জাপানে গ্রীষ্মকাল তিন সপ্তাহ দীর্ঘ হয়েছে, বদলে যাচ্ছে দৈনন্দিন জীবন ও ঝুঁকি

পড়তে 4 মিনিট
জাপানে গ্রীষ্মকাল তিন সপ্তাহ দীর্ঘ হয়েছে, বদলে যাচ্ছে দৈনন্দিন জীবন ও ঝুঁকি

দীর্ঘতর গরমের মৌসুম জাপানকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে

১৯৮০-এর দশকের শুরুর তুলনায় জাপানে এখন গ্রীষ্মকাল প্রায় তিন সপ্তাহ বেশি স্থায়ী হয়। এই পরিবর্তনে দৈনন্দিন জীবন বদলাচ্ছে, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে এবং অনেকের প্রিয় ঋতুগুলোর সময়কাল সংকুচিত হচ্ছে। মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল জানিয়েছে, ১৯৮২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্রীষ্মের শুরু প্রায় দুই সপ্তাহ এগিয়ে এসেছে এবং শেষ হয়েছে প্রায় নয় দিন পরে। ফলে গরমের মৌসুম আগে আসে, পরে বিদায় নেয় এবং বসন্ত ও শরতের জন্য কম সময় থাকে। এশীয় মহাদেশ থেকে আসা প্রবল শৈত্যপ্রবাহ শীতের সীমানায় প্রভাব ফেলতে থাকায় এই ঋতুর সময়কাল প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

সূচিপত্র
  1. দীর্ঘতর গরমের মৌসুম জাপানকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে
  2. গবেষকেরা কী পরিমাপ করেছেন এবং তা কেন গুরুত্বপূর্ণ
  3. গ্রীষ্মের শুরু ও শেষ কীভাবে নির্ধারণ করেছেন
  4. এখন গ্রীষ্মকাল কতটা দীর্ঘ
  5. উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনে এই রূপান্তর

গবেষণায় দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কাছের উষ্ণ সমুদ্র তাপ ধরে রাখে, রাত উষ্ণ রাখে এবং গ্রীষ্মের শেষ ও শরতের শুরুর স্বাভাবিক শীতল হয়ে আসার গতি কমিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানের আশপাশে তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও দেখা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ঘটনা বায়ুর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা—দুটিই বাড়িয়ে স্থলভাগের তাপ আরও তীব্র করতে পারে। এই সমন্বয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, বাইরে কাজের উৎপাদনশীলতা কমে এবং চেরি ফুল ফোটা থেকে ফুজি পর্বতে প্রথম তুষারপাত—পরিচিত ঋতুচিহ্নগুলোর সময় বদলে যায়।

গবেষকেরা কী পরিমাপ করেছেন এবং তা কেন গুরুত্বপূর্ণ

জাপানের আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) জুন থেকে আগস্টকে গ্রীষ্মকাল হিসেবে যে ক্যালেন্ডারভিত্তিক সংজ্ঞা দিয়েছে, শুধু সেটির ওপর নির্ভর না করে বাস্তবে গ্রীষ্মকাল কীভাবে বদলেছে, তা পরিমাপ করতে চেয়েছিল মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দলটি। তারা জাপান ও আশপাশের সমুদ্রকে উত্তর হোক্কাইদো থেকে দক্ষিণ কিউশু পর্যন্ত প্রায় ২০০টি অঞ্চলে ভাগ করেন। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য স্থানীয় গ্রীষ্মের পরিস্থিতির একটি সীমামান হিসেবে তাপমাত্রার একটি মান নির্ধারণ করেন। ওই মানের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার দিনগুলোকে গ্রীষ্মের দিন হিসেবে গণনা করা হয়।

সীমামানটি প্রতিটি এলাকার জন্য আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। বার্ষিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ-তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা একটি সরল মধ্যবর্তী মান নির্ধারণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো স্থানের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২০ সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ০ সেলসিয়াস হলে, গ্রীষ্মের সীমামান ধরা হয় ১৫ সেলসিয়াস। দৈনিক তাপমাত্রা এই মান ছাড়ালে সেই দিনগুলো ওই অঞ্চলের গ্রীষ্মকালের অংশ হিসেবে গণনা করা হয়। এ পদ্ধতিতে সারা দেশের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা ব্যবহারের বদলে প্রতিটি অঞ্চলের বাস্তব জলবায়ুর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গ্রীষ্মের শুরু ও শেষ কীভাবে নির্ধারণ করেছেন

দৈনিক ৪২ বছরের তথ্য ব্যবহার করে দলটি প্রতি বছরের প্রথম দিনটি শনাক্ত করেছে, যেদিন তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়ায়; পাশাপাশি যে শেষ দিন পর্যন্ত তা ছাড়িয়ে যায়, সেটিও চিহ্নিত করেছে। জাপানজুড়ে গড় হিসাবে, ১৯৮২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে গ্রীষ্মের প্রথম দিন প্রায় ১২.৬ দিন আগে এসেছে। গ্রীষ্মের শেষ দিন এসেছে প্রায় ৮.৮ দিন পরে। এতে ঋতুটির দৈর্ঘ্য বেড়েছে আনুমানিক ২১.৪ দিন।

এখন গ্রীষ্মকাল কতটা দীর্ঘ

১৯৮২ সালে মডেল অনুযায়ী গ্রীষ্মকাল প্রায় ৯২ দিন স্থায়ী হয়েছিল—২৯ জুন থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০২৩ সালে তা স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ১২১ দিন—১১ জুন থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত। গবেষকদের উপসংহার, জাপানের কাছের উষ্ণ সমুদ্র ঋতুর শেষভাগে স্বাভাবিক শীতল হয়ে আসা ঠেকিয়েছে, ফলে গ্রীষ্ম আগে শুরু হয়েছে এবং শেষও হয়েছে পরে। তারা আরও উল্লেখ করেছেন, গবেষণার সময়কালে শীতের দৈর্ঘ্যে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সম্ভবত উষ্ণ জলবায়ুতেও মহাদেশ থেকে আসা প্রবল শৈত্যপ্রবাহ শীতের সময়কাল ধরে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনে এই রূপান্তর

জাপান প্রশান্ত মহাসাগর ও জাপান সাগরের মাঝখানে অবস্থিত। উষ্ণ সমুদ্রস্রোত দেশটিকে ঘিরে রেখেছে এবং শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুচাপ বলয়ের প্রভাবও রয়েছে। দুই সমুদ্র অববাহিকাতেই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, আর ২০২৩ সালে পূর্ব এশিয়ার বড় অংশ ঘিরে বিস্তৃত সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। বায়ুমণ্ডলীয় মডেলিংয়ে দেখা গেছে, কাছের সমুদ্র উত্তপ্ত হলে তা স্থলভাগের ওপরের বাতাসে তাপ ও আর্দ্রতা যোগ করে। এর ফলে দিন আরও গরম, রাত আরও ভ্যাপসা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাপজনিত অস্বস্তি থাকে।

আঞ্চলিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ আর্দ্রতা বাড়িয়ে এবং মেঘের আচ্ছাদনে পরিবর্তন এনে জাপানের তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করতে পারে; এর ফলে বেশি সূর্যালোক ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়। ২০২৩ সালের পূর্ব এশিয়ার তাপপ্রবাহ মূল্যায়নকারী বিজ্ঞানীদের ধারণা, জাপানের চারপাশের সামুদ্রিক তাপ গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার তীব্রতা ও স্থায়িত্বের বড় একটি অংশের জন্য দায়ী। সামুদ্রিক প্রভাবপ্রধান, মেঘাচ্ছন্ন জলবায়ুতে এই প্রভাব বিশেষভাবে প্রবল। উষ্ণ সমুদ্রের সঙ্গে গ্রীষ্মের দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্পর্ক—মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলের সঙ্গে এটি মেলে।

বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীষ্মে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উচ্চচাপ বলয় পশ্চিম দিকে বিস্তৃত ও শক্তিশালী হতে পারে। এতে উষ্ণ বায়ু জাপানের দিকে ধাবিত হয় এবং পূর্ব এশীয় মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ প্রভাবিত হয়। টোকিওর আশপাশের নগরাঞ্চল নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুচাপের ধরন ও বাতাসের দিকের সামান্য পরিবর্তনও স্বাভাবিক সামুদ্রিক বাতাসের প্রবাহ দমিয়ে দিতে পারে, ফলে অভ্যন্তরীণ এলাকায় তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে একটানা বয়ে আসা বাতাস স্থানীয় সামুদ্রিক বাতাসের স্বাভাবিক চক্রকে ছাপিয়ে গেলে, অভ্যন্তরীণ এলাকার পাড়াগুলো বেশি গরম হয় এবং রাতে কম ঠান্ডা হয়। বায়ুচাপ ও বাতাসের প্রতি এই সংবেদনশীলতা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, বৃহত্তর উষ্ণায়নের প্রবণতার মধ্যেও কোনো কোনো গ্রীষ্ম কেন বিশেষভাবে অসহনীয় মনে হয়।

টোকিও মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিদ্যার অধ্যাপক ইয়োশিহিরো ইইজিমা বলেন, অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে সারা দেশে গ্রীষ্মের অনুভূতি বদলে গেছে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে