সমালোচনা থেকে জনপ্রিয় তারকা
ওসাকা যখন একটি বিশ্বমেলার আয়োজনের লক্ষ্য স্থির করেছিল, তখন খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন, চোখের চারপাশে লাল বলয় ও উজ্জ্বল নীল দেহের এক পরাবাস্তব প্রাণী অনুষ্ঠানটির প্রতীক হয়ে উঠবে। মিয়াকুমিয়াকুর আত্মপ্রকাশ ২০২২ সালে; তা দেখে কেউ হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন, কেউ করেছেন ঠাট্টা। নকশাটি ছিল ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো: অনেকগুলো চোখে ঘেরা হাসিমুখের এক শূন্যতা, ছোট্ট দেহের সঙ্গে পাখনার মতো হাত আর ক্ষুদ্র লাল লেজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম প্রতিক্রিয়ার ঢেউ ছিল—ভয়ংকর, গা ছমছমে। সেই প্রতিক্রিয়া অবশ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের বসন্তে যে চরিত্রটি একসময় শিউরে ওঠার কারণ ছিল, সেটিকে দেখতেই মানুষ সারিতে দাঁড়াচ্ছিল। মাঠ ছাড়ার আগে মাসকটকে জড়িয়ে ধরা, সেলফি তোলা আর নরম খেলনা কেনার জন্য পরিবারগুলো দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করত। শিশুরা জামার হাতা ধরে টানত, যেতে চাইত না। শুরুতে ব্যর্থ হওয়া চরিত্রটিই একসময় এক্সপো ২০২৫ ওসাকা, কানসাইয়ের উষ্ণ ও হাস্যরসিক মুখ হয়ে ওঠে।
সূচিপত্র
আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল ছয় মাসের আয়োজনে (১৩ এপ্রিল থেকে ১৩ অক্টোবর) ২ কোটি ৮২ লাখ দর্শক টানা। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি দর্শকসংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ৪০ হাজারে, আর শেষ দিনে জানানো হয়, মোট দর্শক ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। ইউমেশিমার মাঠজুড়ে ছিল মিয়াকুমিয়াকু। তার জন্য নির্ধারিত মিয়াকুমিয়াকু হাউসে দর্শকদের স্বাগত জানানো হতো; দোকানের তাকজুড়ে ছিল তার পণ্য, এমনকি ম্যানহোলের ঢাকনা থেকেও উঁকি দিত সে। একসময় যে চরিত্রকে প্রাইম টাইমের জন্য অতিরিক্ত অদ্ভুত মনে হয়েছিল, পরে তার সঙ্গে দেখা করাটা এমন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে, যা কেউই হাতছাড়া করতে চাইত না।
সন্দেহ থেকে ভালোবাসা
অনেক দর্শকের কাছে এই পরিবর্তন ছিল ব্যক্তিগত। নকশাটি নিয়ে একসময় যারা ঠাট্টা করেছিলেন, চরিত্রটিকে নড়াচড়া করতে দেখে তাদের কারও কারও মন বদলে যায়। চোখ ও হাতের নড়াচড়া, প্রাণখোলা হাত নাড়া আর মাসকটের অবিচল হাসি প্রথম দিকের ধারণাকে নরম করে দেয়।
মিয়াকুমিয়াকু হাউসের ভেতরের একটি বার্তা বোর্ডে হাতে লেখা একটি নোটে এক দর্শক এই মন বদলের কথা সংক্ষেপে তুলে ধরেন।
প্রথমবার দেখে তোমাকে ভয়ংকর বলেছিলাম, তার জন্য দুঃখিত। এখন তোমাকে খুব ভালো লাগে।
এই ক্ষমাপ্রার্থনা আরও বড় একটি প্রবণতার প্রতিফলন। প্রথমে বিস্ময়, তারপর কৌতূহল—আর চরিত্রটিকে নড়াচড়া করতে ও মানুষের সঙ্গে মিশতে দেখার পর জন্ম নেয় স্নেহ।
মিয়াকুমিয়াকু কী, আর নকশাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
এক্সপোর আয়োজকেরা মিয়াকুমিয়াকুকে কোষ ও পানির সংমিশ্রণে জন্ম নেওয়া এক রহস্যময় প্রাণী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। লাল অংশগুলো কোষের প্রতীক, যা বিভক্ত হয়ে সংখ্যায় বাড়ে। নীল অংশটি বিশুদ্ধ পানির প্রতীক, যা আকার বদলায়, প্রবাহিত হয় এবং নিজেকে মানিয়ে নেয়। নামটি এসেছে ‘মিয়াকু’ (স্পন্দন) থেকে, যা জীবনের হৃদস্পন্দন এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অবিরাম প্রবাহের ধারণাকে তুলে ধরে। ছবির বইয়ের লেখক ও ডিজাইনার কোহেই ইয়ামাশিতার নেতৃত্বাধীন সৃজনশীল দল মাউন্টেন মাউন্টেন চরিত্রটি নকশা করেছে। মাসকটটি নিজের রূপ বদলাতে পারে, এমনকি একটু আগে দেখতে কেমন ছিল তা-ও ভুলে যেতে পারে—যা নিরন্তর পরিবর্তন ও সংযোগের অনুষ্ঠানের ভাবনার সঙ্গে মানানসই। আনুষ্ঠানিক পরিচিতিতে বলা হয়েছে, এর জন্মস্থান কানসাইয়ের একটি ছোট ঝরনা। সূর্যের আলোয় সে শক্তি পায় এবং বৃষ্টি ভালোবাসে, কারণ বৃষ্টির পানি শুষে নিতে পারে।
নকশার প্রতীকী তাৎপর্য
এই অদ্ভুত চেহারার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট ভাবনা। এক্সপো ২০২৫-এর জন্য ওসাকার লোগো থেকে চোখের বৃত্তাকার বিন্যাসের অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে, আর পানি দীর্ঘদিন ধরেই শহরটির প্রতীক। দেহটি ইচ্ছা করেই নরম ও বেখাপ্পা রাখা হয়েছে। চোখের বলয় কার্টুনের চেনা মিষ্টি চেহারার নিয়ম উল্টে দেয়। গোল মাথায় ছোট্ট মুখের বদলে এখানে সতর্ক দৃষ্টির চোখে ঘেরা একটি ফাঁকা জায়গাই মুখ। ফলে চরিত্রটি একই সঙ্গে অদ্ভুত ও মজার—প্রথম দেখায় অস্বস্তি জাগাতে পারে, কিন্তু বারবার দেখলে আপন মনে হয়। চরিত্রটির আনুষ্ঠানিক পরিচিতিতেও তার অপূর্ণতার মধ্যকার আকর্ষণের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
স্বভাব: বন্ধুসুলভ, তবে একটু বোকাসোকা; প্রায়ই হাস্যকর ভুল করে।
মাঠজুড়ে কস্টিউম পরা চরিত্রটির সঙ্গে যাদের দেখা হয়েছে, তারা এই বর্ণনার বাস্তব রূপ দেখেছেন। সে একটু হোঁচট খেত, খুব জোরে হাত নাড়ত, অগণিত ছবির জন্য পোজ দিত, আর ছোটদের দিকে তার অনেকগুলো চোখ পিটপিট করত। ভক্তদের সঙ্গে মেলামেশায় ধারণাগত নকশা আর বাস্তব পরিবেশনার মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে।
এত দ্রুত জনপ্রিয়তা বদলে গেল কীভাবে
এর একটি কারণ মনস্তত্ত্ব। মানুষ সাধারণত মুখ ও বস্তুর প্রতিসাম্য পছন্দ করে। সৌন্দর্য সম্পর্কে শেখা ধারণার সঙ্গে তা মেলে। তবে অতিরিক্ত প্রতিসাম্য একঘেয়ে লাগতে পারে। ডিজাইনার ও মডেলরা জানেন, দৃষ্টিকে আটকে রাখতে সামান্য খুঁত—একটু কাত হওয়া বা কেন্দ্র থেকে সরে থাকা কোনো বিবরণ—যোগ করা দরকার। বেশির ভাগ চরিত্রের তুলনায় মিয়াকুমিয়াকু প্রতিসাম্য থেকে অনেক দূরে। সে প্রত্যাশাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তাই শুরুতে অনেকে অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। পরে চরিত্রটির উষ্ণতা, সহজে কাছে পাওয়া এবং বোকাসোকা কাণ্ডকারখানা মানুষের মনে নতুন ধারণা তৈরি করে। দর্শকেরা শুধু চোখ আর অদ্ভুত আকৃতি দেখেননি। তারা এমন এক হাসিখুশি আয়োজককে পেয়েছিলেন, যে তাদের সঙ্গে দেখা করে আনন্দিত।
জ্ঞানীয় বিজ্ঞানের গবেষকদের মতে, নতুনত্ব প্রথম দেখায় গভীর ছাপ ফেলতে পারে। চ্যালেঞ্জ হলো নতুনত্ব থেকে অনুরাগে পৌঁছানো। জ্ঞানীয় নিউরোইনফরমেটিকসের গবেষক তামামি নাকানো মিয়াকুমিয়াকুর স্বাতন্ত্র্যকে এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন, যা পরে অনেক ভক্তের কথার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।
মিয়াকুমিয়াকুর মতো কিছু আমরা আগে কখনো দেখিনি।
এই স্বাতন্ত্র্য ছিল কেবল শুরু। অনুষ্ঠানের শুরুর দিকের কিছুটা অমসৃণ সময়ে মাসকটটি হয়ে ওঠে পরিচিত, নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি। প্রথম দিকে দর্শকেরা গরম, দীর্ঘ সারি এবং অনলাইন সংরক্ষণে সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। মাসকটের সহজে কাছে টানা হাসি আর সারাক্ষণের উপস্থিতি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এক হালকা উপলক্ষ তৈরি করেছিল। অনুরাগ জন্মালে যা একসময় ভয়ংকর মনে হয়েছিল, তা-ই পরে বোকাসোকা ও মিষ্টি ঠেকে।
পণ্য, যাতায়াত এবং প্রতিদিনের দেখা
ভক্তের সংখ্যা আপনাআপনি বাড়েনি। লাইসেন্সিং চুক্তি, খুচরা বিক্রির কৌশল এবং পরিবহনে মাসকটের নকশা ব্যবহারের কারণে উদ্বোধনের কয়েক মাস আগেই বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীদের কাছে চরিত্রটি পরিচিত হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের মার্চের শেষ নাগাদ ১০৭টি কোম্পানি লাইসেন্সিং চুক্তি করেছিল এবং প্রায় ৮০০টি আনুষ্ঠানিক মিয়াকুমিয়াকু পণ্য বিক্রি হচ্ছিল। এসবের মধ্যে ছিল নরম খেলনা, স্টিকার থেকে শুরু করে গৃহস্থালির জিনিসপত্র। টোকিও, ওসাকা ও কিয়োটোতে বিশেষ দোকান খোলা হয়; পরে অন্য অঞ্চলগুলোতেও আরও বিক্রয়কেন্দ্র যোগ হয়। মেলবোর্ন ও হো চি মিন সিটিতে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি উদ্বোধনের অনেক আগেই মাসকটটিকে দূত হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
পরিবহনে নকশা ব্যবহারের ফলে দৈনন্দিন জীবনেও চরিত্রটি পরিচিত হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ওসাকা লুপ লাইন ও জেআর ইউমেসাকি লাইনে মিয়াকুমিয়াকুর নকশা-সম্বলিত ট্রেন চলতে শুরু করে; ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে পশ্চিম জাপানে দ্রুতগতির ট্রেনও যুক্ত হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে বিশেষ জেএএল মিয়াকুমিয়াকু জেটের যাত্রা শুরু হয়, যা ২০২৫ সালের বসন্ত পর্যন্ত উড়েছে। যাত্রী, শিক্ষার্থী ও বেড়াতে আসা ভক্তদের কাছে এসব দেখা চরিত্রটিকে অপরিচিতের বদলে প্রতিবেশীর মতো করে তোলে।
- বড় শহরগুলোতে বিশেষ পণ্য ও লটারিসহ আনুষ্ঠানিক দোকান
- ওসাকায় নকশা-সম্বলিত ট্রেন এবং অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত শিনকানসেনের একটি নকশা
- ২০২৫ সালের বসন্ত পর্যন্ত একটি জাতীয় বিমান সংস্থার বিশেষ নকশার জেট
- জাপানের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পপ-আপ দোকান ও উপস্থিতি
পণ্যের কৌশলও চলতি প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। আয়োজনের শেষ দিকে ভয়ংকর অথচ মিষ্টি সাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত চরিত্র লাবুবুর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের একটি সীমিত সংস্করণের পণ্য আসে, যা মাঠের ভেতরের আনুষ্ঠানিক দোকানে লটারির মাধ্যমে বিক্রি হয়। ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও নতুন টি-শার্ট চাহিদা ধরে রাখে। নরম খেলনার লটারির জন্য লাইন পড়ে; প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী কয়েকটি আকারের মধ্যে একটি মিয়াকুমিয়াকু নিয়ে ফিরতে পারতেন। কিছু সীমিত পণ্যের পুনর্বিক্রি দ্রুত অনলাইনে শুরু হয়, যা নিবেদিত সংগ্রাহকদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
এক্সপোর মাঠে
প্রথম দিন থেকেই চরিত্রটি দর্শক টানত। উদ্বোধনী সপ্তাহান্তে দর্শকেরা ছবি তোলা এবং নরম খেলনা ও আনুষঙ্গিক পণ্য দেখার জন্য মিয়াকুমিয়াকু হাউসে ঢুকতে অপেক্ষা করেছিলেন। লাল ও নীল সাজে ভরা জায়গাটি ছিল সহজ কিন্তু কার্যকর ভক্তকেন্দ্র; সেখানে কর্মীরা ছবি তোলার জন্য উদ্গ্রীব পরিবারগুলোর অবিরাম ভিড় সামলাতেন। নির্দিষ্ট সময়ে চরিত্রটি মাঠের বিভিন্ন জায়গায়ও হাজির হতো, আর তাৎক্ষণিক সেলফির মিছিলে ভিড় জমে যেত।
দর্শকেরা প্রকাশ্যেই নিজেদের মন বদলের কথা বলেছেন। ওসাকার ২৫ বছর বয়সী এক নারী স্বীকার করেন, নকশাটি প্রথম প্রকাশের সময় তিনি তা নিয়ে বিচার করেছিলেন। মাসকটটিকে নড়াচড়া করতে দেখে তাঁর অনুভূতি বদলে যায়।
এটিকে বেছে নেওয়া হলো কেন?
চরিত্রটি নাচতে, হাত নাড়তে এবং চোখের বলয় ঘোরাতে শুরু করলে অনেকের কাছে প্রশ্নটির গুরুত্ব হারায়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সংশয় হাসিতে বদলে যায়। ভক্তরা কতটা আপন করে নিয়েছিলেন, তা বোঝা যায় আরেকটি ঘটনায়: একটি ছোট প্যাভিলিয়ন জানায়, প্রদর্শনে রাখা মাসকটের নরম খেলনাটি চুরি হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই দর্শকেরা দান করা খেলনা ও উপহার নিয়ে আসেন; পরের অতিথিদের স্বাগত জানাতে কাউন্টারটি মিয়াকুমিয়াকু-সামগ্রীর ভরে ওঠে। প্যাভিলিয়নের কর্মীরা জনসাধারণকে ধন্যবাদ জানান এবং উপহারগুলো প্রদর্শনে রাখেন। দৃশ্যটি সেই সময়কার আবহ তুলে ধরেছিল: মানুষ চাইছিল মাসকটটি সেখানে থাকুক, হাসিমুখে দর্শকদের স্বাগত জানাক।
ছয় মাসে ২ কোটি ৮২ লাখ দর্শক টানার লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষীই ছিল। তা পূরণ করতে দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার দর্শক দরকার হতো। এই লক্ষ্য সারি ব্যবস্থাপনা থেকে রাতের অনুষ্ঠান—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি করে। মাসকটটি খুচরা বিক্রির এলাকায় দর্শক টানতে সাহায্য করে, আর তার সঙ্গে দেখা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের স্মৃতি অনেক দর্শক অনলাইনে ভাগ করে নেন, যা মুখে মুখে প্রচার বাড়ায়।
সব সময় এক নম্বর নয়
আয়োজনের শেষ দিকে ওসাকা হেলথকেয়ার প্যাভিলিয়নে একটি উৎসব হয়, যেখানে মঞ্চে ওসাকা প্রিফেকচারের বিভিন্ন এলাকা এবং বিদেশি প্যাভিলিয়ন থেকে কয়েক ডজন মাসকট আসে। দিনের শেষে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ভোট হয়। জার্মান প্যাভিলিয়নের বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রতীক, বুদবুদের মতো দেখতে দেবশিশু সার্কুলার প্রথম স্থান পায়। এক্সপোর আনুষ্ঠানিক মুখ সহজেই জিতবে বলে যারা ভেবেছিলেন, তাদের কাছে ফলটি ছিল বিস্ময়কর। আয়োজকদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের ধারণা, মিয়াকুমিয়াকুর সর্বত্র উপস্থিতি হয়তো এক দিনের ভোটে নতুন কোনো চরিত্রের শীর্ষে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবু ভক্তরা যা দেখতে এসেছিলেন, তা পেয়েছেন—গান ও শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে আনুষ্ঠানিক চরিত্র এবং তার অনেক বন্ধুর সঙ্গে সেলফি।
হাসির আড়ালের ব্যবসা
মিয়াকুমিয়াকু ছিল আবেগের অংশ, আবার ব্যবসায়িক পরিকল্পনারও অংশ। আয়োজনটির পরিচালন বাজেট ছিল প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ইয়েন; আয়ের বেশির ভাগ টিকিট বিক্রি থেকে এবং উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পণ্য, খাবার ও পানীয় থেকে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল। খরচ উঠে আসতে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টিকিট বিক্রি দরকার হবে বলে আয়োজকেরা হিসাব করেছিলেন। জুলাইয়ের শুরুতে বিক্রি প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার বলে জানানো হয়; আর শেষ দিনে মোট প্রবেশসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। চরিত্রের পণ্যের লাইসেন্স থেকে আসা অর্থ জাপান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ২০২৫ ওয়ার্ল্ড এক্সপোজিশনের কাছে যায়, যা খরচ মেটাতে সহায়তা করে।
মাস গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খুচরা পণ্যের তালিকা নাটকীয়ভাবে বাড়ে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি আনুষ্ঠানিক পণ্যের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। ট্রেন, বিমান, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ এবং সীমিত লটারি চাহিদার শীর্ষ তৈরি করে। আয়োজন শেষ হওয়ার পরও চাহিদা অব্যাহত থাকায় আয়োজক আনুষ্ঠানিক মিয়াকুমিয়াকু পণ্যের বিক্রি ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। এই সিদ্ধান্ত বৃহত্তর এক বাস্তবতার প্রতিফলন। কোনো অনুষ্ঠান শেষ হলেই জনপ্রিয় মাসকট হারিয়ে যায় না। বাসিন্দা ও দর্শকদের কাছে গল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখে দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস, ট্রাভেল কার্ড এবং সংগ্রহের সামগ্রীতে তার উপস্থিতি।
জাপান কেন মাসকট ভালোবাসে
মিয়াকুমিয়াকুর সাফল্য বুঝতে জাপানের বৃহত্তর মাসকট সংস্কৃতির দিকে তাকানো দরকার। পৌরসভা, পুলিশ বিভাগ, কোম্পানি ও প্রিফেকচারগুলো জনসেবা, পর্যটন এবং স্থানীয় খাবারের প্রচারে বহু বছর ধরে নানা চরিত্র তৈরি করে আসছে। এই ধরনের চরিত্রের একটি কথ্য নামও আছে: ‘ইউরু চারা’, যা ঢিলেঢালা, নির্ভার স্বভাবের ইঙ্গিত দেয়। কুমামোতো প্রিফেকচারের কুমামন কিংবা নিরুদ্বেগ ভালুক রিলাক্কুমার মতো চরিত্রগুলোর সাফল্যের পেছনেও সেই একই প্রবণতা কাজ করেছে, যা মিয়াকুমিয়াকুকে জনপ্রিয় করেছে। প্রতিষ্ঠানকে আপন করে তোলা মুখে রূপ দেয়—এমন বন্ধুসুলভ পথপ্রদর্শক মানুষ পছন্দ করে।
‘কিমো কাওয়াই’ নামে পরিচিত কুৎসিত অথচ মিষ্টি চেহারারও আবেদন রয়েছে, যা জাপানি পপ সংস্কৃতির একটি ধারা। এসব নকশা ইচ্ছা করেই চিরাচরিত মিষ্টি চেহারা থেকে সরে গিয়ে অদ্ভুত বা সামান্য বিকট হয়ে ওঠে, তারপর হাস্যরস ও উষ্ণতার মাধ্যমে মানুষের স্নেহ আদায় করে। মিয়াকুমিয়াকু এই ধারার সঙ্গে মানানসই। চোখের সংখ্যা বেশি, লেজটি ঝুঁটির মতো, দেহ নরম ও দুলুনিময়। এর আকর্ষণ ধাপে ধাপে ধরা দেয়। প্রথমে হাসি, তারপর সন্দিগ্ধভাবে মাথা কাত করা, এরপর একটি ছবি, তারপর ক্যাশ কাউন্টার থেকে একটি নরম খেলনা। এর সঙ্গে যোগ হয় যাতায়াতের পথে চোখে পড়া, নিজের রঙে আঁকা বিমান এবং বিশেষ মূর্তির লটারি—সব মিলিয়ে চরিত্রটি কানসাইয়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
এক্সপোর আয়োজকেরা নকশাটিকে অনুষ্ঠানের ভাবনার জীবন্ত রূপক হিসেবেও তুলে ধরেছেন। কোষের সংমিশ্রণ ও প্রবাহিত পানির ধারণা জীবনকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ সমাজের ভাবনার সঙ্গে মেলে। নামের স্পন্দন ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়। দর্শকদের কাছে কেমন জীবন চান, তা কল্পনা করতে বলা একটি অনুষ্ঠানের জন্য রূপ বদলাতে পারা বন্ধুসুলভ পথপ্রদর্শক কার্যকর প্রতীক হয়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিক পরিচিতিতে এমনকি বলা হয়েছে, চরিত্রটি কখনো কখনো তার আগের রূপ ভুলে যায়—পরিবর্তন নিয়ে কথা বলার এক মজার উপায়। নতুন দ্বীপে অনুষ্ঠানস্থল এবং সবাইকে এক বিশাল ছাদের নিচে জড়ো করা গ্র্যান্ড রিং প্লাজা গড়ে ওসাকার জলতীরবর্তী এলাকার পুনর্গঠনের ভাবনার সঙ্গেও এই চেতনা মিলে যায়।
আনুষ্ঠানিক পেছনের গল্প পড়তে চাইলে অনুষ্ঠানের ওয়েবসাইটে পরিচিতিটি পাওয়া যাবে। সহজ ভাষায় সেখানে মাসকটের ক্ষমতা, পছন্দের কাজ এবং নকশার উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়েছে; পাশাপাশি চরিত্রটিকে জীবন বাঁচানো, জীবনকে শক্তিশালী করা এবং জীবনকে সংযুক্ত করার এক্সপোর ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এক্সপোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর্কাইভেও দর্শকেরা নকশা ও কর্মসূচি ঘেঁটে দেখতে পারেন।
এক্সপো ২০২৫-এর আনুষ্ঠানিক চরিত্র পরিচিতি
এক্সপো ২০২৫ ওসাকা কানসাই সম্পর্কে বিআইইর সংক্ষিপ্ত বিবরণ
এক নজরে
- ২০২২ সালে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মিয়াকুমিয়াকুর আত্মপ্রকাশ হলেও এক্সপো ২০২৫ ওসাকা, কানসাইয়ে সে দর্শকদের প্রিয় হয়ে ওঠে।
- আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল ২ কোটি ৮২ লাখ দর্শক; সমাপনী দিনে দর্শকসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়ায়।
- মাসকটটির নকশায় কোষ ও পানির ভাবনা মিশেছে, আর ‘মিয়াকু’ নামের অর্থ স্পন্দন।
- ২০২৪ সালের মার্চে ১০৭টি কোম্পানির লাইসেন্স ছিল এবং পণ্য ছিল প্রায় ৮০০টি; পরে তা কয়েক হাজারে পৌঁছায়।
- ট্রেন ও শিনকানসেনে নকশা, পাশাপাশি জেএএল মিয়াকুমিয়াকু জেট চরিত্রটিকে প্রতিদিন মানুষের চোখে পড়ার সুযোগ করে দেয়।
- ছবি ও পণ্য কেনার জন্য মিয়াকুমিয়াকু হাউসে দীর্ঘ লাইন পড়ত; মন বদলের কথা জানিয়ে দর্শকেরা নোটও লিখেছেন।
- লাবুবু মূর্তি ও ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগসহ সীমিত সংস্করণের পণ্য চাহিদা ও পুনর্বিক্রি বাড়ায়।
- আয়োজনের শেষ দিকে মাসকটদের এক ভোটে জার্মান প্যাভিলিয়নের সার্কুলার জেতে, যা মনে করিয়ে দেয় এক দিনের অনুষ্ঠানে নতুন মুখও আলো ছড়াতে পারে।
- চলমান চাহিদা মেটাতে আনুষ্ঠানিক পণ্য বিক্রি ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
- মিয়াকুমিয়াকুর যাত্রা কুৎসিত অথচ মিষ্টি নকশার শক্তি এবং জাপানের মাসকট সংস্কৃতির বিস্তার তুলে ধরে।






