কারখানার মেঝে থেকে প্রাগৈতিহাসিক তারকায়
দ্রুত পরিপক্ব হয়ে ওঠা চীনের রোবটিকস খাত জনসাধারণের জন্য নতুন ধরনের এক আকর্ষণীয় চমক হাজির করেছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গতিনিয়ন্ত্রণে চালিত জীবন্তসদৃশ ডাইনোসর রোবট। দুটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান, ইউজিয়াং টেকনোলজি কোং (যা ডোবট নামে বেশি পরিচিত) এবং লিমএক্স ডায়নামিকস, ধারণাটির একেবারে ভিন্ন দুটি রূপ সামনে এনেছে। ডোবটের প্রাণীটি তৈরি করা হয়েছে সিনোসরোপটেরিক্সের আদলে। ১৯৯৬ সালে লিয়াওনিংয়ে প্রথম আবিষ্কৃত এই ছোট পালকওয়ালা ডাইনোসরটির আদলেই এটি নির্মিত। সম্প্রতি ডুইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রোবটটি অন্ধকার জাদুঘরের মেঝেতে নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পালক কাঁপছে, মাথা সজাগ ভঙ্গিতে কাত হচ্ছে; পরে কাচের প্রদর্শনীগুলোর পাশ দিয়ে ধীরে হেঁটে যাওয়ার সময় ক্যামেরা ও অপটিক্যাল সেন্সর তার চলার পথ স্ক্যান করছে। এর বাইরের আবরণ বদলে অন্য প্রজাতির আদল দেওয়া যায়, যা প্রদর্শনী ও শোতে নানা ভূমিকায় ব্যবহারযোগ্য একটি প্ল্যাটফর্মের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
- কারখানার মেঝে থেকে প্রাগৈতিহাসিক তারকায়
- ডোবট কী তৈরি করেছে এবং সিনোসরোপটেরিক্স কেন বেছে নিয়েছে
- রোবটটি কীভাবে চলে এবং চারপাশের জগৎ বোঝে
- বিজ্ঞানে সিনোসরোপটেরিক্সের গুরুত্ব
- শহরের পরীক্ষায় ভারসাম্য দেখাল লিমএক্স TRON1
- TRON1-এর প্রদর্শনীর ভেতরের প্রযুক্তি
- চীনে শিক্ষামূলক বিনোদন রোবটের বিস্তৃত ঢেউ
- এই রোবটগুলো কতটা জীবন্তসদৃশ হতে পারে
- বর্তমান যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা
- তারা কী শেখাবে এবং কোথায় যাবে
- পরবর্তী সময়ে কোথায় দেখা যেতে পারে
- গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও ব্যয়
- ব্যবসায়িক মডেল ও সময়কাল
- কোম্পানিগুলো এখনই কেন এগোচ্ছে
- মূল বিষয়গুলো
লিমএক্স ডায়নামিকস বেছে নিয়েছে মজাদারভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কৌশল। হ্যালোইনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি তাদের দুই পায়ে চলা TRON1 হিউম্যানয়েড প্ল্যাটফর্মকে টি-রেক্সের সাজে সাজিয়ে শহরে নিয়ে যায়। রোবটটি ফুটপাতের উঁচু-নিচু অংশ পার হয়েছে, পথচারী পারাপারের জায়গায় থেমেছে এবং পরিচালকেরা ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টা করলেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে। TRON1-কে বিশেষভাবে ডাইনোসর হিসেবে তৈরি করা হয়নি। এটি একটি সাধারণ কাজে ব্যবহারযোগ্য দ্বিপদী রোবট, যা ভারসাম্য, ধাক্কা সামলে ফের স্থিত হওয়া এবং পরিস্থিতি বোঝার সক্ষমতা প্রদর্শন করে। জনসমাগমপূর্ণ স্থানে রোবট চালানোর জন্যও একই গুণগুলো প্রয়োজন।
ডোবট কী তৈরি করেছে এবং সিনোসরোপটেরিক্স কেন বেছে নিয়েছে
ডোবটের সিনোসরোপটেরিক্স বেছে নেওয়া শুধু চীনের জীবাশ্মবিদ্যার প্রতি সম্মান জানানো নয়, এর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও রয়েছে। লিয়াওনিংয়ের জীবাশ্মস্তরেই প্রথম ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ডাইনোসরের পালকের প্রমাণ পাওয়া যায়। সিনোসরোপটেরিক্স আকারে প্রায় একটি টার্কির সমান ছিল, এর ছিল লম্বা লেজ এবং সম্ভবত ডোরাকাটা নকশা। এতে রোবট নির্মাতারা পেয়েছেন সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য আকার এবং সহজে চেনা যায় এমন চেহারা। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা দ্রুতই এর পালক ও অবয়ব চিনতে পারে, যা জাদুঘরের মেঝেতে রোবটটিকে গল্প বলার চরিত্রে পরিণত করতে সাহায্য করে।
যন্ত্রটি হাঁটা, শ্বাস নেওয়ার মতো বুক ওঠানামা করা, এমনকি মৃদু গুঞ্জনধ্বনি তৈরির জন্যও নকশা করা হয়েছে। ডোবটের ভাষ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে বহুমাত্রিক মিথস্ক্রিয়া, পরিবেশ উপলব্ধি এবং উন্নত গতিনিয়ন্ত্রণ। বাস্তবে এর মানে, রোবটটি দর্শনার্থীদের দেখতে পারে, সাধারণ কণ্ঠ নির্দেশে সাড়া দিতে পারে এবং বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে অঙ্গভঙ্গির সময় নির্ধারণ করতে পারে। বাইরের আবরণটি মডিউলার। কর্মীরা বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী বা এমনকি সংস্কৃতি ও পুরাণের চরিত্রের আদল দিতে এর গঠন ও রং বদলাতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটি জাদুঘর, কমিউনিটি শিক্ষা কেন্দ্র, শ্রেণিকক্ষ ও থিম পার্ককে লক্ষ্য করছে। একই রোবটিক মূল কাঠামো ব্যবহার করে অন্য চরিত্র যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। দাম ও অর্ডারের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রোবটটি কীভাবে চলে এবং চারপাশের জগৎ বোঝে
এ ধরনের ব্যবস্থায় সাধারণত কয়েকটি পরিচিত উপাদান থাকে। ক্যামেরা ও গভীরতা-সেন্সর চারপাশের মানচিত্র তৈরি করে। ইনর্শিয়াল ইউনিট রোবটের কাত হওয়া ও ত্বরণ শনাক্ত করে। পায়ের সেন্সর মাটির সঙ্গে সংযোগ বুঝতে পারে, ফলে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের সময় ও পায়ের অবস্থান ঠিক করতে পারে। ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পরের দিকে কোথায় এগোবে তা ঠিক করতে অনবোর্ড কম্পিউটার এই তথ্যগুলো একত্র করে। স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর ভরকেন্দ্র রেখে প্রতিটি পদক্ষেপ কোথায় ফেলতে হবে, তা গতিপরিকল্পক নির্ধারণ করে। শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি প্রায়ই উল্টো দোলকের সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এতে কোনো জাদু নেই; রয়েছে সন্ধি ও সময়ের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ।
চলাচলের পাশাপাশি একটি আচরণ-নিয়ন্ত্রণ স্তর মাথা, লেজ, শ্বাসের ভঙ্গি ও শব্দের সমন্বয় করে। প্রাণীর মতো স্বাভাবিক মনে হয়, এমন চলনের ধারা তৈরি করেন মোশন ডিজাইনাররা। সহজ কথোপকথন এবং অঙ্গভঙ্গি বা মুখ চিনতে এআই সহায়তা করে, ফলে কোনো শিশু হাত নাড়ালে রোবটটি তার দিকে ফিরতে পারে, কিংবা কেউ খুব কাছে এলে থেমে যেতে পারে। কিছু ব্যবস্থায় ক্লাউড থেকে কনটেন্ট হালনাগাদ ও নতুন পাঠ পাঠানো যায়, ফলে প্রতিটি ইউনিট হাতে ধরে পুনঃপ্রোগ্রাম না করেই প্রদর্শনীগুলোতে নতুন বিষয় যোগ করা সম্ভব।
বিজ্ঞানে সিনোসরোপটেরিক্সের গুরুত্ব
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীনের জেহোল বায়োটার জীবাশ্ম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ণনা করা প্রথম পালকওয়ালা ডাইনোসর ছিল সিনোসরোপটেরিক্স। জীবাশ্মে সুতার মতো পালকের প্রমাণ মিলেছিল, যা এই ধারণাকে সমর্থন করে যে বহু থেরোপডেরই পালক ছিল। শিক্ষা-উদ্দেশ্যে তৈরি রোবটের জন্য এই পটভূমি অত্যন্ত মূল্যবান। উড়তে পারার বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হওয়ার অনেক আগেই পালক কীভাবে তাপ ধরে রাখতে ও প্রদর্শনীতে কাজে লাগতে পারে, তা একজন গাইড ব্যাখ্যা করতে পারেন। এরপর রোবটটি দেখাতে পারে, আদি ক্রিটেশিয়াস যুগের বাস্তুতন্ত্রে একটি ছোট শিকারি কীভাবে চলাফেরা করত। হাতে-কলমে মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেওয়া যায় এমন বাস্তব অবয়ব সাধারণত স্থির মডেলের চেয়ে বেশি মনোযোগ ধরে রাখে।
শহরের পরীক্ষায় ভারসাম্য দেখাল লিমএক্স TRON1
লিমএক্স ডায়নামিকস ডাইনোসরের পোশাক ব্যবহার করে একেবারে ভিন্ন একটি অর্জনের দিকে নজর কেড়েছে: বাস্তব পরিবেশে স্থিতিশীলভাবে দুই পায়ে হাঁটা। জনসমক্ষে হ্যালোইনের প্রদর্শনীতে টি-রেক্সের পোশাক পরা TRON1 ফুটপাত ধরে এবং ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। পরিচালকেরা একে ধাক্কা দিয়েছেন, নড়াচড়া করিয়েছেন, কিন্তু রোবটটি হোঁচট না খেয়ে ধাক্কা সামলেছে। পরীক্ষাগারের প্রোটোটাইপ আর জনসমাগমপূর্ণ স্থানে আকস্মিক পরিস্থিতি সামলাতে সক্ষম প্ল্যাটফর্মের মধ্যে এ ধরনের স্থিতিস্থাপকতাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
TRON1-এর এই প্রদর্শনী চীনের একটি প্রবণতার উদাহরণ: বিভিন্ন দল হিউম্যানয়েড ও পা-চালিত রোবটকে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগার থেকে বের করে শপিং মল, পার্ক ও রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে। ডাইনোসরের পোশাক নাটকীয়তা যোগ করেছে, তবে প্রযুক্তিগত দিকটি হলো এর নিচে থাকা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সক্ষম একটি দ্বিপদী রোবটকে জাদুঘরের ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিনয়শিল্পী থেকে থিম পার্কের চলমান গাইড—বিভিন্ন ভূমিকায় কাজে লাগানো যায়।
TRON1-এর প্রদর্শনীর ভেতরের প্রযুক্তি
কেউ মানুষের সমান আকারের রোবটকে ধাক্কা দিলে অনবোর্ড সেন্সর সঙ্গে সঙ্গেই কাত হওয়ার পরিবর্তন এবং মাটির প্রতিক্রিয়া বলের তারতম্য বুঝতে পারে। নিয়ন্ত্রক দ্রুত এক পা ফেলে, পায়ের দূরত্ব বাড়িয়ে অথবা শরীরের ওপরের অংশ দোলায়, যাতে ভরকেন্দ্র আবার ভর দেওয়ার স্থিতিশীল এলাকার মধ্যে আসে। প্রকৌশলীরা একে ধাক্কা সামলে পুনরুদ্ধার বলেন। এতে প্রায়ই প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ-চক্রের সঙ্গে শেখার মাধ্যমে তৈরি নীতির সমন্বয় থাকে। ধাক্কা সামলে ফের স্থিত হতে পারা নিরাপত্তারও একটি বৈশিষ্ট্য, কারণ এতে দর্শনার্থীদের কাছে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
শহুরে পরীক্ষা সীমাবদ্ধতাও সামনে আনে। মোটর ও শব্দপ্রভাব বেশি ব্যবহার করলে ব্যাটারির আয়ু কমতে পারে। অসম মাটি ও ছড়িয়ে থাকা জিনিসপত্র পা ফেলার জায়গা নির্ধারণ কঠিন করে তোলে। আবহাওয়া সেন্সর ও সন্ধির জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। পোশাক পরা রোবটের বিনোদনমূলক পদচারণাকে বিভিন্ন স্থানে নির্ভরযোগ্য দৈনন্দিন কার্যক্রমে রূপ দিতে পারবে কি না, তা কোম্পানিগুলোকে প্রমাণ করতে হবে।
চীনে শিক্ষামূলক বিনোদন রোবটের বিস্তৃত ঢেউ
ডোবট ও লিমএক্স একা নয়। চীনের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও এমন অ্যানিম্যাট্রনিক ডাইনোসর তৈরি করছে, যেগুলো গর্জন করতে পারে, মাথা ঝাঁকাতে পারে, কণ্ঠ নির্দেশে সাড়া দিতে পারে এবং সংক্ষিপ্ত পাঠ দিতে পারে। এসব ব্যবস্থায় কণ্ঠ শনাক্তকরণ, স্বাভাবিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ এবং কনটেন্ট ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়। কোনো শিশু ডাইনোসর কী খেত জানতে চাইলে রোবটটি সহজ ভাষায় উত্তর দিতে পারে এবং দৃশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে শরীর নাড়াতে পারে। জাদুঘর ও বিজ্ঞান কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকেরা বহু বছর ধরে শিক্ষা ও বিনোদনের এই মিশ্রণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সরকার ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোও জনজীবনে রোবটের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এই দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বিভিন্ন খাতে দেহধারী বুদ্ধিমান রোবটের ব্যবহার ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে শেনঝেনের। বেইজিংয়ে চালু হয়েছে রোবটের জন্য আলাদা একটি মল, যেখানে ভোক্তা ও পেশাগত কাজে ব্যবহারের নানা যন্ত্র রয়েছে; এর মধ্যে আছে ডাইনোসরের প্রদর্শনী এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মুখাবয়বসহ মানুষের সমান আকারের একটি হিউম্যানয়েড। সেখানে কয়েক শ ডলার থেকে শুরু করে কয়েক মিলিয়ন ইউয়ান পর্যন্ত দামের যন্ত্র রয়েছে, যা খেলনা, সঙ্গী রোবট ও শিল্প-সরঞ্জাম—বিস্তৃত বাজারের ইঙ্গিত দেয়।
চীন পাতালরেল ব্যবস্থাতেও পণ্য সরবরাহকারী রোবট পরীক্ষা করেছে। শেনঝেনের এক পরীক্ষায় অফ-পিক সময়ে কয়েক ডজন চাকার রোবট ট্রেনে উঠে স্টেশনের ভেতরের 7 Eleven দোকানে পণ্য পৌঁছে দিয়েছে। পরীক্ষায় যুক্ত এক ব্যবস্থাপক ব্যাখ্যা করেছেন, নিয়মিত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কোথায়।
পাতালরেলে পণ্য সরবরাহের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক কনভিনিয়েন্স স্টোরের ব্যবস্থাপক বলেন, "আগে দোকানের পণ্য কেবল সড়কপথে পাতালরেল স্টেশনে পৌঁছানো যেত। সড়কে গাড়ি পার্ক করা যেমন কঠিন ছিল, তেমনি সেখান থেকে দোকানে পণ্য নিতে গিয়ে প্রায়ই পাতালরেলের সকালের ব্যস্ত সময়ের মুখে পড়তে হতো। ফলে পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগত এবং শ্রম ব্যয়ও বাড়ত।"
বাস্তব ব্যবহারের প্রতি একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বোঝা যায়, ডাইনোসর রোবট কেন জাদুঘরে যাচ্ছে। পরিকল্পনাকারীরা যদি পাতালরেলে রোবটকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন, তবে নির্দিষ্ট চলার পথ ও স্থির সময়সূচি থাকা প্রদর্শনী কক্ষেও তা সম্ভব।
এই রোবটগুলো কতটা জীবন্তসদৃশ হতে পারে
বিশ্বাসযোগ্য ডাইনোসর তৈরি করা একই সঙ্গে শিল্প ও প্রকৌশলের কাজ। দেহভঙ্গি, গায়ের রং বা আচরণের সব খুঁটিনাটি বিজ্ঞানীরা জানেন না। তাই সৃজনশীল দলগুলোর সামনে নিখুঁত বলে দাবি না করেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এমন অভিজ্ঞতা গড়ে তোলার সুযোগ থাকে। চলনই মূল বিষয়। মাথা মসৃণভাবে নড়াচড়া অনুসরণ করলে, শ্বাসের সঙ্গে বুক ওঠানামা করলে এবং সঠিক ছন্দে পায়ের আঙুল উঠিয়ে আবার মাটিতে রাখলে, বাকি দৃশ্যটা মস্তিষ্ক নিজেই কল্পনা করে নেয়। শব্দও সাহায্য করে। শান্ত মুহূর্তে মৃদু গুঞ্জন বা কিচিরমিচির শুনলে প্রাণীটিকে স্বস্তিতে আছে বলে মনে হয়। দর্শনার্থীদের দলের দিকে তাকানোর সময় তীক্ষ্ণ ডাক দিলে সতর্কতার ভাব তৈরি হয়।
চোখে দেখার জন্য গঠন ও পালকও গুরুত্বপূর্ণ। রোবট চলার সময় পালকের সূক্ষ্ম তন্তু দুলতে পারে, যা ছোটখাটো যান্ত্রিক কাঁপুনি আড়াল করে। আলো ব্যবহার করে পেশির রেখা ও শ্বাসের ওঠানামা আরও স্পষ্ট করা যায়। নকশাকারীরা প্রায়ই চলচ্চিত্রের অ্যানিম্যাট্রনিক্স ও আধুনিক থিম পার্কের কৌশল অনুসরণ করেন। সেখানে চোখ ও গলার মতো অভিব্যক্তিপূর্ণ অংশের দিকে মনোযোগ টেনে নিয়ে, যান্ত্রিক অংশ যেখানে বড় ও ভারী, সেদিক থেকে তা সরিয়ে রাখাই মূল কৌশল।
বর্তমান যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা
সেরা যন্ত্রগুলোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মোটরে শব্দ হয়। ভারী আবরণ ও আনুষঙ্গিক অংশের বাড়তি ওজনে ব্যাটারির আয়ু কমে। রোবট যত বেশি কথা বলে ও পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ করে, কম্পিউটার তত বেশি শক্তি ব্যবহার করে। জাদুঘরে দীর্ঘ সময় চালাতে হলে চার্জের পরিকল্পনা, অতিরিক্ত ব্যাটারি এবং মঞ্চের আড়ালে নিরাপদ জায়গা প্রয়োজন। টেকসই হওয়াও জরুরি। শিশুরা জিনিসপত্রে হাত দেয়। আবরণ ও যন্ত্রাংশ বারবার বদলানোর ধকল সামলাতে কর্মীদের এমন প্যানেল ও সংযোগকারী অংশ প্রয়োজন, যেগুলো সহজে নষ্ট হবে না।
তারা কী শেখাবে এবং কোথায় যাবে
শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপকেরা স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখছেন। পালকের বিবর্তন বা শিকারি-শিকারের সম্পর্কের মতো বিষয়ে নির্ধারিত সময়ে শো চালাতে পারে ডাইনোসর রোবট। দর্শনার্থীদের অবাধ চলাচলের সময়ে এটি একজন মানব গাইডের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারে, যিনি প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেবেন। স্বাভাবিক ভাষা বোঝার সক্ষমতা থাকলে চরিত্রটি সহজ কথোপকথনে অংশ নিতে পারবে, ফলে পাঠটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মতো মনে হবে। শব্দচয়ন ও বলার গতি বদলে একই রোবটকে দিনে প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং রাতে তুলনামূলক বড় বয়সী দর্শনার্থীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে কোথায় দেখা যেতে পারে
প্রথম ধাপে বিজ্ঞান জাদুঘর, প্রাকৃতিক ইতিহাসের প্রদর্শনী কক্ষ, থিম পার্ক এবং কমিউনিটি যুবকেন্দ্রে এগুলো দেখা যেতে পারে। ভ্রাম্যমাণ প্ল্যানেটেরিয়ামের মতো স্কুলগুলোও শিক্ষাসফর বা বিশেষ আয়োজনে এগুলো ব্যবহার করতে পারে। নমনীয় আবরণ ও মডিউলার সংযুক্তি সৃজনশীল নানা সম্ভাবনা খুলে দেয়। কোনো প্রতিষ্ঠান উৎসবের সময় সিনোসরোপটেরিক্সের আবরণ বদলে ছোট ড্রাগনের আবরণ লাগাতে পারে, কিংবা স্থানীয় প্রদর্শনীর সঙ্গে মিলিয়ে প্রাচীন চীনা প্রাণীদের বিভিন্ন আদল পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করতে পারে। শুরু থেকে রোবটটি নতুন করে তৈরি না করেই একই চালনা-ব্যবস্থায় নতুন চরিত্র যুক্ত করা সম্ভব।
দৈনন্দিন শিক্ষায় এআই যুক্ত করার চীনের বৃহত্তর প্রবণতার সঙ্গে এসব ধারণার মিল রয়েছে। পাঠ্যক্রম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এআই বিষয়ে জ্ঞান এবং নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করার পরিধি বাড়ছে। কথা বলা ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ডাইনোসর এআইয়ের বিমূর্ত ধারণাকে শিশুদের দেখা ও ছোঁয়ার মতো বাস্তব কিছুতে পরিণত করতে পারে।
গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও ব্যয়
শিশুদের আশপাশে এআইচালিত চরিত্র রাখার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। নির্দেশ প্রক্রিয়াকরণের জন্য কণ্ঠ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা প্রায়ই কথার কিছু অংশ রেকর্ড করে। তথ্য কত দিন রাখা হবে এবং অভিভাবকের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আয়োজনস্থলের পরিচালকদের স্পষ্ট নীতি থাকতে হবে। রোবটকে চলাচলে সহায়তা করা ক্যামেরা মুখও দেখতে পায়, তাই নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত প্রয়োজন ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা যায় এমন ছবি সংরক্ষণ এড়িয়ে চলা উচিত। কোনো দর্শনার্থী অপভাষা ব্যবহার করলে বা উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করলে রোবট যাতে অনুপযুক্ত কিছু না বলে, তা নিশ্চিত করতে কনটেন্ট ফিল্টার দরকার।
জনসমাগমপূর্ণ স্থানে চলমান যন্ত্র হিসেবে রোবটকে বিবেচনা করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা করতে হবে। এর মধ্যে ভিড়ের কাছে চলাচলের গতি সীমিত রাখা, কেউ খুব কাছে এলে চলন থামানোর সেন্সর এবং দৃশ্যমান জরুরি বন্ধের বোতামসহ কর্মী রাখা অন্তর্ভুক্ত। নকশাকারীরা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে চলার পথ নির্ধারণ করতে পারেন এবং নিরাপদ পথে রোবটকে চালাতে মেঝেতে বীকন ব্যবহার করতে পারেন। শো শুরুর আগে পরিচালকেরা মহড়া চালাতে পারেন, যাতে দলগুলো ব্যাটারি বদলানো, ত্রুটি থেকে রোবট সচল করা এবং কৌতূহলী ভিড় সামলানোর প্রক্রিয়া জেনে নেয়।
ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টম আবরণ, সিল করা ইলেকট্রনিকস এবং মজবুত সন্ধিসহ জীবন্তসদৃশ একটি অবয়ব সস্তা হবে না। শক্তি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণেও নিয়মিত খরচ রয়েছে। সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক মডেল হলো এমন সেবা চুক্তি, যাতে যন্ত্রপাতি, আবরণ, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং ঘটনাস্থলে সহায়তা একসঙ্গে থাকবে। এতে নির্ভরযোগ্যতার দায় সরবরাহকারীর ওপর পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যয়ের খাত আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
ব্যবসায়িক মডেল ও সময়কাল
জাদুঘর ও পার্ক বহু বছর আগেই বাজেট পরিকল্পনা করে। এতে সরবরাহকারীরা নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণের জন্য পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও সীমিত পরিসরে চালুর সুযোগ পায়। সিনোসরোপটেরিক্স প্ল্যাটফর্মের দাম প্রকাশ করেনি ডোবট। ইজারা ও সাবস্ক্রিপশন মডেল ছোট প্রতিষ্ঠান ও স্কুলের মূলধনি ব্যয় ভাগ করে নিতে সাহায্য করতে পারে। আবরণের বিভিন্ন ধরন ক্যাটালগ আকারেও দেওয়া যেতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান এক মৌসুমের জন্য কয়েকটি প্রাণী বেছে নিয়ে প্রদর্শনী বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পাল্টে নিতে পারবে।
কোম্পানিগুলো এখনই কেন এগোচ্ছে
ঐতিহ্যবাহী বাজারে চীনের শিল্প রোবট নির্মাতারা প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। কারখানার কার্যক্রমে কখনো কখনো সংকোচন দেখা গেছে, আর বৈশ্বিক বাণিজ্য টানাপোড়েন রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি করছে। শিক্ষা ও বিনোদনের খাতে প্রবেশ করলে নতুন আয়ের পথ তৈরি হয় এবং হিউম্যানয়েডের চলাচল, পরিবেশ উপলব্ধি ও এআইয়ের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ মেলে। শিক্ষামূলক রোবটের বাজার অনুসরণকারী বিশ্লেষকেরা এই দশকজুড়ে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন। চীনের গ্রাহকসেবামূলক স্থানগুলোতে ক্যাশিয়ারবিহীন দোকান থেকে পণ্য সরবরাহকারী রোবট পর্যন্ত দৃশ্যমান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উপস্থিতি ইতিমধ্যে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এমন ভবিষ্যৎ নিয়ে রসিকতাও করেন, যেখানে ডাইনোসর পার্ক চালাবে যন্ত্র। তবে নিকট ভবিষ্যতের চিত্র সম্ভবত অনেক সহজ: কয়েকটি সতর্কভাবে পরিকল্পিত চরিত্র, যারা কাউকে জঙ্গলের মতো এদিক-ওদিক তাড়া না করে প্রদর্শনী কক্ষকে প্রাণবন্ত করবে।
মূল বিষয়গুলো
- ডোবট জীবন্তসদৃশ সিনোসরোপটেরিক্স রোবট উন্মোচন করেছে, যা হাঁটে, শ্বাস নেওয়ার ভঙ্গি করে এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় এআই ব্যবহার করে।
- রোবটটির মডিউলার আবরণ বদলে অন্য প্রাগৈতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক চরিত্রের আদল দেওয়া যায়, ফলে একই মূল কাঠামো দিয়ে নানা প্রদর্শনী সাজানো সম্ভব।
- লিমএক্স ডায়নামিকস টি-রেক্সের পোশাকে তাদের TRON1 দ্বিপদী রোবট দেখিয়েছে, যা শহরে চলার সময় ভারসাম্য ও ধাক্কা সামলে ফের স্থিত হওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
- চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো গতিনিয়ন্ত্রণ ও কণ্ঠের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সমন্বয়ে তৈরি শিক্ষামূলক বিনোদন রোবট নিয়ে জাদুঘর, স্কুল ও থিম পার্ককে লক্ষ্য করছে।
- শেনঝেন ও বেইজিংয়ের উদ্যোগ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সেবা ও সঙ্গী রোবটকে স্বাভাবিক করে তোলার বৃহত্তর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
- পাতালরেলে পণ্য সরবরাহকারী রোবটসহ বাস্তব পরীক্ষাগুলো দেখায়, দৈনন্দিন পরিবেশে মানুষের পাশাপাশি রোবট কীভাবে কাজ করতে পারে।
- শিশুদের জন্য বিভিন্ন স্থানে ডাইনোসর রোবট চালু করার পরিধি ও গতি নির্ধারণে গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, শক্তি ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
- নতুন প্ল্যাটফর্মগুলোর দাম প্রকাশ করা হয়নি বলে সরবরাহকারীরা সেবা চুক্তি ও ক্লাউড থেকে কনটেন্ট হালনাগাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন।






