এআইয়ের চাহিদায় চিপশিল্পের দুই পরাশক্তির চিত্র বদলাচ্ছে
বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে উন্মাদনা সবচেয়ে উন্নত চিপের চাহিদা বাড়াচ্ছে। এই ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা এশিয়ার প্রবৃদ্ধির দৌড়ে তাইওয়ানকে এগিয়ে নিচ্ছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার গতি কমছে—যদিও চিপশিল্পে দুটিই শীর্ষস্থানীয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস, সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় এ বছর তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫.১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি থাকবে প্রায় ০.৮ শতাংশে, অর্থাৎ অনেকটাই পিছিয়ে; যদিও স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের মুনাফা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এই ব্যবধানের পেছনে রয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং শুল্কের প্রভাবের ভিন্নতা—কোন দেশের প্রতিষ্ঠান বেশি চিপ বিক্রি করছে, তার সরল হিসাব নয়। ডেটা সেন্টার থেকে স্মার্টফোন পর্যন্ত এআই ব্যবস্থা চালাতে অত্যাধুনিক লজিক প্রসেসর ও বিপুল পরিমাণ মেমোরি—দুটিই দরকার। ফলে ফাউন্ড্রি ও মেমোরি, উভয় খাতেই অর্ডার বাড়ছে।
সূচিপত্র
তাইওয়ানের রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন এখন সর্বোচ্চ গতিতে চলছে। আগস্টে দ্বীপটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড প্রায় ৫৮৫০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ওই মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার ৫৮৪০ কোটি ডলারের রপ্তানিকেও সামান্য ছাড়িয়ে যায় তা। পূর্বাভাসে জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রেও প্রতীকী এক পালাবদলের ইঙ্গিত রয়েছে। তাইওয়ানের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩৮ হাজার ডলার ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়াকে পেছনে ফেলবে। মোট উৎপাদনের হিসাবে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি এখনো অনেক বড়, তবে দীর্ঘ সময় দুর্বল প্রবৃদ্ধি ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারে।
তাইওয়ানের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে চিপের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, তাইওয়ানের জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ আসে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১০ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি। রপ্তানির ক্ষেত্রে তাইওয়ানের চালানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমন্বিত সার্কিট, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে তা প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই কেন্দ্রীভবনের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার থেকে তাইওয়ান বেশি লাভবান হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিস্তৃত শিল্পভিত্তি দেশটিকে গাড়ি, ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের মন্দা এবং শুল্কের চাপের কাছে বেশি উন্মুক্ত রেখেছে।
তাইওয়ান কেন এগিয়ে যাচ্ছে?
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের সম্প্রসারণের ভিত্তি তাইওয়ানের ফাউন্ড্রি খাতে নেতৃত্ব। এআই প্রসেসর ও স্মার্টফোনের শীর্ষ মার্কিন নকশাকারদের ব্যবহৃত অধিকাংশ অত্যাধুনিক লজিক চিপ তৈরি করে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। দ্বীপটির সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সিনচু সায়েন্স পার্ক ও এর আশপাশে গড়ে ওঠা ঘন শিল্পগুচ্ছের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। সেখানে দক্ষ জনবল, সরবরাহকারী, যন্ত্রপাতি বিক্রেতা ও পরিবহনব্যবস্থা ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করে। এই শিল্পপরিবেশ খরচ কমায়, উৎপাদন-ফলন বাড়ায় এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সময় কমায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান গবেষণা, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল ধরে রাখার জন্য কর-ছাড় জোরদার করেছে। ২০৩৩ সাল পর্যন্ত দেশে অত্যাধুনিক উৎপাদনসক্ষমতা ও প্যাকেজিং ধরে রাখতে বিলিয়ন ডলারের তহবিলও বরাদ্দ করেছে। তীব্র খরার সময় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়া ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ চিপ কারখানাগুলোর জন্য পানির অগ্রাধিকার নিশ্চিত করে। এতে স্পষ্ট, জাতীয় নীতি কীভাবে এ খাতের প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বিত হয়েছে।
