চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ডলারকে ছাড়াল ইউয়ান, বাণিজ্যে ব্যবহার বাড়লেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে

পড়তে 10 মিনিট
চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ডলারকে ছাড়াল ইউয়ান, বাণিজ্যে ব্যবহার বাড়লেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে

চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ইউয়ানের উত্থানের কারণ

চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ব্যবহৃত প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে ইউয়ান। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালজুড়ে এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অধিকাংশ লেনদেনের অর্থ পরিশোধ ও প্রাপ্তিতে ইউয়ান ব্যবহৃত হয়েছে। মে মাসে স্থানীয় মুদ্রাটির অংশ বেড়ে প্রায় ৫৩ শতাংশে পৌঁছায়, আর ডলারের অংশ নেমে আসে প্রায় ৪৩ শতাংশে। একই সময়ে চীনের পণ্য বাণিজ্যে ইউয়ানে নিষ্পত্তির হার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে; ২০২১ সালে যা ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। এই পরিবর্তন দেশের সীমানার বাইরে নিজ মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় একটি মাইলফলক।

সূচিপত্র
  1. চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ইউয়ানের উত্থানের কারণ
  2. চীন যেভাবে এখানে পৌঁছাল: সংকট থেকে মুদ্রা কৌশল
  3. পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে ধারাবাহিক কৌশল
  4. পরিসংখ্যান আসলে কী বলছে
  5. বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বাণিজ্য অর্থায়ন ও রিজার্ভ—তিনটি আলাদা মাপকাঠি
  6. রাশিয়া, নিষেধাজ্ঞা ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণ
  7. ওয়াল স্ট্রিটের মুদ্রা নয়, বাণিজ্যের মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে চায় বেইজিং
  8. অবকাঠামো: CIPS, সোয়াপ লাইন ও ডিজিটাল ইউয়ান
  9. কারা ইউয়ান ব্যবহার করছে এবং কেন
  10. যেসব বাধা এখনো এর অগ্রগতি আটকে রেখেছে
  11. এরপর কী নজরে রাখবেন
  12. মূল কথা

এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে বিশ্বে ডলারের শীর্ষস্থান হারিয়ে গেছে। চীনের বাইরে ইউয়ানের উপস্থিতি এখনো সীমিত। SWIFT-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের অংশ প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বাণিজ্য অর্থায়নে কখনো কখনো ডলারের পর দ্বিতীয় স্থানেও উঠেছে, তবে ইউরোকে সামান্য সময়ের জন্যই ছাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এখনো ডলারের আধিপত্য। আইএমএফের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বরাদ্দকৃত রিজার্ভে ইউয়ানের অংশ ২ শতাংশের সামান্য বেশি। চীনের ভেতরের এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ চীনা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বাজারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য এখন ডলারের বদলে ইউয়ান অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ নীতি ও ভূরাজনীতি—দুটিই ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের ইউয়ানে চালান নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ শুরুর পর কর্তৃপক্ষ ক্লিয়ারিং ব্যাংকের নেটওয়ার্ক, অংশীদার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ লাইন এবং নিজস্ব আন্তসীমান্ত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে। এরপর ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। রাশিয়ার ইউয়ানমুখী হওয়া এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলে মুদ্রার বৈচিত্র্য বাড়ানোর আগ্রহ—দুটিই সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চীন যেভাবে এখানে পৌঁছাল: সংকট থেকে মুদ্রা কৌশল

২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট বাণিজ্য ও অর্থায়নে একটিমাত্র তহবিলের মুদ্রার ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে আনে। জবাবে বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেয়: পুঁজি হিসাবের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো। তারা বাণিজ্য নিষ্পত্তির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চালু করে, অফশোর ইউয়ান ক্লিয়ারিং ব্যাংক নির্ধারণ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সোয়াপ লাইন নিয়ে আলোচনা করে, যাতে সংকটের সময়ে বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্থানীয় ব্যাংক ও কোম্পানিকে সহায়তা দিতে ইউয়ান ধার নিতে পারে।

পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে ধারাবাহিক কৌশল

অফশোর বাজার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশিরা ইউয়ান ধারণ ও ব্যবহারের আরও সুযোগ পায়। স্টক কানেক্ট ও বন্ড কানেক্ট মূল ভূখণ্ডের এক্সচেঞ্জ এবং হংকংয়ের মধ্যে লেনদেনের পথ তৈরি করে; এর মাধ্যমে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের অর্থপ্রবাহ আসে, যা সব সময় ইউয়ানে হিসাব করা হয়। বড় সূচক-প্রস্তুতকারীরা বৈশ্বিক মানদণ্ডে চীনা শেয়ার ও বন্ড অন্তর্ভুক্ত করায় বিদেশি বিনিয়োগ আসে এবং চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ইউয়ানের অংশ বাড়ে। পাণ্ডা বন্ড—যার মাধ্যমে বিদেশি ইস্যুকারীরা চীনের ভেতরে ইউয়ানে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে—এর বিস্তার ঘটেছে, কারণ গত দুই বছরের বেশির ভাগ সময় চীনের সুদের হার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম ছিল।

কর্তৃপক্ষ অবকাঠামোও গড়ে তুলেছে। ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম বা CIPS অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউয়ান লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করে। SWIFT-এর মেসেজিং ব্যবস্থার পাশাপাশি CIPS চালানো যায়, ফলে লেনদেনের অংশীদাররা বিকল্প খুঁজলে একটি বাড়তি ব্যবস্থা পাওয়া যায়। পিপলস ব্যাংক অব চায়না (PBOC) ৫০টিরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সোয়াপ লাইন সম্প্রসারিত করেছে। এর মাধ্যমে অংশীদাররা ইউয়ান তারল্যের বিকল্প উৎস পায়, যা বাজারে অস্থিরতার সময় বাণিজ্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান আসলে কী বলছে

চীনের আন্তসীমান্ত নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানে শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, লেনদেনের ভারসাম্যের সব শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আন্তসীমান্ত ইউয়ান প্রবাহের ৬০ শতাংশের বেশি আসে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের লেনদেন থেকে, পণ্য বাণিজ্যের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের অংশ আরও কম। এর মানে, এই উল্লম্ফনের পেছনে বাণিজ্য নিষ্পত্তির পাশাপাশি কানেক্ট কর্মসূচি ও সূচকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিদেশিদের চীনের অভ্যন্তরীণ সম্পদ কেনাবেচারও বড় ভূমিকা রয়েছে। এর অর্থ আরও হলো, চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে ইউয়ানের অংশ বাড়লেও তা সরাসরি তৃতীয় দেশগুলোর মধ্যে বৈশ্বিক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন নয়।

বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বাণিজ্য অর্থায়ন ও রিজার্ভ—তিনটি আলাদা মাপকাঠি

পণ্য ও সেবার বাণিজ্যে দুই পক্ষ সম্মত হলে কোম্পানিগুলো চীনের সঙ্গে ইউয়ানে চালানের মূল্য নির্ধারণ ও নিষ্পত্তি করতে পারে। ২০২৪ সালে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। বাণিজ্য অর্থায়নে ব্যাংকগুলো যেখানে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয় এবং স্বল্পমেয়াদি তহবিল সরবরাহ করে, সেখানে SWIFT-এর হিসাব অনুযায়ী ইউয়ানের অংশ এক অঙ্কের নিচু হার থেকে বেড়ে এক অঙ্কের মাঝামাঝি পর্যায়ে উঠেছে; কখনো কখনো ডলারের পর দ্বিতীয় স্থানেও ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী ইউয়ানের অংশ প্রায় ২ থেকে ২.৪ শতাংশ, যেখানে ডলারের অংশ প্রায় ৬০ শতাংশ এবং ইউরোর প্রায় ২০ শতাংশ। ব্যবস্থায় এই তিনটি মাপকাঠির কাজ আলাদা বলে এগুলোর পরিবর্তনের গতিও আলাদা।

রাশিয়া, নিষেধাজ্ঞা ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণ

নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের লেনদেন-অংশীদারদের নেটওয়ার্কে পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়ার কোম্পানি ও ব্যাংকগুলো এখন বাণিজ্য ও অর্থায়ন—দুই ক্ষেত্রেই ইউয়ানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। মস্কো এক্সচেঞ্জের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে, রাশিয়া চীনে জ্বালানি রপ্তানি বাড়ানো এবং চীনা পণ্য আমদানি বাড়ানোর পর ইউয়ানে লেনদেনের পরিমাণ ডলারকে ছাড়িয়ে যায়। রাশিয়ার তেল ও পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাসের চীনা ক্রয় প্রায়ই ইউয়ানে মূল্য নির্ধারণ ও পরিশোধ করা হয়। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট লেনদেনে ডলার বা ইউরো ব্যবহার এড়াতে কিছু তৃতীয় দেশও রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইউয়ানে নিষ্পত্তি করে।

