প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের শতবর্ষ উদ্‌যাপন

পড়তে 11 মিনিট
প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের শতবর্ষ উদ্‌যাপন

শতবর্ষের শিল্প, স্মৃতি ও যাত্রা

২০ অক্টোবর প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই একটি ছোট দল পাহাড় বেয়ে তাইপের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুটি মাইলফলক উদ্‌যাপন করতে তারা এসেছিল। এর একটি ১০০ বছর পূর্তি, যার সূত্রপাত ১৯২৫ সালে বেইজিংয়ের নিষিদ্ধ নগরী জাদুঘরে রূপান্তরের দিন থেকে। অন্যটি তাইওয়ানে তাইপের জাদুঘরটির নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম শুরুর ৬০ বছর পূর্তি, যা চীনা সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ষাট বছরের চক্রের সঙ্গে মিলে যায়।

সূচিপত্র
  1. শতবর্ষের শিল্প, স্মৃতি ও যাত্রা
  2. শতবর্ষে প্রদর্শনীতে যা থাকছে
  3. অবিনশ্বর উত্তরাধিকার: ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের শতবর্ষ উদ্‌যাপন
  4. দুই শ ধন: ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের সং রাজবংশের দুর্লভ বই
  5. যুগযুগান্তরের সমাবেশ: পশ্চিম উদ্যানের উত্তর সং যুগের মার্জিত সমাবেশের কাহিনি
  6. সং যুগের সেরা শিল্পকর্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ
  7. সাম্রাজ্যিক রত্নভান্ডার থেকে জনসাধারণের আস্থা
  8. যুদ্ধকালীন স্থানান্তর এবং বাক্সগুলো যাঁরা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন
  9. সমান্তরাল শতবর্ষ উদ্‌যাপন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
  10. ডিজিটাল সরঞ্জাম ও দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা
  11. বিশ্বজুড়ে পৌঁছানো ও নতুন দর্শক
  12. মূল বিষয়গুলো

শতবর্ষের উপলক্ষটি ফিরে দেখে ১৯২৫ সালের ১০ অক্টোবরকে, যেদিন সাম্রাজ্যিক প্রাসাদ জনসাধারণের জন্য প্যালেস মিউজিয়াম হিসেবে খুলে দেওয়া হয়। কয়েক দশক পর, মূল ভূখণ্ডজুড়ে দীর্ঘ যুদ্ধকালীন যাত্রার পর ১৯৪৯ সালে শিল্পকর্ম ও নথিপত্রভর্তি ২,৯৭২টি বাক্স তাইওয়ানে পাঠানো হয়। জাদুঘরটি ১৯৬৫ সালে ওয়াইশুয়াংশি প্রাঙ্গণে কার্যক্রম শুরু করে। আজ সম্রাট ও পণ্ডিতদের সংগ্রহ থেকে গড়ে ওঠা এর সংগ্রহে কয়েক লাখ নিদর্শন রয়েছে, যা দশ হাজার বছরেরও বেশি সময়ের শিল্প ও বস্তুগত সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।

বৃষ্টিভেজা এই দিনে জাদুঘরের ভেতরের পরিবেশ ছিল উষ্ণ ও আন্তরিক। পরিচালক শিয়াও সুং-হুয়াং দরজায় অতিথিদের স্বাগত জানান, তারপর এক সংক্ষিপ্ত মুহূর্তের জন্য থামেন, যাতে গর্ব ও ধারাবাহিকতা দুটোই ধরা পড়ে। শত বছরের তত্ত্বাবধানের সারকথা তুলে ধরে তিনি একটি বাক্য বলেন।

সংক্ষিপ্ত এক অনুষ্ঠানে জাদুঘরের পরিচালক শিয়াও এই ঘোষণা দেন।

ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের বয়স ১০০ বছর!

