বন ধ্বংস না করে টেকসই পাম অয়েল কি ক্রমবর্ধমান বিশ্বের খাদ্যচাহিদা মেটাতে পারে?

পড়তে 11 মিনিট
How To Make Palm Oil Production More Sustainable at Eliza Pethebridge blog

ভূমি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এই ফসল কেন

সুপারমার্কেটের তাকে থাকা প্যাকেটজাত পণ্যের অর্ধেকেই এবং লাখ লাখ পরিবারের রান্নাঘরে পাম অয়েল রয়েছে। এর গুরুত্ব শুধু বহুমুখী ব্যবহারের কারণে নয়। এর সঙ্গে জড়িত ভূমির ব্যবহার। অন্য যেকোনো প্রধান তেলবীজ ফসলের তুলনায় প্রতি হেক্টরে অনেক বেশি তেল দেয় অয়েল পাম। সীমিত জমিতে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজন এমন এক বিশ্বে এ কারণেই ফসলটি গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদক হিসেবে ব্রাজিল এখন এই বাজারে প্রবেশ করছে। ফলে বন ধ্বংসের নতুন ঢেউ ছাড়াই কীভাবে পাম অয়েল উৎপাদন বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ তৈরি হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. ভূমি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে এই ফসল কেন
  2. পাম অয়েল কেন ভূমি ব্যবহারে সবচেয়ে দক্ষ ভোজ্য তেল
  3. ফলন ও দীর্ঘ জীবনচক্র কীভাবে জমি বাঁচায়
  4. পাম অয়েলের বদলে অন্য তেল ব্যবহার করলে কেন উল্টো ফল হতে পারে
  5. বন উজাড়ের রেকর্ড ও পরিবর্তনের মোড়
  6. বন উজাড়ের কত অংশ পাম অয়েলের কারণে
  7. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উজাড়ের হার কেন কমেছে
  8. ব্রাজিলের পরীক্ষা: বন পরিষ্কার না করেই সম্প্রসারণ
  9. কোথায় সম্প্রসারণ সম্ভব
  10. সনদায়ন, সরবরাহের উৎস শনাক্তকরণ ও করপোরেট অঙ্গীকার
  11. আরএসপিও ও জাতীয় মানদণ্ড
  12. বড় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা কী করছেন
  13. প্রযুক্তি ও জেনেটিকসের লক্ষ্য পরিবেশগত ছাপ কমানো
  14. উন্নত গাছ, উন্নত চর্চা
  15. মিলের নির্গমন কমানো ও পিটভূমি এড়ানো
  16. জীববৈচিত্র্য ও জনগোষ্ঠীর অধিকারই এখনো মূল পরীক্ষা
  17. সনদায়ন জরুরি, তবে যথেষ্ট নয়
  18. অভিযোজন না হলে জলবায়ু পরিবর্তনে ফলন হুমকির মুখে
  19. উৎপাদক ও নীতিনির্ধারকদের অভিযোজনের অগ্রাধিকার
  20. যা জানা জরুরি

ভূমির দক্ষ ব্যবহারের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে পরিণত অয়েল পাম সাধারণত প্রতি হেক্টরে ৪ থেকে ৫ টন তেল দেয় এবং গাছগুলো প্রায় ৩০ বছর ধরে ফলন দেয়। বিশ্বে তেল ফসলের জন্য ব্যবহৃত জমির প্রায় এক দশমাংশে অয়েল পাম চাষ হয়, অথচ বিশ্বের ভোজ্য উদ্ভিজ্জ তেলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসে এ ফসল থেকে। পাম অয়েলের বদলে সয়াবিন, সূর্যমুখী বা সরিষার মতো বিকল্প ব্যবহার করলে কয়েক গুণ বেশি জমি লাগবে, ফলে কৃষিকাজ আবারও প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ছড়িয়ে পড়বে।

সমালোচনার ভিত্তি বাস্তব। পাম অয়েলের সম্প্রসারণের সঙ্গে বন উজাড়, পিটভূমি নিষ্কাশন ও আগুনের সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠীগুলোর হিসাব, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন উজাড়ের প্রায় ৫ শতাংশ এবং বিশ্বজুড়ে বন উজাড়ের আনুমানিক ২.৩ শতাংশের জন্য পাম অয়েল দায়ী। জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এর প্রভাব গুরুতর, যদিও অন্য কিছু পণ্য ও ভূমি ব্যবহারের প্রভাব আরও বেশি। বিতর্কের প্রশ্ন এখন আর পাম অয়েল টেকসই হতে পারে কি না, তা নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ ব্যাপক পরিসরে একে টেকসই করতে কী প্রয়োজন, সেটিই মুখ্য।

খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব কমানোর পথ হলো বিদ্যমান জমিতে ফলন বাড়ানো, বন ও পিটভূমির সুরক্ষা জোরদার করা, উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচ্ছন্ন করা এবং ফসলের বড় অংশ উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবিকার উন্নতি। ব্রাজিলের প্রাথমিক পদক্ষেপ, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতা এবং নীতি ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তনের ঢেউ এসব ধারণাকে বাস্তবে যাচাই করছে।

পাম অয়েল কেন ভূমি ব্যবহারে সবচেয়ে দক্ষ ভোজ্য তেল

অয়েল পামের জৈবিক বৈশিষ্ট্যই এর সুবিধার ব্যাখ্যা দেয়। স্থিতিশীল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে প্রতিটি গাছে সারা বছর বড় বড় ফলের কাঁদি ধরে। কার্যকর সালোকসংশ্লেষণ ও তেলসমৃদ্ধ ফলের কারণে এর ফলন নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের তেলবীজ ফসলের চেয়ে অনেক বেশি। ইন্দোনেশিয়ার অয়েল পাম, ব্রাজিলের সয়াবিন ও জার্মানির সরিষার তুলনায় গবেষকদের সাম্প্রতিক একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৪০ সালের মধ্যে অয়েল পাম প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪.৮ টন অপরিশোধিত তেল দিতে পারে। সয়াবিনের ক্ষেত্রে তা আনুমানিক ৩.১ টন এবং সরিষার ক্ষেত্রে ২.৬ টন। বিকল্প ফসলের বদলে পাম অয়েল দিয়ে চাহিদা মেটালে এই পার্থক্যের কারণে জমির রূপান্তর লাখ লাখ হেক্টর কমানো সম্ভব।

ফলন ও দীর্ঘ জীবনচক্র কীভাবে জমি বাঁচায়

অয়েল পামের ৩০ বছরের উৎপাদনক্ষম জীবনচক্রের ফলে বার্ষিক ফসলের তুলনায় জমি পরিবর্তন, মাটির ব্যাঘাত এবং উপকরণ ব্যবহারের প্রয়োজন কমে। গাছের ছায়াও মাটিকে আচ্ছাদিত রাখে, ফলে ক্ষয় ও বাষ্পীভবন কমে। ভালো ব্যবস্থাপনায় উন্নত রোপণ উপকরণ, সার প্রয়োগ ও ফসল সংগ্রহের পদ্ধতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ফলন বাড়ানো যায়। সবচেয়ে উৎপাদনশীল বাগানগুলোতে ইতিমধ্যে প্রতি হেক্টরে ৬ টনের বেশি ফলন হচ্ছে। গড় ফলন ও সর্বোত্তম চর্চার ব্যবধান কমানোই জমি সাশ্রয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

পাম অয়েলের বদলে অন্য তেল ব্যবহার করলে কেন উল্টো ফল হতে পারে

সংরক্ষণবাদী সংগঠনগুলো বর্জন করার আহ্বানের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। বিকল্প তেল উৎপাদনে বেশি জমি লাগে, ফলে বন উজাড়ের চাপ নতুন এলাকায় সরে যেতে পারে। অর্থাৎ, পাম অয়েল বনাম কিছুই নয়—বিষয়টি এমন নয়। বিকল্প হলো কঠোর বন উজাড়বিরোধী নিয়ম মেনে উৎপাদিত পাম অয়েল, অথবা তৃণভূমি, সাভানা ও বনের ওপর নিজস্ব প্রভাব ফেলা অধিক জমিনির্ভর ফসল।

বিজ্ঞাপন

বন উজাড়ের রেকর্ড ও পরিবর্তনের মোড়

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াজুড়ে বাগান সম্প্রসারিত হওয়ায় পাম অয়েল ব্যাপক বনভূমি রূপান্তরের কারণ হয়। সে সময় নিষ্কাশিত পিটভূমিতে আগুন থেকে ধোঁয়াশা, ওরাংওটানসহ বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থল হারানো এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধি দেখা যায়। সাম্প্রতিক প্রমাণে অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। বেশি দাম থাকা সময়েও প্রধান উৎপাদক দেশগুলোতে পাম অয়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন উজাড় কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

বন উজাড়ের কত অংশ পাম অয়েলের কারণে

বিশ্বজুড়ে বন হারানোর প্রধান চালক এখনো কৃষি। এর মধ্যে মোট বৈশ্বিক বন উজাড়ে পাম অয়েলের অংশ তুলনামূলকভাবে কম, তবে উচ্চ কার্বন ও উচ্চ জীববৈচিত্র্যসম্পন্ন ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিলে গেলে এর পরিবেশগত প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি হতে পারে। প্রাথমিক বন, অক্ষত পিটভূমি ও অন্যান্য সংরক্ষিত এলাকায় নতুন চাষ বন্ধ রাখাই কম ও বেশি প্রভাবসম্পন্ন সরবরাহের মধ্যে নির্ধারক পার্থক্য গড়ে দেয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উজাড়ের হার কেন কমেছে

প্রাথমিক বন ও পিটভূমি উজাড়ের ওপর স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকারগুলো নিয়ম কঠোর করেছে। সনদায়ন ব্যবস্থাও শক্তিশালী হয়েছে। করপোরেট ক্রেতারা বন উজাড় নয়, পিটভূমি নয় এবং শোষণ নয়—এমন অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে এবং সরবরাহের উৎস শনাক্তকরণ ও সরবরাহকারী যাচাইয়ের মাধ্যমে তা কার্যকর করেছে। সংবেদনশীল এলাকায় জমি পরিষ্কার শুরু হলে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে এখন প্রায় তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। একসঙ্গে এসব পদক্ষেপ দেখায়, নীতি, বাজারের চাপ ও স্বচ্ছতা সমন্বিত হলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বন সুরক্ষাকে আলাদা পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলের পরীক্ষা: বন পরিষ্কার না করেই সম্প্রসারণ

পূর্ব আমাজন ও উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু অংশে পাম চাষের উপযোগী জমি থাকায় ব্রাজিলে অয়েল পামের সম্ভাবনা ব্যাপক। ২০১০ সালে চালু হওয়া সরকারের টেকসই পাম অয়েল উৎপাদন কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল কৃষি-পরিবেশগত অঞ্চল নির্ধারণের মাধ্যমে বনভূমি নয়, এমন জমিতে সম্প্রসারণ পরিচালিত করা। পারা অঙ্গরাজ্যের ওপর একটি স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে অয়েল পাম চাষের এলাকা তিন গুণের বেশি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার হেক্টরে পৌঁছায়। নতুন বাগানের প্রায় ৯১ শতাংশ করা হয়েছিল চারণভূমির জায়গায়। কর্মসূচি শুরুর পর অক্ষত বনভূমি সরাসরি রূপান্তরের হারও দ্রুত কমে নতুন এলাকার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

এই ফলাফল দেখায়, অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও নীতির সমন্বয় সরাসরি বন উজাড় সীমিত করতে পারে। তবে এতে বাস্তব সীমাবদ্ধতাও উঠে এসেছে। জমির উপযোগিতা নিয়ে হিসাবের তুলনায় উন্নয়নের গতি ছিল কম, কারণ স্থাপনের খরচ বেশি, স্থানীয় অভিজ্ঞতা সীমিত এবং অবকাঠামোর ঘাটতি ছিল। পরিবেশগতভাবে উপযোগী জমি মানচিত্রে চিহ্নিত করতে ফাজি জিআইএস পদ্ধতি ব্যবহার করা আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, উপযোগী জমিগুলো প্রায়ই বিচ্ছিন্নভাবে রয়েছে। বিদ্যমান বাগানে ফলন বাড়ানো, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা বড় পরিসরে নতুন বাগান গড়ার চেয়ে ভালো ফল দিতে পারে।

কোথায় সম্প্রসারণ সম্ভব

অগ্রাধিকারযোগ্য এলাকার মধ্যে রয়েছে অবক্ষয়িত চারণভূমি ও আগে কৃষিকাজে ব্যবহৃত জমি, যা সংরক্ষিত এলাকা, উচ্চ সংরক্ষণমূল্যের অঞ্চল ও পিটভূমির বাইরে। এসব এলাকায় বিনিয়োগ পরিচালিত করা এবং কঠোর সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষার শর্ত আরোপ করলে বনভূমির ওপর চাপ কম রেখে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা সম্ভব। পারার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এটি সম্ভব; তবে এর জন্য সতর্ক প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

বিজ্ঞাপন

সনদায়ন, সরবরাহের উৎস শনাক্তকরণ ও করপোরেট অঙ্গীকার

স্বাধীন মানদণ্ড ও করপোরেট নীতি এখন পাম অয়েল কীভাবে উৎপাদিত ও বাণিজ্য করা হবে, তা নির্ধারণ করছে। টেকসই পাম অয়েলবিষয়ক গোলটেবিল (আরএসপিও) উৎপাদক ও সরবরাহশৃঙ্খলের অংশীজনদের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করে। মালয়েশিয়ার টেকসই পাম অয়েল মানদণ্ড ও ইন্দোনেশিয়ার টেকসই পাম অয়েল মানদণ্ডসহ জাতীয় কর্মসূচিগুলো আরএসপিওর পরিপূরক এবং সরকারি নীতিতে যুক্ত। বড় বাজারগুলোর নতুন আমদানি বিধিও বাড়তি প্রণোদনা দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন উজাড়বিষয়ক বিধিমালা অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর বন উজাড় করা জমি থেকে আসা পাম অয়েল বাজারজাত করা যাবে না। পাশাপাশি উৎপত্তিস্থলের ভূ-অবস্থানভিত্তিক প্রমাণও দিতে হবে।

আরএসপিও ও জাতীয় মানদণ্ড

বিশ্বের পাম অয়েল উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরএসপিওর অধীনে সনদপ্রাপ্ত। ২০২০ সালে মালয়েশিয়া তার জাতীয় মানদণ্ড বাধ্যতামূলক করে এবং নতুন চাষের জন্য ২০১৯ সালের শেষকে শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করে। ইন্দোনেশিয়া খাতের সংস্কারের দিকনির্দেশনা দিতে বহু অংশীজনের একটি প্ল্যাটফর্ম এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের অন্তর্ভুক্তি ও সুশাসন জোরদার করতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। ক্রেতারা সনদপ্রাপ্ত বা বন উজাড়মুক্ত তেল চাইলে, নিয়ন্ত্রকেরা ভূমি আইন কার্যকর করলে এবং উৎপাদকদের মান পূরণের জন্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা মিললে এসব কাঠামো সবচেয়ে কার্যকর হয়।

বড় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা কী করছেন

বড় ব্যবসায়ী ও খাদ্য কোম্পানিগুলো বন উজাড় নয়, পিটভূমি নয় এবং শোষণ নয়—এমন নীতি গ্রহণ করেছে এবং অগ্রগতি ও অভিযোগের হিসাব রাখা উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড চালু করেছে। একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, যারা বন পরিষ্কার করে, পিটভূমি নিষ্কাশন করে বা শ্রমিকদের শোষণ করে, এমন সরবরাহকারীর কাছ থেকে তারা পণ্য নেবে না। সরবরাহকারীদের নিয়ম মানা ও সংশোধনী পদক্ষেপের বিষয়ে তারা নিয়মিত প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। বড় একটি খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা যে সব অপরিশোধিত পাম অয়েল ও পাম কার্নেল অয়েল কেনে, তার সবই সনদায়ন বা ক্রেডিট কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। মিল পর্যন্ত উৎস শনাক্ত করা যায় ৯৯ শতাংশ তেলের এবং বাগান পর্যন্ত ৯০ শতাংশের বেশি তেলের। সংগ্রহের এলাকায় সাম্প্রতিক বন উজাড় নেই, তা যাচাই করতে প্রতিষ্ঠানটি স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে, সরবরাহকারীদের তালিকা প্রকাশ করে এবং সংবেদনশীল ভূদৃশ্যে শ্রম অধিকার, ভূমির মালিকানা ও সংরক্ষণ নিয়ে কর্মসূচি পরিচালনা করে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তি ও জেনেটিকসের লক্ষ্য পরিবেশগত ছাপ কমানো

পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট, মেশিন লার্নিং ও উন্মুক্ত ডেটাসেট এখন মেঘের আড়ালেও জমি পরিষ্কারের ঘটনা শনাক্ত করতে পারে। উৎপাদক দেশগুলোর সরকার বাগানের নিবন্ধন এবং অনুমতিপত্র, মানচিত্র ও সরবরাহের রেকর্ড সংযুক্ত করতে উৎস শনাক্তকরণ প্ল্যাটফর্ম গড়ছে। এতে কোম্পানিগুলোর নতুন আমদানি বিধি মেনে চলা সহজ হয় এবং নিরীক্ষকেরা বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে দাবিগুলো যাচাই করতে পারেন।

উন্নত গাছ, উন্নত চর্চা

ফলন বাড়লে জমির ওপর চাপ কমে। জিনোম মানচিত্রায়ন ও বাছাই প্রজননের ফলে উন্নত রোপণ উপকরণ তৈরি হয়েছে, যা ফলন দুই অঙ্কের শতাংশে বাড়াতে পারে। বড় একটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবিত জাত প্রতি হেক্টরে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি তেল দেয়। নির্ভুল পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত ফসল সংগ্রহের পদ্ধতিতেও আরও লাভ হয়। চাষের বড় অংশ পরিচালনাকারী ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে এসব কৌশল পৌঁছে দেওয়া জরুরি। প্রশিক্ষণ, অর্থায়নের সুযোগ ও সহজ সনদায়ন পদ্ধতি তাদের বনভূমি সম্প্রসারণ না করেই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে।

মিলের নির্গমন কমানো ও পিটভূমি এড়ানো

পাম অয়েলের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বেশির ভাগই পিটভূমিতে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এবং মিলের বর্জ্যপানি থেকে নির্গত মিথেনের কারণে হয়। পিটভূমিতে নতুন চাষ বন্ধ করা এবং নিষ্কাশিত পিটভূমি পুনরুদ্ধার করলে নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস দূর হয়। মিলে মিথেন ধারণ ব্যবস্থা বর্জ্যপানির গ্যাসকে শক্তি উৎপাদনের বায়োগ্যাসে রূপান্তর করে, ফলে প্রতি টন অপরিশোধিত পাম অয়েলের নির্গমন অনেক কমে। পরিস্থিতি মডেলিংয়ে দেখা যায়, মিলগুলো মিথেন ধারণ করলে এবং পিটভূমি রূপান্তর ধাপে ধাপে বন্ধ করা হলে ২০৪০ সালের দিকে পাম অয়েলের নির্গমন-ঘনত্ব প্রতিদ্বন্দ্বী তেলের সমান বা তার চেয়েও কম হতে পারে। শক্তি বা পশুখাদ্য হিসেবে উপজাত ও বর্জ্যপণ্য ব্যবহারের ওপর জোর দিলেও সামগ্রিক ফল আরও ভালো হয়।

বিজ্ঞাপন

জীববৈচিত্র্য ও জনগোষ্ঠীর অধিকারই এখনো মূল পরীক্ষা

টেকসই পাম অয়েল উৎপাদনে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, নদীতীরের সুরক্ষাবলয়, উচ্চ সংরক্ষণমূল্য ও উচ্চ কার্বন মজুতসম্পন্ন এলাকা রক্ষা করতে হবে। বাগানের ভেতরে ও আশপাশে সংরক্ষিত এলাকা নির্ধারণ এবং পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ভূদৃশ্যে প্রজাতির চলাচলের সংযোগ বজায় রাখা ও পানির গুণমান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলের উৎপাদকেরা সীমান্ত পেরিয়ে পরিচালিত বড় সংরক্ষণ উদ্যোগে অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে বিশাল বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করা হয়।

সনদায়ন জরুরি, তবে যথেষ্ট নয়

অভিযোগের ঘটনাগুলো দেখায় কেন কঠোর প্রয়োগ জরুরি। পশ্চিম আফ্রিকার নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বাগান প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘন ও বন উজাড়ের তথ্য নথিভুক্ত করেছে এবং প্রতিকার পরিকল্পনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার জন্য সনদায়ন সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, মানদণ্ডের সঙ্গে স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ, সময়মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা থাকা চাই। ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় শিল্পভিত্তিক বাগান থেকে বন উজাড় কমলেও কিছু এলাকায় ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কারণে বন পরিষ্কার বেড়েছে। ফলন বাড়ানোর প্রশিক্ষণ, জমির বৈধ মালিকানার নথি পাওয়ার সুযোগ এবং ন্যায্য ক্রয়চুক্তি নতুন এলাকা পরিষ্কার করার চাপ কমাতে সহায়তা করে।

