বহু বছরের অপেক্ষার পর এক মাইলফলক
অর্থনীতিবিদেরা বহু বছর ধরেই যে র্যাঙ্কিং পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন, ভারত এখন তার দ্বারপ্রান্তে। নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে দেশটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, তা ২০২৫ সালের মধ্যেই হতে পারে; অথবা ভারতের ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরের শেষ নাগাদ। এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দুটি ভিন্নমুখী প্রবণতা। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধির একটি অর্জন করেছে ভারত। অন্যদিকে, জাপানের প্রবৃদ্ধি দুর্বল এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারে হিসাব করা দেশটির জিডিপি কমে যাচ্ছে।
সূচিপত্র
- বহু বছরের অপেক্ষার পর এক মাইলফলক
- সময়ের হিসাব কেন ভিন্ন: বর্ষপঞ্জি, মুদ্রা ও পদ্ধতি
- বর্ষপঞ্জি বনাম অর্থবছর
- মুদ্রার প্রভাব
- নামমাত্র জিডিপি বনাম ক্রয়ক্ষমতার সমতা
- যে শক্তিগুলো ভারতের প্রবৃদ্ধি চালাচ্ছে
- বিনিয়োগ ও অবকাঠামো
- উৎপাদন খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা
- সেবা খাত ও ডিজিটাল জনপরিকাঠামো
- জাপানের ধীরগতির কারণ
- জনমিতি ও উৎপাদনশীলতা
- নীতির পরিবর্তন ও ইয়েন
- তৃতীয় স্থানের কতটা কাছে
- জার্মানিকে ছাড়ানোর চ্যালেঞ্জ
- প্রবৃদ্ধির গতি কমাতে পারে যেসব ঝুঁকি
- অর্থনীতির আকার বনাম জীবনযাত্রার মান
- ব্যবসা ও ভূরাজনীতিতে এর তাৎপর্য
- মূল বিষয়গুলো
পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, প্রতিযোগিতা কতটা কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। আইএমএফের ২০২৫ সালের এপ্রিলের পূর্বাভাসে ওই বছর ভারতের নামমাত্র উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ৪.১৮৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জাপানের প্রায় ৪.১৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে সামান্য বেশি। ব্যবধানটি খুবই সামান্য। কয়েকটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ, ভোগব্যয় ও তরুণ কর্মশক্তির সহায়তায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি থাকবে। বিপরীতে, জাপানের প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৬ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইয়েন দুর্বল থাকলে ডলারের হিসাবে দেশটির অর্থনীতি কার্যত স্থবির থাকবে।
ভারতের জন্য এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থানের এক প্রতীকী অগ্রগতি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানির পরেই থাকবে দেশটি। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে দশকের শেষভাগে তৃতীয় অবস্থানেও পৌঁছাতে পারে। এই পরিবর্তনে এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রও নতুন করে সাজবে। ২০১০ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে এ অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছিল চীন। এখন এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসছে ভারত, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার বৃদ্ধি এবং জাপানে দীর্ঘদিনের ধীর নামমাত্র প্রবৃদ্ধি, দুটিই প্রতিফলিত করে।
সময়ের হিসাব কেন ভিন্ন: বর্ষপঞ্জি, মুদ্রা ও পদ্ধতি
সরকারি হিসাব প্রকাশের আগেই সংবাদ শিরোনামে কখনো বলা হয়েছে পরিবর্তনটি “ইতিমধ্যেই ঘটেছে”, আবার কখনো বলা হয়েছে “এখনো নয়”। জিডিপির তালিকায় প্রভাব ফেলা তিনটি কারিগরি বিষয়ের ওপর এই পার্থক্য নির্ভর করে: হিসাবের বর্ষপঞ্জি, বিনিময় হার এবং নামমাত্র জিডিপি ও ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে হিসাব করা জিডিপির পার্থক্য।
বর্ষপঞ্জি বনাম অর্থবছর
