দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে নেমে আসে নীরবতা
দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে পরিচিত এক নীরবতা নেমে আসতে চলেছে। বৃহস্পতিবার পাঁচ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী কলেজ স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্টে বসবে। সুনেউং নামে পরিচিত এই বার্ষিক পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথ নির্ধারণ করতে পারে এবং অনেকের প্রাথমিক কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলে। পরীক্ষার্থীরা যাতে শান্ত পরিবেশে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য দেশজুড়ে যাতায়াতের গতি কমানো হয়, উড়োজাহাজের উড্ডয়ন স্থগিত থাকে এবং কর্মদিবসের সময়সূচি শিথিল করা হয়। পরিবার ও শিক্ষার্থীদের কাছে বছরের পর বছর প্রস্তুতির পরিণতি এসে মেলে এক দীর্ঘ দিনে।
সূচিপত্র
এ বছর দেশজুড়ে ১,৩১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসার জন্য নিবন্ধিত হয়েছে ৫৫৪,১৭৪ জন। শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাত বছরের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পরীক্ষার্থীসংখ্যা। ২০০৭ সালে জন্ম নেওয়া ‘গোল্ডেন পিগ’ প্রজন্মের সংখ্যাগত বৃদ্ধিও এর একটি কারণ। উচ্চমাধ্যমিকের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় অংশ; বাকিদের মধ্যে রয়েছে স্নাতক এবং অন্যান্য পরীক্ষার্থী। পরীক্ষাটির গুরুত্ব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভবিষ্যৎ সুযোগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সকালে কেন্দ্রের দরজা খোলে, আর সময়সূচিতে কোনো ছাড় নেই। পরীক্ষার্থীদের সকাল ৮টা ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাতে হবে এবং পরীক্ষা চলবে বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। নিরিবিলি সড়ক, শেয়ারবাজার দেরিতে খোলা এবং বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা এখন সুনেউং সপ্তাহের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। লক্ষ্যটা সহজ: সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষার্থীরা বাইরের যানজট নয়, পরীক্ষায় মনোযোগ দিতে পারে।
পরীক্ষার দিনে কী ঘটে
পরীক্ষার্থীদের জন্য সকালের প্রস্তুতিতে থাকে রুটিন আর তাড়াহুড়োর ভারসাম্য। অনেকে ভোর হওয়ার আগেই বাড়ি থেকে বের হয়। দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তারা ১১২ নম্বরে ফোন করতে পারে; পুলিশ মোটরসাইকেল আরোহী ও টহল গাড়ি পাঠিয়ে তাদের নির্ধারিত কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার্থীদের পৌঁছে দিতে জাতীয় পুলিশ সংস্থা দশ হাজারের বেশি কর্মকর্তা মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে। স্কুলের কাছে থাকবে দুই হাজারের বেশি টহল গাড়ি। সকাল ৮টা ১০ মিনিটের পর কোনো শিক্ষার্থী স্কুলের ফটকে পৌঁছালে তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না, আর সে বছরের সুযোগও শেষ হয়ে যাবে।
শব্দ নিয়ন্ত্রণ সুনেউংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশে শব্দ এড়িয়ে চলতে বলা হয়, ভারী যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকে, আর স্কুলের কাছে গাড়ির হর্ন বাজানো নিরুৎসাহিত করা হয়। ইংরেজি শ্রবণ অংশের সময় এই নীরবতা আকাশেও ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত দেশজুড়ে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ থাকে। ইতিমধ্যে আকাশে থাকা উড়োজাহাজগুলোকে ৩,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় থাকতে হয়। নীরবতা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটসহ ডজনখানেক ফ্লাইটের সময়সূচি বদলে দেয়। ওই সময় ড্রোন ওড়ানো এবং নিচু দিয়ে সামরিক মহড়াও স্থগিত থাকে।
যান চলাচল সচল রাখতে পরিবহন সংস্থাগুলো অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেয়। সিউলে সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে পাতালরেলে আরও ২৯টি ট্রিপ যোগ হয়। দেরি করা পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে শহরজুড়ে ৬৪৬টি শাটল গাড়ি প্রস্তুত থাকে। স্কুলের কাছে হঠাৎ ব্রেক না করতে এবং হর্ন না বাজাতে বাস ও ট্যাক্সিচালকদের অনুরোধ করা হয়েছে। সকালের যাতায়াত সহজ করতে কসপি, কসডাক ও কোনেক্স শেয়ারবাজার স্বাভাবিক সময়ের এক ঘণ্টা পরে সকাল ১০টায় খোলে। শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময়ে সড়ক ফাঁকা রাখতে সরকারি দপ্তরগুলোর কাজ শুরুর সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হয়।
পরীক্ষার ভেতরের চিত্র
জাতীয় উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা কলেজে পড়ার জন্য কতটা প্রস্তুত, তা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সুনেউং নেওয়া হয়। মূল বিষয়গুলো হলো কোরীয় ভাষা, গণিত, ইংরেজি ও কোরীয় ইতিহাস। শিক্ষার্থীরা সমাজবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান থেকে অতিরিক্ত বিষয় বেছে নেয়। অনেকে, তবে সবাই নয়, দ্বিতীয় একটি বিদেশি ভাষা বা ধ্রুপদি চীনা ভাষাও নেয়। কোরীয় ইতিহাস সবার জন্য বাধ্যতামূলক। অধিকাংশ প্রশ্নই বহুনির্বাচনী। গণিত পরীক্ষায় থাকে অল্প কয়েকটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়ার প্রশ্ন। ক্যালকুলেটর ব্যবহারের অনুমতি নেই, তাই গণিতে সময় ব্যবস্থাপনা ও সমাধান সাজিয়ে নেওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সকাল ও বিকেলজুড়ে পাঁচটি পর্বে পরীক্ষা চলে, দিনটি তাই দীর্ঘ। প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষা চলে প্রায় ৮০ থেকে ১০৭ মিনিট। পর্বগুলোর মাঝে থাকে ছোট বিরতি, আর দুপুরের দিকে থাকে খাবারের বিরতি। ইংরেজি পরীক্ষায় দুপুরের শুরুতে শ্রবণ অংশ রয়েছে; এ কারণেই দেশজুড়ে ফ্লাইট বন্ধ থাকে। ইংরেজিতে নিরঙ্কুশ মানদণ্ডে নম্বর দেওয়া হয়, আর অধিকাংশ বিষয়ে মানসম্মত স্কোর নির্ধারণ করা হয় জাতীয় পর্যায়ের বণ্টন অনুযায়ী। নয় ধাপের প্রচলিত র্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরা পড়ে। নম্বরে সামান্য হেরফেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সম্ভাবনা বদলে দিতে পারে।
পরীক্ষার নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত প্রশ্নপ্রণেতারা পরীক্ষা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে কঠোর বিচ্ছিন্নতায় কাজ করেন। সিল করা প্রশ্নপত্র স্থানীয় শিক্ষা দপ্তরে নেওয়া হয়, সেখান থেকে ভোর হওয়ার আগে স্কুলে পৌঁছায়। প্রতিটি কক্ষে সাধারণত ত্রিশজনের কম পরীক্ষার্থী বসে এবং দায়িত্বে থাকেন অন্তত দুজন পরিদর্শক। পরীক্ষার আগের দিন পরিদর্শকদের নিয়মকানুন নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরীক্ষার্থী কতটি বিষয়ে বসছে তার ওপর পরীক্ষার ফি নির্ভর করে। স্থানীয় শিক্ষা দপ্তর প্রতিটি শিক্ষার্থীর কেন্দ্র ও আসন নির্ধারণ করে, যা পরীক্ষার আগের দিনই জানানো হয়।
চাপ এত বেশি কেন
দক্ষিণ কোরিয়ার মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ নির্ধারণে সুনেউং কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। সব প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় এই পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে; ফলাফল ইন্টার্নশিপ, বৃত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি ও ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়াই অনেক পরীক্ষার্থীর লক্ষ্য। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই ‘স্কাই’ সংক্ষিপ্ত নামে একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়। পরিবারগুলো প্রস্তুতির পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করে, আর প্রতি নভেম্বরে এক তীব্র পরীক্ষার মুহূর্তে অসাধারণ ফলের প্রত্যাশা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির হয় এক প্রতিযোগিতামুখর সংস্কৃতি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর সীমিত আসনের এই মিশ্রণ এমন চাপ তৈরি করে, যার তুলনা অন্য খুব কম পরীক্ষার সঙ্গেই চলে।
নিয়মিত ক্লাস আর প্রতিযোগিতামূলক লক্ষ্যের মধ্যকার ব্যবধানের বড় অংশ পূরণ করে বেসরকারি শিক্ষা। ‘হাগওন’ নামে পরিচিত কোচিং স্কুলগুলো গভীর রাত পর্যন্ত চলে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এলাকার কিছু শিক্ষার্থী আগেভাগে উচ্চমাধ্যমিক ছেড়ে ডিপ্লোমার সমমানের যোগ্যতা অর্জনের পরীক্ষা দেয়, তারপর পুরো এক বছর শুধু সুনেউংয়ের প্রস্তুতিতে কাটায়। পুরো বছরের কোর্সে ক্লাস, আবাসন ও অনুশীলনী পরীক্ষা একসঙ্গে থাকলে খরচ কয়েক কোটি ওনে পৌঁছাতে পারে। যেসব পরিবার মনে করে স্কুলের নম্বর, বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরীক্ষার প্রস্তুতি একসঙ্গে সামলানোর চেয়ে শুধু সুনেউংয়ে মনোযোগ দেওয়া বেশি কার্যকর, তাদের কাছে এই পদ্ধতি আকর্ষণীয়। তবে এতে চাপ বাড়তে পারে এবং সমান সুযোগ নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হতে পারে।
পরীক্ষার বিষয়বস্তু ও ন্যায্যতা নিয়ে বিতর্ক বহু বছর ধরেই চলছে। গণিত ও কোরীয় ভাষায় প্রায়ই আসা সবচেয়ে কঠিন, কথিত ‘কিলার প্রশ্ন’ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জ্ঞান প্রয়োজন হয় এমন প্রশ্ন প্রতিযোগিতার মাঠকে অসম করে তোলে। বিষয় বাছাই ও সমন্বিত শিক্ষায় পরিবর্তনসহ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও পরিকল্পনায় রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ধরন বদলে দেবে। বড় চ্যালেঞ্জটি এখনো একই: শিক্ষার্থীদের উৎকর্ষ কীভাবে যাচাই করা যায়, অথচ পরীক্ষাকে সহনীয় এবং উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও পড়ার ওষুধের প্রলোভন
পরীক্ষার আগের শেষ ২৪ ঘণ্টায় রুটিন বদলানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসক ও স্কুল কাউন্সেলররা। পরামর্শগুলো সহজ: আগেভাগে বই বন্ধ করা, মধ্যরাতের আগে ঘুমানো এবং ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার লক্ষ্য রাখা। বৃহস্পতিবার পরীক্ষার দিনের মতো একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা উচিত। দিনের শেষভাগে এনার্জি ড্রিংক ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে হবে। সহজ, সুষম খাবার খেতে হবে; গভীর রাতে ভারী নাশতা বাদ দিতে হবে। হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং, গভীর শ্বাস নেওয়া ও ছোট বিরতি—এসব মনকে ক্লান্ত না করে অস্থিরতা সামলাতে সাহায্য করতে পারে। শরতের শেষ দিকে দিনের সর্বোচ্চ ও রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান বেশি থাকায় শিক্ষার্থীদের কয়েক স্তরের পোশাক পরতে এবং ঠান্ডা লাগা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
কিছু উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী এগিয়ে থাকার আশায় শর্টকাট খোঁজে। কোচিং স্কুল বেশি এমন এলাকার, বিশেষ করে দক্ষিণ সিউলের, ফার্মেসিগুলোতে মিথাইলফেনিডেট সম্পর্কে খোঁজখবর বেড়েছে। এটি অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশনের ওষুধ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সুস্থ ব্যক্তিরা এই ওষুধ থেকে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানীয় সুবিধা পান না। অনিদ্রা, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও উদ্বেগের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষার দিন পারফরম্যান্সে ক্ষতি করতে পারে। বীমা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এডিএইচডির ওষুধের প্রেসক্রিপশন সবচেয়ে বেশি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে, এরপর বিশের কোঠায় বয়সীদের মধ্যে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে গাংনাম, সেচো ও সংপা—এই সচ্ছল এলাকাগুলো। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, শেষ সময়ে বিশ্রাম, রুটিন ও মনোযোগের বিকল্প কোনো ওষুধ হতে পারে না।
রীতিনীতি, প্রয়োজনীয় জিনিস ও ছোটখাটো স্বস্তি
সুনেউং সপ্তাহে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকাও নির্দিষ্ট হয়ে যায়। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে আনতে হয় প্রবেশপত্র, পরিচয়পত্র, দুপুরের খাবার এবং নিয়মে অনুমোদিত লেখার সরঞ্জাম। পরীক্ষার কক্ষে শুধু ঘণ্টা ও মিনিটের কাঁটাযুক্ত অ্যানালগ ঘড়ি ব্যবহার করা যায়। মোবাইল ফোন, স্মার্ট ঘড়ি, ওয়্যারলেস ইয়ারফোন, ব্লুটুথ ডিভাইস এবং তথ্য সংরক্ষণ বা সংকেত পাঠাতে পারে এমন সব ইলেকট্রনিক যন্ত্র নিষিদ্ধ। গোপনে যন্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতে ২০০৬ সাল থেকে পরীক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে একটি করে নির্ধারিত মেকানিক্যাল পেন্সিল দেয়। তবু পুরোনো বছরের নির্ধারিত পেন্সিল ও অনুশীলনী সেটের কেনাবেচা প্রায়ই জমে ওঠে সেকেন্ডহ্যান্ড বাজারে। কিছু শিক্ষার্থী ঐতিহ্যের ছোঁয়া আছে এমন খাবারও সঙ্গে নেয়, যেমন আঠালো চালের মিষ্টি ও ইয়ট ক্যান্ডি; অনেকে এগুলোকে অধ্যবসায় ও সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে।
খাবার একদিকে শক্তি জোগায়, অন্যদিকে স্বস্তিও দেয়। দীর্ঘ পরীক্ষার দিনে, যখন ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ থাকে, পরিচিত গরম খাবার স্নায়ু শান্ত রাখতে সাহায্য করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ওয়াং সুং জুন ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এই পরীক্ষায় বসেছিলেন। দুপুরে তাঁর কাছে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তিনি স্মরণ করেছেন।
আমিও পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় গরম, আরামদায়ক খাবার সঙ্গে নেওয়াকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম। মা এমন খাবার দিতেন যা সহজে হজম হয়, যেমন ভাতের জাউ আর শুকনো সামুদ্রিক শৈবাল। বিশেষ কিছু খাওয়া নয়, বরং পরিচিত খাবার খাওয়াটাই ছিল আসল, যাতে গুরুত্বপূর্ণ দিনে অসুস্থ না হয়ে পড়ি।
উৎসাহের প্রতীক ছড়িয়ে আছে পপ সংস্কৃতিতেও। শিক্ষার্থীরা প্রিয় তারকাদের ফটোকাড অদলবদল করে, খাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো-সংবলিত স্টিকার লাগায় এবং হালকা মেজাজের তাবিজ সঙ্গে রাখে। মা-বাবা ও দাদা-দাদিরা অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাসের আশ্রয় নেন। মন্দির ও গির্জায় প্রার্থনার ভিড় জমে; কেউ কেউ পরীক্ষা হওয়ার আগের একশ দিন ধরে প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। উত্তর সিউলের দোসনসা এবং দেগুর গাত বাওয়ির মতো ধর্মীয় স্থানে পরিবারগুলো যায়, নতজানু হয়, মোমবাতি জ্বালে এবং সন্তানের নাম ফিসফিস করে বলে। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে এই রীতি চলে আসছে।
কিছু কিশোর-কিশোরীর কাছে ছোটখাটো স্মারক টানটান সপ্তাহে ব্যক্তিগত ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে। জেজুর এক উচ্চমাধ্যমিকের শেষ বর্ষের ছাত্রী কাং বড় দিনের জন্য একগাদা তারকার কার্ড প্রস্তুত করেছে। কেন সেগুলো সঙ্গে নেয়, তা সে বলেছে।
শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এমন তারকাদের ফটোকাড আমরা সঙ্গে নিই, কারণ এগুলো আমাদের কাছে তাবিজের মতো। সুনেউং বা অন্য পরীক্ষার সময় প্রিয় কার্ডটার দিকে তাকালে চাপ কমে যায়।
পরীক্ষা শেষে নম্বর ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে শেষ পর্ব শেষ হলে স্কুলের ফটকে নীরবতার জায়গা নেয় স্বস্তি। এক দিনের ছুটি পাওয়া নিম্ন শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বড়দের অভিনন্দন জানাতে জড়ো হয়। অনেকে উত্তর মেলাতে সোজা বাড়ি চলে যায়। প্রতিটি পর্ব শেষে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তরসূচি তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রবেশপত্রের পেছনে উত্তর চিহ্নিত করে রাখা পরীক্ষার্থীরা মানসম্মত স্কোর ও পার্সেন্টাইলের আনুমানিক হিসাব করতে পারে। রাতের মধ্যেই কোচিং স্কুলগুলো প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সম্ভাব্য কাট-অফ নম্বর প্রকাশ করে। পরবর্তী কয়েক দিনের প্রাথমিক যোগাযোগ ও পরামর্শে এসব অনুমান কাজে লাগে।
৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। ‘সুসি’ নামে পরিচিত আগাম ভর্তি প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীদের ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষার ফল জমা দিতে হবে। ‘জুংসি’ নামে পরিচিত নিয়মিত ভর্তি প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীদের ফল জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর। এই সংক্ষিপ্ত বিরতিতে প্রবেশপত্র দেখালে রেস্তোরাঁ, সেলুন ও বিনোদন পার্ক পরীক্ষার্থীদের ছোটখাটো ছাড় দেয়। এই দিন পর্যন্ত পৌঁছাতে তারা যে বছরগুলো বিনিয়োগ করেছে, তার প্রতি হালকা মেজাজে সম্মান জানায় এসব উদ্যোগ।
একটি পরীক্ষার জন্য দেশ থেমে যায় কেন
বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থাজুড়ে মূল্যায়নের একটি অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করে বলেই সুনেউংয়ের ভূমিকা অনন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক ও অধ্যাপকরা জাতীয় পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে কলেজে পড়ার প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য একটি অভিন্ন পরীক্ষা তৈরি করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করতে পারে। পরীক্ষার দিনটি তাই রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মতো দেখায়। পুলিশ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, পাইলটরা রুট বদলান, আর সরকারি কর্মচারীরা সময়সূচি সামঞ্জস্য করেন। শব্দ কমিয়ে ও সড়ক ফাঁকা রেখে জনসাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান জানায়, যাতে পরীক্ষা পরিস্থিতির ওপর নয়, জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে।
এই জাতীয় রীতি এমন একটি ব্যবস্থার চাপও সামনে আনে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার পরীক্ষা বছরের পর বছরের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীরা নমুনা পরীক্ষায় বসে, দীর্ঘ সময় পড়াশোনার মাধ্যমে সহনশীলতা গড়ে তোলে এবং শীর্ষ পর্যায়ে সীমিত আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই চাহিদাকে ঘিরে বেসরকারি শিক্ষার বাজার বেড়ে ওঠে। চরম কঠিন প্রশ্নের সংখ্যা কমানো, বিকল্প পথ বাড়ানো এবং বিষয় বাছাইয়ে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন কর্মকর্তারা। পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য একই রয়েছে: ভর্তির জন্য পাঠ্যক্রমভিত্তিক একটি ন্যায্য মানদণ্ড দেওয়া, পাশাপাশি যেখানে সম্ভব অস্বাস্থ্যকর চাপ কমাতে কাজ করা।
মূল বিষয়গুলো
- এই বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার ১,৩১০টি কেন্দ্রে ৫৫৪,১৭৪ জন শিক্ষার্থী সুনেউং পরীক্ষায় বসবে।
- সকাল ৮টা ১০ মিনিটে কেন্দ্রের দরজা বন্ধ হবে; পাঁচটি বিষয়ের পর্ব ও বিরতিসহ পরীক্ষা চলবে বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত।
- সিউলে সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে পাতালরেলে ২৯টি অতিরিক্ত ট্রিপ যোগ হবে; দেরি করা পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুত থাকবে শহরের ৬৪৬টি শাটল।
- ইংরেজি শ্রবণ অংশের জন্য দুপুর ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সব উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ থাকবে; আকাশে থাকা উড়োজাহাজগুলো ৩,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় থাকবে।
- শেয়ারবাজার সকাল ১০টায় খুলবে এবং স্কুলের আশপাশে যান চলাচল সহজ করতে সরকারি দপ্তরগুলো কাজ শুরু করতে দেরি করবে।
- অধিকাংশ বিষয়ে বণ্টনভিত্তিক নম্বর দেওয়া হয়; ইংরেজিতে নিরঙ্কুশ মানদণ্ডে নম্বর দেওয়া হয়। কোরীয় ইতিহাস বাধ্যতামূলক।
- প্রশ্নপ্রণেতারা পরীক্ষা হওয়ার আগে বিচ্ছিন্নতায় কাজ করেন; প্রশ্নপত্র সিল করে ভোর হওয়ার আগে কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়।
- চিকিৎসকেরা বিশ্রাম, সহজ খাবার ও হালকা স্ট্রেচিংয়ের পরামর্শ দেন; শেষ মুহূর্তের গাদাগাদি পড়া ও এনার্জি ড্রিংক এড়িয়ে চলতে বলেন।
- ফার্মেসিগুলোতে এডিএইচডির ওষুধ নিয়ে খোঁজখবর বেড়েছে; মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রমাণিত উপকার না থাকার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
- শুধু অ্যানালগ ঘড়ি অনুমোদিত; ইলেকট্রনিক যন্ত্র নিষিদ্ধ। পরীক্ষাকেন্দ্রে নির্ধারিত মেকানিক্যাল পেন্সিল দেওয়া হয়।
- অভিভাবকেরা মন্দির ও গির্জায় প্রার্থনা করেন; স্বস্তির জন্য শিক্ষার্থীরা ছোট তাবিজ ও পরিচিত খাবার সঙ্গে রাখে।
- ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ হবে; আগাম ও নিয়মিত ভর্তি প্রক্রিয়ার পরবর্তী সময়সীমা যথাক্রমে ১১ ও ৩১ ডিসেম্বর।






