কেন আসিয়ান-ইইউ ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে সিঙ্গাপুর
বিচ্ছিন্ন পাইলট প্রকল্প থেকে সরে এসে একটি সুসংগঠিত ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তির দিকে এগোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে সিঙ্গাপুর। সুরক্ষাবাদ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের মধ্যে বাড়তে থাকা মতপার্থক্য সীমান্তপারের ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করছে। এমন সময়ে বাণিজ্য উন্মুক্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখা এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। উপপ্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী গ্যান কিম ইয়ংয়ের বক্তব্য ছিল এটাই। সিঙ্গাপুর ফিনটেক উৎসবে তিনি আসিয়ান-ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সহযোগিতায় নতুন গতি আনার আহ্বান জানান।
সূচিপত্র
- কেন আসিয়ান-ইইউ ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে সিঙ্গাপুর
- ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তিতে কী কী থাকতে পারে
- তথ্য প্রবাহ, গোপনীয়তা ও আস্থা
- অর্থ পরিশোধ, পরিচয় ও সীমান্তে সহজ বাণিজ্য
- আসিয়ানের ডিজিটাল কর্মসূচি পরিণত হচ্ছে
- যেসব বিষয়ে আসিয়ান ও ইইউ একমত, আর যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য
- সিঙ্গাপুরের প্রস্তাব, আস্থা ও ডব্লিউটিওর সন্ধিক্ষণ
- কোম্পানি ও ভোক্তাদের জন্য চুক্তির সুফল
- মূল কথা
গ্যান প্রস্তাবটিকে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে এগোনোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন, আসিয়ান ও ইইউ পৃথক আঞ্চলিক প্রকল্প হিসেবেই থাকবে, তবে ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি অভিন্ন নিয়মকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। তাঁর মতে, দুই পক্ষের মৌলিক বিষয়গুলো দিয়ে শুরু করা উচিত; আস্থা ও অভিজ্ঞতা বাড়লে চুক্তির পরিসরও বাড়ানো যাবে।
একটি চুক্তি নিয়ে যৌথ আলোচনা শুরুর প্রস্তাব তুলে ধরে গ্যান বলেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অনলাইন বাণিজ্য এখন যেখানে প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, সেই অঞ্চলের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতির মোট পণ্যদ্রব্যের মূল্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অর্থ পরিশোধ, ই-কমার্স, কনটেন্ট, লজিস্টিকস ও ফিনটেক খাতে এটি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন। একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারত্বের জন্য ব্যাপক ও প্রগতিশীল চুক্তি (সিপিটিপিপি)-সহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কথাও বলেন। যুক্তরাষ্ট্র ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর ১১টি দেশ মিলে সিপিটিপিপি নামে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি গঠন করে।
শ্রোতাদের উদ্দেশে বক্তব্যে উপপ্রধানমন্ত্রী দুই অঞ্চলের মধ্যে আলোচনা শুরুর সুফল তুলে ধরেন।
ইইউ ও আসিয়ান যদি ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে একসঙ্গে বসতে পারে, তবে তা হবে বড় ধরনের অগ্রগতি।
ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তিতে কী কী থাকতে পারে
ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তিতে সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য, সেবা ও ডিজিটাল পণ্য চলাচলের অভিন্ন নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। ইলেকট্রনিক চুক্তি ও স্বাক্ষর, ডিজিটাল চালান, পরিচয় যাচাই, তথ্য স্থানান্তর, ক্লাউড সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, অনলাইন ভোক্তা সুরক্ষা এবং প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত নিয়মের মতো বিষয়গুলোতে এটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামো দেয়। নিয়ম মেনে চলার ব্যয় কমানো, লেনদেনের গতি বাড়ানো এবং সীমান্তপারের ডিজিটাল বাণিজ্যে আস্থা জোরদার করাই এর লক্ষ্য।
তথ্য প্রবাহ, গোপনীয়তা ও আস্থা
ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্যের চলাচল এবং সুরক্ষাকে ঘিরেই সাধারণত সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো দেখা দেয়। ইইউর গোপনীয়তা ব্যবস্থা মূলত সাধারণ তথ্য সুরক্ষা বিধিমালার (জিডিপিআর) ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, আসিয়ানের অর্থনীতিগুলোতে বিভিন্ন মাত্রার কঠোরতাসম্পন্ন জাতীয় আইনের মিশ্র প্রয়োগ রয়েছে। আসিয়ান-ইইউ চুক্তিতে আস্থাভিত্তিক তথ্য স্থানান্তরের নিয়ম, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও স্থানান্তরের কার্যকর আইনি ভিত্তি, তথ্য ব্যবস্থাপনাকারীদের সুস্পষ্ট জবাবদিহি এবং কোনো সমস্যা হলে প্রতিকার পাওয়ার পথ নির্ধারণ করতে হবে।
