মিশনের মাঝপথে বিরল বিপত্তি, দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষের আঘাত
জানালায় ফাটল দেখা দেওয়ায় চীনের মানব মহাকাশযান কর্মসূচিতে মিশনের মাঝপথে প্রথমবারের মতো পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত শেনঝৌ-২০ মহাকাশযানটি নভোচারী ছাড়াই পৃথিবীতে ফেরাবে চীন। কক্ষপথে থাকা দলের জন্য জরুরি ফেরার যান নিশ্চিত করতে এবং নভোচারীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশন ঘিরে এক সপ্তাহ ধরে জরুরি কার্যক্রম চালানোর পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূচিপত্র
- মিশনের মাঝপথে বিরল বিপত্তি, দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষের আঘাত
- জানালায় কী পেয়েছেন প্রকৌশলীরা
- কীভাবে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলো
- ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষ কেন বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে
- যাত্রা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ছিল নিরাপত্তার স্বার্থে
- নভোচারীহীন ফেরা ও পরিদর্শনে যা যা করা হবে
- তিয়ানগংয়ের কার্যক্রমে জরুরি ফেরার যানের ভূমিকা
- এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি অন্য মিশনগুলো যেভাবে সামলেছে
- আগামী কয়েক মাসে যা দেখার
- মূল বিষয়গুলো
৫ নভেম্বর মহাকাশযান বিচ্ছিন্ন করার আগে নিয়মিত পরীক্ষার সময় সমস্যাটি ধরা পড়ে। নভোচারীরা ফেরার ক্যাপসুলের জানালার কিনারায় একটি ছোট ত্রুটি দেখতে পান। পরে বিভিন্ন কোণ থেকে তোলা ছবি এবং তিয়ানগংয়ের বাইরের ক্যামেরার ছবিতে বোঝা যায়, এটি উপরিভাগের কোনো দাগ নয়, সত্যিকারের ফাটল। প্রকৌশলীরা মনে করেন, নভোচারীসহ ফেরার ঝুঁকি অগ্রহণযোগ্য; কারণ চাপযুক্ত পুনঃপ্রবেশ ক্যাপসুলে চাপ ও তাপের কারণে ফাটল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শেনঝৌ-২০-এর তিন নভোচারী তিয়ানগংয়ে ছয় মাসের দায়িত্ব শেষ করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিরে না গিয়ে তাঁরা বিকল্প মহাকাশযানের জন্য নয় দিন অপেক্ষা করেন, তারপর শেনঝৌ-২১-এ চড়ে পৃথিবীর পথে রওনা হন। অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার দংফেং অবতরণস্থলে তাঁদের অবতরণের মধ্য দিয়ে কক্ষপথে কোনো চীনা দলের টানা অবস্থানের নতুন রেকর্ড হয়—২০০ দিনের কিছু বেশি।
ক্ষতিগ্রস্ত শেনঝৌ-২০ এখনো স্টেশনে যুক্ত রয়েছে। প্রকৌশলীরা ফেরার উচ্চচাপের পর্যায়গুলোতে ফাটলধরা জানালাটি কীভাবে আচরণ করে তা পরীক্ষা করতে এবং ভবিষ্যৎ নকশার জন্য উড্ডয়ন-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে নভোচারী ছাড়াই যানটিকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথিবীতে ফেরার নির্দেশ দেবেন। চায়না ম্যানড স্পেস এজেন্সির মুখপাত্র জি ছিমিং বলেন, যানটি নভোচারী ছাড়াই ফিরবে এবং উড্ডয়নের সময় এমন মূল্যবান পরিমাপ সংগ্রহ করবে, যা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
জানালায় কী পেয়েছেন প্রকৌশলীরা
কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলছেন, এর জন্য সম্ভবত মহাকাশের অতি ক্ষুদ্র একটি ধ্বংসাবশেষ দায়ী। বালুকণার চেয়েও ছোট কণা নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক কিলোমিটার আপেক্ষিক গতিতে আঘাত হানতে পারে। এ সংঘর্ষে নির্গত শক্তি কাচ ও ধাতুতে চিড় ধরাতে বা ফাটল সৃষ্টি করতে যথেষ্ট। মহাকাশযানের নকশা দলের ভাষ্য অনুযায়ী, শেনঝৌ-২০-এর জানালায় পুরুত্ব ভেদ করে ফাটল তৈরি হয়েছে, যা জানালার ভেতরের পৃষ্ঠ থেকে বাইরের পৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং জানালার কিনারার কাছে দৃশ্যমান।
চায়না একাডেমি অব স্পেস টেকনোলজির চীনা নভোচারীবাহী মহাকাশযান ব্যবস্থার প্রধান নকশাবিদ জিয়া শিজিন মূল্যায়ন এবং নভোচারীদের ঝুঁকির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, কাচের উপাদান বিশেষজ্ঞরা কেবিনের ভেতর থেকে তোলা ছবি ও ভিডিও এবং তিয়ানগংয়ের রোবোটিক বাহুর ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য পর্যালোচনা করেছেন। তাঁদের মূল্যায়নের পরই আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়।
আমাদের প্রাথমিক ধারণা, মহাকাশের ধ্বংসাবশেষটির আকার ১ মিলিমিটারের কম ছিল, তবে সেটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছিল। এর ফলে এক সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা ফাটল তৈরি হয়েছে। কক্ষপথে সরাসরি এটি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই শেনঝৌ-২০ ফেরার পর আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করব।
নভোচারীবাহী যানগুলোর জানালায় সাধারণত একাধিক কাচের স্তর ও অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা থাকে। শেনঝৌয়ের জানালায় তিন স্তরের কাঠামো রয়েছে। এর বাইরের তাপরোধী স্তরকে পুনঃপ্রবেশের প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে হয়, যে তাপমাত্রা ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। যেকোনো স্তরে পুরুত্ব ভেদ করে ফাটল তৈরি হলে চাপযুক্ত অবস্থায় ফেরার জন্য নকশাবিদদের নির্ধারিত নিরাপত্তার মার্জিন নষ্ট হয়। ভূ-নিয়ন্ত্রণ দল এমন একটি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিও মডেল করেছে, যেখানে পুনঃপ্রবেশের সময় ফাটলটি বাড়তে পারে, চাপ কমে যেতে পারে এবং উচ্চগতির গ্যাস কেবিনে ঢুকে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকি মেনে নেওয়ার মতো ছিল না।
কীভাবে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলো
ফাটল নিশ্চিত হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে মিশন নিয়ন্ত্রণ শেনঝৌ-২০-এর ফেরার সময় পিছিয়ে দেয় এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি চালু করে। নিরাপদে ফেরার যান আসা পর্যন্ত নভোচারীরা তিয়ানগংয়ে অপেক্ষা করেন। পরবর্তী দলের সদস্যদের নিয়ে শেনঝৌ-২১ পৌঁছালে চীন বিরল এক অদলবদল কার্যক্রম চালায়। বিদায়ী নভোচারীরা নতুন যানটিতে চড়ে পৃথিবীতে ফেরেন, ফলে আগত দলের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জরুরি ফেরার যান ছিল না।
এই ঘাটতি পূরণে মহাকাশ কর্মসূচি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি পরিকল্পনা এগিয়ে আনে। ২৫ নভেম্বর, বিলম্বের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ২০ দিন পর, লং মার্চ ২এফ রকেটে করে নভোচারীহীন শেনঝৌ-২২ উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মহাকাশযানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিত হয়ে তিয়ানগংয়ে যুক্ত হয়। এতে বর্তমানে তিয়ানগংয়ে থাকা তিন নভোচারীর জন্য আবার জরুরি ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। শেনঝৌ-২০-এর ক্ষতিগ্রস্ত জানালা সামলে যানটি ফেরার জন্য প্রস্তুত করতে প্রযুক্তিবিদদের দরকার হবে—এমন অতিরিক্ত সরঞ্জাম ও বিশেষ উপকরণও মিশনটিতে পাঠানো হয়।
ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষ কেন বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে
নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে বস্তুগুলো ঘণ্টায় নয়, প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার গতিতে চলে। দুটি বস্তু ভিন্ন কোণ থেকে এলে তাদের মুখোমুখি হওয়ার আপেক্ষিক গতি আরও বেশি হতে পারে। ভূমি থেকে শনাক্ত করার মতো ছোট নয়, এমন ক্ষুদ্র খণ্ডেরও এই গতিতে বিপুল গতিশক্তি থাকে। মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কণা ধাতুতে গর্ত করতে, কাচ ফাটাতে বা তাপরোধী আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অতীতে আরও বড় ধ্বংসাবশেষের আঘাতে মহাকাশযানের সৌর প্যানেলে দাগ পড়েছে, রেডিয়েটরের শীতলীকরণ নল ফুটো হয়েছে এবং জানালা ক্ষয়ে গেছে।
প্রকৌশলীরা এই পরিবেশ সামলানোর উপযোগী করে নভোচারীবাহী মহাকাশযান নকশা করেন। অনেক পৃষ্ঠ ‘হুইপল শিল্ড’ নামে পরিচিত স্তরযুক্ত প্রতিরোধক দিয়ে সুরক্ষিত থাকে। এগুলো চাপবাহী কাঠামোয় পৌঁছানোর আগেই ছোট কণাকে ভেঙে দেয়। জানালা আরও কঠিন সমস্যা তৈরি করে। ডকিং ও আশপাশের পরিস্থিতি বোঝার জন্য নভোচারীদের পরিষ্কারভাবে দেখতে হয়, তাই জানালায় ঘন সুরক্ষাবর্ম লাগানো যায় না। এর বদলে নকশাবিদেরা শক্ত উপাদানের পুরু, বহুস্তর কাচ ব্যবহার করেন, দৃষ্টির প্রয়োজন না হলে সুরক্ষামূলক ঢাকনা লাগান এবং জানালার আকার ও সংখ্যা সীমিত রাখেন। এসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দুর্ভাগ্যজনক কোণে বা অত্যন্ত উচ্চগতিতে আঘাত হানলে সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করা কোনো কণা ক্ষতি করতে পারে।
তালিকাভুক্ত করার মতো বড় ৩০ হাজারের বেশি বস্তুর ওপর নজর রাখে ট্র্যাকিং নেটওয়ার্কগুলো। আরও ছোট লাখ লাখ খণ্ড শনাক্ত করা যায় না, তবে ক্ষতি করার মতো যথেষ্ট বড়। পরিত্যক্ত রকেটের ধাপ, পুরোনো উপগ্রহ, সংঘর্ষে ছিটকে যাওয়া খণ্ড এবং প্রাকৃতিক উৎসের ক্ষুদ্র উল্কাখণ্ড থেকে এসব ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের মহাকাশ সংস্থা ধ্বংসাবশেষ কমানোর কিছু পদ্ধতি উৎসাহিত করে, যেমন নিষ্ক্রিয়করণ, মিশন শেষে নিয়ন্ত্রিতভাবে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করানো এবং দায়িত্বশীলভাবে বর্জন বা নির্দিষ্ট কক্ষপথে সরিয়ে নেওয়া। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও জনপ্রিয় কক্ষপথের পথে বস্তুর ঘনত্ব বাড়ছে।
ঝুঁকি কমাতে মহাকাশযাত্রীরা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল ও সুরক্ষাবর্ম—দুইয়ের ওপরই নির্ভর করেন। শনাক্ত করা ধ্বংসাবশেষ এড়াতে স্টেশন ও সেখানে আসা মহাকাশযান নিয়মিত কক্ষপথ বদলায়, আর বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি আসার আশঙ্কা থাকলে নভোচারীরা তাঁদের ফেরার ক্যাপসুলে আশ্রয় নেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহাকাশে যান চলাচলের উন্নত সমন্বয় এবং তথ্য ভাগাভাগির আহ্বান বেড়েছে। চীন অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ প্রকল্প এগিয়ে নিয়েছে এবং এ হুমকি মোকাবিলায় কক্ষচ্যুত করার পাল ও নিখুঁত ট্র্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
যাত্রা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ছিল নিরাপত্তার স্বার্থে
স্বাভাবিকভাবে পুনঃপ্রবেশের চাপ শেনঝৌ-২০ সম্ভবত সহ্য করতে পারত, কিন্তু কক্ষপথে থেকে তা প্রমাণ করার কোনো উপায় ছিল না। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনা ও পরিণতি—দুটিই বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফাটল বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও এর পরিণতি হতো প্রাণঘাতী। নিরাপদ বিকল্প ছিল ভালো অবস্থায় থাকা একটি ফেরার যান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা, তারপর ক্ষতিগ্রস্ত যানটি মানুষ ছাড়াই পৃথিবীতে ফেরানো।
অবতরণের পর মিশন কমান্ডার চেন দং এ সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ও সুফলের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে অনুসন্ধানের জন্য শৃঙ্খলা ও ধৈর্য জরুরি।
মহাকাশে মানুষের অনুসন্ধানের পথ মসৃণ নয়, এতে রয়েছে অনেক বাধা ও চ্যালেঞ্জ।
চীনের মহাকাশ স্টেশন কর্মসূচিতে এই প্রথম বিদায়ী কোনো দল এমন একটি মহাকাশযানে পৃথিবীতে ফিরেছে, যেটি নিয়ে তারা উৎক্ষেপণ করেনি। এ অভিযানে তাঁদের মিশন নয় দিন দীর্ঘ হয়েছে, দেশের নতুন মেয়াদি রেকর্ড তৈরি হয়েছে এবং জরুরি উৎক্ষেপণ ও অবতরণ-সংক্রান্ত পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ নভোচারী দলের জন্য এসব পদ্ধতি নিয়মিত প্রস্তুতির অংশ হয়ে উঠবে।
নভোচারীহীন ফেরা ও পরিদর্শনে যা যা করা হবে
আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে ফ্লাইট কন্ট্রোলাররা শেনঝৌ-২০-এর নিয়মিত পরীক্ষা করবেন, এর প্রবেশপথগুলো বন্ধ করবেন এবং তিয়ানগং থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নির্দেশ দেবেন। কক্ষপথ থেকে নামার জন্য মহাকাশযানটি রকেট ইঞ্জিন চালিয়ে নির্ধারিত পথ ধরে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করবে। গোবি মরুভূমির দংফেং অবতরণ এলাকায় উদ্ধারকারী দল প্যারাসুটের সাহায্যে মাটিতে নামার পর ক্যাপসুলটি সুরক্ষিত করবে।
প্রকৌশলীরা শুধু কাছ থেকে দেখতে চান না; পুনঃপ্রবেশের সময় ফাটলধরা জানালার আচরণ সম্পর্কেও বাস্তব তথ্য সংগ্রহ করতে চান। তাপমাত্রা, চাপ ও কম্পন মাপার সেন্সরগুলো তাপে দীর্ঘক্ষণ উন্মুক্ত থাকার প্রভাব, বায়ুর চাপ এবং শব্দজনিত চাপের ফলে ফাটল কীভাবে সাড়া দেয়, তা নথিভুক্ত করতে পারে। জি ছিমিং বলেন, এ প্রত্যাবর্তনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরীক্ষামূলক তথ্য পাওয়া যাবে। তাঁর এ কথায় ইঙ্গিত মেলে, দলটি বাস্তব পুনঃপ্রবেশের চাপের সঙ্গে তাদের মডেল ও ভূমিতে করা পরীক্ষার তুলনা করবে। বিরল হলেও গুরুতর এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে এই তথ্য ভবিষ্যৎ নকশা উন্নত করবে এবং উড্ডয়নের নিয়ম আরও কার্যকর করবে।
নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগারে পৌঁছানোর পর বিশেষজ্ঞরা ফাটলের গঠন ও মাপ নির্ণয় করতে পারবেন, আঘাতের স্থানে থাকা অবশিষ্টাংশ বিশ্লেষণ করবেন এবং অবতরণের সময় ফাটলটি ছড়িয়েছিল কি না তা পরীক্ষা করবেন। কক্ষপথের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো সুপ্ত ত্রুটি ছিল কি না, তা যাচাই করতে তদন্তকারীরা জানালা তৈরির নথি এবং স্থাপনের প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করবেন।
তিয়ানগংয়ের কার্যক্রমে জরুরি ফেরার যানের ভূমিকা
শেনঝৌ-২২ এখন স্টেশনে যুক্ত থাকায় চিকিৎসাজনিত সমস্যা বা অন্য কোনো জরুরি অবস্থা দেখা দিলে বর্তমান দলের কাছে পালানোর একটি বিকল্প রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ স্টেশনে প্রতিটি নভোচারী দলকে প্রস্তুত ফেরার ক্যাপসুলের সঙ্গে রাখা হয়। এটি জরুরি নৌকা, যাতায়াতের যান এবং তাপরোধী ঢাল হিসেবে কাজ করে—কয়েক মাস অপেক্ষার পর অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। পালাবদলের সময় তিয়ানগংয়ে ছয়জন নভোচারী থাকতে পারেন, তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য এর জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা তিনজনের উপযোগী করে সাজানো। স্টেশনে যুক্ত এবং ভালো অবস্থায় থাকা একটি ফেরার যান প্রস্তুত রাখা এই পরিচালনাব্যবস্থার মূল অংশ।
চীন একটি শেনঝৌ মহাকাশযান ও একটি লং মার্চ ২এফ রকেট জরুরি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখে। দ্রুত প্রয়োজনমতো চালু করার উপযোগী করে ব্যবস্থাটি সাজানো হয়েছে—জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যেমন সয়ুজ ও নভোচারীবাহী যান প্রস্তুত রাখে, অনেকটা সে রকম। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে শেনঝৌ-২২ উৎক্ষেপণ এ সক্ষমতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি রসদ সরবরাহের কাজও করেছে; স্টেশনের কার্যক্রম সচল রাখতে সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ ও পরীক্ষামূলক উপকরণ পৌঁছে দিয়েছে।
এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি অন্য মিশনগুলো যেভাবে সামলেছে
মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে শেনঝৌ-২০-এর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বোঝায়, এমন নজির রয়েছে। ২০২২ সালে একটি ক্ষুদ্র উল্কাখণ্ড আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যুক্ত রাশিয়ার সয়ুজ মহাকাশযানের শীতলীকরণ নল ফুটো করে দেয়। ওই যানে করে ফেরার কথা ছিল যে নভোচারীদের, বিকল্প সয়ুজ নভোচারী ছাড়াই উৎক্ষেপণ না করা পর্যন্ত তাঁরা কক্ষপথেই ছিলেন। নাসার নভোচারী ফ্র্যাঙ্ক রুবিও এবং দুই মহাকাশচারী দীর্ঘায়িত মিশন শেষে নিরাপদে পৃথিবীতে ফেরেন।
আরেক ঘটনায়, একটি মার্কিন নভোচারীবাহী ক্যাপসুলের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে থ্রাস্টার ও চালনাব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ায় দুই নভোচারীকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সময় থাকতে হয়। নিরাপদে তাঁদের ফিরিয়ে আনার উপায় খুঁজতে ভূ-নিয়ন্ত্রণ দল কাজ করার সময় তাঁরা স্টেশনে থাকা দলের কাজে যোগ দেন। দুই ক্ষেত্রেই সময়সূচির চাপে নয়, বরং সতর্কতা ও বিকল্প ব্যবস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। শেনঝৌ-২০-এর ক্ষেত্রেও একই যুক্তি কাজ করেছে।
আগামী কয়েক মাসে যা দেখার
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো হলো শেনঝৌ-২০-এর নভোচারীহীন প্রত্যাবর্তন ও উড্ডয়ন-পরবর্তী বিশ্লেষণ, জরুরি ফেরার যান হিসেবে শেনঝৌ-২২-সহ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং তিয়ানগংয়ে নিয়মিত বিজ্ঞান ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। শেনঝৌ-২১-এ যাত্রা করা দলের মধ্যে রয়েছেন এ পর্যন্ত চীনের সবচেয়ে কমবয়সী নভোচারী। দীর্ঘমেয়াদি জীববিজ্ঞান ও মানবিক কার্যকারিতা-সংক্রান্ত গবেষণার অংশ হিসেবে একজনের এক বছরের বেশি সময় মহাকাশে থাকার কথা। জরুরি ফেরার যান আবার প্রস্তুত থাকায় এসব পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
চীনের মানব মহাকাশযান কর্মসূচিতে উড্ডয়ন চলাকালে বড় ধরনের সমস্যা খুব বেশি ঘটেনি, তাই এ ঘটনাটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এটি একই সঙ্গে পরিণত প্রতিক্রিয়ারও পরিচয় দিয়েছে। দলটি নভোচারীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, স্টেশনের সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে দ্রুত উৎক্ষেপণ চালিয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত যানটি পদ্ধতিগত পরিদর্শনের জন্য ফিরিয়ে এনে সমস্যাটিকে শিক্ষার সুযোগে পরিণত করেছে। এ পরীক্ষার ফল ভবিষ্যৎ মিশনগুলোতে জানালার নকশা, আঘাতরোধী সুরক্ষা এবং পুনরায় উড্ডয়নের নিয়মে কাজে লাগতে পারে; এর মধ্যে দশকের শেষভাগে চাঁদে অবতরণের পরিকল্পিত প্রচেষ্টাও রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- জানালায় ফাটলের কারণে নভোচারীসহ পুনঃপ্রবেশ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় শেনঝৌ-২০ নভোচারী ছাড়াই পৃথিবীতে ফিরবে।
- নয় দিন বিলম্বের পর চেন দং, চেন ঝংরুই ও ওয়াং জিয়ে শেনঝৌ-২১-এ নিরাপদে ফিরে এসেছেন; এতে দেশের নতুন মেয়াদি রেকর্ড হয়েছে।
- ২৫ নভেম্বর জরুরি উৎক্ষেপণে নভোচারীহীন শেনঝৌ-২২ তিয়ানগংয়ে পাঠানো হয়; এটি জরুরি ফেরার যান হিসেবে কাজ করবে এবং সরঞ্জাম ও রসদ পৌঁছে দেবে।
- প্রকৌশলীদের ধারণা, মিলিমিটারের চেয়ে ছোট একটি ধ্বংসাবশেষ জানালার একটি কাচে এক সেন্টিমিটারের বেশি লম্বা পুরুত্বভেদী ফাটল তৈরি করেছে।
- জি ছিমিং বলেন, ফাটলধরা জানালাটি পুনঃপ্রবেশের সময় কীভাবে আচরণ করে, সে বিষয়ে বাস্তব উড্ডয়ন-তথ্য সংগ্রহ করাই নভোচারীহীন প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য।
- ভবিষ্যৎ নকশা ও উড্ডয়নের নিয়ম নির্ধারণে চীন দংফেংয়ে অবতরণের পর ক্যাপসুলটি বিশ্লেষণ করবে।
- এ ঘটনা নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে ধ্বংসাবশেষের স্থায়ী ঝুঁকি এবং জরুরি নভোচারী উদ্ধারের প্রস্তুত পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।






