতা চলতেই থাকবে। সাময়িক সমঝোতায় চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হার্ডওয়্যার, লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম এবং চুম্বক উৎপাদনের ওপর কঠোর নজরদারি কমবে না।
আঞ্চলিক দেশগুলো ঝুঁকি কমাতে একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন ইউরোপ ও কানাডার সঙ্গে চুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে। আরও বিস্তৃত ও পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামোয় বাণিজ্য নিয়ম স্থির করতে কয়েকটি সরকার ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারত্বের জন্য সমন্বিত ও অগ্রগামী চুক্তিতে যোগদান বা এর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর একই প্রচেষ্টার অংশ এসব পদক্ষেপ।
জেনে রাখুন
- মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্কছাড় ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে সহযোগিতাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের শর্তে বাঁধা হয়েছে।
- ব্যাখ্যা চেয়ে এবং প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খল, সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল মৃত্তিকা উপাদান নিয়ে কৌশলগত সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন।
- যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির একটি ধারা অনুযায়ী, মালয়েশিয়া পরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য হুমকি বলে বিবেচিত কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করলে ওয়াশিংটন উচ্চতর শুল্ক ফিরিয়ে আনতে পারে।
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে: যুক্তরাষ্ট্রে এসব খনিজ পাঠানো সীমিত না করার অঙ্গীকার করেছে মালয়েশিয়া। বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নতুন শুল্ক বাড়ানো সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।
- চীনা জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করবে—এমন মার্কিন দাবির বিরোধিতা করছে ইন্দোনেশিয়া; তাদের যুক্তি, এতে রপ্তানিকারকদের খরচ বাড়বে।
- ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড এমন কাঠামো মেনে নিয়েছে, যাতে উচ্চ পাল্টা শুল্ক বহাল থাকবে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর অনেক বাধা তুলে নেওয়া হবে। থাইল্যান্ড প্রায় সব শুল্কই তুলে নেবে।
- যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক তুলে নিয়ে দেশটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যে সম্মত হয়েছে কম্বোডিয়া। এ নিয়ে বেইজিং প্রশ্ন তুলেছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যাচাই-বাছাই ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে গিয়ে চীনা বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত না করা এবং কোনো পক্ষের চুক্তির শাস্তিমূলক ধারা কার্যকর না হওয়া নিশ্চিত করাই মালয়েশিয়ার চ্যালেঞ্জ।