মানদণ্ড কমিয়ে না এনেও মতপার্থক্য দূর করার উপায় রয়েছে। সরকারগুলো একে অপরের সুরক্ষাব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিতে পারে, উভয় পক্ষের আইন মেনে চলে এমন স্থানান্তর পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারে এবং অর্থায়ন বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের জন্য খাতভিত্তিক ব্যবস্থা স্থির করতে পারে। নিয়ম স্পষ্ট, পারস্পরিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল হলে প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হয়। আসিয়ান ও ইইউ আস্থার ন্যূনতম ব্যবস্থা নিয়ে একমত হতে পারলে রপ্তানিকারক ও স্টার্টআপগুলোর তথ্যসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
অর্থ পরিশোধ, পরিচয় ও সীমান্তে সহজ বাণিজ্য
অর্থ পরিশোধ ও পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা ডিজিটাল বাণিজ্যের মূল অবকাঠামো। ব্যবস্থাগুলোর পারস্পরিক সামঞ্জস্য থাকলে কোনো পর্যটক অন্য বাজারে কিউআর কোড স্ক্যান করে অর্থ দিতে পারেন, কিংবা হ্যানয়ের কোনো ক্ষুদ্র বিক্রেতা বার্লিনের ক্রেতার কাছ থেকে স্থানীয় লেনদেনের মতো সহজেই অর্থ পেতে পারেন। ডিজিটাল পরিচয় ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের পারস্পরিক স্বীকৃতি হিসাব খোলা, অর্থায়ন ও লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করে এবং জালিয়াতির ঝুঁকি কমায়। কাগজবিহীন বাণিজ্য ও ই-ইনভয়েসিংয়ের মতো ই-কমার্স লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল শুল্ক প্রক্রিয়ায় অভিন্ন নিয়ম চালু হলে পণ্য খালাসে সময় কমে এবং ভুলের সংখ্যা হ্রাস পায়।
সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন ভোক্তা সুরক্ষা হলো অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড, প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং ঘটনা মোকাবিলার পরিকল্পনায় সামঞ্জস্য থাকলে কোম্পানিগুলোর নিয়ম মেনে চলা এবং কোনো ঘটনার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা সহজ হয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীদের ন্যায্য আচরণসংক্রান্ত অভিন্ন নিয়ম ভোক্তাদের আস্থা বাড়ায় এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে।
আসিয়ানের ডিজিটাল কর্মসূচি পরিণত হচ্ছে
আসিয়ান সদস্যরা আসিয়ান ডিজিটাল অর্থনীতি কাঠামো চুক্তি (ডিইএফএ) নিয়ে আলোচনা করছেন। এটি হবে অঞ্চলজুড়ে একটি চুক্তি, যার মাধ্যমে ডিজিটাল বাণিজ্য, তথ্য, অর্থ পরিশোধ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিচয় ও ভোক্তা সুরক্ষার নিয়মে সামঞ্জস্য আনা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের ডিজিটাল অর্থনীতি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও সমন্বিত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ডিজিটাল বাজারের ভিত্তি হবে ডিইএফএ। এর লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া, তবে একই সঙ্গে নমনীয় থাকা, যাতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করা দেশগুলোও এতে অংশ নিতে ও সুফল পেতে পারে।
বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতাও এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় উন্নত আঞ্চলিক ইইউ-আসিয়ান সংলাপ উদ্যোগের মাধ্যমে তৈরি আসিয়ান ডিজিটাল সূচক (এডিআইএক্স) প্রকল্প দেশগুলোকে সংযোগ, জনসেবা ও ডিজিটাল দক্ষতার মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিমাপে সহায়তা করে। ২০২৫ সালের মে মাসে এডিআইএক্সের এক কর্মশালায় প্রথম সংস্করণ থেকে পাওয়া শিক্ষা পর্যালোচনা করা হয় এবং আরও উন্নত পরিসংখ্যান পদ্ধতি ও সংস্থাগুলোর মধ্যে ভালো সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এডিআইএক্স ২.০-এর সূচক নির্ধারণ করা হয়। অভিন্ন পরিমাপক নীতিনির্ধারকদের বিনিয়োগের লক্ষ্য ঠিক করতে এবং অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা তৈরি করা ঘাটতি চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।