তাইপে ও বেইজিং—দুই শহরই নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে এই বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন করছে। দিনটি আধুনিক চীনের ইতিহাসের আরেকটি সন্ধিক্ষণের কথাও মনে করিয়ে দেয়: ১৯১১ সালের উচাং বিদ্রোহ, যা ছিং রাজবংশের অবসানে ভূমিকা রেখেছিল এবং নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল।

বিজ্ঞাপন

শতবর্ষে প্রদর্শনীতে যা থাকছে

উত্তর তাইপে শাখা ও দক্ষিণ চিয়াই শাখায় স্মরণোৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে জাদুঘরটি তিনটি বড় প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এসব প্রদর্শনীতে রয়েছে সচরাচর দেখা যায় না এমন চিত্রকর্ম, ক্যালিগ্রাফি, দুর্লভ বই, আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জপাত্র, জেড, চীনামাটির বাসন এবং ডিজিটাল উপস্থাপনা। এগুলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে সংগ্রহ সংরক্ষণ, গবেষণা ও জনসাধারণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।

অবিনশ্বর উত্তরাধিকার: ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের শতবর্ষ উদ্‌যাপন

অবিনশ্বর উত্তরাধিকার হলো মূল ধারাবাহিক প্রদর্শনী, যা দুই শাখাতেই চলছে। এতে শতাধিক সেরা শিল্পকর্ম ও গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে, যেগুলো রাজদরবারের সংগ্রহ থেকে জনসাধারণের জাদুঘর হয়ে ওঠার প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস বলে। দর্শকেরা এখানে জাদুঘরটির পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত চিত্রকর্ম ও ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজবংশের ব্রোঞ্জ ঢালাই, জেড খোদাই ও চীনামাটির বাসন তৈরির কারিগরি দক্ষতার পরিচায়ক প্রাচীন নিদর্শন দেখতে পাবেন।

প্রদর্শনীতে রয়েছে ধ্রুপদি চীনা চিত্রকলার পরিচয় বহনকারী সং রাজবংশের তিনটি বিখ্যাত প্রাকৃতিক দৃশ্য: ফান কুয়ানের ‘পাহাড় ও ঝরনার মাঝে পথিক’, গুও শির ‘বসন্তের শুরু’ এবং লি তাংয়ের ‘অসংখ্য উপত্যকায় পাইনবনে বাতাস’। দক্ষিণ শাখায় চিয়াইয়ে প্রথমবারের মতো এই তিনটি কাজ একসঙ্গে দেখানো হচ্ছে। উপস্থাপনায় জাপানের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ধার করা নিদর্শনও রয়েছে। এর মধ্যে ওসাকার মিউজিয়াম অব ওরিয়েন্টাল সিরামিকস থেকে নেওয়া নীল-সাদা চীনামাটির বাসনের একটি সেট এবং কিউশু ন্যাশনাল মিউজিয়ামের কিছু নিদর্শন রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক বিনিময় নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়।

এই আখ্যান শুধু সেরা শিল্পকর্মেই সীমাবদ্ধ নয়। জাদুঘরের স্থানান্তর ও তালিকাভুক্তির প্রকল্পগুলোর ইতিহাস তুলে ধরেছে নথিপত্র। ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শকেরা বড় করে তুলির আঁচড় দেখতে, উপকরণ পরীক্ষা করতে এবং সংরক্ষণের পেছনের বিজ্ঞান বুঝতে পারবেন।

দুই শ ধন: ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়ামের সং রাজবংশের দুর্লভ বই

এই প্রদর্শনীতে জাদুঘরের দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহশালার দরজা খুলে সং যুগের সংস্করণগুলোর এ পর্যন্ত সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সং রাজবংশ ছিল মুদ্রণশিল্পের স্বর্ণযুগ। কাঠের ব্লকে ছাপার মাধ্যমে ধ্রুপদি গ্রন্থ, ইতিহাস, কবিতা ও কারিগরি বিষয়ের পরিশীলিত সংস্করণ তৈরি হতো। প্রদর্শনীতে থাকা শতাধিক খণ্ডে রয়েছে স্পষ্ট মুদ্রণ, মার্জিত পৃষ্ঠাবিন্যাস এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠকদের রেখে যাওয়া চিহ্ন।

অনেক দর্শকের কাছে ‘দুর্লভ বই’ বলতে ইউরোপের ইনকুনাবুলা বা ছাপাখানার শুরুর যুগের বইয়ের কথা মনে পড়ে। সং যুগের বইগুলো সেই ধারণারও আগের। এগুলোর মধ্যে রয়েছে যত্ন করে খোদাই করা অক্ষর, কাগজের সূক্ষ্ম বর্ণভেদ এবং পরবর্তী সময়ের টীকা, যা দেখায় কীভাবে ভাবনা রাজদরবার থেকে শিক্ষাঙ্গনে, সেখান থেকে ব্যক্তিগত অধ্যয়নে ছড়িয়েছে। প্রদর্শনীতে নতুন গবেষণাও তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন সংস্করণের তুলনা এবং প্রান্তলিখন ও সংগ্রাহকদের সিলমোহর নিয়ে গবেষণা রয়েছে। এখানে দেখা যায়, পাণ্ডিত্য শুধু লেখা নয়, বইটির জীবনকালের বস্তুগত প্রমাণও কীভাবে পাঠ করে।

যুগযুগান্তরের সমাবেশ: পশ্চিম উদ্যানের উত্তর সং যুগের মার্জিত সমাবেশের কাহিনি

মার্জিত সমাবেশে পণ্ডিত-আমলারা কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, ভাবনা নিয়ে আলোচনা এবং নৈতিক সাধনার আদর্শ ধরে রাখার জন্য মিলিত হতেন। এই প্রদর্শনীতে উত্তর সং যুগের বিদ্বৎসমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সু শি, হুয়াং তিংজিয়ান ও মি ফুর চিত্রকর্ম ও ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি তাঁদের উত্তরাধিকার ফিরে দেখা পরবর্তী সময়ের কাজও একত্র করা হয়েছে। প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ লি গংলিনের ‘পাঁচটি ঘোড়া’, যা টোকিও ন্যাশনাল মিউজিয়াম থেকে ধার করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো বিদেশে দেখানো হচ্ছে। ছবিটির নিখুঁত রেখা ও ঘোড়ার মানবিক প্রতিকৃতি শিল্পীর দক্ষতার ব্যাপ্তি এবং সে যুগের রাজদরবারের রুচি তুলে ধরে।

প্রদর্শনীটি স্পষ্ট করে যে পশ্চিম উদ্যানের কিংবদন্তি কেবল একটি বিশেষ ঘটনার গল্প নয়। বন্ধুত্ব, প্রতিভা ও কর্তব্যকে শিল্পীরা কীভাবে কল্পনা করেছেন, তার এক মাপকাঠি এটি। পাশাপাশি, পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে সং যুগের শিল্পীদের রীতি অনুকরণ, নতুনভাবে ব্যাখ্যা, এমনকি কখনো চ্যালেঞ্জ করেছে, সেটিও দেখানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সং যুগের সেরা শিল্পকর্ম কেন গুরুত্বপূর্ণ

সং রাজবংশ (৯৬০–১২৭৯) চীনা শিল্পের রূপ ও ভাষাকে গড়ে দিয়েছিল। চিত্রকলা, মুদ্রণ, সিরামিক প্রযুক্তি ও ক্যালিগ্রাফি নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। সরকারি পদে থাকা পণ্ডিতেরা শিল্পচর্চাকে নৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতেন। বিশাল জগতের মধ্যে মানবজাতির অবস্থান নিয়ে ভাবার মাধ্যম হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। আর বই জ্ঞানকে আরও বড় পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়, যে স্বচ্ছতা আগের পাণ্ডুলিপি সংস্কৃতিতে সম্ভব ছিল না।

ফান কুয়ানের ‘পাহাড় ও ঝরনার মাঝে পথিক’ উত্তর সং যুগের দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত নিদর্শন। বিশাল চূড়ার পাদদেশে নদী পার হচ্ছে ক্ষুদ্র মানবমূর্তি ও খচ্চরের একটি কাফেলা। ছবিটি ধীরে ও মনোযোগ দিয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানায়। কালির স্তরে স্তরে তৈরি খসখসে পাহাড়ি শিলা, পাইনগাছ ও কুয়াশাকে মনে হয় যেন তারা শ্বাস নিচ্ছে। ছবিটির বক্তব্য শুধু দৃশ্যের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দার্শনিকও: এখানে এমন এক পরিসরের ধারণা রয়েছে, যেখানে মানুষের পরিকল্পনাকে প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

গুও শির ‘বসন্তের শুরু’ এমন এক ঋতুকে বেছে নিয়েছে, যখন শীতের দাপট কমে আসে, কিন্তু নতুন কুঁড়ি এখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ছবির অবয়বে বরফ গলা, বাতাস ও পানির শব্দের আভাস মেলে। গুও লিখেছিলেন ‘পাহাড়ের বিন্যাস’ নিয়ে এবং কীভাবে চিত্রকর আবহাওয়া ও দিনের সময়ের আভাস দিতে পারেন, সে বিষয়ে। এই ছবিতে আলো-বাতাসের শূন্যতা ও ঘন অবয়বের ভারসাম্য গভীরতা তৈরি করেছে, কিন্তু একক দৃষ্টিবিন্দুর আশ্রয় নেয়নি।

লি তাংয়ের ‘অসংখ্য উপত্যকায় পাইনবনে বাতাস’ এক সন্ধিক্ষণের কাজ। ভাঙা কুঠারের মতো আঁচড়ে তুলির রেখা পাথরের আকৃতি ফুটিয়ে তোলে, যা তাদের ধারালো প্রাণশক্তি দেয়। জীবন্ত ঝাপটা সামলানোর মতো করে পাইনগাছগুলো ঢালে পাকিয়ে আঁকড়ে আছে। ছবিটি একদিকে উত্তর সং যুগের গঠনের স্বচ্ছতার দিকে ফিরে তাকায়, অন্যদিকে দক্ষিণ সং যুগের পরবর্তী চিত্রকলায় অন্তরঙ্গ দৃশ্যের প্রতি ঝোঁকের পথ দেখায়।

দুর্লভ বইগুলো দেখায়, সং সংস্কৃতিতে ছাপা পৃষ্ঠার গুরুত্ব কতখানি। কাঠের ব্লকে মুদ্রণ কনফুসীয় ধ্রুপদি গ্রন্থ, কবিতার সংকলন ও ব্যবহারিক নির্দেশিকার প্রসারে সহায়তা করেছিল। পৃষ্ঠার বিন্যাসে স্তম্ভ ও মার্জিন এমন যুক্তিতে সাজানো হতো, যা পাঠে দিশা দিত। পরবর্তী মালিকদের প্রান্তলিখন দেখায়, একটি বই কীভাবে এক হাত থেকে অন্য হাতে গেছে। চীনা অক্ষর জানা দর্শকেরা অক্ষরের খোদাইয়ে আলাদা এক শিল্পরূপ দেখতে পাবেন। আর যাঁরা বিষয়টির সঙ্গে নতুন পরিচিত, তাঁদের জন্য প্রদর্শনীতে উপকরণ, সরঞ্জাম এবং একসময় এই পৃষ্ঠাগুলো উল্টেছেন এমন পাঠকদের জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাম্রাজ্যিক রত্নভান্ডার থেকে জনসাধারণের আস্থা

নিষিদ্ধ নগরী জনসাধারণের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হলে ১৯২৫ সালে বেইজিংয়ের প্যালেস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজদরবারের একচ্ছত্র মালিকানা থেকে সমাজের পক্ষে তত্ত্বাবধানের পথে যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩০-এর দশকে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মুখে কর্মীরা ধনসম্পদ রক্ষায় সেগুলো বাক্সবন্দী করে দক্ষিণ ও পশ্চিমে পাঠাতে বাধ্য হন। যুদ্ধের পর সংগ্রহের একাংশ বেইজিংয়ে থেকে যায়। ১৯৪৯ সালে জাতীয়তাবাদী সরকার পিছু হটার সময় আরেক অংশ তাইওয়ানে আসে। তাইপের জাদুঘরটি ১৯৬৫ সালে স্থায়ী প্রাঙ্গণ খুলে দেয় এবং ২০১৫ সালে চিয়াইয়ে দক্ষিণ শাখা প্রতিষ্ঠা করে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথজুড়ে লক্ষ্য একই থেকেছে: সংরক্ষণ, গবেষণা ও ভাগ করে নেওয়া।

যুদ্ধকালীন স্থানান্তর এবং বাক্সগুলো যাঁরা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন

১৯৩৩ সালে রাজধানী আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় ১৩ হাজারের বেশি বাক্স রেল, নদী ও সড়কপথে বেইজিং ছেড়ে যায়। পাহারার দায়িত্বে থাকা দলগুলো বোমাবর্ষণ, রোগব্যাধি ও দুর্গম ভূখণ্ডের প্রতিকূলতা সহ্য করেও তালিকাগুলো অক্ষত রেখেছিল। এই প্রচেষ্টায় চীনা শিল্পের এমন একটি মূল সংগ্রহ রক্ষা পায়, যা প্রাসাদের ভেতরে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল। যুদ্ধের পর যে প্রাথমিক কর্মীরা পরে তাইপের জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন, তাঁরা প্রণালির ওপারে নতুন আবাসে সেই শৃঙ্খলার চর্চা নিয়ে যান। সে সময়ের পারিবারিক স্মৃতিতে পাণ্ডুলিপি, অ্যালবাম, ব্রোঞ্জপাত্র ও বই সংরক্ষণকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবনের কথা উঠে আসে। জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীগুলো সেই যাত্রা এবং যাঁরা তা সম্ভব করেছিলেন, তাঁদের স্বীকৃতি দেয়।

সমান্তরাল শতবর্ষ উদ্‌যাপন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

বেইজিং ও তাইপে—দুই শহরেই শতবর্ষ উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে আয়োজিত সংশ্লিষ্ট এক অনুষ্ঠানে স্মারক ডাকটিকিটের একটি শিট উন্মোচন করা হয় এবং ‘অন্তহীন প্রাণশক্তি’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনী খোলে। জাতিসংঘের ডাক প্রশাসন প্যালেস মিউজিয়ামের সংগ্রহের নিদর্শন থেকে অনুপ্রাণিত ফুলের নকশার ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। অনুষ্ঠানে কর্মকর্তারা সংস্কৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও অভিন্ন ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাদুঘরের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।

জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী মিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গেং শুয়াং ডাকটিকিটগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন।

জাতিসংঘের ডাক প্রশাসনের নতুন প্রকাশিত ডাকটিকিটগুলো শুধু প্যালেস মিউজিয়ামের ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীই স্মরণ করায় না, বরং চীনা সংস্কৃতির চিরন্তন আকর্ষণও বিশ্বের সামনে তুলে ধরে।

জাতিসংঘের অপারেশনাল সাপোর্ট বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল অতুল খারে জাদুঘরের জনসেবামূলক ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।

জাদুঘর এমন জায়গা, যেখানে সংস্কৃতি বেঁচে থাকে, গল্প বলা হয় এবং মানুষ শেখা ও যোগাযোগের জন্য একত্র হয়। এগুলো আমাদের অতীত সংরক্ষণ করে, বর্তমান বুঝতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়।

বক্তারা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় প্যালেস মিউজিয়ামের অন্তর্ভুক্তি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে প্রদর্শনী ও গবেষণার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তাইপের জাদুঘরের শতবর্ষের কর্মসূচিও এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ঋণ ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগ পুরোনো সেরা শিল্পকর্মের সঙ্গে নতুন দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল সরঞ্জাম ও দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা

ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম তার সংগ্রহ ঘুরে দেখার আরও নানা উপায় তৈরি করছে। ত্রিমাত্রিক সংগ্রহশালায় এমন নিদর্শন কাছ থেকে দেখা যায়, যেগুলো দীর্ঘ সময় প্রদর্শনে রাখা কঠিন। ই-বুক, ডিজিটাল নথি ও দুর্লভ বইয়ের ডেটাবেসে এমন শিক্ষার্থী ও গবেষকেরাও সংগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন, যাঁদের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রদর্শনীতে ডিজিটাল দেখার ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে খালি চোখে দেখা যায় না এমন তুলির আঁচড়ের স্তর ও মেরামতের চিহ্ন ফুটে ওঠে।

শতবর্ষের কর্মসূচিতে নানা অংশীদারত্বও যুক্ত হয়েছে। উত্তর শাখায় সমকালীন ব্যাখ্যামূলক সরঞ্জামের মাধ্যমে জাদুঘরের বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পরিচালিত প্রদর্শনও রয়েছে, যা দর্শকদের বিভিন্ন সংস্করণের তুলনা করতে এবং শতাব্দীজুড়ে মোটিফের বিবর্তন অনুসরণ করতে সাহায্য করে। দক্ষিণ শাখায় এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব বজায় রেখেই বড় আকারের ঋণ ও নতুন প্রদর্শনীর মাধ্যমে জাদুঘরের সুপরিচিত চিত্রকর্মগুলো চিয়াইয়ে আনা হয়েছে।

এত বড় উদ্‌যাপনে ব্যবহারিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। দুই শাখার খোলার সময়, টিকিট ও বিনা মূল্যে প্রবেশের দিনগুলো সরকারি ওয়েবপেজে প্রকাশ করা হয়। প্রতি বছর কয়েকটি দিনে বিনা মূল্যে প্রবেশ করা যায়; এর মধ্যে রয়েছে নববর্ষের দিন, লণ্ঠন উৎসব, আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস, বিশ্ব পর্যটন দিবস ও জাতীয় দিবস। দুই শাখার যৌথ ভ্রমণ সহজ করতে বিমান সংস্থা, তাইওয়ান হাই স্পিড রেল ও সহযোগী হোটেলগুলোর সঙ্গে যৌথ টিকিট ও ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরির কাজ চলছে, যা দেশি-বিদেশি ভ্রমণকারীদের সুবিধা দেবে। সর্বশেষ সময়সূচি ও দর্শনার্থীদের তথ্যের জন্য জাদুঘরের শতবর্ষের ওয়েবসাইট দেখুন: theme.npm.edu.tw/npm100/en।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বজুড়ে পৌঁছানো ও নতুন দর্শক

শতবর্ষের উদ্‌যাপন শুধু তাইওয়ানে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম প্রাগের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে ‘১০০ ধন, ১০০ গল্প’ প্রদর্শনী উপস্থাপন করছে। চেক প্রজাতন্ত্রে এটিই জাদুঘরটির প্রথম প্রদর্শনী, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তাইওয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। নির্বাচিত নিদর্শনের মধ্যে আছে জনপ্রিয় ‘জেডের বাঁধাকপি’: প্রাকৃতিকভাবে ছোপযুক্ত জেডের একটি ছোট খণ্ড খোদাই করে বাঁধাকপির আকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার ওপর রয়েছে একটি পঙ্গপাল ও একটি ঘাসফড়িং। এই বস্তুটি প্রতিভা ও সংযমের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি দেখায়, কারিগরেরা কীভাবে পাথরের শিরাগুলোর বিরোধিতা না করে সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে কাজ করেন।

ছিয়েনলুং দরবারের কিউরিও ক্যাবিনেট উপকরণ ও মোটিফের মাধ্যমে চীনের বৈশ্বিক যোগাযোগের পরিচয় দেয়। ছিং রাজবংশের ‘ছিংমিং উৎসবে নদীর ধারে’ শিরোনামের একটি হাতে আঁকা দীর্ঘ চিত্রে শহুরে জীবন ফুটে উঠেছে: কাঠের সেতুতে জড়ো হওয়া ক্ষুদ্র মানুষ, বিক্রেতা ও মাঝি, আর এমন এক বিস্তৃত দৃশ্যপট, যা মনোযোগ দিয়ে দেখার দাবি রাখে। সূর্যের আলো পড়লে নাটকীয় নকশা ফেলে এমন ব্রোঞ্জের আয়না প্রাচীন চীনে বিজ্ঞান ও শিল্পের মেলবন্ধনের ইঙ্গিত দেয়। সু শির ‘রেড ক্লিফ’ বিষয়ক স্তবক থেকে অনুপ্রাণিত ক্যালিগ্রাফি সাহিত্যিক স্মৃতির সঙ্গে প্রাকৃতিক দৃশ্যকে যুক্ত করে। জাদুঘরের আদি আবাস থেকে বহু দূরের দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে বেছে নেওয়া একটি গল্পের ভেতরেই প্রতিটি কাজের স্থান হয়েছে।

মূল বিষয়গুলো

  • তাইপের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম ১৯২৫ সালে প্যালেস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ১০০ বছর পূর্তি এবং তাইওয়ানে নিজস্ব প্রাঙ্গণে কার্যক্রম শুরুর ৬০ বছর উদ্‌যাপন করেছে।
  • তিনটি বড় প্রদর্শনী এই কর্মসূচির মূল আকর্ষণ: ‘অবিনশ্বর উত্তরাধিকার’, সং যুগের দুর্লভ বই নিয়ে ‘দুই শ ধন’ এবং উত্তর সং যুগের বিদ্বৎসমাজের শিল্পকর্ম নিয়ে ‘যুগযুগান্তরের সমাবেশ’।
  • চিয়াইয়ের দক্ষিণ শাখায় ফান কুয়ান, গুও শি ও লি তাংয়ের সং যুগের তিনটি বিখ্যাত প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি সেই শাখায় প্রথমবারের মতো একসঙ্গে দেখানো হচ্ছে।
  • লি গংলিনের ‘পাঁচটি ঘোড়া’ টোকিও ন্যাশনাল মিউজিয়াম থেকে ধার করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো বিদেশে দেখানো হচ্ছে।
  • সং যুগের দুর্লভ বইগুলো ওই সময়ের সংগ্রহ নিয়ে জাদুঘরের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, যেখানে কাঠের ব্লকে মুদ্রণের স্বর্ণযুগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
  • যুদ্ধকালীন স্থানান্তর এবং ১৯৪৯ সালে ২,৯৭২টি বাক্স স্থানান্তরসহ নিষিদ্ধ নগরী থেকে তাইওয়ান পর্যন্ত জাদুঘরের যাত্রার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
  • সমান্তরাল শতবর্ষের অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ডাকটিকিট প্রকাশ ও প্রদর্শনী, যেখানে সংস্কৃতির মধ্যে সেতু হিসেবে জাদুঘরের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
  • ডিজিটাল সরঞ্জাম, ত্রিমাত্রিক প্রদর্শনীশালা ও ডেটাবেস সংগ্রহে প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়েছে; উত্তর ও দক্ষিণ শাখায় যুক্ত হয়েছে নতুন ব্যাখ্যামূলক প্রদর্শন।
  • প্রতি বছর কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে বিনা মূল্যে প্রবেশ করা যায় এবং পরিবহন ও হোটেল সহযোগীদের সঙ্গে যৌথ টিকিটের কাজ চলছে।
  • বিশ্বজুড়ে পৌঁছানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রাগে ‘১০০ ধন, ১০০ গল্প’ প্রদর্শনী হচ্ছে, যেখানে ‘জেডের বাঁধাকপি’ ও ‘ছিংমিং উৎসবে নদীর ধারে’র মতো বিখ্যাত নিদর্শন রয়েছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে