যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিকস বর্জ্যের আড়ালে থাকা সুনামি
জাতীয় নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল অবকাঠামো সত্ত্বেও ফেলে দেওয়া মার্কিন ইলেকট্রনিকসের চালান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঢুকছে অবিরাম। বিষাক্ত বর্জ্যের বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক সংস্থা বাসেল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের নতুন এক অনুসন্ধানে প্রতি মাসে কার্গো কনটেইনারে করে বর্জ্যের এক আড়াল থাকা সুনামি চলাচলের চিত্র উঠে এসেছে। ফোন, ল্যাপটপ, সার্ভার, পর্দা ও প্রিন্টারে পুনরুদ্ধারযোগ্য তামা, সোনা ও বিরল উপাদান রয়েছে। তবে এগুলোর সঙ্গে থাকে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও ব্রোমিনযুক্ত অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক, যা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত করলে মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সূচিপত্র
- যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিকস বর্জ্যের আড়ালে থাকা সুনামি
- যেভাবে চলে এই বাণিজ্য, আর কেন তা অব্যাহত
- মধ্যস্থতাকারী, আইনি ফাঁক ও ভুলভাবে চিহ্নিত কার্গো
- সনদ নিয়ে বিতর্ক
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর পড়ছে খরচের বোঝা
- অনানুষ্ঠানিক স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে কী ঘটে
- শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি
- চীনের বর্জ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞা থেকে আঞ্চলিক ঢল
- এই রপ্তানি কি বৈধ
- অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বর্জ্য উপনিবেশবাদ নিয়ে বিতর্ক
- সম্ভাব্য সমাধান ও নজরে রাখার বিষয়
- ভোক্তা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পছন্দ
- আঞ্চলিক আইন প্রয়োগ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা
- জেনে রাখুন
বিশ্বে ই-বর্জ্যের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহারের হারের চেয়ে অনেক দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালে বিশ্বে রেকর্ড ৬ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালে তা প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছাবে। বিশ্বে উৎপাদিত ই-বর্জ্যের প্রায় অর্ধেকই এশিয়ায় তৈরি হয়। মার্কিন রপ্তানি সেই বোঝা আরও বাড়াচ্ছে। প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে প্রায় ২,০০০ কনটেইনার, অর্থাৎ প্রায় ৩৩,০০০ মেট্রিক টন ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকস বেরিয়ে যায়। এর বড় অংশই লাইসেন্সপ্রাপ্ত কেন্দ্রে যায় না। সেগুলো ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয় অথবা শহরের পেছনের অলিগলির খোলা ইয়ার্ডে খুলে যন্ত্রাংশ বের করা হয়, যেখানে শ্রমিকেরা সুরক্ষা ছাড়াই ধোঁয়া ও অ্যাসিডের বাষ্পে শ্বাস নেন।
তদন্তকারীরা এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকস সংগ্রহ, বেচাকেনা বা সরবরাহের মধ্যস্থতা করে—এমন অন্তত ১০টি মার্কিন কোম্পানির খোঁজ পেয়েছেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব রপ্তানিকারক সম্ভাব্য ই-বর্জ্যের ১০,০০০টির বেশি কনটেইনার পাঠিয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি। এ খাতের মাসিক বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভবত ২০ কোটি ডলারেরও বেশি। ১০টি কোম্পানির মধ্যে আটটির রয়েছে R2V3 সনদ, যা দায়িত্বশীল পুনর্ব্যবহারের অঙ্গীকার বোঝানোর জন্য দেওয়া হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা নিয়ম মেনে চলে। তবু এসব কনটেইনার এমন দেশগুলোতে আসছে, যেখানে এ ধরনের আমদানি নিষিদ্ধ।
যেভাবে চলে এই বাণিজ্য, আর কেন তা অব্যাহত
দেশের ভেতরে দায়িত্বশীলভাবে প্রক্রিয়াজাত করার চেয়ে বর্জ্য রপ্তানি করা সস্তা। মিশ্র ইলেকট্রনিকসের কনটেইনার দ্রুত নগদ অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা যায়, আর আমদানিকারক দেশগুলোতে শ্রম, জমি ও নিয়ম মানার খরচ কম। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই চালানগুলোকে মেরামত করে আবার ব্যবহারের জন্য পাঠানো যন্ত্রপাতি হিসেবে দেখান। বাস্তবে এসব চালানে নানা ধরনের জিনিস থাকে। কিছু যন্ত্র চালু হয়, অনেকগুলোই নষ্ট বা অচল। আমদানিকারকেরা মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও উপাদান বের করে নেন, তারপর বাকিগুলো ফেলে দেন। পুনর্বিক্রয় থেকে আয় আর বর্জ্য ফেলার খরচের ব্যবধানই এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারী, আইনি ফাঁক ও ভুলভাবে চিহ্নিত কার্গো
বিশেষায়িত মধ্যস্থতাকারীরা পুরোনো যন্ত্রপাতির ট্রাকভর্তি চালান একত্র করে কনটেইনারে তোলেন এবং বাণিজ্য কোড দেন, যা সব সময় ভেতরের পণ্যের সঙ্গে মেলে না। নথিতে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের বদলে ‘পণ্যসামগ্রী’ বা ‘মিশ্র ধাতব স্ক্র্যাপ’-এর মতো বিবরণ দেওয়ার নজির রয়েছে। ভুল লেবেল লাগালে কাস্টমস ও স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি যাচাই এড়িয়ে চালান পার করে দেওয়া সহজ হয়। ট্রানজিট হাব ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ঘুরে পাঠালে চালান শনাক্ত করা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিপজ্জনক বর্জ্যের আন্তর্জাতিক চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী বৈশ্বিক চুক্তি বাসেল কনভেনশন বিষাক্ত স্ক্র্যাপের অনেক ধরনের বাণিজ্য সীমিত বা নিষিদ্ধ করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ এ কনভেনশনের পক্ষভুক্ত এবং বিদেশি ই-বর্জ্য আমদানিতে জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি অনুমোদন করেনি। নথিপত্রের দুর্বলতা ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির সঙ্গে এই ব্যবধান মিলেই রপ্তানিকারকদের এমন গন্তব্যে কার্গো পাঠানোর সুযোগ করে দেয়, যেখানে তা নিষিদ্ধ।
সনদ নিয়ে বিতর্ক
R2V3 সনদে যন্ত্র পরীক্ষা, তথ্য মুছে ফেলা, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং পরবর্তী পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণের নিয়ম রয়েছে। সনদের উদ্দেশ্য হলো মেরামত-অযোগ্য জিনিসকে রপ্তানির ধারা থেকে দূরে রাখা। নতুন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু সনদ থাকলেই দায়িত্বশীল ফল নিশ্চিত হয় না। সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পক্ষের কাছে পরিবহন ব্যবস্থাপনার কাজ দিলে, অথবা পরবর্তী পর্যায়ের সরবরাহকারীদের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা না হলে ফাঁক তৈরি হয়। দেয়ালে টাঙানো সনদ থেকে বোঝা যায় না, লোডিং ডক ছেড়ে যাওয়ার পর কনটেইনারটি কোথায় যায়।
সমস্যা সমাধানে আরও কঠোর নিরীক্ষা, পরবর্তী পর্যায়ের অংশীদারদের বিষয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদন এবং যন্ত্র ও কনটেইনারের ডিজিটাল ট্র্যাকিং দরকার। সনদ সহায়ক হতে পারে, তবে প্রতিটি চালান শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছায় তা যাচাই করে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পুরো সরবরাহশৃঙ্খল এর আওতায় আনতে হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর পড়ছে খরচের বোঝা
যুক্তরাষ্ট্রের ই-বর্জ্যের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়া। কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত চালান পরীক্ষা করতে পারে, তার চেয়ে দ্রুত গতিতে আমদানি আসছে। এসব কার্গো গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুমতি বা দূষণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি কর্মকর্তারা প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার মূল্যের চালান জব্দ করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, পরিদর্শন করা বেশির ভাগ স্থাপনা অবৈধ এবং সেখানে পরিবেশ সুরক্ষার মৌলিক ব্যবস্থাও ছিল না।
থাইল্যান্ড বন্দর ও গুদামে তল্লাশি বাড়িয়েছে। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কার্গোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৩৮ টন ই-বর্জ্য ব্যাংককের প্রধান বন্দরে জব্দ করে কর্তৃপক্ষ। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কনটেইনার পৌঁছায়। এসব দেশে জাতীয় আইন এ ধরনের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে বা কঠোরভাবে সীমিত করেছে, তবু ভুল ঘোষণা দেওয়া চালান ঢুকে পড়ে। এরপর স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্লাস্টিক ও সার্কিট বোর্ডের স্তূপের মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো নিরাপদে সরিয়ে ফেলার কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়ভাবে তৈরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গড়ে ওঠা ব্যবস্থার ওপর এই চাপ অসহনীয় হয়ে উঠছে। পৌরসভার ভাগাড়ে বিষাক্ত উপাদান জমা হচ্ছে, যা থেকে ধাতু ও দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক মাটি ও পানিতে মিশে যায়। বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কাছে গড়ে উঠছে অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারকেন্দ্র। সেখানকার বাসিন্দারা প্লাস্টিক পোড়ানোর ধোঁয়া, দূষিত নর্দমা এবং পরিচিত ই-বর্জ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে মিলে যায় এমন অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন।
অনানুষ্ঠানিক স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে কী ঘটে
অনানুষ্ঠানিক ইয়ার্ডে শ্রমিকেরা হাতে খোলস খুলে ফেলেন, ক্যাথোড রে টিউবের টেলিভিশন ও মনিটর ভেঙে খোলেন, আর তাপ দিয়ে সার্কিট বোর্ড থেকে চিপ আলাদা করেন। তারের আবরণ ছাড়াতে প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলা হয়। বোর্ড থেকে মূল্যবান ধাতু বের করতে অ্যাসিডে দ্রবীভূত করার পদ্ধতি ও প্রাথমিক মানের গলনপ্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। এসব প্রক্রিয়ায় সিসার ধুলো, ক্যাডমিয়াম ও পারদের বাষ্প ছড়ায়। এ ছাড়া বিপজ্জনক উপজাতের মিশ্রণ তৈরি হয়, যা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জলপথে জমা হয়।
শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধারের স্থানগুলোকে বিভিন্ন ধরনের দূষকের উচ্চ উপস্থিতির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে বিষাক্ত ধাতু, প্লাস্টিকের সংযোজক, ব্রোমিনযুক্ত অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইল, পারফ্লুরোঅ্যালকাইল ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল পদার্থ এবং ডাইঅক্সিন, ফিউরান ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো অবশিষ্টাংশ। খোলস ও তারের আবরণ পোড়ালে বা কুচি করলে মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিক ছড়ায়। স্বল্পমেয়াদি সংস্পর্শে চোখ ও ফুসফুসে জ্বালা হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের সঙ্গে স্নায়বিক ক্ষতি, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা ও ক্যানসারের যোগসূত্র রয়েছে।
দূষণ ইয়ার্ডের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধুলো দূষকের অবশিষ্টাংশ বাড়ি ও স্কুলে নিয়ে যায়। ছাই ও অ্যাসিডযুক্ত বর্জ্য সেচ ও মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত জলধারায় মেশে। গবাদিপশু ও ফসলে ধাতু জমা হতে পারে। এসব স্বাস্থ্যঝুঁকির ভার বেশি পড়ে নথিপত্রহীন শ্রমিক ও আশপাশের পরিবারগুলোর ওপর, যাদের চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত। এই ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব, তবে সে জন্য চালান বন্ধ করতে হবে এবং বায়ু চলাচল, পরিশোধন ও রাসায়নিক নিরাপদে ব্যবহারের ব্যবস্থা আছে—এমন নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রে পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।
চীনের বর্জ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞা থেকে আঞ্চলিক ঢল
বহু বছর ধরে বিশ্বের নিম্নমূল্যের স্ক্র্যাপ ও ব্যবহৃত পণ্যের বড় অংশ চীনে যেত, যেখানে বিশাল পুনর্ব্যবহারকেন্দ্রগুলো সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করত। দূষণ ও জনচাপের কারণে ২০১৭ সালে নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়, যা ২০২১ সালে কঠিন বর্জ্য আমদানিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞায় গিয়ে শেষ হয়। বাণিজ্যটি বন্ধ হয়নি, স্থান বদলেছে। অনেক ব্যবসায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চলে যান। সঙ্গে নিয়ে যান যন্ত্রপাতি, পুঁজি ও দক্ষতা, কিন্তু চীন যে দূষণ সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে শুরু করেছিল, তা নিয়ে যাননি।
আঞ্চলিক তথ্য দেখায়, চীনের নীতি পরিবর্তনের পর বর্জ্য আমদানি বেড়ে যায়। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি দ্রুত বেড়েছিল। ইলেকট্রনিকস স্ক্র্যাপের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নতুন চালান ও নতুন ব্যবসায়ীদের সামাল দিতে হিমশিম খায়। সীমান্তজুড়ে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ভেতরে লাইসেন্স ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির সুযোগ নেয় রপ্তানিকারকেরা।
এই রপ্তানি কি বৈধ
বাসেল কনভেনশনের আওতায় বিপজ্জনক বর্জ্য পরিবহনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু দেশের গোষ্ঠীর মধ্যে এ বর্জ্য বাণিজ্য নিষিদ্ধ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ চুক্তিটি অনুমোদন করেছে এবং জাতীয় আইনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটির পক্ষভুক্ত নয়। বাণিজ্য নথিতে চিহ্নিত অনেক কার্গো ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকসের সঙ্গে মেলে না—এমন কোডে ঘোষণা করা হয়েছিল। ভুলভাবে পণ্যের পরিচয় দেওয়া হলে আগাম সম্মতির প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আসল বিষয়বস্তু গোপন থাকে এবং আমদানিকারক দেশের আইন লঙ্ঘিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মে পরীক্ষিত ও সচল যন্ত্রপাতি এবং কিছু নির্দিষ্ট উপাদান রপ্তানির অনুমতি রয়েছে। ব্যবহৃত পণ্য ও বর্জ্যের চালানের মধ্যকার সীমা সহজেই অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিছু মেরামতযোগ্য যন্ত্রের সঙ্গে নষ্ট বা অচল যন্ত্রও প্যাক করা হয়। কাগজপত্রে পুরো চালানকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখানো হয়। কনটেইনার খোলার সময় সেটি উৎসবন্দর থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। প্রতি মাসে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ চালান থেকে যে মুনাফা হয়, তার তুলনায় শাস্তি সামান্য।
অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও বর্জ্য উপনিবেশবাদ নিয়ে বিতর্ক
এই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার হিসাব সহজ। ক্যাথোড রে টিউবের কাচ, ফ্ল্যাট প্যানেলের পারদযুক্ত ব্যাকলাইট এবং মিশ্র প্লাস্টিক সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে খরচ হয়। ফেরতপথে কনটেইনার পাঠানোর খরচ তুলনামূলক কম। তামা ও সোনার দাম অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষণীয়। আমদানিকারক দেশগুলোতে শ্রম ও ভাড়ার খরচও কম। রপ্তানিকারকেরা করপোরেট গ্রাহকদের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি সরানোর জন্য ফি নেন, পরে বিদেশে কনটেইনারভর্তি চালান বিক্রি করেও আয় করেন। যারা বর্জ্য তৈরি করেনি, দূষণের খরচ চাপানো হয় সেই জনগোষ্ঠীর ওপর।
পরিবেশবাদীরা এই প্রবণতাকে ‘বর্জ্য উপনিবেশবাদ’ বলেন। আশির দশকের শেষ দিকে ধনী দেশ থেকে দরিদ্র দেশে বর্জ্য ফেলে দেওয়ার বর্ণনায় শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। পুরোনো বাণিজ্য সম্পর্কের আদলেই ঝুঁকি ও ক্ষতি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এ শব্দে উঠে আসে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নীতিনির্ধারকেরা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। থাইল্যান্ড প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি বন্ধ করেছে, ইন্দোনেশিয়া নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে এবং মালয়েশিয়া নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। ২০২৬ সাল থেকে ওইসিডিভুক্ত নয়—এমন দেশগুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানিতে নতুন সীমা অনুমোদন করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রচারকর্মীরা ই-বর্জ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করে আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক চুক্তির দাবি জানাচ্ছেন।
কিছু শিল্পগোষ্ঠীর যুক্তি, আমদানি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল জোগায়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্ন কাঁচামাল দিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণে কাজ করলে তা সত্যি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, যখন কাগজপত্রহীন নষ্ট যন্ত্র ট্রাকভর্তি হয়ে আসে এবং অবশিষ্টাংশ নিরাপদে সরিয়ে ফেলার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। তখন অবৈধভাবে পোড়ানো ও ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ হয়। স্বাস্থ্যঝুঁকির খরচ বহন করতে হয় করদাতাদের, আর মুনাফা চলে যায় অন্য কোথাও।
সম্ভাব্য সমাধান ও নজরে রাখার বিষয়
বর্জ্যের প্রবাহ ও ক্ষতি কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাসেল কনভেনশন অনুমোদন করতে পারে, রপ্তানির আইনি ফাঁক বন্ধ করতে পারে এবং পরবর্তী পর্যায়ের অংশীদারদের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কনটেইনারের ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ভুলভাবে পণ্যের পরিচয় দেওয়ার জন্য কঠোর শাস্তি এবং প্রতিটি চালান কোথায় পৌঁছায় তা যাচাই করে এমন স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে পারে। বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতার নিয়মে ব্র্যান্ডগুলোকে পণ্য ফেরত নেওয়া ও নিরাপদে পুনর্ব্যবহারের খরচ বহন করতে বলা যেতে পারে। কোনো যন্ত্র পুনর্ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করার পর যাতে বন্দরে গিয়ে না ঠেকে, তা নিশ্চিত করতে ফেডারেল সংস্থা ও অঙ্গরাজ্যগুলো নীতিমালা সমন্বয় করতে পারে।
ভোক্তা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পছন্দ
মেরামত ও যন্ত্রাংশের সহায়তা দীর্ঘদিন চালু রাখলে সরঞ্জামের আয়ু বাড়ে এবং বর্জ্য হওয়া পিছিয়ে যায়। মেরামতের অধিকারবিষয়ক আইন, করপোরেট পণ্য ফেরত নেওয়ার কর্মসূচি এবং বর্জ্য হিসেবে রপ্তানি নিষিদ্ধ করে এমন ক্রয়চুক্তি সহায়ক হতে পারে। কোম্পানিগুলো যাচাইযোগ্য সরবরাহশৃঙ্খল নিশ্চিত করতে এবং নিরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে পারে। পরিবার ও স্কুলের উচিত এমন পুনর্ব্যবহারকারী বেছে নেওয়া, যারা মেরামত-অযোগ্য যন্ত্র বিদেশে বাণিজ্যে না পাঠানোর অঙ্গীকার করে এবং তাদের পরবর্তী পর্যায়ের অংশীদার কারা, তা জানাতে পারে।
আঞ্চলিক আইন প্রয়োগ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলো অবৈধ চালান শনাক্ত ও প্রত্যাখ্যান করার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বন্দরে কঠোর পরিদর্শন, আন্তসীমান্ত সহযোগিতা ও জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ চোরাচালানকারীদের নিরুৎসাহিত করে। যেখানে অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার ইতিমধ্যে চলছে, সেখানে স্বাস্থ্য সুরক্ষা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষার সরঞ্জাম, গ্লাভস, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, অ্যাসিড নিষ্ক্রিয়করণ এবং বিপজ্জনক অবশিষ্টাংশ রাখার জন্য আস্তরণযুক্ত সংরক্ষণাগার। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় এনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কেন্দ্রে পাঠালে জীবিকা বজায় রেখেই দূষণ কমানো সম্ভব।
জেনে রাখুন
- প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকসের প্রায় ২,০০০ কনটেইনার, অর্থাৎ প্রায় ৩৩,০০০ মেট্রিক টন বেরিয়ে যায়।
- দুই বছরব্যাপী এক তদন্তে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা অন্তত ১০টি মার্কিন কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে।
- ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ১০,০০০টির বেশি কনটেইনার পাঠিয়েছে, যার মূল্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
- ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকসের পুরো শিল্পখাতের বাণিজ্যের পরিমাণ মাসে আনুমানিক ২০ কোটি ডলার।
- চিহ্নিত ১০ রপ্তানিকারকের মধ্যে আটটির R2V3 সনদ রয়েছে, যা নিরীক্ষার ঘাটতি ও পরবর্তী পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
- মালয়েশিয়া প্রধান গন্তব্যগুলোর একটি। দেশটি প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার মূল্যের ই-বর্জ্য জব্দ করেছে, আর থাই কর্তৃপক্ষ মে মাসে ২৩৮ টন বর্জ্য জব্দ করেছে।
- যুক্তরাষ্ট্র বাসেল কনভেনশন অনুমোদন করেনি। অনেক চালানের ভুল ঘোষণা দেওয়া হয় এবং তা আমদানিকারক দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে।
- ই-বর্জ্যে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও অন্যান্য বিপজ্জনক রাসায়নিক থাকে। অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে ডাইঅক্সিন, ফিউরান এবং মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিক ছড়ায়।
- চীন কঠিন বর্জ্য আমদানি বন্ধ করার পর চালান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরে যায়, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ায়।
- সমাধানের মধ্যে রয়েছে রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা, মেরামতবান্ধব নকশা, স্বচ্ছ সনদ ব্যবস্থা এবং অঞ্চলজুড়ে নিরাপদ পুনর্ব্যবহারে সহায়তা।






