কেন থাইল্যান্ডে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আর শ্রমিকের ঘাটতি হচ্ছে
থাইল্যান্ড এখন প্রবীণ জনসংখ্যার সমাজে পরিণত হয়েছে; দেশটির প্রতি পাঁচজনের একজনেরও বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। এই পরিবর্তন ইতোমধ্যে শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৫৮ লাখ, যার মধ্যে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪১ লাখ, অর্থাৎ ২১.৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হয়েছে। এটি জনসংখ্যার বয়স বাড়ার প্রবণতা এবং কর্মজগতে নতুন প্রবেশকারীর সংখ্যা কমে আসার ইঙ্গিত। জনমিতিবিদ ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, আরও বেশি মানুষ—প্রবীণ, নারী ও অভিবাসীসহ—দীর্ঘ সময় ধরে এবং বেশি উৎপাদনশীলতার সঙ্গে কাজে অংশ নিতে না পারলে এই পরিস্থিতি প্রবৃদ্ধি, সরকারি অর্থব্যবস্থা ও পরিবারের কল্যাণের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সূচিপত্র
পূর্বাভাসে দেখা যায়, কয়েক দশক ধরে এই চাপ বাড়বে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যার অনুপাত ২০২০ সালের প্রায় ৭১ শতাংশ থেকে কমে ২০৬০ সাল নাগাদ প্রায় ৫৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। এক বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে, অন্য কিছু অপরিবর্তিত থাকলে জনমিতিক পরিবর্তনের কারণে ২০২০-এর দশকে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৮৬ শতাংশ কমতে পারে। ২০৪৫ সাল নাগাদ প্রবীণ নির্ভরতার হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সময়ে, শ্রমশক্তির আকার ইতোমধ্যেই কমছে এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও ব্যাপক। অর্ধেকেরও বেশি চাকরি আনুষ্ঠানিক সুরক্ষার বাইরে, আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। এই পরিস্থিতি উৎপাদনশীলতা ও করভিত্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং অবসরকালীন সঞ্চয়কে জটিল করে তোলে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রবীণরা নানা বাধার মুখে পড়েন। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পরিচর্যার দায়িত্ব, অনেকের ক্ষেত্রে সীমিত আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি। তবে সুস্থভাবে দীর্ঘ জীবন, উন্নত প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রের উন্নত নকশা এবং আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অনেক প্রবীণকে কর্মচঞ্চল ও উৎপাদনশীল রাখতে পারে। থাইল্যান্ডে নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন কীভাবে আরও বেশি প্রবীণকে উপযোগী কাজে যুক্ত করা যায়, কর্মক্ষেত্রের নকশা নতুন করে সাজানো যায়, নমনীয় কর্মসূচির জন্য শ্রমবিধি হালনাগাদ করা যায় এবং প্রবীণ সমাজের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা যায়।
প্রবীণদের আবার কাজে ফেরানো
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে অভিজ্ঞ প্রবীণ কর্মীদের কাজে লাগাচ্ছে। সেন্ট্রাল রেস্টুরেন্টস গ্রুপ এমন একটি কর্মসূচি চালু করেছে, যার আওতায় অবসরপ্রাপ্ত ও নতুন করে চাকরি খুঁজছেন এমন প্রবীণদের আন্টি অ্যানস ও কেএফসির মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেটে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় ১৪ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৮০ জন প্রবীণ কর্মী রয়েছেন। প্রত্যেকের সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে তাঁদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়। ভারী জিনিস তোলার মতো কাজ এড়িয়ে চলা হয়; গ্রাহকসেবা, মান যাচাই, পরামর্শদান এবং সামনের সারির দায়িত্ব তাঁদের দেওয়া হয়। প্রবীণ কর্মীদের চলাচল ও নিরাপত্তা সহজ করতে দোকানগুলোতে প্রবেশগম্যতার উপযোগী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন কর্মী-নিয়োগ সংযোগকারী প্ল্যাটফর্মও গড়ে উঠছে। ইয়াংহ্যাপির হ্যাপি জব প্ল্যাটফর্ম প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও দক্ষতার সঙ্গে মানানসই খণ্ডকালীন, পূর্ণকালীন ও ফ্রিল্যান্স কাজ খুঁজে পেতে সহায়তা করে। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের মজুরির ওপর দ্বিগুণ করছাড়সহ নীতিগত প্রণোদনাও রয়েছে। নিয়োগদাতা ও অধিকারকর্মীরা এই করছাড়ের ক্ষেত্রে মজুরির সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষণের নথি, সনদ এবং কাজের পছন্দ এক জায়গায় সংরক্ষণ করে—এমন কেন্দ্রীয় চাকরিপ্রার্থী ডেটাবেস তৈরির দাবি জানাচ্ছেন। বর্তমানে দৈনিক ন্যূনতম মজুরি বাধ্যতামূলক করে এমন শ্রমবিধির কারণে অল্প সময়ের পালায় কাজ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অথচ অনেক প্রবীণ এমন কাজই পছন্দ করেন। যথাযথ সুরক্ষাসহ ঘণ্টাভিত্তিক বা কাজভিত্তিক কর্মসংস্থানের আইনি সুযোগ তৈরি হলে আরও নমনীয় ব্যবস্থা সম্ভব হবে।
অবসরের বয়স বাড়ালে কি সুফল মিলবে
দীর্ঘায়ু ও কর্মীসংকটের চাপ বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে। পেনশন তহবিল, মানবসম্পদ ব্যবস্থা এবং তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি কর্মচারী কমিশনের দপ্তরকে। এই পর্যালোচনায় ১১ লাখ ২০ হাজার সরকারি কর্মকর্তার বিষয়টি রয়েছে; বিবেচনার প্রধান গোষ্ঠী ৪ লাখ ১৪ হাজার সরকারি কর্মচারী। বিঘ্ন কমাতে অন্তত এক দশক ধরে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ইঙ্গিত, নিয়োগের গতি স্থিতিশীল থাকবে এবং অযথা আর্থিক চাপ এড়াতে পেনশনের হিসাব ৬০ বছর বয়সে পাওয়া বেতনের ভিত্তিতেই করা হবে।
কর্মী ও সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে কী বদলাবে
অবসরের বয়স বাড়লে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা আরও দীর্ঘ সময় চাকরিতে থাকবেন এবং কর্মীসংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ শূন্য থাকার চাপ কমবে। অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখার পাশাপাশি তরুণ কর্মীদের অগ্রগতির সুযোগ নিশ্চিত করতে সংস্থাগুলোকে সুপরিকল্পিত জনবল ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে থাকবে একই স্তরে দায়িত্ব বদলে উন্নয়নের সুযোগ এবং লক্ষ্যভিত্তিক পদোন্নতি। প্রবীণ কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যগত সুবিধা ও নিরাপদ কর্মভার নিশ্চিত করাও ব্যবস্থাপকদের দায়িত্ব হবে। পাশাপাশি সরকারি চাকরি শেষে দ্বিতীয় পেশায় যাওয়ার স্পষ্ট পথ—যেমন খণ্ডকালীন কাজ ও পরামর্শক হিসেবে কাজের সুযোগ—ব্যক্তির পছন্দকে সমর্থন করতে এবং কাজের আগ্রহ ধরে রাখতে পারে।
পরিচর্যা অর্থনীতির সংকট
জনসংখ্যার বার্ধক্যের কারণে বাড়িতে ও স্থানীয় পর্যায়ে পরিচর্যার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, পরিচর্যার ঘাটতি পূরণ এবং আইনি ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩৭ সাল নাগাদ থাইল্যান্ডে বাড়িতে প্রবীণদের পরিচর্যার জন্য আরও সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার বেতনভুক্ত কর্মীর প্রয়োজন হবে। থাইল্যান্ড প্রবীণদের নিজ নিজ এলাকায় বসবাস অব্যাহত রাখার নীতি উৎসাহিত করছে। এতে প্রবীণরা নিজেদের সম্প্রদায়ে থাকতে পারেন, তবে এই ব্যবস্থার সাফল্য পরিচর্যাকারী পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগ না হলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে। কঠিন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ কাজের ভার পড়তে পারে নার্স, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও গৃহকর্মীদের ওপর; তাঁদের অনেকেই অভিবাসী।
আইএলও স্থানীয় পরিচর্যা ব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, ন্যায্য ও বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরি, দক্ষতার সনদ প্রদান এবং থাই ও অভিবাসী—উভয় ধরনের পরিচর্যাকারীর প্রশিক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে। প্রযুক্তিও সহায়ক হতে পারে। টেলিমেডিসিন, দূর থেকে পর্যবেক্ষণ এবং সহায়ক যন্ত্র পরিচর্যাকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করতে পারে; এতে পূর্বাভাস দেওয়া কর্মীঘাটতি ১ লাখের নিচে নামতে পারে। শ্রম সুরক্ষা আইন, ১৯৯৮-এর অধীনে মন্ত্রিপরিষদীয় প্রবিধান নং ১৫ (২০২৪)-এ আনা নতুন সুরক্ষা সাধারণত প্রবীণ পরিচর্যার কাজ করা গৃহকর্মীদের অধিকার জোরদার করেছে। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাও পিডিআরের জন্য আইএলওর কান্ট্রি অফিসের পরিচালক শিয়াওইয়ান চিয়ান পরিচর্যা খাতে মানসম্মত চাকরির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
চিয়ান জোর দিয়ে বলেন, পরিচর্যার কাজকে দক্ষতানির্ভর পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং এটিকে একটি টেকসই পেশাজীবনের পথ করে তুলতে হবে।