তাইওয়ানের জন্য চাহিদা বাড়ছে উপযুক্ত খাতগুলোতেই। ক্লাউড সেবা কোম্পানি ও যন্ত্রনির্মাতারা এআই-সংশ্লিষ্ট সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকসের অর্ডার বাড়ানোয় যুক্তরাষ্ট্রে দ্বীপটির রপ্তানি বেড়েছে। এ বছর কোনো কোনো মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চালান ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা রপ্তানিতে রেকর্ড গড়তে ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি কেনায় দক্ষিণ কোরিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে তাইওয়ান। উন্নত লজিক চিপ ও উচ্চমূল্যের প্যাকেজিংয়ে সক্ষমতা বাড়ানোর জোরালো উদ্যোগের ইঙ্গিত এটি। শিল্পখাতের পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, বৈশ্বিক চুক্তিভিত্তিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের অংশ ৬০ শতাংশের বেশি; আর সবচেয়ে উন্নত লজিক চিপ উৎপাদনে এর অংশ প্রায় ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি। নিকট ভবিষ্যতে এআই চিপের বৈশ্বিক বাজার বছরে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। সামগ্রিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের প্রবৃদ্ধি হবে উচ্চ একক অঙ্কের কাছাকাছি। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তাইওয়ানের অবস্থানের কারণে দ্রুত বাড়তে থাকা বাজারের বড় অংশ দেশটি পাচ্ছে।
চিপ খাত ঘুরে দাঁড়ালেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি কেন মন্থর
দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতারা মেমোরি খাতের গভীর মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এআই প্রশিক্ষণ ও অনুমানের কাজে বিপুল পরিমাণ দ্রুতগতির মেমোরি দরকার হওয়ায় ডিআরএএম ও ন্যান্ড—দুই ধরনের মেমোরির দাম স্থিতিশীল হয়ে পরে বাড়তে শুরু করেছে। এআই অ্যাকসেলারেটরের সঙ্গে যুক্ত উচ্চ ব্যান্ডউইডথ মেমোরির চাহিদা থেকে লাভবান হয়েছে এসকে হাইনিক্স। স্যামসাং ডিআরএএমের নতুন প্রযুক্তিগত নোড চালু করছে এবং উন্নত লজিক চিপের জন্য ফাউন্ড্রি ব্যবসা বাড়াচ্ছে। তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য খাত চাপের মুখে রয়েছে। গাড়ি, ইস্পাত ও যন্ত্রাংশ প্রধান বাজারগুলোতে বেশি শুল্কের মুখে পড়ছে। একাধিক অঞ্চলে জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোকে ব্যয় ওঠানামা ও নীতিনিয়মের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। ফলে চিপ খাতের মুনাফা সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারেনি।
নীতিনির্ধারণের ধরনেও পার্থক্য রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়া ব্যাপক পরিসরের একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। তবে ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে কৌশলগত আরও কিছু শিল্পকেও সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। কোম্পানি ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সহায়তার লক্ষ্যভিত্তিকতা ও গতি এখনো তাইওয়ানের চেয়ে পিছিয়ে। কারখানার নমনীয় কর্মঘণ্টা, জরুরি প্রকল্পে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার সীমা শিথিল, দ্রুত অনুমোদন এবং মূলধনি ব্যয়, বিদ্যুৎ ও পানির জন্য প্রণোদনা সহজ করার বিষয়ে বিতর্ক চলছে। ২০৪০-এর দশকের মধ্যে চিপ উৎপাদন ও সরবরাহকারীদের নিয়ে একটি বৃহৎ শিল্পগুচ্ছ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এতে সরকারি ও বেসরকারি বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এই কৌশল কাজে লাগতে পারে, তবে কারখানা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জলাধারের সক্ষমতা বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগে। নিকট ভবিষ্যতে গাড়ি ও উপকরণ খাতে শুল্কের প্রভাব রপ্তানির গতি কমাচ্ছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি সামান্য বেড়েছে; চিপ ও গাড়ির রপ্তানি বাড়লেও ইস্পাত ও পেট্রোলিয়ামের রপ্তানি কমেছে।
রপ্তানির গতিপ্রকৃতি ও শুল্কের চাপ
শুল্কনীতি দুই দেশের ওপর অসম চাপ তৈরি করেছে। আমদানিকারক অর্থনীতিগুলো নিজেদের প্রযুক্তি খাতের ক্ষতি এড়াতে চায় বলে অনেক চিপপণ্য কঠোরতম শুল্কের আওতার বাইরে রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। এআই-সংশ্লিষ্ট অর্ডারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের রপ্তানি জোরালোভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে শুল্ক বাড়ায় গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি কমেছে। সাম্প্রতিক এক মাসে তাইওয়ানের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে ৫৮৫০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি, মোট ৫৮৪০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাত রপ্তানিতে চড়া শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং গাড়ি রপ্তানিও দুর্বল হয়েছে। বিপরীতে ইলেকট্রনিকসের চাহিদার ঢেউয়ে এগিয়ে গেছে তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাড়তে থাকা বাণিজ্য উদ্বৃত্তও এই পরিবর্তনের প্রতিফলন। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বড় ভারসাম্যহীনতা নজর কাড়তে পারে। তবে আপাতত চিপের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে অনেক পণ্য নতুন শুল্কতালিকার বাইরে রয়েছে।
চিপের ধরনে কাঠামোগত পার্থক্য
এই খাতে দুই ধরনের চিত্রই প্রধান। এআই ব্যবস্থা ও স্মার্টফোনের মস্তিষ্ক হিসেবে ব্যবহৃত উন্নত লজিক চিপের চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে এগিয়ে তাইওয়ান। আর এসব প্রসেসরে তথ্য সরবরাহকারী মেমোরি তৈরিতে এগিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া। বর্তমান এআই প্রবণতায় অত্যাধুনিক লজিক চিপ, উচ্চ ব্যান্ডউইডথ মেমোরির সঙ্গে লজিক চিপ যুক্ত করা উন্নত প্যাকেজিং এবং কম বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিগত নোডের গুরুত্ব বেশি। এতে তাইওয়ানের ফাউন্ড্রি ও প্যাকেজিং কোম্পানিগুলো সুবিধা পাচ্ছে, পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার মেমোরি সরবরাহকারীরাও লাভবান হচ্ছে। লজিক চিপ ও মেমোরির এই পার্থক্য সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্রকেও প্রভাবিত করে। মেমোরির বাজারে মজুতের চক্রের কারণে ওঠানামা বেশি হয়, যা মুনাফা ও বিনিয়োগকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বহু বছরের এআই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত অত্যাধুনিক লজিক চিপের ফাউন্ড্রি অর্ডার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে।
উৎপাদনের পরিসর ও শিল্পগুচ্ছও গুরুত্বপূর্ণ। তাইওয়ানের শিল্পপরিবেশে উপকরণ, যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং, পরীক্ষা ও নকশা সহায়তার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান কারখানার কাছাকাছি সমন্বিতভাবে কাজ করে। উচ্চাভিলাষী পণ্য বাজারে আনার সময়সূচি মেনে চলতে মার্কিন চিপ নকশাকারীরা এই সক্ষমতার ওপর নির্ভর করেন। তবে শিল্পের কেন্দ্রীভবনের সীমাবদ্ধতাও আছে। নতুন কারখানা চালাতে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বাড়াতে হবে, আর প্রযুক্তিগত নোড আরও ছোট হওয়ার সঙ্গে কারখানার স্থান নির্বাচনও কঠিন হচ্ছে। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এআই খাতের সম্প্রসারণে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রিড উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই সক্ষমতা গড়ে তুলতে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া—দুই দেশকেই সময়সীমার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম ও চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে সেমিকন্ডাক্টর কারখানার জন্য পানি ও বিদ্যুৎ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় সুবিধা ধরে রাখতে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। দীর্ঘমেয়াদে চিপশিল্পের জন্য জ্বালানি ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে এগোচ্ছে। পাশাপাশি প্রক্রিয়া প্রকৌশল ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালাচ্ছে।
ঝুঁকি ও স্থিতিস্থাপকতা
তাইওয়ানে উন্নত চিপ উৎপাদন অত্যধিক কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাইওয়ান প্রণালি ঘিরে সংঘাত হলে ভয়াবহ বিঘ্ন ঘটবে। অর্থনীতিবিদদের মডেল অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার সংঘাতে বৈশ্বিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে, আর অবরোধের পরিস্থিতিতে ক্ষতি হতে পারে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বের নির্ভরতা কতটা, তা স্পষ্ট। অত্যাধুনিক লজিক চিপের অধিকাংশই তৈরি হয় তাইওয়ানে এবং দেশটির প্রধান ফাউন্ড্রি চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে আধিপত্য ধরে রেখেছে। বন্ধুভাবাপন্ন সরকারগুলো আরও কারখানায় অর্থায়ন করলেও নিকট ভবিষ্যতে তাইওয়ানের দক্ষতা, গভীর দক্ষ জনবল ও ঘন সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের সমকক্ষ হওয়া কঠিন।
নিজ দেশে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং মিত্রদেশে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ দ্রুত এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দেশে চিপ উৎপাদন, প্যাকেজিং ও উপকরণশিল্প বাড়াতে ভর্তুকি কর্মসূচি ও কর-ছাড় চালু করেছে। অ্যারিজোনা ও নিউইয়র্ক থেকে কিউশু ও ড্রেসডেন পর্যন্ত অনেক প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে সময় লাগবে; ব্যয় ও শ্রমিকসংকটও রয়ে গেছে। ভৌগোলিক বিস্তার বাড়াতে তাইওয়ানের কোম্পানিগুলোও এসব উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে এবং বিদেশে কিছু উৎপাদনসক্ষমতা গড়ে তুলছে। তবে অত্যাধুনিক উৎপাদনের কেন্দ্র এখনো দ্বীপটিই। বিশ্লেষকদের ধারণা, কয়েক বছর এই ভারসাম্য বজায় থাকবে।
দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে সামাজিক ও আর্থিক চাপও তৈরি হয়। তাইওয়ানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে বেতন অন্যান্য খাতের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে, ফলে আয়বৈষম্যও বাড়ছে। সিনচুর মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রিক এলাকায় আবাসনসংকট প্রযুক্তি খাতের বাইরের কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। স্থানীয় তথ্য-প্রমাণে ভালো বেতনের প্রযুক্তি খাতের পরিবারগুলোর মধ্যে জন্মহার সামান্য বাড়ার ইঙ্গিতও রয়েছে। অন্যদিকে সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবে অনেকে পরিবার গড়তে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কোনো কোনো সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির সুফল কমিয়ে দিয়েছে, আর উৎপাদনের তুলনায় পারিবারিক ঋণের পরিমাণ বেশি। দক্ষিণ কোরিয়াও জনমিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত নিজস্ব চাপের মুখে রয়েছে; বড় শহরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বাড়ানো নয়, তার সুফল ও মান নিশ্চিত করাও এখন কারখানা ও রপ্তানি বাড়ানোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এখন কোন অর্থনীতির কী করণীয়
চিপ খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর সুফল কাজে লাগাতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করে নিজের শক্তির ক্ষেত্রগুলো আরও বহুমুখী করতে পারে। শিল্প খাতের নির্বাহীরা নমনীয় কর্মব্যবস্থা এবং সময়-সংবেদনশীল কারখানা প্রকল্পের জন্য সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার সীমায় লক্ষ্যভিত্তিক ছাড় চেয়েছেন। বিদ্যুৎ লাইন, সাবস্টেশন ও পানির অবকাঠামোর অনুমোদন দ্রুত হলে সক্ষমতা বাড়ানোর সময়সূচির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত নোড ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের জন্য স্পষ্ট ও স্থিতিশীল কর-ছাড় দেশীয় ফাউন্ড্রি সম্প্রসারণে উৎসাহ দিতে পারে, যা বিশ্বমানের মেমোরি খাতের পরিপূরক হবে। সেমিকন্ডাক্টরের বাইরেও নীতিগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে উচ্চমূল্যের গাড়ি ও ব্যাটারি, কম কার্বন নিঃসরণকারী ইস্পাত এবং ডিজিটাল সেবায়, যাতে রপ্তানির ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া যায়। গাড়ি ও উপকরণ খাতে শুল্কসংক্রান্ত উত্তেজনা কমাতে বাণিজ্য কূটনীতিও সহায়ক হবে। যন্ত্রপাতি প্রযুক্তিবিদ ও প্রক্রিয়া প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিলে শ্রমিকের ঘাটতি কমবে, যা প্রায়ই উৎপাদন সম্প্রসারণ ধীর করে। বৃহৎ শিল্পগুচ্ছ গড়ার পরিকল্পনার সঙ্গে সময়মতো বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।
তাইওয়ানের অগ্রাধিকার হলো প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি নেতৃত্ব ধরে রাখা। এআইয়ের চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনসক্ষমতার চাহিদাও বাড়ছে; তাই পানি পুনর্ব্যবহার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা কৌশলগত প্রয়োজন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত নোড দেশে ধরে রাখতে নিয়মিত বিনিয়োগ সহায়তা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি দরকার। মূল নেতৃত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে কিছু প্যাকেজিং ও পুরোনো প্রজন্মের প্রযুক্তিগত নোডের কাজ মিত্রদেশগুলোতে ছড়িয়ে দিলে কেন্দ্রীভবনের ঝুঁকি কমতে পারে। আর্থিক স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে প্রভাব ফেলা মুদ্রার ওঠানামা এবং সিনচু ও তাইপেতে আবাসনের সাশ্রয়যোগ্যতা সামলানো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে সরবরাহশৃঙ্খল অংশীদারত্বে অংশ নেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির পরিমিত সম্প্রসারণ সেমিকন্ডাক্টরের বাইরের যেসব খাত শুধু দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে, সেগুলোর সহায়ক হতে পারে।
সারকথা
- ২০২৫ সালে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫.১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ০.৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
- আগস্টে মাসিক হিসাবে তাইওয়ানের রপ্তানি দক্ষিণ কোরিয়াকে ছাড়িয়ে প্রায় ৫৮৫০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
- প্রায় ২২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাইওয়ানের মাথাপিছু জিডিপি দক্ষিণ কোরিয়াকে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- তাইওয়ানের জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১০ শতাংশ সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে আসে; এআই প্রবণতার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবেও এই পার্থক্য ভূমিকা রাখে।
- তাইওয়ানের রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চিপ।
- যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি ও ইস্পাত খাতে চাপ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে অনেক চিপপণ্য কঠোরতম শুল্কের আওতার বাইরে রয়েছে।
- অত্যাধুনিক লজিক চিপ ও প্যাকেজিংয়ে তাইওয়ান এবং মেমোরিতে দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে; দুই দেশকেই বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
- তাইওয়ানের বাইরে উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানোর বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, তবে নিকট ভবিষ্যতে অত্যাধুনিক চিপের জন্য দ্বীপটিই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে থাকবে।