জাপান বর্ষপঞ্জি বছর অনুযায়ী জিডিপির হিসাব প্রকাশ করে। ভারতের সরকারি হিসাব সাধারণত অর্থবছর অনুযায়ী দেওয়া হয়, যা এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে। ভারতের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সঙ্গে জাপানের ২০২৫ বর্ষপঞ্জি বছরের তুলনা করলে, একই বর্ষপঞ্জি ধরে তুলনার চেয়ে আগেই পরিবর্তনটি ঘটেছে বলে মনে হতে পারে। এ কারণেই নয়াদিল্লির কিছু কর্মকর্তা ভিন্ন প্রতিবেদনকালকে একসঙ্গে বিবেচনা করা আইএমএফের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে নতুন র্যাঙ্কিংয়ের কথা বলেছেন। অথচ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সর্বশেষ বাস্তব পরিসংখ্যানে ভারত পঞ্চম অবস্থানেই ছিল।
মুদ্রার প্রভাব
নামমাত্র জিডিপির তালিকা মার্কিন ডলারে তৈরি করা হয়। ইয়েনের অবমূল্যায়ন হলে জাপানের ডলারভিত্তিক জিডিপি কমে যায়, যদিও দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন না-ও ঘটে। বহু বছরের অতি সহজ নীতির পর ব্যাংক অব জাপান নীতি স্বাভাবিক করার পথে থাকায় ইয়েন দুর্বল হয়েছে; অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে সুদের হার দ্রুত বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে ভারতীয় রুপি বেশি স্থিতিশীল ছিল। ইয়েনের ওপর চাপ যত দিন থাকবে, এই মুদ্রার ব্যবধান নামমাত্র জিডিপিতে ভারত ও জাপানের পার্থক্য আরও বাড়িয়ে তুলবে।
নামমাত্র জিডিপি বনাম ক্রয়ক্ষমতার সমতা
নামমাত্র জিডিপিতে বাজারে হওয়া লেনদেনের মোট মূল্য ডলারে রূপান্তর করে অর্থনীতিগুলোর র্যাঙ্কিং করা হয়। ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাবে স্থানীয় দামের পার্থক্য সমন্বয় করা হয়। পিপিপির হিসাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত ইতিমধ্যেই তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বর্তমান মাইলফলকটি নামমাত্র জিডিপি নিয়ে, যা বাজার ও সরকারি ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাপকাঠি। কারণ, এটি আর্থিক প্রবাহ, বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক করপোরেট কৌশলের ভিত্তি।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই পরিবর্তন দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঘটবে বলে ধারণা করা হয়েছিল; সুনির্দিষ্ট মাসটি নির্ভর করছে ওই কারিগরি বিষয়গুলোর ওপর। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান মার্সেল থিলিয়াঁ কয়েক বছর ধরে এই ব্যবধান কমে আসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আমাদের বিদ্যমান পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আমরা ধারণা করেছিলাম, ২০২৬ সালে ভারত জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে।
আইএমএফের মূল পূর্বাভাসে ২০২৫ এবং কিছু বেসরকারি পূর্বাভাসে ২০২৬ সাল বলা হয়েছে। তারিখের এই ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, বিতর্কটি দিকনির্দেশের চেয়ে সংজ্ঞা নিয়ে বেশি। দিকটি অবশ্য স্পষ্ট। দুই দশক আগে যে ব্যবধান ট্রিলিয়ন ডলারে মাপা হতো, ভারত তা কমিয়ে এখন প্রায় হিসাবের সামান্য এদিক-ওদিকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
যে শক্তিগুলো ভারতের প্রবৃদ্ধি চালাচ্ছে
ভারতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হলো বিনিয়োগ, বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য ধীর হলেও রপ্তানি অব্যাহত রাখা সেবা খাত এবং এক দশকের ডিজিটাল ও লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়ন, যা দৈনন্দিন বাণিজ্যে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে। দেশটি এখনো রূপান্তরের মাঝপথে। পূর্ব এশিয়ার মানদণ্ডে উৎপাদন খাতের অংশ এখনো সীমিত এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিসর বাড়ানো প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মতো শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে এর মূল চালিকাশক্তিগুলো।
বিনিয়োগ ও অবকাঠামো
বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারি মূলধনী ব্যয় বেড়েছে। এতে মহাসড়ক, মালবাহী পণ্য পরিবহনের করিডর, নগর গণপরিবহন এবং জ্বালানি নেটওয়ার্কের উন্নতি হয়েছে। উন্নত লজিস্টিকস পরিবহন খরচ কমায় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিলম্ব হ্রাস করে। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হওয়া এবং গত দশকের তুলনায় খেলাপি ঋণ কম থাকায় বেসরকারি খাতের মূলধনী ব্যয়ও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই প্রবণতাগুলো একসঙ্গে নির্মাণ, সিমেন্ট, ধাতু এবং বড় প্রকল্পে সরবরাহ দেওয়া ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তৃত পরিসরকে সহায়তা করছে।
উৎপাদন খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ইলেকট্রনিকস, সৌর সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত রাসায়নিকসহ যেসব খাতে ভারত বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করতে চায়, সেসব ক্ষেত্রে কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দিতে নতুন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। উৎপাদনে প্রণোদনা, বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ বাজার এবং পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ভারতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোবাইল ফোন সংযোজনের কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সংযোজন থেকে যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতির গভীর সরবরাহব্যবস্থায় অগ্রসর হওয়া, যা বেশি বেতনের কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করে।
সেবা খাত ও ডিজিটাল জনপরিকাঠামো
সেবা খাতই এখনো ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা ডলারে বিশ্ববাজারে বিক্রি হয়, যা পণ্য রপ্তানি দুর্বল হলে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেয়। দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচয়, অর্থ পরিশোধ ও তথ্য ব্যবহারে সম্মতির ব্যবস্থা একসূত্রে যুক্ত করেছে। তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধব্যবস্থা ও কম খরচের ডিজিটাল অর্থায়ন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তাকে আনুষ্ঠানিক লেনদেনের আওতায় এনেছে। এতে দেশব্যাপী পণ্য ও সেবা করের আওতায় কর আদায় বাড়ে, ঋণযোগ্যতা নিরূপণ উন্নত হয় এবং ব্যবসা করার জটিলতা কমে।
জাপানের ধীরগতির কারণ
উন্নত উৎপাদন খাতে শক্তিশালী ভিত্তিসম্পন্ন জাপানের অর্থনীতি এখনো বড় ও অত্যাধুনিক। তবে নামমাত্র জিডিপির তালিকায় দেশটির অবস্থান দীর্ঘদিনের নিম্ন মূল্যস্ফীতি, কয়েক দফা মূল্যহ্রাস, অত্যন্ত ধীর নামমাত্র প্রবৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে। ডলারে রূপান্তর করলে এই সমন্বিত প্রভাব জাপানের পরিমাপ করা অর্থনীতির আকার কমিয়ে দেয়, যদিও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
জনমিতি ও উৎপাদনশীলতা
জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং কর্মশক্তি সংকোচন প্রবণতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধিকে চাপে ফেলছে। সরকার নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং অভিবাসন উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে; এতে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। তবে জনমিতিক শক্তিগুলো প্রবল। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক কয়েকটি খাতের বাইরে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চিত্রও অসম। এসব কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের কাছাকাছি সীমিত থাকে; ইয়েন দুর্বল হলে ডলারের হিসাবে তা আরও কমে যায়।
নীতির পরিবর্তন ও ইয়েন
বহু বছর ধরে ব্যাংক অব জাপান সুদের হার প্রায় শূন্যে রেখেছিল, যখন অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতিতে কড়াকড়ি আনছিল। এতে সুদের হারের ব্যবধান বেড়ে ইয়েনের ওপর চাপ পড়ে। ব্যাংক অব জাপান সুদের হার বাড়াতে শুরু করলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় দেশটির নীতি এখনো অনেক সহজ। ২০২৩ সালের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর আইএমএফ এখন ২০২৫ সালে জাপানের প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৬ শতাংশ হবে বলে আশা করছে। অতীতের নিম্নপর্যায়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি ও ভোগব্যয় এখনো পুরোপুরি তার সঙ্গে খাপ খায়নি। ফলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি সামান্য, আর ডলারে রূপান্তর করলে নামমাত্র জিডিপি আরও সংকুচিত হয়।
তৃতীয় স্থানের কতটা কাছে
ভারতের পরবর্তী লক্ষ্য জার্মানি, বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। জ্বালানি ব্যয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল ধারা এবং শিল্প খাতের রূপান্তর জার্মানির উৎপাদনকে চাপে ফেলায় দেশটির প্রবৃদ্ধি দুর্বল। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি প্রায় ৫.৫৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। বার্লিনের অর্থনীতি ধীরগতিতে বাড়লে এবং ভারত ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে, এই পরিমাণ জার্মানিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। বিনিময় হার ও প্রবৃদ্ধির গতিপথের ওপর নির্ভর করে কয়েকটি বেসরকারি পূর্বাভাসে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিবর্তনটি ঘটতে পারে বলে বলা হয়েছে।
জার্মানিকে ছাড়ানোর চ্যালেঞ্জ
জার্মানির সঙ্গে ব্যবধান কমাতে বড় ধরনের প্রয়াস প্রয়োজন। ভারতকে বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং পণ্য ও উচ্চমূল্যের সেবা, উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, আরও গভীর আর্থিক বাজার এবং দ্রুত বিচারিক নিষ্পত্তি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বড় হতে সহায়তা করে। প্রণোদনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক লজিস্টিকস এবং পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ।
প্রবৃদ্ধির গতি কমাতে পারে যেসব ঝুঁকি
টেকসই ও ব্যাপকভিত্তিক প্রবৃদ্ধি কখনোই নিশ্চিত নয়। কয়েকটি ঝুঁকি অব্যাহত বা তীব্র হলে প্রবৃদ্ধির গতিপথ বদলে যেতে পারে।
- বিশেষ করে উৎপাদন ও উচ্চ উৎপাদনশীল সেবা খাতে, কর্মশক্তিতে নতুন যোগ হওয়া মানুষের সংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া।
- বিশ্বের মানদণ্ডে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কম থাকা, যা পরিবারের আয় ও কার্যকর কর্মশক্তির পরিসর সীমিত করে।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি উৎপাদনশীলতাকে সীমিত করা, বিশেষ করে পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়া জেলা ও গ্রামীণ এলাকায়।
- তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টি এবং পানির সংকটের মতো জলবায়ুজনিত ধাক্কা কৃষি ও নগরজীবন ব্যাহত করা।
- বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক এবং বৈশ্বিক চাহিদা ধীর হওয়ার মতো বহিরাগত প্রতিকূলতা, যা রপ্তানি ও বিনিয়োগ প্রবাহে আঘাত হানতে পারে।
- বাজেটের পরিসর সংকুচিত হলে ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি ও সরকারি মূলধনী ব্যয় থেকে সৃষ্ট আর্থিক চাপ, এবং ঋণকে টেকসই পথে রাখার প্রয়োজন।
নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্য বিধিবিধান বিনিয়োগকারীদের বহু বছরের প্রকল্প পরিকল্পনায় সহায়তা করে। লজিস্টিকস ও ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নতি ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কীভাবে সময়ের সঙ্গে সুফল বাড়ায়।
অর্থনীতির আকার বনাম জীবনযাত্রার মান
জিডিপি র্যাঙ্কিং অর্থনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে, তবে সমৃদ্ধি কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে তা দেখায় না। ভারতের গড় আয় জাপানের তুলনায় এখনো অনেক কম। আইএমএফের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ২,৭০০ ডলার; জাপানে তা প্রায় ৩৯,০০০ ডলার। স্থানীয় দামের ভিত্তিতে সমন্বয় করার পরও ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে ভারতের মাথাপিছু আয় জাপানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এই ব্যবধান ভারতের উন্নয়নের বর্তমান পর্যায় তুলে ধরে এবং প্রবৃদ্ধির গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রবৃদ্ধির গুণমানও কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝায়।
জিডিপি বাড়লেই যে সব পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, তা নয়। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানো, শিক্ষার ফল উন্নত করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো সামষ্টিক প্রবৃদ্ধিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উন্নতিতে রূপান্তর করার জন্য জরুরি। এসব ক্ষেত্রে রাজ্য ও খাতভেদে অগ্রগতি অসম। আগামী বছরগুলোতে দেখা যাবে, বিশেষ করে বড় মহানগরের বাইরের নারী ও তরুণ কর্মীদের জন্য ভারত অর্থনীতির বিশালতাকে সুযোগে রূপ দিতে পারে কি না।
ব্যবসা ও ভূরাজনীতিতে এর তাৎপর্য
বিশ্বের কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতের উত্থান মানে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে—এমন আরেকটি বড় বাজার যুক্ত হওয়া। একক দেশের সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগে ইতিমধ্যেই আরও বেশি ইলেকট্রনিকস, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও বিশেষায়িত রাসায়নিক খাতের বিনিয়োগ ভারতে এসেছে। স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিসহ বড় অর্থনীতি পুঁজিপ্রবাহ ও বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর বরাদ্দও বদলে দেয়, কারণ বৈশ্বিক তহবিলগুলো ভারতীয় শেয়ার ও বন্ডে তাদের বিনিয়োগের ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ করে।
বিশ্ব উৎপাদনে ভারতের অংশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতির গুরুত্বও বাড়বে। গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশাধিকার, সহজ শুল্কপ্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগ চুক্তি ঠিক করে দেয় পরবর্তী কারখানাগুলো কোথায় যাবে। ভারতের আমদানির প্রয়োজন বিবেচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো ও বিদ্যুৎ গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা জোরদার করলে বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিকে আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপের প্রেক্ষাপট তৈরি করবে।
মূল বিষয়গুলো
- আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৫ সালে ভারতের নামমাত্র জিডিপি প্রায় ৪.১৮৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জাপানের প্রায় ৪.১৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে সামান্য বেশি।
- বর্ষপঞ্জি ও বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী পরিবর্তনটি ২০২৫ সালে দেখা যেতে পারে, অথবা ভারতের অর্থবছর শেষ হওয়ার সময় ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ ঘটতে পারে।
- ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জাপানের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ০.৬ শতাংশ; দুর্বল ইয়েন ডলারভিত্তিক জিডিপি কমিয়ে দিচ্ছে।
- ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বে তৃতীয়, তবে বর্তমান মাইলফলকটি বাজার ও সরকারি র্যাঙ্কিংয়ে ব্যবহৃত নামমাত্র জিডিপি নিয়ে।
- ভারতের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তির মধ্যে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নত লজিস্টিকস, সেবা রপ্তানি এবং অর্থ পরিশোধ ও পরিচয় যাচাইয়ের জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো।
- জনমিতিক চাপ, বছরের পর বছর নিম্ন মূল্যস্ফীতি এবং ইয়েনের অবমূল্যায়ন, যা ডলারে হিসাব করা জিডিপি কমায়, জাপানের অবস্থানকে চাপে ফেলছে।
- বর্তমান ধারা বজায় থাকলে দশকের শেষভাগে ভারত জার্মানিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে; কয়েকটি পূর্বাভাসে ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের কথা বলা হয়েছে।
- ভারতে মাথাপিছু আয় জাপানের তুলনায় অনেক কম, যা কর্মসংস্থাননির্ভর প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।