অভিযোজন না হলে জলবায়ু পরিবর্তনে ফলন হুমকির মুখে

অয়েল পাম তাপ, পানির সংকট ও বৃষ্টিপাতের সময়সূচির পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর্যালোচনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ফলন হ্রাস, বালাই ও রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর। অভিযোজন না হলে জলবায়ুর চাপ অয়েল পাম চাষের উপযোগী জমির পরিমাণ কমাতে এবং উৎপাদনে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

উৎপাদক ও নীতিনির্ধারকদের অভিযোজনের অগ্রাধিকার

জলবায়ু-সহনশীল জাত উদ্ভাবন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। এর পাশাপাশি অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ শুষ্ক সময় সামাল দেওয়ার জন্য পানি নিষ্কাশন ও সেচ নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থায় বিনিয়োগ দরকার। মালচিং, মাটির আচ্ছাদনকারী ফসল, কৃষিবনায়নের প্রান্ত এবং নির্ভুল উপকরণ ব্যবহারের মতো জলবায়ু-সহনশীল চর্চা বাগানকে আরও স্থিতিস্থাপক করে। নীতি পর্যায়ে শক্তিশালী ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, বন ও পিটভূমি সুরক্ষা, এবং মিলে মিথেন ধারণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রণোদনা নির্গমন কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে পারে। ক্ষুদ্র কৃষকদের অভিযোজন ও দীর্ঘমেয়াদি মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে আরও ভালো তথ্যসহ কিছু ঘাটতির দিকেও গবেষণায় নজর দেওয়া হয়েছে।

যা জানা জরুরি

  • অন্য তেল ফসলের তুলনায় অয়েল পামে সামান্য জমি লাগে। এটি প্রতি হেক্টরে ৪ থেকে ৫ টন তেল দিতে পারে, আর পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ২০৪০ সালের মধ্যে আরও বেশি ফলনের সম্ভাবনা দেখা গেছে।
  • পাম অয়েলের বদলে বিকল্প তেল ব্যবহার করলে মোট জমি রূপান্তর বাড়তে পারে এবং অন্য বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ সরে যেতে পারে।
  • গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন উজাড়ে পাম অয়েলের অংশ আনুমানিক ৫ শতাংশ; বিশ্বজুড়ে এই অংশ প্রায় ২.৩ শতাংশ।
  • নিষেধাজ্ঞা, কঠোর আইন, সনদায়ন এবং করপোরেট বন উজাড়বিরোধী নীতির কারণে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাম অয়েল-সংশ্লিষ্ট বন উজাড় কমেছে।
  • পারা অঙ্গরাজ্যে ব্রাজিলের অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনায় নতুন পাম চাষের বেশির ভাগ চারণভূমিতে হয়েছে; কর্মসূচি শুরুর পর সরাসরি বন রূপান্তর ১ শতাংশের নিচে নেমেছে।
  • আরএসপিও, জাতীয় মানদণ্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন উজাড়বিষয়ক বিধিমালা এমন সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে, যার উৎস শনাক্ত করা যায় এবং যা বন উজাড়মুক্ত।
  • বড় কোম্পানিগুলো সরবরাহের উৎস শনাক্ত করার উচ্চ হার জানিয়েছে এবং বন উজাড় নয়, পিটভূমি নয় ও শোষণ নয়—এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যার পেছনে রয়েছে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।
  • জেনেটিক উন্নয়ন, উন্নত কৃষিচর্চা এবং মিলে মিথেন ধারণ ফলন বাড়াতে ও নির্গমন-ঘনত্ব কমাতে পারে।
  • জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষিত এলাকা, জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা এবং কঠোর প্রয়োগ অগ্রগতি ধরে রাখতে অপরিহার্য।
  • জলবায়ু পরিবর্তন উৎপাদনশীলতার জন্য হুমকি; তাই সহনশীল জাত ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এখন জরুরি অগ্রাধিকার।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে