নতুন নিয়োগবিধি নিয়ে নেপাল ও মালয়েশিয়ার মতবিরোধ
জনশক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উৎসদেশগুলোকে ব্যবহারের জন্য মালয়েশিয়া নতুন যে মানদণ্ডের প্রস্তাব দিয়েছে, তা প্রয়োগ করবে না বলে দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে নেপাল। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো কূটনৈতিক নোটে কর্মকর্তারা বলেছেন, মালয়েশিয়ার নির্ধারিত ১০ দফা মানদণ্ড নেপালের বর্তমান আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পড়ে না। শ্রম অভিবাসনে প্রভাব ফেলবে—এমন যেকোনো পরিবর্তন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এবং বিদ্যমান চুক্তি ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির ভিত্তিতে করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। এ পদক্ষেপ এশিয়ার বৃহত্তম অভিবাসী শ্রমিক করিডরগুলোর একটির সঙ্গে যুক্ত দুই দেশের মধ্যে সংবেদনশীল আলোচনার পথ তৈরি করেছে।
সূচিপত্র
মালয়েশিয়া সম্প্রতি নেপালসহ পাঁচটি প্রধান উৎসদেশের কাছে অভিন্ন মানদণ্ড পাঠিয়েছে এবং সংস্থাগুলোকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়সীমার মধ্যে তথ্য জমা দিতে বলেছে। নতুন মানদণ্ডের লক্ষ্য, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে এমন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা সীমিত করা এবং যাচাই করা। নেপালের শ্রম, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশে আইনি পরিবর্তন না করে নতুন শর্তে জনশক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপারিশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সংস্থাগুলোর তোলা উদ্বেগের কথাও মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে: মানদণ্ডগুলো অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে পারে, ফলে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং শ্রমিকদের ওপর প্রায়ই বর্তানো খরচ বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমানে শ্রম ও পররাষ্ট্র—দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির নির্দেশনার সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। কর্মকর্তারা বলছেন, নেপালের নিয়ম লঙ্ঘন না করে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পথ খুঁজতে কাঠমান্ডু মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা এবং যৌথ কারিগরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মালয়েশিয়াগামী নেপালি কর্মীদের উচ্চ নিয়োগ ফি ও অন্যান্য অনিয়ম মোকাবিলায় নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও সরকার জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রস্তাব কী
মালয়েশিয়ার ১০ দফা প্রস্তাবে দেশটির শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ করতে চায়—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যূনতম শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে, সংস্থাগুলোর অন্তত পাঁচ বছর ধরে বৈধ লাইসেন্স থাকা, সাম্প্রতিক কয়েক বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়কালে অন্তত ৩,০০০ কর্মী পাঠানো এবং একাধিক গন্তব্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা। পাঁচ বছরে অন্তত তিনটি দেশে কর্মী নিয়োগের প্রমাণ, প্রায় ১০,০০০ বর্গফুটের বড় কার্যালয় এবং প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের অনুমতিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখাতে হবে।
প্রস্তাবে সুনাম যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের সদাচরণের সনদ থাকতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখাতে হবে যে তারা জোরপূর্বক শ্রম, মানবপাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘন, মুদ্রা আত্মসাৎ বা অন্য অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িত ছিল না। তালিকাভুক্ত উৎসদেশগুলোর সরকারকে মানদণ্ড পূরণকারী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ পাঠাতে বলেছে মালয়েশিয়া। এর ফলে অভিবাসী শ্রমিক নিতে আগ্রহী মালয়েশীয় নিয়োগকর্তাদের জন্য যাচাই করা প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা তৈরি হবে।
বাস্তবে এ ব্যবস্থায় বড় পরিসর, বিস্তৃত কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্ন রেকর্ড আছে—এমন অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই যাচাই সীমাবদ্ধ থাকবে। ঘোষিত লক্ষ্য হলো তদারকি জোরদার করা এবং নিয়োগের বিভিন্ন ধাপে শোষণের ঝুঁকি কমানো। উৎপাদন, বাগান, সেবা ও নির্মাণ খাতে ব্যাপকভাবে অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল মালয়েশিয়ার কাছে উন্নত নিয়ন্ত্রণকে নিপীড়নমূলক চর্চা কমানো এবং শ্রম অধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক প্রত্যাশা পূরণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নেপাল কেন না বলেছে
নেপালের শ্রম কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদেশে কর্মসংস্থান পরিচালনাকারী আইন ও পদ্ধতি পরিবর্তন না করে মালয়েশিয়ার ছক বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নেপালের সংস্থাগুলো বিদেশে কর্মসংস্থান আইন, বিভিন্ন বিধিবিধান, দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি এবং সাংবিধানিক বিধানের আওতায় কাজ করে। কর্মকর্তারা বলছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে পারবে এমন নেপালি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগে বাছাই করে দেওয়া যেকোনো নতুন পদ্ধতির ভিত্তি হতে হবে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা, যা নেপালের আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের মতে, একতরফা পরিবর্তন হলে তা দেশীয় লাইসেন্সবিধি, বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান তদারকি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও কর্মকর্তারা জোর দিচ্ছেন। কর্মীদের খরচ কমানো, নৈতিক মান জোরদার করা এবং নিরাপদ অভিবাসনের পথ আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা নেপাল বহু বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, কোনো বিদেশি সরকারের বেসরকারি বাছাইয়ের মানদণ্ড প্রয়োগ করলে যৌথ শাসনের সুরক্ষা ছাড়াই নেপালের বাজারের কাঠামো বদলে যেতে পারে। শ্রমিকদের কল্যাণ ও নিয়োগকর্তাদের চাহিদাসহ অভিন্ন লক্ষ্যগুলো দুই পক্ষই পরিচালনা করতে পারবে—এমন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে কারিগরি আলোচনা ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে কাঠমান্ডু।
নতুন মানদণ্ড কি বাজারে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারে?
নেপালি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি, মালয়েশিয়ার তালিকা এমন বড় সংস্থাগুলোকে সুবিধা দেয়, যারা ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠায় এবং একাধিক দেশে কার্যক্রম চালায়। বড় কার্যালয় ও পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার মতো শর্ত ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পূরণ করা কঠিন হতে পারে, যদিও তাদের নিয়ম মানার রেকর্ড ভালো। নেপালের বিদেশে কর্মসংস্থান সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা, এসব নিয়ম অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করে অন্যদের কোণঠাসা করতে পারে—যদিও সেই প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিক চর্চায় বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু বড় পরিসরে কাজ করে না।
শিল্প খাতের কিছু নেতার পরোক্ষ খরচ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যোগ্য নিয়োগকারীর সংখ্যা কমে গেলে দর-কষাকষির ক্ষমতা বড় মধ্যস্থতাকারীদের দিকে ঝুঁকতে পারে। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা নিয়োগকারীদের কাছ থেকে কম প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব পেতে পারেন, আর ছোট নেপালি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন উপঠিকাদারি ব্যবস্থায় যেতে হতে পারে, যা নিয়োগের ধাপে আরও স্তর যোগ করে। অনেক করিডরে অতিরিক্ত স্তরের অর্থ প্রায়ই বেশি সেবামাশুল ও ফি। নিয়মে কর্মীদের নিয়োগের খরচ দেওয়ার কথা না থাকলেও, প্রেরণকারী ও গ্রহণকারী—দুই দেশের কঠোর নজরদারি না থাকলে গোপন মাশুলের মাধ্যমে এসব খরচ আবার ফিরে আসতে পারে।
মালয়েশিয়া করিডরে নতুন মধ্যস্থতাকারী ও ফি আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে আগের বিরোধের পর সম্ভাব্য একচেটিয়াকরণ নিয়ে উদ্বেগ আরও জোর পেয়েছে। নেপালের শিল্প সংগঠনগুলো এমন ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে, যেগুলো তাদের মতে কর্মী প্রক্রিয়াকরণ ও নিয়োগকর্তাদের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেয়। সরকার জানিয়েছে, যেকোনো পুনর্গঠনে এমন বাধা বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র তৈরি করা এড়াতে হবে, যা প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা কমাতে পারে।
বহু বছরের সংস্কার প্রচেষ্টার সঙ্গে এর যোগসূত্র
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপাল ও মালয়েশিয়া এই করিডরকে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করার চেষ্টা করছে। ২০১৮ সালে দুই সরকার এমন একটি চুক্তি সই করে, যার লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের কাছ থেকে নেওয়া নিয়োগ ফি কমানো বা তুলে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ নিয়োগে উৎসাহ দেওয়া। ‘নিয়োগকর্তা খরচ দেবেন’—এ নীতি বৈশ্বিক আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে, বিশেষ করে ঋণ ও প্রতারণার ঝুঁকিতে থাকা স্বল্প মজুরির অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। দুই দেশই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেও, সেগুলোর প্রয়োগে ঘাটতি ছিল এবং নানা ফাঁকফোকর রয়ে গেছে।
নেপাল থেকে মালয়েশিয়াগামী পথ নিয়ে একাডেমিক ও নীতিবিষয়ক গবেষণায় মধ্যস্থতাকারী ও উপঠিকাদারদের একটি ঘন নেটওয়ার্কের কথা উঠে এসেছে, যারা নীতিকে বাস্তবে রূপ দেয়। এসব পক্ষ শ্রমিকদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত করে, কাগজপত্র সামলায়, প্রশিক্ষণ দেয় এবং কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের ব্যবস্থা করে, যা নিয়োগ ব্যয় বাড়ায়। লাইসেন্স ও ফি-সীমা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগের ঘাটতির কারণে অন্যায্য মাশুল এবং বিভ্রান্তিকর চাকরির শর্ত চলতে পেরেছে। মহামারির সময় চিকিৎসা-সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত গ্লাভস উৎপাদনসহ মালয়েশিয়ার শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খরচের চাপ ও দুর্বল তদারকি কীভাবে শ্রমিকদের ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারে এবং চাকরি বদলানো বা নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর সক্ষমতা সীমিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিধিমালা আংশিক পথনির্দেশনা দেয়। মালয়েশিয়া কর্মসংস্থান সেবা কনভেনশন C88 গ্রহণ করেছে, আর নেপাল ও মালয়েশিয়া—দুই দেশই বেসরকারি কর্মসংস্থান সংস্থা কনভেনশন C181 অনুসমর্থন না করলেও এর কিছু উপাদান দেশীয় আইনে যুক্ত করেছে। এসব কনভেনশনে কর্মসংস্থান সেবায় সরকারি তদারকি, বেসরকারি সংস্থার লাইসেন্স ও নজরদারি এবং শ্রমিকদের ওপর খরচ চাপিয়ে দেওয়া ফি থেকে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। চ্যালেঞ্জ হলো, সীমান্ত পেরিয়ে জটিল সরবরাহশৃঙ্খলের প্রতিদিনকার কাজে এসব মানদণ্ড বাস্তবায়ন করা।
অভিবাসনের ব্যাপকতা থেকেই এর গুরুত্ব স্পষ্ট। ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। নেপালি শ্রমিকেরা কারখানা, সেবা খাত ও বাগানে কাজ করেন; তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশে পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিকে সহায়তা করে। নিয়োগব্যবস্থা স্বচ্ছ করা কেবল কারিগরি নিয়ম মানার বিষয় নয়। বিদেশে চাকরি পেতে প্রায়ই ঋণ নেওয়া মানুষের ঋণভার, নিরাপত্তা, মজুরি ও চলাচলের সুযোগ—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।
এরপর কী
মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে যৌথ কারিগরি কর্মসমিতি গঠন ও উচ্চপর্যায়ের আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে কাঠমান্ডু। তাৎক্ষণিক কাজ হলো, দুই দেশের আইনি কাঠামো তুলনা করা, মালয়েশিয়ার মানদণ্ড নেপালের নিয়মের সঙ্গে কোথায় সাংঘর্ষিক তা চিহ্নিত করা এবং উভয় পক্ষ পরিচালনা করতে পারবে—এমন বাছাইপ্রক্রিয়া তৈরি করা। মালয়েশিয়ার প্রস্তাব নিয়ে নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতামতও সংগ্রহ করেছে নেপালের শ্রম মন্ত্রণালয়। এই পরামর্শ আলোচনা চলাকালে নেপালের অবস্থান নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে এবং যাচাই ও নিয়ম মানার বিষয়ে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ দেখাতে পারে।
নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্থাগুলোকে তথ্য জমা দিতে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়সীমা দিয়েছে মালয়েশিয়া। ওই পদ্ধতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান মনোনীত করতে নেপালের অস্বীকৃতির ফলে এখন দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপর দায়িত্ব বর্তেছে। করিডরটি সচল রাখা দুই পক্ষেরই স্বার্থে। মালয়েশিয়ার শ্রমিকের নিয়মিত সরবরাহ দরকার, আর নেপাল চায় এমন নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ পথ, যেখানে শ্রমিকদের ভারী ঋণের বোঝা বা দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে হবে না। কাঠমান্ডুর কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন নিয়ম নিয়ে যেকোনো আলোচনায় শ্রমিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাই পথনির্দেশক হবে; পাশাপাশি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে নেপালের আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের ঝুঁকি
দুই সরকার কোনো প্রক্রিয়ায় একমত হতে না পারলে নিয়োগ ধীর হয়ে যেতে পারে এবং নেপালি শ্রমিকনির্ভর খাতগুলোতে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা শ্রমিকসংকটে পড়তে পারেন। এ ধরনের ঘাটতি সাধারণত অনিয়মিত পথে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায়, যেখানে চুক্তি বদলে দেওয়া বা পাসপোর্ট ও মজুরি আটকে রাখার মতো বড় ঝুঁকির মুখে পড়েন শ্রমিকেরা। অনেক করিডরে ব্যবস্থায় স্পষ্ট হস্তান্তর ছাড়া পরিবর্তন এলে বা চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ অল্প কয়েকটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকলে শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত খরচের বোঝা পড়ে।
আঞ্চলিক নীতির পরিবর্তনও চাপ বাড়াচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়ার কিছু দেশে এ বছর বিভিন্ন সময়ে ভিসা পদ্ধতি কঠোর করা হয়েছে, যা নেপালি চাকরিপ্রার্থীদের যাতায়াত জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়াও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এনেছে। একাধিক গন্তব্যে সুযোগ সীমিত হলে শ্রমিকেরা যে দরজা খোলা থাকে, সেদিকে যেতে পারেন—কখনো বেশি খরচে। এমন পরিস্থিতিতে শোষণ ঠেকাতে স্পষ্ট নিয়ম, নৈতিক নিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা এবং যৌথ তদারকি জরুরি।
নিয়োগকর্তাদের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা প্রশাসনিক খরচ ও বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ায়। দায়িত্বশীল নিয়োগের মানদণ্ড মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন স্থিতিশীল পথ পছন্দ করে, যেখানে নথি যাচাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও কাজে যোগদানের প্রক্রিয়া পূর্বানুমেয় সময়সূচিতে চলে। স্বচ্ছ মানদণ্ড ও যৌথ নজরদারির ব্যবস্থা করে দ্বিপক্ষীয় সমাধান হলে দুই পক্ষই কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করতে পারবে এবং তাৎক্ষণিক বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন এড়াতে পারবে।
কার্যকর সমঝোতা কেমন হতে পারে
যেকোনো সমাধানে দুটি ভিত্তি থাকতে হবে। প্রথমত, অপব্যবহারকারী বা প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ঘাটতি আছে—এমন সংস্থাকে বাছাই থেকে বাদ দেওয়ার মালয়েশিয়ার লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, বাছাইপ্রক্রিয়া দেশীয় আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে হতে হবে—নেপালের এই শর্ত। সম্ভাব্য পথের মধ্যে রয়েছে, নেপালের আইনি মানদণ্ডে তৈরি এবং মালয়েশিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য স্বচ্ছতা ও যাচাইয়ের অতিরিক্ত ধাপযুক্ত যৌথভাবে সম্মত একটি তালিকা। উদাহরণস্বরূপ, দুই সরকার ন্যূনতম কাজের মান, সততা যাচাই ও কার্যালয়ের মান নিয়ে একমত হতে পারে; একই সঙ্গে নেপালের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজস্ব আইনে প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স ও নিরীক্ষার সুযোগ দিতে পারে। এরপর মালয়েশিয়া নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই করা তালিকাটি স্বীকৃতি দিতে পারে।
আরেকটি পথ হলো পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত সময়ের জন্য ব্যবস্থা চালু করা। দুই পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অল্প কয়েকটি মানদণ্ড পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করে ফলাফল পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে পারে। যৌথ পরিদর্শন, তথ্য বিনিময় এবং শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর হটলাইন ব্যবস্থাটিকে কার্যকর করবে। স্বাধীন মানদণ্ডও সহায়ক হতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার আন্তর্জাতিক নিয়োগের সততা ব্যবস্থা নৈতিক নিয়োগচর্চায় উৎসাহ দেয় এবং মূল্যায়নকারী ও সংস্থাগুলোর জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম দেয়। স্বাধীন সনদ রাষ্ট্রের তদারকির বিকল্প নয়; তবে তা দ্বিপক্ষীয় নিরীক্ষার পরিপূরক হতে পারে এবং নিয়োগকর্তাদের এ নিশ্চয়তা দিতে পারে যে শূন্য-ফি নীতি বাস্তবেই কার্যকর।
প্রযুক্তিও সহায়তা করতে পারে। চাকরির চাহিদা, চুক্তি, ফি প্রকাশ, স্বাস্থ্য সনদ এবং শ্রমিকের সম্মতির তথ্য সংরক্ষণকারী সুরক্ষিত ডিজিটাল পোর্টাল অননুমোদিত মাশুল ও চুক্তিতে কারসাজির সুযোগ কমায়। দুই সরকারের জন্য অভিন্ন ড্যাশবোর্ড থাকলে একক এজেন্টের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ বা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ফি নেওয়ার প্রবণতার মতো অসংগতি শনাক্ত করা সহজ হবে। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় যেকোনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় কঠোর গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার নিয়ম থাকতে হবে।
সবশেষে, দুই পক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের নিয়ে স্থায়ী পর্যালোচনা দল গঠন করতে পারে। নিয়োগ ফি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদন ফলাফলের প্রতি নজরদারি বজায় রাখবে। মূল কথা হলো, স্পষ্ট নিয়ম, যোগ্য সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা এবং লঙ্ঘন হলে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—এই তিনটি একত্রে নিশ্চিত করা।
যা জানা জরুরি
- জনশক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ১০ দফা মানদণ্ড প্রয়োগ করবে না জানিয়ে নেপাল মালয়েশিয়াকে কূটনৈতিক নোট পাঠিয়েছে।
- কাঠমান্ডুর যুক্তি, প্রস্তাবটি নেপালের বিদেশে কর্মসংস্থান আইন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
- পাঁচ বছর লাইসেন্স থাকা এবং ৩,০০০ কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতার মতো মানদণ্ড পূরণকারী প্রতিষ্ঠান সুপারিশ করতে নেপালসহ পাঁচটি উৎসদেশকে বলেছে মালয়েশিয়া।
- প্রস্তাবে অন্তত তিনটি দেশে কার্যক্রম, বড় কার্যালয় এবং শ্রম বা অর্থনৈতিক অপরাধমুক্ত পরিচ্ছন্ন রেকর্ডের শর্তও রয়েছে।
- যাচাইপ্রক্রিয়াকে নেপালের আইন ও শ্রমিকদের কল্যাণের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও যৌথ কারিগরি বৈঠক চায় নেপাল।
- নেপালের নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা, মানদণ্ডগুলো অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বাজারকে ঠেলে দিতে পারে।
- আগের সংস্কারের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের দেওয়া ফি কমানো ও নিরাপত্তা বাড়ানো; তবে প্রয়োগের ঘাটতির কারণে শোষণ এখনো চলছে।
- সমঝোতা খুঁজে পেতে দেরি হলে কর্মী পাঠানো ধীর হতে পারে, খরচ বাড়তে পারে এবং অনিয়মিত পথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- যৌথভাবে স্বীকৃত তালিকা, পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা, যৌথ নিরীক্ষা এবং নৈতিক নিয়োগের মানদণ্ড কাজে লাগিয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
- শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের জন্য করিডরটি সচল ও নিরাপদ রাখতে দুই সরকারেরই জোরালো স্বার্থ রয়েছে।