পরিমাপের বাইরেও আসিয়ান ও ইইউ ডিজিটাল বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে সিঙ্গাপুরে আয়োজিত কর্মশালায় কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা নিয়ন্ত্রক পদ্ধতির তুলনা করেন এবং সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিচয় ও অনলাইন ভোক্তা সুরক্ষাসহ যেসব ক্ষেত্রে সমন্বয় সম্ভব, সেগুলো তুলে ধরেন। পাশাপাশি, ইইউর গ্লোবাল গেটওয়ে কর্মসূচি এ অঞ্চলজুড়ে সংযোগ ও অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। ২০২৫ সালের জুনে অনুষ্ঠিত যৌথ সহযোগিতা কমিটির বৈঠকে দুই পক্ষ ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের জন্য আসিয়ান-ইইউ কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এবং স্বচ্ছ, টেকসই ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকের পর দুই পক্ষ একটি যৌথ বার্তা প্রকাশ করে, যেখানে ডিজিটাল অর্থনীতিসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে তাদের অংশীদারত্বের কেন্দ্রে রাখা হয়।
দুই পক্ষই নিয়মভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল বাণিজ্য, সবুজ প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতায় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
যেসব বিষয়ে আসিয়ান ও ইইউ একমত, আর যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য
দুই অঞ্চলই প্রবৃদ্ধি, নিরাপদ তথ্য, স্থিতিস্থাপক সরবরাহব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য পরিবেশ চায়। তবে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে তাদের পার্থক্য রয়েছে। ইইউ জিডিপিআর ও নতুন প্ল্যাটফর্ম বিধিমালার মতো বিস্তৃত ও বাধ্যতামূলক নিয়মের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, আসিয়ানে বিভিন্ন পরিসর ও প্রয়োগক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় আইনের বিচ্ছিন্ন সমাহার রয়েছে। কিছু অর্থনীতিতে তথ্য স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আর অনলাইন কনটেন্ট ও প্ল্যাটফর্মের দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রেও পদ্ধতির ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়।
এই পার্থক্য দূর করতে প্রথম দিনেই বড় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। বাস্তবসম্মত প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে তথ্য স্থানান্তর, গোপনীয়তা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা এবং ইলেকট্রনিক লেনদেন নিয়ে ন্যূনতম অঙ্গীকারসহ নীতিভিত্তিক একটি কাঠামো। অর্থায়ন, উৎপাদন ও লজিস্টিকস খাতের জন্য সংযুক্তি পরে যুক্ত করা যেতে পারে। পারস্পরিক স্বীকৃতির একটি পথ উচ্চতর মান পূরণকারী দেশগুলোকে উৎসাহিত করতে পারে, তবে সক্ষমতা গড়ে তুলছে এমন দেশগুলোকে বাদ না দিয়েই। সাম্প্রতিক সময়ে ইইউ ও সিঙ্গাপুরের ডিজিটাল সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। আসিয়ান ও ইইউ এ অভিজ্ঞতাকে প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হিসেবে পর্যালোচনা, পরিমার্জন ও সম্প্রসারণ করতে পারে।
সিঙ্গাপুরের প্রস্তাব, আস্থা ও ডব্লিউটিওর সন্ধিক্ষণ
সিঙ্গাপুরের প্রস্তাবের ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। বন্দর উন্মুক্ত রাখা, চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানো এবং স্থিতিশীল আইনি পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমে দেশটি ভৌত বাণিজ্যে সুনাম গড়ে তুলেছে। এখন ডিজিটাল বাণিজ্য ও অর্থায়নেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করছে তারা। সিঙ্গাপুরের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ স্টেবলকয়েনের জন্য প্রাথমিক নিয়ম নির্ধারণ করেছে, নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্স ও পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে এবং প্রজেক্ট গার্ডিয়ানের অধীনে টোকেনভিত্তিক সম্পদের মতো সীমান্তপারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবং প্রজেক্ট অর্কিডের অধীনে খুচরা পর্যায়ের অবকাঠামো পরীক্ষায় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। কী কার্যকর, তা প্রমাণ করা এবং পরে পারস্পরিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানের মাধ্যমে অংশীদারদের নিয়ে তা সম্প্রসারণ করাই লক্ষ্য।
আঞ্চলিক ডিজিটাল উদ্যোগকে বৈশ্বিক নিয়ম হালনাগাদের প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত করেন গ্যান। তিনি বলেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হতে ডব্লিউটিওকে রূপান্তরিত করতে হবে। তবে ন্যায্য বাণিজ্যের জন্য সংস্থাটিকে তিনি অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, উন্মুক্ত বাজার ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রয়োগের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন আঞ্চলিক চুক্তি এবং আধুনিক বহুপক্ষীয় নিয়ম একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।
অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এগিয়ে নিতে আসিয়ানের উচিত জিসিসি ও সিপিটিপিপির মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা। বাইরের পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠলেও অনেক সুযোগ এখনো রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইইউ-আসিয়ান ডিজিটাল আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বলতে গিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্যোগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তববাদ, দুটিই তুলে ধরেন গ্যান।
আরও পদক্ষেপ বিবেচনা করার আগে আমরা ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা ও মৌলিক নিয়ম নিয়ে শুরু করব।
কোম্পানি ও ভোক্তাদের জন্য চুক্তির সুফল
ব্যবসার ক্ষেত্রে ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তির সুফল দেখা যাবে দ্রুত হিসাব খোলা, সহজ অর্থ পরিশোধ, কম কাগজপত্র এবং সীমান্তপারে পণ্য বিক্রির সময় কম আইনি ঝুঁকির মধ্যে। ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ আরও ভালো সুরক্ষা, সীমান্তপারে পণ্য ও সেবার বেশি বিকল্প এবং ডিজিটাল সেবার নিরাপদ ব্যবহার। সরকারের জন্য এটি সাইবার হামলা ও জালিয়াতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী সহযোগিতা এবং সংকটের সময় সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার উন্নত উপায় দেবে।
- স্পষ্ট আইনি ভিত্তি ও সুরক্ষাসহ আস্থাভিত্তিক সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহ, যা রপ্তানিকারক, ব্যাংক ও ক্লাউড সেবা প্রদানকারীদের নিয়ম মানার অনিশ্চয়তা কমাবে।
- বিভিন্ন বাজারে ডিজিটাল পরিচয় ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের স্বীকৃতি, যা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব খোলা, বাণিজ্য অর্থায়ন, লাইসেন্স গ্রহণ ও জনসেবার প্রক্রিয়া দ্রুত করবে।
- তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর ও কিউআর কোডে অর্থ পরিশোধসহ পারস্পরিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ পেমেন্ট ব্যবস্থা, যা প্রবাসী আয় পাঠানো এবং সীমান্তপারের কেনাকাটার খরচ কমাবে।
- কাগজবিহীন বাণিজ্য ও ই-ইনভয়েসিং, যা শুল্ক খালাসের সময় কমাবে, ভুল হ্রাস করবে এবং সরবরাহব্যবস্থায় পণ্যের গতিপথ অনুসরণ সহজ করবে।
- সাইবার নিরাপত্তায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঘটনা প্রতিবেদন তৈরির সমন্বিত নিয়ম, যা স্থিতিস্থাপকতা ও যৌথভাবে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে।
- অনলাইন ভোক্তা সুরক্ষার আরও স্পষ্ট নিয়ম, যা সীমান্তপারের কেনাকাটা ও সেবায় আস্থা বাড়াবে।
- বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করতে আসিয়ান ডিজিটাল সূচকের মতো সক্ষমতা বৃদ্ধির উপকরণ, বিশেষত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য।
মূল কথা
- বাণিজ্য উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক রাখতে ডিজিটাল অর্থনীতি চুক্তি নিয়ে আসিয়ান ও ইইউর আলোচনা শুরুর আহ্বান জানাচ্ছে সিঙ্গাপুর।
- গ্যান কিম ইয়ং বলেন, দুই অঞ্চলের মধ্যে আলোচনা বড় অগ্রগতি হবে; প্রথম পর্যায়ে ডিজিটাল অর্থনীতির মৌলিক নিয়মে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
- ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতির মূল্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
- আসিয়ান ডিইএফএ নিয়ে আলোচনা করছে। এদিকে আসিয়ান-ইইউ সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে এডিআইএক্স এবং ডিজিটাল বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে যৌথ কর্মশালা।
- আসিয়ান-ইইউ যৌথ সহযোগিতা কমিটি স্বচ্ছ, টেকসই ও নিয়মভিত্তিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
- যেকোনো চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে তথ্য স্থানান্তর, গোপনীয়তা, অর্থ পরিশোধ, ডিজিটাল পরিচয়, সাইবার নিরাপত্তা, ভোক্তা সুরক্ষা ও কাগজবিহীন বাণিজ্য।
- সিঙ্গাপুর ডিজিটাল আস্থার কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে চায় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ম হালনাগাদে ডব্লিউটিও সংস্কারেরও সমর্থক।
- এ ধরনের চুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানার ব্যয় কমাতে, ভোক্তাদের পছন্দ বাড়াতে এবং সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে।