ওয়াল স্ট্রিটের মুদ্রা নয়, বাণিজ্যের মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে চায় বেইজিং

চীনের নীতিনির্ধারকেরা অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে চান। পূর্ণ রূপান্তরযোগ্যতা সুদের হার, ঋণ বণ্টন ও বিনিময় হারের ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করবে। বিদ্যমান কাঠামোয় অগ্রাধিকার খাতে সঞ্চয় পরিচালনা এবং আর্থিক চক্র নিয়ন্ত্রণে বড় রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংক ও মূলধন নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করা হয়। দ্রুত বড় অঙ্কের অর্থপ্রবাহ এলে এই ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হতে পারে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনা জটিল হয়ে উঠতে পারে।

চীনের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও শিক্ষাবিদ হুয়াং ছিফান—চায়না ফাইন্যান্স ৪০ ফোরামের একাডেমিক কাউন্সেলর এবং চংকিংয়ের সাবেক মেয়র—ডলারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে বাস্তবধর্মী স্থিতিশীলতার লক্ষ্য হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি, ইউয়ানকে আন্তর্জাতিকীকরণের উদ্দেশ্য হলো বাস্তব অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতায় সহায়তা করা, ডলারের বৈশ্বিক ভূমিকা প্রতিস্থাপন করা নয়।

মুদ্রাকে আন্তর্জাতিকীকরণের চীনের প্রচেষ্টার লক্ষ্য মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক ভূমিকা প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং বৈশ্বিক শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

অবকাঠামো: CIPS, সোয়াপ লাইন ও ডিজিটাল ইউয়ান

চীনের পেমেন্ট অবকাঠামো ইউয়ানের পরিসর বাড়াচ্ছে। CIPS-এ এখন শত শত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণকারী যুক্ত, যা ব্যাংকগুলোকে কম মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইউয়ানে লেনদেন ক্লিয়ার ও নিষ্পত্তি করতে সক্ষম করে। বাস্তবে অনেক আন্তসীমান্ত ইউয়ান লেনদেনে মেসেজ পাঠানোর জন্য এখনো SWIFT ব্যবহৃত হয়, আর নিষ্পত্তির অংশটি সামলায় CIPS। তারপরও সমান্তরাল একটি অবকাঠামো থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হয়। নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বা মেসেজিং ব্যবস্থায় বিঘ্ন নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোর জন্য এই বিকল্প ব্যবস্থা মূল্যবান হতে পারে।

সোয়াপ লাইনও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। PBOC ৫০টিরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। সক্রিয় হলে এসব লাইনের মাধ্যমে অংশীদাররা নিজেদের বাজারের চাহিদা মেটাতে ইউয়ান পেতে পারে—বাণিজ্যিক চালান নিষ্পত্তি কিংবা স্থানীয় ব্যাংক ও কোম্পানিকে তারল্য সরবরাহের জন্য। সোয়াপ লাইন আস্থার সংকেতও দিতে পারে এবং চীনের সঙ্গে বড় অংশের বাণিজ্য করা অংশীদারদের লেনদেন ব্যয় কমাতে পারে।

কর্তৃপক্ষ একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা—যাকে প্রায়ই ডিজিটাল ইউয়ান বা e CNY বলা হয়—নিয়েও পরীক্ষা চালাচ্ছে। পরীক্ষামূলক উদ্যোগে দেশের ভেতরে খুচরা লেনদেন এবং হংকং ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে কয়েকটি আন্তসীমান্ত পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রক তদারকি বজায় রেখে পেমেন্টকে দ্রুত ও সাশ্রয়ী করা। একাধিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্ল্যাটফর্ম নিয়ে পরীক্ষায় অন্যান্য মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ও বাণিজ্য নিষ্পত্তিতে ডিজিটাল ইউয়ান তাৎক্ষণিকভাবে কীভাবে কাজ করতে পারে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কারা ইউয়ান ব্যবহার করছে এবং কেন

ব্যবহার সাধারণত শুরু হয় বাণিজ্যিক সংশ্লিষ্টতা থেকে। যেসব দেশ চীনে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে বা বিপুল পরিমাণ চীনা পণ্য আমদানি করে, তাদের জন্য বাণিজ্যের অন্তত একটি অংশের চালানের মূল্য ইউয়ানে নির্ধারণ করা সহজ। রাশিয়া এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু জ্বালানি রপ্তানিকারক আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে, আর এশিয়ার কয়েকটি অংশীদার মধ্যবর্তী পণ্যের বাণিজ্যে আরও ঘন ঘন ইউয়ান ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে আদর্শগত কারণ নেই। চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন হলে, কিংবা চীনে বিক্রির বিপরীতে পাওয়া ইউয়ানের সঙ্গে নিষ্পত্তি মেলানো গেলে, লেনদেনের ঝামেলা কমে—এটাই মূল আকর্ষণ।

ঋণ ও বিনিয়োগের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। কেনিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও ইথিওপিয়াসহ আফ্রিকার কিছু ঋণগ্রহীতা চীনা ঋণদাতাদের কাছে দায়ের কিছু অংশ পুনর্বিন্যাস করে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়িয়েছে, অথবা ইউয়ান বন্ড ইস্যু করেছে, যা ইউয়ানে পাওয়া বাণিজ্যিক অর্থের সঙ্গে সহজে মেলে। লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২২ সালে রিজার্ভ সম্পদে ইউয়ানের অংশ বাড়িয়ে ৫ শতাংশের বেশি করেছে; দেশটির সঙ্গে চীনের বড় বাণিজ্যিক সম্পর্কের সঙ্গে এই পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিভিন্ন বাজারে চীনা ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক ইউয়ান ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। পাঁচ বছরে তা প্রায় চার গুণ হয়ে ৪৮০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা এই মুদ্রায় বাণিজ্য ও প্রকল্প অর্থায়নে সহায়তা করছে।

পুঁজিবাজারের মাধ্যমেও এই প্রবণতা জোরদার হচ্ছে। ডলারের বাজারের তুলনায় চীনের অভ্যন্তরীণ তহবিল সংগ্রহের ব্যয় আকর্ষণীয় থাকায় পাণ্ডা বন্ড ইস্যু বেড়েছে। অফশোর ইউয়ান বন্ড ও ঋণ বহুজাতিক কোম্পানি এবং সার্বভৌম ঋণগ্রহীতাদের ইউয়ানে নগদ অর্থপ্রবাহের সঙ্গে দায় মেলানোর আরেকটি উপায় দিচ্ছে। তারল্য বাড়লে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালান্স শিটের আরও অংশ ইউয়ানে হেজ করতে পারে; এতে এই মুদ্রায় চালানের মূল্য নির্ধারণ ও নিষ্পত্তিও উৎসাহ পায়।

যেসব বাধা এখনো এর অগ্রগতি আটকে রেখেছে

রূপান্তরযোগ্যতা ও নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। ইউয়ান অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়, আর চীনে অর্থের প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর কোটা এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া রয়েছে। এক দশক আগের তুলনায় অফশোর ইউয়ানের তারল্য বেড়েছে, তবে ডলারের বাজারের তুলনায় এখনো কম। হেজিংয়ের উপকরণ থাকলেও অনেক কেন্দ্রে এর বাজারের গভীরতা ও মেয়াদ সীমিত, আর চাপের সময়ে ক্লিয়ারিং সক্ষমতাও সংকুচিত হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও আরেকটি বাধা। বিনিয়োগকারীরা তথ্যের স্বচ্ছতা, আইনের পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেন। বাজারে হস্তক্ষেপ, আকস্মিক নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের মন্দা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কেউ কেউকে সতর্ক করেছে। দুর্বল পারিবারিক চাহিদা এবং স্থানীয় সরকারের ঋণ নিয়ন্ত্রণের চলমান প্রচেষ্টা প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব পরিস্থিতিতে অনেক রিজার্ভ ব্যবস্থাপকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে ইউয়ানের আকর্ষণ কমে যায়।

নেটওয়ার্কের প্রভাবও দ্রুত পরিবর্তনের পথে বাধা। বিপুল পরিমাণ নিরাপদ ও তারল্যপূর্ণ সম্পদ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাভাজন আইনি ব্যবস্থার সুবিধা ডলার পায়। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, চালানের হিসাব এবং করপোরেট কোষাগার পরিচালনায় এখনো ডলারই প্রধান মুদ্রা। চীন-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের বাইরে ইউয়ানকে এগোতে হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ইউয়ানে তহবিল সংগ্রহ ও হেজিংয়ের আরও গভীর, পূর্বানুমানযোগ্য সুযোগ লাগবে। পাশাপাশি, তারল্য বা নমনীয়তা বিসর্জন না দিয়ে আরও ইউয়ান সম্পদ রিজার্ভে যোগ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বস্তি বোধ করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

এরপর কী নজরে রাখবেন

চীন-সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বাইরেও ইউয়ানের উত্থান ছড়াচ্ছে কি না, তা কয়েকটি সূচক থেকে বোঝা যাবে। প্রথমটি হলো চীনের পণ্য বাণিজ্যে ইউয়ানে নিষ্পত্তির অংশ। এই হার উচ্চ ২০ শতাংশের ঘর থেকে ধারাবাহিকভাবে ৩০ শতাংশের মাঝামাঝি পর্যায়ে উঠলে বড় অংশীদারদের মধ্যে ব্যবহার আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত মিলবে। দ্বিতীয়টি বাণিজ্য অর্থায়ন। SWIFT-এর হিসাবে ইউয়ান যদি ধারাবাহিকভাবে ডলারের পর দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখে, তাহলে তা বৈশ্বিক ব্যাংক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেবে।

জ্বালানি পণ্যের চালানের মূল্য নির্ধারণও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বড় উৎপাদকরা চীনে বিক্রি করা তেল বা গ্যাসের মূল্য ইউয়ানে নিতে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনলে আন্তসীমান্ত তারল্য ও ইউয়ান সম্পদের চাহিদা বাড়বে। অবকাঠামোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বাইরের ব্যাংকগুলোর সরাসরি CIPS-এ অংশগ্রহণ বাড়া, ইউয়ান লেনদেনে SWIFT-এর মাধ্যমে পাঠানো মেসেজ কমা এবং PBOC-এর সোয়াপ লাইনের সক্রিয় ব্যবহার—এসব ব্যবস্থাটির প্রতি আস্থা বাড়ার ইঙ্গিত দেবে। সবশেষে নীতিগত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগের পথ সম্প্রসারণ, ডেরিভেটিভ বাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং তথ্য ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম চালু করা—এসব পদক্ষেপ বাণিজ্য ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানের অবস্থান জোরদার করবে।

মূল কথা

  • আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তির তথ্য অনুযায়ী, চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনে অর্থ পরিশোধ ও প্রাপ্তির অধিকাংশই এখন ইউয়ানে হচ্ছে; ২০২৪ সালের মাঝামাঝি এর অংশ ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ।
  • চীনের পণ্য বাণিজ্যে ইউয়ানে নিষ্পত্তির হার বেড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে; ২০২১ সালে তা ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।
  • বিশ্বজুড়ে SWIFT-এর মাধ্যমে লেনদেনে ইউয়ানের অংশ প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ; বাণিজ্য অর্থায়ন ও রিজার্ভে ডলারের আধিপত্য বজায় রয়েছে।
  • আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বরাদ্দকৃত রিজার্ভে ইউয়ানের অংশ ২ শতাংশের সামান্য বেশি, যা ডলার ও ইউরোর তুলনায় অনেক কম।
  • বাণিজ্য ও অর্থায়নে রাশিয়ার ইউয়ান ব্যবহার বেড়েছে এবং ২০২৩ সালে মস্কো এক্সচেঞ্জে ইউয়ানে লেনদেনের পরিমাণ ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে।
  • চীনের ব্যবস্থায় ইউয়ান পেমেন্টের জন্য CIPS, ৫০টিরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে PBOC-এর সোয়াপ লাইন এবং ডিজিটাল ইউয়ানের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ রয়েছে।
  • স্টক কানেক্ট ও বন্ড কানেক্টের মাধ্যমে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের অর্থপ্রবাহ আন্তসীমান্ত ইউয়ান লেনদেনের বড় অংশ পরিচালনা করে।
  • মূলধন নিয়ন্ত্রণ, সীমিত অফশোর তারল্য এবং স্বচ্ছতা ও আইনের পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ এখনো বাধা হয়ে রয়েছে।
  • পাণ্ডা বন্ড ইস্যু এবং চীনা ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক ইউয়ান ঋণ বাড়ছে, যা বাণিজ্য ও প্রকল্প অর্থায়নে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
  • সামনের দিনগুলোতে নজর রাখতে হবে পণ্য বাণিজ্যে ইউয়ানের অংশ, বাণিজ্য অর্থায়নের অবস্থান, জ্বালানি পণ্যের চালানের মূল্য নির্ধারণ এবং অফশোর ইউয়ান বাজারের গভীরতার দিকে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে