প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অপহরণে থাইল্যান্ডের পর্যটন নিয়ে উদ্বেগ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে দক্ষিণ কোরীয়দের অপহরণের ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এ সংখ্যা স্পষ্টভাবে বেড়েছে, যা ভ্রমণকারী ও দেশে থাকা তাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরীয়দের কাছে থাইল্যান্ড এখনো জনপ্রিয় গন্তব্য; প্রতি সপ্তাহে ছুটি কাটাতে ও ব্যবসার কাজে সেখানে যান হাজারো মানুষ। অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধি দেখিয়ে দিচ্ছে, অনলাইন জালিয়াতি ও কল সেন্টার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত অনেক অপরাধী চক্র এখন মূলধারার পর্যটন ও অভিবাসী শ্রমিকদের চলাচলের পথের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
সূচিপত্র
- প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অপহরণে থাইল্যান্ডের পর্যটন নিয়ে উদ্বেগ
- তথ্যে যা দেখা যাচ্ছে
- যেভাবে অপহরণ ঘটে
- প্রলোভন ও প্রতারণা
- ফাঁদে পড়ার পর
- জনমনে আলোড়ন তোলা ঘটনা
- থাইল্যান্ড এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
- আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও কূটনীতি
- ভ্রমণকারী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য নিরাপত্তা পরামর্শ
- নিয়োগ জালিয়াতির সতর্কসংকেত
- ভুক্তভোগীরাও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন
- আঞ্চলিক তুলনা থেকে প্রেক্ষাপট
- মূল বিষয়গুলো
প্রধান বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির আইনপ্রণেতা কিম গনের কাছে জমা দেওয়া মন্ত্রণালয়ের তথ্যে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়: ২০২১ সালে কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি, ২০২২ সালে একটি এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পাঁচটি করে ঘটনা ঘটেছে। কোনো একজন পর্যটকের অপহৃত হওয়ার আশঙ্কা এখনো কম হলেও, যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো ক্রমেই এমন সংগঠিত গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যারা প্রতারণা, জবরদস্তি ও সীমান্ত পেরিয়ে চলাচলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের নিয়োগ বা ফাঁদে ফেলে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বৃহত্তর পরিবর্তনের সঙ্গেও এ প্রবণতা মিলে যায়: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপের পর সাইবার জালিয়াতি চক্রগুলো তাদের কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে আবার গড়ে তুলছে।
তথ্যে যা দেখা যাচ্ছে
থাইল্যান্ডে ঘটনার সংখ্যা বৃহত্তর আঞ্চলিক চিত্রের একটি অংশ। থাই সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ১৮ লাখ ৬০ হাজার দক্ষিণ কোরীয় থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই কোনো সহিংস অপরাধের শিকার হননি। তবে আন্তদেশীয় প্রতারণামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি কোরীয় ভুক্তভোগী বা অপরাধীদের জড়িত অপহরণের অভিযোগ ও অপরাধের ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডে ৩৪ বছর বয়সী এক কোরীয় পর্যটককে স্বদেশিরা হত্যা করে; পরে তিনটি দেশে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র থাকায় জনমনে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
প্রতিবেশী কম্বোডিয়ায় এ বছর ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত সেখানে ২৫২ জন দক্ষিণ কোরীয়কে অপহরণ ও আটকে রাখা হয়েছে; ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৭ এবং ২০২৪ সালে ২২০। এ বছরের প্রথম আট মাসে কম্বোডিয়ায় ৩৩০ জন দক্ষিণ কোরীয়কে আটক রাখার খবর পাওয়া গেছে, যাদের বেশির ভাগের ঘটনাই নিষ্পত্তি হয়েছে। কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, মেকং অঞ্চলের অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রগুলো জোরপূর্বক শ্রম ও মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত। প্রায়ই বিদেশি কর্মীদের বিভ্রান্তিকর চাকরির প্রস্তাব দিয়ে সেখানে টেনে নেওয়া হয়, তারপর হুমকি দিয়ে আটকে রাখা হয়।
যেভাবে অপহরণ ঘটে
থাইল্যান্ডের তদন্তে তিনটি পুনরাবৃত্ত ধরন দেখা গেছে। কিছু ভুক্তভোগীকে সরাসরি মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়। অন্যদের চাকরির প্রস্তাবে সাড়া দেওয়ার পর অপহরণ করা হয়, যেগুলো আসলে প্রতারণামূলক কার্যক্রমের আড়াল। তৃতীয় একটি দল অপরাধী চক্রে আগে থেকেই যুক্ত স্বদেশিদের জবরদস্তির শিকার হয়; পরে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে তাদের বেআইনি কাজে বাধ্য করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সীমান্ত পেরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং হুমকি বা সহিংসতার ঘটনা থাকতে পারে, ফলে বাইরের সহায়তা ছাড়া পালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রলোভন ও প্রতারণা
প্রতারণা চক্রের নিয়োগকারীরা প্রায়ই দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের লক্ষ্য করে। সাধারণত তাদের বয়স ২০ বা ৩০-এর কোঠায়, তারা কোরীয় ভাষায় সাবলীল এবং মেসেজিং অ্যাপ ও ফোনে যোগাযোগে স্বচ্ছন্দ। চক্রের ভেতরের লোকদের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, এসব গোষ্ঠী আকর্ষণীয় সাপ্তাহিক বেতনের প্রলোভন দেখায়; কখনো কখনো ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ওনের বেতনের কথা বলে। দেখতে সাধারণ অফিসের মতো জায়গায় সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়ারও দাবি করে তারা। এসব কার্যক্রমকে কয়েক স্তরের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের কর্মীরা লক্ষ্য খোঁজে, মধ্যম স্তরের কর্মীরা আস্থা তৈরি করে ভুক্তভোগীদের ভুয়া বিনিয়োগের দিকে নিয়ে যায়, আর জ্যেষ্ঠ সদস্যরা অর্থের লেনদেন ও অর্থপাচার সামলায়।
থাইল্যান্ডে স্থানান্তরিত হওয়া চক্রগুলো আবেদনকারীদের কঠোরভাবে যাচাই করে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু চক্র সম্প্রতি মিয়ানমার, লাওস বা কম্বোডিয়া ভ্রমণ করেছেন এমন কাউকে নিয়োগ দেয় না; তাদের ধারণা, এমন ভ্রমণ থাই কর্তৃপক্ষের বাড়তি নজর কাড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ কঠোর নিয়মের কথা বলা হয়েছে, যেমন পুলিশের নজর এড়াতে কর্মদিবসে মদ্যপান ও মাদক সেবনে নিষেধাজ্ঞা। আবেদনকারীদের পাসপোর্টের কপি, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথি এবং অপরাধের ইতিহাসসংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। একবার এই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হলে, নিয়োগপ্রাপ্তরা পরে পালাতে বা অপরাধের কথা জানাতে চাইলে তাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে তা ব্যবহার করা হতে পারে।
ফাঁদে পড়ার পর
প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য হওয়া ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখা হয় এবং নির্ধারিত কাজের পরিমাণ পূরণে অস্বীকৃতি জানালে সহিংসতা বা ঋণের হুমকি দেওয়া হয়। থাইল্যান্ডে পুলিশের অভিযানে সাদা বোর্ডে কোরীয় ভাষায় লেখা ভুয়া বিনিয়োগ, প্রেমের ফাঁদে প্রতারণা ও অন্যান্য কৌশলের প্রচারবার্তা পাওয়া গেছে। জুনে চনবুরির ব্যাং লামুং জেলায় এক অভিযানে কর্মকর্তারা কল সেন্টারের জন্য সাজানো সরঞ্জাম উদ্ধার করেন এবং অপহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর কাজে বাধ্য করা এক দক্ষিণ কোরীয়কে উদ্ধার করেন। তাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং পরে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা জানান, জব্দ করা জিনিসপত্র অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।
এসব গোষ্ঠীর ভেতরের নিয়মকানুন কঠোর। সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান না করতে এবং আড়ালে থাকতে বলা হয়। যারা প্রতিরোধ করে, তাদের মারধরসহ নানা হুমকি দেওয়া হয়; অন্যদের বলা হয়, বাসস্থান ও প্রশিক্ষণের খরচ বাবদ তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা দেনা হয়েছে। বিচ্ছিন্নতা, নজরদারি ও ভয়ের সম্মিলিত প্রভাবে অনেকে বাধ্য হয়ে নির্দেশ মেনে চলে, যতক্ষণ না পুলিশের অভিযান বা বাইরের হস্তক্ষেপে পালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
জনমনে আলোড়ন তোলা ঘটনা
দুটি ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল এবং এসব চক্র কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডে ৩৪ বছর বয়সী এক দক্ষিণ কোরীয় পর্যটককে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়; তারা সবাই দক্ষিণ কোরীয়। স্থানীয় পুলিশের চোখ এড়াতে অপরাধীরা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে চলাচল করে, এ ঘটনা তা দেখিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কোরীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।
২০২৫ সালের জুনে দক্ষিণ কোরীয় দূতাবাসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে থাই পুলিশ চনবুরির একটি বিলাসবহুল পুল ভিলায় অভিযান চালায়। কর্মকর্তারা ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেন, যাদের মধ্যে ২০ জন দক্ষিণ কোরীয় ও একজন চীনা নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া, অপহরণের পর কল সেন্টারভিত্তিক প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা এক কোরীয়কে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলটি পুরো অঞ্চলে দেখা যাওয়া একটি পরিচিত চিত্রের সঙ্গে মিলে যায়: বাইরে থেকে বন্ধ কর্মস্থল, সারি সারি কম্পিউটার এবং ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য আগে থেকে লেখা কথোপকথনের স্ক্রিপ্ট। কয়েকজন সন্দেহভাজন পালানোর চেষ্টা করেন; দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে একজন আহত হন। পুলিশ দলটিকে তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেয় এবং কর্মকর্তারা ভুক্তভোগীর পরিবারকে জানান যে তিনি নিরাপদে আছেন।
গ্রীষ্মকাল ও শরতের শুরুতেও পরবর্তী পদক্ষেপ চলতে থাকে। সেপ্টেম্বরে চনবুরি থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দক্ষিণ কোরীয় সন্দেহভাজনদের দেশে বিচারের মুখোমুখি করতে তাদের প্রত্যর্পণ সম্পন্ন করে থাই কর্তৃপক্ষ। এ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে একাধিক অভিযানের ধারাবাহিকতা শেষ হয়; এসব অভিযানে পুলিশ ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন জব্দ করে এবং সন্দেহভাজনদের ভিসা বাতিল করে। দক্ষিণ কোরীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা ও থাই অভিবাসন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযানগুলো চালানো হয়। এতে গভীরতর সহযোগিতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নতুন ঘাঁটি খুঁজে পাওয়া গেলে আবারও দেখা যেতে পারে।
কম্বোডিয়ার ঘটনাগুলো কোরীয় পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী পার্ক মিন হোর মরদেহ আগস্টে কম্বোডিয়ার কাম্পোত প্রদেশে পাওয়া যায়। কম্বোডীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, মুক্তিপণ দাবি করা একটি অপরাধী চক্রের নির্যাতন ও মারধরের পর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। কম্বোডিয়ার কয়েকটি স্থানে, যার মধ্যে বোকর পর্বত, বাভেট ও পোইপেট রয়েছে, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দক্ষিণ কোরিয়া। এ ঘটনা প্রতারণা চক্রের আস্তানায় আটকে পড়া নাগরিকদের দেশে ফেরানো ও সুরক্ষা দেওয়া নিয়ে সিউল ও নমপেনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সূত্রপাত করে।
থাইল্যান্ড এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
কম্বোডিয়ায় দমন-পীড়নের কারণে কয়েকটি প্রতারণা চক্র নতুন ঘাঁটি খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এসব চক্রের মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকদের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, আগে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে পরিচালিত কার্যক্রমের কিছু অংশ এখন থাইল্যান্ডে ঘাঁটি গেড়েছে। থাইল্যান্ডের অবকাঠামো, পর্যটন এলাকায় প্রচুর আবাসন এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যোগাযোগব্যবস্থা অপরাধীদের কাছে দেশটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে; তারা গোপনীয়তা ও দ্রুত পালানোর পথকে গুরুত্ব দেয়। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের ভিড়ে প্রতারকদের মিশে যাওয়া, সম্পত্তি ভাড়া নেওয়া এবং কম নজরে অর্থ ও সরঞ্জাম সরানোও সহজ হয়।
থাই কর্তৃপক্ষ অভিবাসন যাচাই জোরদার করেছে এবং পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বাড়িয়েছে। অপরাধীরা এর জবাবে কৌশল বদলেছে। নজর এড়াতে নিয়োগকারীরা নিজেদের যাচাইপ্রক্রিয়া চালু করেছে এবং পুলিশের আগ্রহের খবর ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত স্থান বদলায় তারা। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এসব চক্রকে ধরাটা কঠিন হয়ে পড়েছে: এক প্রদেশে আস্তানা গড়ে কিছুদিন নীরব থাকার পর অন্য কোথাও আবার কার্যক্রম শুরু করে তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও কূটনীতি
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত পেরিয়ে সহযোগিতা বাড়ছে। চনবুরির অভিযানে দূতাবাসের দেওয়া তথ্য কাজে লেগেছিল এবং থাই পর্যটন পুলিশ তল্লাশি চালানো ও সরঞ্জাম জব্দ করতে অভিবাসন বিভাগ ও স্থানীয় ইউনিটগুলোর সঙ্গে কাজ করে। সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণ দেখায়, এখন একাধিক বিচারব্যবস্থার আওতায় মামলা এগোচ্ছে, যাতে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত স্থানে বিচার করা যায়। নমপেনসহ অন্যান্য শহরে একাধিক আলোচিত উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের পর দক্ষিণ কোরীয় তদন্তকারীরাও কম্বোডীয় প্রতিপক্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
প্রধান বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির সদস্য আইনপ্রণেতা কিম গন সিউলকে কূটনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজ বোর্ড থেকে শুরু হওয়া নিয়োগের পথগুলোর দিকে আরও বেশি নজর দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের অপরাধী চক্রে নিয়ে যায় এমন প্রতারণামূলক চাকরির বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে।
"আমাদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে সরকারকে শুধু কম্বোডিয়া নয়, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে," বলেন কিম। তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের এ অঞ্চলে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যায় এমন বেআইনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত।
কর্মকর্তাদের ধারণা, কম্বোডিয়ার অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ করেন, যাদের মধ্যে দক্ষিণ কোরীয় প্রায় ১ হাজার। কম্বোডীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গত দুই বছরে অনলাইন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্তত ১৫ হাজার বিদেশিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক সাইবার প্রতারণা চক্রগুলো বছরে কয়েক শ কোটি ডলার মুনাফা করে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের মামলাগুলো, যার মধ্যে কয়েক শ কোটি ডলারের বিটকয়েন জব্দ এবং নমপেনের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে, এসব আর্থিক লেনদেনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও কম্বোডিয়া নাগরিকদের দেশে ফেরানো এবং সাইবার অপরাধ দমনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রতারণায় জড়িত থাকার সন্দেহে কম্বোডিয়ায় গ্রেপ্তার কয়েক ডজন নাগরিককে দ্রুত দেশে ফেরানোর চেষ্টাও করছে দক্ষিণ কোরিয়া, যাতে জবরদস্তির শিকার ও অপরাধে জড়িতদের আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। এ বছর কয়েকটি মামলায় প্রত্যর্পণের সমন্বয় করেছে থাই ও দক্ষিণ কোরীয় কর্মকর্তারা। দক্ষিণ কোরীয়, চীনা ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের নিয়ে মিশ্র দল গঠন করে অপরাধী চক্রগুলো যখন কার্যক্রম চালায় ও অর্থ সরায়, তখন এ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভ্রমণকারী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য নিরাপত্তা পরামর্শ
থাইল্যান্ড এখনো জনপ্রিয় এবং সাধারণভাবে নিরাপদ গন্তব্য; অধিকাংশ ভ্রমণ নির্বিঘ্নে শেষ হয়। রাতের বিনোদন ও যাতায়াতের সময় সতর্ক থাকা, নিবন্ধিত ট্যাক্সি বা পরিবহনসেবা ব্যবহার করা এবং কোথায় যাচ্ছেন তা বন্ধুদের জানিয়ে রাখলে ভ্রমণকারীরা ঝুঁকি কমাতে পারেন। পরিবারের উচিত প্রতিদিন খোঁজ নেওয়ার পরিকল্পনা করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দূতাবাসের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, তা জেনে রাখা। কোনো সঙ্গী উচ্চ বেতনের চাকরির আগ্রহের কথা জানানোর পর হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলে, সেটিকে বিপদের সংকেত হিসেবে ধরে কর্তৃপক্ষকে ফোন করুন।
অপহরণের অনেক ঘটনার শুরু হয় বৈধ বলে মনে হওয়া চাকরির প্রস্তাব থেকে। নিয়োগকারীরা উদার সাপ্তাহিক বেতনের প্রলোভন দেখায় এবং বিপণন বা অর্থায়ন খাতে চাকরি দেওয়ার দাবি করে। তারা নথিপত্র চায়, কখনো কখনো ভ্রমণ বা আবাসনের অগ্রিম খরচও দাবি করে। চাকরিপ্রার্থী থেকে বন্দি হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে পাসপোর্ট তুলে দেওয়ার বা চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাড়িতে ওঠার পরপরই।
নিয়োগ জালিয়াতির সতর্কসংকেত
- অভিজ্ঞতা ছাড়াই অস্বাভাবিক বেশি সাপ্তাহিক বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হঠাৎ আসা চাকরির প্রস্তাব
- আনুষ্ঠানিক চুক্তির আগেই পাসপোর্টের কপি, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথি ও অতীত যাচাইয়ের তথ্য চাওয়া
- কোম্পানি সম্পর্কে অস্পষ্ট তথ্য, বারবার অফিসের ঠিকানা বদল এবং অল্প সময়ের নোটিশে ভ্রমণের চাপ
- শুধু এনক্রিপ্ট করা অ্যাপ ব্যবহার করার জেদ এবং ভিডিও সাক্ষাৎকার বা জনসমাগমস্থলে সরাসরি সাক্ষাতে অস্বীকৃতি
- প্রশিক্ষণ, আবাসন বা কাজের অনুমতিপত্রের জন্য অগ্রিম অর্থ বা ফি দাবি
কেউ তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে থাকলে স্থানীয় পুলিশ ও দক্ষিণ কোরীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রতিবেশী, হোটেলকর্মী ও পর্যটন সংস্থার কর্মীরাও দ্রুত ফোন করতে এবং অবস্থানের তথ্য জানাতে সহায়তা করতে পারেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে কাউকে আরও সুরক্ষিত কোনো আস্তানায় সরিয়ে নেওয়া ঠেকানো সম্ভব, যেখানে তাকে উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীরাও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন
প্রতারণাকেন্দ্রের কঠিন বাস্তবতাগুলোর একটি হলো, ভুক্তভোগীদের কখনো কখনো জালিয়াতি ও অর্থপাচারসহ অপরাধ করতে বাধ্য করা হয়। পুলিশ অভিযান চালালে তদন্তকারীরা কার কী ভূমিকা ছিল তা নির্ধারণ না করা পর্যন্ত সেখানে থাকা ব্যক্তিদের সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। সাম্প্রতিক মামলায় থাইল্যান্ড থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণ দেখায়, কর্তৃপক্ষ অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিরা সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা চাইতে পারেন, তবে প্রক্রিয়াটি জটিল ও দীর্ঘ হতে পারে। কোনো কিছু ভুল মনে হলে প্রতিরোধ ও দ্রুত অভিযোগ জানানোই এখনো সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
আঞ্চলিক তুলনা থেকে প্রেক্ষাপট
ফিলিপাইনে দক্ষিণ কোরীয়দের অপহরণ এবং সম্প্রতি একজনকে উদ্ধার করার পর তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকার ঘটনা দেখায়, হুমকিটি কোনো এক দেশে সীমাবদ্ধ নয়। ওই ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ওই ব্যক্তি নিরাপদে আছেন এবং সহায়তা পাচ্ছেন।
"শুক্রবার ফিলিপাইনে অপহৃত এক কোরীয় নাগরিককে দেশটির পুলিশ নিরাপদে উদ্ধার করেছে এবং আমাদের নাগরিকের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল," বলেন ওই কর্মকর্তা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ভ্রমণের ধরন অপরাধী চক্রগুলোর জন্য ভুক্তভোগীদের সীমান্ত পেরিয়ে সরিয়ে নেওয়া সহজ করে এবং অনুসন্ধান জটিল করে তোলে। এ বাস্তবতা যৌথ নজরদারি তালিকা, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং থাই, কম্বোডীয়, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ কোরীয় সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তা জোরালো করে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া থাইল্যান্ডে নাগরিকদের অপহরণের ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে; ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পাঁচটি করে ঘটনা ছিল।
- কল সেন্টার চক্র ও অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত অপরাধ থাইল্যান্ডে বেড়েছে; এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৩৪ বছর বয়সী এক দক্ষিণ কোরীয় পর্যটককে হত্যার ঘটনাও রয়েছে।
- ২০২৫ সালের জুনে চনবুরিতে থাই পুলিশ ২০ জন দক্ষিণ কোরীয় ও একজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে এবং অপহৃত এক কোরীয়কে উদ্ধার করে।
- থাইল্যান্ড থেকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরীয় একাধিক সন্দেহভাজনকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে পাঠানো হয়েছে; এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রতিফলিত হয়েছে।
- তদন্তকারীরা অনেক অপহরণের সঙ্গে ভুয়া চাকরির প্রস্তাবের যোগসূত্র পেয়েছেন। এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতারণাকেন্দ্রে নেওয়া হয়, যেখানে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং হুমকি দেওয়া হয়।
- কম্বোডিয়ায় দমন-পীড়নের কারণে অপরাধী চক্রগুলো অন্যত্র সরে গেছে; ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় দক্ষিণ কোরীয়দের অপহরণ ও আটকে রাখার ২৫২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
- কর্মকর্তাদের ধারণা, কম্বোডিয়ার অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ করেন; পুরো অঞ্চলে অবৈধ মুনাফার পরিমাণ কয়েক শ কোটি ডলার।
- দক্ষিণ কোরিয়া থাইল্যান্ড ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর এবং তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে দেওয়া প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে ঘনিষ্ঠ নজরদারির আহ্বান জানিয়েছে।
- ভ্রমণকারীদের নিবন্ধিত পরিবহন ব্যবহার, ভ্রমণসূচি অন্যদের জানিয়ে রাখা এবং নথি বা ফি চাওয়া অচেনা চাকরির প্রস্তাব এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনে উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা দেখায়, এটি একটি আঞ্চলিক সমস্যা; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি যৌথ পদক্ষেপ প্রয়োজন।






