বেইজিংয়ে উদ্যাপন, মাঠপর্যায়ে নানা সীমাবদ্ধতা
১৯৯৫ সালের জাতিসংঘের বিশ্ব নারী সম্মেলনের ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বেইজিংয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক বৈঠকে শি জিনপিং নারীদের অগ্রগতির প্রশংসা করেন। মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমা, জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং চীনের বাইরের নারীদের সহায়তায় নতুন তহবিলের কথা তিনি তুলে ধরেন। এই আয়োজনে চীনকে লিঙ্গসমতার অগ্রদূত এবং বেইজিং ঘোষণার উত্তরাধিকারের বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে চীনের অবদানের কথা উল্লেখ করেন এবং সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপকে এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন যে, দেশটির দৃষ্টিভঙ্গিতে সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে রয়েছে নারীরা।
সূচিপত্র
- বেইজিংয়ে উদ্যাপন, মাঠপর্যায়ে নানা সীমাবদ্ধতা
- সম্মেলনে যা তুলে ধরা হয়েছে
- ১৯৯৫ সালের উত্তরাধিকার ও পার্টির নিয়ন্ত্রণ
- চীনের ভেতরে নতুন নিষেধরেখার মুখে সক্রিয়তা
- অনলাইন লড়াই: সেন্সরশিপ, তকমা ও সমন্বিত হয়রানি
- জনমিতিক চাপ ও বিয়ে-সন্তান জন্মদানে উৎসাহ
- কাগজে অগ্রগতি, বাস্তবে ঘাটতি
- স্বাধীনভাবে সংগঠিত হলে কেন উদ্বেগ তৈরি হয়
- সময়ের পরিচায়ক কয়েকটি মামলা
- খাপ খাওয়ানো ও নীরব প্রতিরোধ
- মূল বিষয়গুলো
সম্মেলনস্থলের বাইরে অধিকারকর্মীরা ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলছেন। নাগরিক সমাজের ওপর বৃহত্তর দমন-পীড়ন এবং স্বাধীন সংগঠনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে গত এক দশকে জনপরিসরে নারীবাদী কর্মকাণ্ডের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। যৌন হয়রানিবিরোধী প্রচারণার পরিকল্পনা করায় ২০১৫ সালে পাঁচ তরুণ কর্মীকে আটক করা ছিল এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। এরপর নারীবাদী গোষ্ঠীগুলো বন্ধ হতে বাধ্য হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো পরিচিত অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে এবং নতুন বিধিতে সরব লিঙ্গবিষয়ক বিতর্ককে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোতে ১৯৯৭ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো নারী ছিলেন না। জনপ্রিয় নারীবাদী ভাষ্যকারদের পোস্ট মুছে দেওয়া হয়েছে, প্রোফাইল সরিয়ে ফেলা হয়েছে; অন্যদিকে, জন্মহার কমে যাওয়া মোকাবিলায় নারীদের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা গ্রহণে উৎসাহিত করে চলেছে সরকারি প্রচার। উদ্যাপনমুখর বক্তৃতা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান এখনো স্পষ্ট।
সম্মেলনে যা তুলে ধরা হয়েছে
চীনা নেতারা এই সমাবেশকে অগ্রগতি ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের বয়ান তুলে ধরার কাজে ব্যবহার করেছেন। মাতৃমৃত্যু কমা, উচ্চশিক্ষা ও জনপ্রশাসনে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ধারাবাহিকতার ওপর তাঁরা জোর দেন। নারীদের অগ্রগতিকে জাতীয় শক্তির অংশ হিসেবেও তুলে ধরেন তাঁরা; বলেন, সামাজিক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক প্রাণশক্তির জন্য লিঙ্গসমতা অপরিহার্য। রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অর্জনকে দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের ফল হিসেবে দেখিয়েছে, যার সূত্রপাত নারী-পুরুষের সমতার বিষয়ে সংবিধানের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতিতে।
সম্মেলনে তহবিলের প্রতিশ্রুতিও ছিল। চীন ইউএন উইমেনকে নতুন অনুদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে সহায়তার জন্য পৃথক একটি তহবিলের ঘোষণা দেয়। অতিথিদের কাছে বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: দেশে ও বিদেশে নারীবিষয়ক উন্নয়নে অংশীদার এবং বেইজিং প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্যগুলোর রক্ষক হিসেবে নিজেকে দেখে বেইজিং। সরকার একে এমন ধারাবাহিক নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নারীর অগ্রগতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
১৯৯৫ সালের উত্তরাধিকার ও পার্টির নিয়ন্ত্রণ
১৯৯৫ সালের সম্মেলন নারী অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে বেইজিংকে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে এটি চীনের ভেতরে তৃণমূল পর্যায়ের সক্রিয়তার নতুন ঢেউ সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে পার্টি-রাষ্ট্র আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করেছে কে সংগঠিত হতে পারবে, কী বলা যাবে এবং কোথায় জনসমক্ষে প্রচারণা চালানো যাবে। অল চায়না উইমেনস ফেডারেশন প্রচার ও সহায়তামূলক সেবা চালিয়ে গেলেও, রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে থাকা স্বাধীন গোষ্ঠীগুলোকে আরও কড়া নজরদারির মুখে পড়তে হয়েছে। সরকারি কর্মসূচি ও তৃণমূল সংগঠনের এই অস্থির সহাবস্থানই পরবর্তী সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে।
চীনের ভেতরে নতুন নিষেধরেখার মুখে সক্রিয়তা
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে, ২০১৫ সালের মার্চে ফেমিনিস্ট ফাইভের গ্রেপ্তার স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন অসহিষ্ণুতার ইঙ্গিত দেয়। যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য গণপরিবহনে স্টিকার বিলি করার পরিকল্পনা করায় পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে ‘ঝগড়া বাধানো ও গোলযোগ সৃষ্টির’ অভিযোগ আনে। কয়েক সপ্তাহ আটক থাকার পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান, তবে তাঁদের মামলাটি এক সন্ধিক্ষণ হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে সারা দেশের নাগরিক সমাজকে বিস্তৃত বার্তা দেওয়া হয় যে, লিঙ্গ ও অন্যান্য সামাজিক প্রশ্নে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর আরও কঠোর নজরদারি চলবে।
এরপর থেকে বিধিনিষেধ বেড়েছে। ২০১৮ সালে প্রভাবশালী ‘ফেমিনিস্ট ভয়েসেস’ অ্যাকাউন্টসহ পরিচিত নারীবাদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এখন প্ল্যাটফর্মের বিধিতে ‘লিঙ্গবৈরিতা’ ছড়ায় বলে চিহ্নিত বক্তব্যকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে; ব্যাপক হারে কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে এই শ্রেণিবিভাগ ব্যবহার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই যুক্তিতে বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর এক হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ হয়েছে। জিয়াং চানসহ নারীবাদী ব্লগারদের উইচ্যাট অ্যাকাউন্ট মুছে দেওয়া হয়েছে। দুবানে লিঙ্গবিষয়ক বিতর্ককেন্দ্রিক গোষ্ঠীগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনলাইন পরিবেশ এখন কীওয়ার্ড ফিল্টার, কনটেন্ট অপসারণ ও অ্যাকাউন্ট স্থগিতের গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
চাপ শুধু নীতিমালা ও প্ল্যাটফর্মের বিধিতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ আনহুইয়ের ভ্লগার ওয়াং হুইলিং নারীদের স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক দক্ষতার প্রশংসা করে ভিডিও বানিয়ে লাখ লাখ অনুসারী পেয়েছিলেন। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর অ্যাকাউন্ট উধাও হয়ে যায় এবং তাঁর স্মৃতিকথার পুনর্মুদ্রণ আটকে দেওয়া হয়। তিনি বলেছেন, স্বাধীন চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই এ প্রতিক্রিয়ার কারণ। জনপ্রিয় কণ্ঠকে হেয় করা, মুছে ফেলা বা নীরব করে দেওয়ার বৃহত্তর প্রবণতারই প্রতিফলন এই অভিজ্ঞতা।
বেইজিং ঘোষণার বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক মানবাধিকার ফোরামে চীনা নারীবাদী কর্মীদের পক্ষে দেওয়া বার্তায় তাঁরা কঠোরতর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা এবং একে অপরকে সহায়তাকারী নারীদের ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্কের কথা তুলে ধরেন।
আজ আমাদের দেশে যেসব অন্যায়ের মুখোমুখি হই, তার বিরুদ্ধে আরও বেশি নারী সোচ্চার হচ্ছেন।
এই অবিচলতার মূল্য চড়া। কর্মীদের নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। কেউ কেউ নির্বাসনে গেছেন। অন্যরা প্রকাশ্য প্রতিবাদের বদলে তথ্য নথিবদ্ধ করা, আইনি সহায়তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে ঝুঁকে আরও নীরবে সংগঠিত হচ্ছেন। আন্দোলন টিকে আছে, তবে এমন কঠিন পরিবেশে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেরই পরিণতি হতে পারে।
অনলাইন লড়াই: সেন্সরশিপ, তকমা ও সমন্বিত হয়রানি
চীনের ইন্টারনেট শাসনব্যবস্থায় আইন প্রয়োগ, প্ল্যাটফর্মের নির্দেশিকা ও স্বয়ংক্রিয় ফিল্টার একসঙ্গে কাজ করে। সময়ের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলো এমন অভিযোগ জানানোর শ্রেণি যুক্ত করেছে, যেখানে বিতর্কিত নারীবাদী বক্তব্যকে ‘লিঙ্গবৈরিতা উসকে দেওয়া’ হিসেবে দেখানো হয়। এভাবে চিহ্নিত কনটেন্ট প্রায়ই মুছে ফেলা হয় এবং দ্রুত অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ হতে পারে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের ওপর আলোকপাত করা কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে দ্রুত দমন-পীড়ন শুরু হতে পারে; কীওয়ার্ড আটকে দেওয়া হয়, মন্তব্যের বিভাগ বন্ধ করা হয়।
শত্রুতাপূর্ণ প্রচারণা চাপ আরও বাড়ায়। সরব কর্মীরা ডক্সিং ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানির শিকার হতে পারেন। এক পরিচিত অধিকারকর্মী রেস্তোরাঁয় হয়রানির শিকার হওয়ার পর তাঁর অনলাইন পোস্টে আক্রমণের ঢল নামে। তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দেওয়া হয় এবং তাঁর অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। তাঁর পক্ষে মন্তব্য করা সমর্থকদেরও নীরব করা হয়। মাইক্রোব্লগ থেকে ই-কমার্স পর্যন্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই ঘটনা ঘটে; নারীবাদী স্লোগান-সংশ্লিষ্ট পণ্যতালিকাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এমন ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা অনেককে কিছু পোস্ট করা থেকেই বিরত রাখে।
আইনি ঝুঁকিও ভূমিকা রাখে। জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিস্তৃত অপরাধের বিধানে কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা সহজ হয়। অনলাইনে অভিযুক্ত নির্যাতনকারীর নাম প্রকাশ করা ভুক্তভোগীদের কখনো কখনো মানহানির পাল্টা মামলার মুখে পড়তে হয়। এতে ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা অন্যদের নিরুৎসাহিত করে। প্ল্যাটফর্মের শাস্তির সঙ্গে মিলিত হয়ে এসব প্রবণতা ইন্টারনেটকে, যা একসময় নারীবাদী মতপ্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র ছিল, অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
জনমিতিক চাপ ও বিয়ে-সন্তান জন্মদানে উৎসাহ
জন্মহার কমে যাওয়া ও দ্রুত বার্ধক্যের মুখে চীনের নীতিগত প্রচারে পরিবার গঠনে উৎসাহ দেওয়ার ওপর জোর বেড়েছে। প্রচারণায় আদর্শ পরিবারের প্রশংসা করা হয় এবং অল্প বয়সে বিয়ে ও অধিক সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো ঐতিহ্যবাহী নারীত্বের গুণাবলির ওপর জোর দিয়ে কর্মসূচি শুরু করেছে। একই সময়ে তরুণদের মধ্যে নারীত্বসুলভ সাজসজ্জার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা; সামরিক প্রচারণায় পুরুষদের কঠোর ও কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি শুধু সাংস্কৃতিক মেরুকরণের কথাবার্তা নয়। এর সঙ্গে জনমিতিক চাপ ও সামাজিক পূর্বানুমেয়তা বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা জড়িত।
শি লিঙ্গবিষয়ক আলোচনাকে জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ২০২৩ সালে তিনি পারিবারিক জীবন নিয়ে সামাজিক রীতিনীতিতে নতুন করে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।
চীনের উচিত বিয়ে ও সন্তান জন্মদান নিয়ে নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
স্থানীয় সরকারগুলো সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে দীর্ঘ ছুটি, ভর্তুকি ও বাড়ির ঋণে সহায়তার মতো প্রণোদনা চালু করেছে। কিছু আদালত স্বল্পমেয়াদি বিয়েতে বিচ্ছেদ পাওয়া কঠিন করেছে। নারীরা বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার জন্য ধারাবাহিক চাপের কথা বলেন; পাশাপাশি তাঁদের কাছ থেকেই অধিকাংশ পরিচর্যার কাজের প্রত্যাশা করা হয়। এসব নীতি এমন এক শ্রমবাজারে কার্যকর হচ্ছে, যেখানে কিছু খাতে এখনো চাকরির বিজ্ঞাপনে পুরুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, সাক্ষাৎকারে নারীদের সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় এবং মজুরিতে লিঙ্গবৈষম্য রয়ে গেছে। মাতৃত্বের খরচ এখনো বেশি এবং নারীদের ওপর অসমভাবে পড়ে; ফলে নীতিনির্ধারকেরা যে লক্ষ্য অর্জন করতে চান, তা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কাগজে অগ্রগতি, বাস্তবে ঘাটতি
চীনের নেতারা প্রায়ই বাস্তব অর্জনের কথা তুলে ধরেন। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের ভর্তি বেড়েছে। ২০১৬ সালে পারিবারিক সহিংসতাবিরোধী আইন কার্যকর হয়, যা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর নির্যাতন মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষকে আরও স্পষ্ট আইনি হাতিয়ার দেয়। সম্প্রতি নারীদের সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে বৈষম্যমূলক নিয়োগ নিষিদ্ধ করার এবং হয়রানি মোকাবিলার বিধান যুক্ত হয়েছে। কর্মকর্তা ও অধিকারকর্মী, উভয়ের কয়েক দশকের কাজের প্রতিফলন এসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে দেখা যায়।
তবে বাস্তবায়নে অসামঞ্জস্য রয়েছে। ভুক্তভোগীদের এখনো সুরক্ষামূলক আদেশ বা পুলিশের নিরাপত্তা পেতে বেগ পেতে হয়। আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ চলতে থাকে। হয়রানির অনেক মামলা আদালত খারিজ করে দিয়েছেন; প্রকাশ্যে কথা বললে নারীরা সুনামহানি বা আইনি ঝুঁকির মুখে পড়েন। আইন ও তার প্রয়োগের ব্যবধান অনেক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বদলে নীরবে সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং কিছু ভুক্তভোগী মুখ খুলতে পারেন না।
বিভিন্ন সূচকে শির শাসনামলে নারীদের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমেছে। বহুল পর্যবেক্ষিত বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকে চীনের অবস্থান এক দশক আগে তালিকার ওপরের মধ্যভাগের কাছাকাছি ছিল, ২০২২ সালে তা নেমে নিচের এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছায়। রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে ২০২২ সালে নির্বাচিত ২৪ সদস্যের পলিটব্যুরোতে কোনো নারী ছিলেন না, যা ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে চলে আসা ধারার ব্যতিক্রম। পদোন্নতি, বেতন ও নীতিগত মনোযোগের প্রত্যাশা গড়ে ওঠায় এসব ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনভাবে সংগঠিত হলে কেন উদ্বেগ তৈরি হয়
পার্টি স্বাধীনভাবে সংগঠিত আন্দোলনকে জনসমর্থন ও মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। নারীবাদী প্রচারণা দ্রুত ছড়াতে পারে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে জনপরিসরের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে এবং শ্রেণি ও অঞ্চল পেরিয়ে মানুষকে একত্র করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের রাস্তায় পরীক্ষিত এই সংগঠনী শক্তির সঙ্গে এমন এক ব্যবস্থার অস্বস্তিকর সংঘাত রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক উদ্যোগের অধিকার রাষ্ট্রের জন্য সংরক্ষিত। ফলে নারীদের অধিকার আদায়ের পথ সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে, আর স্বাধীন উদ্যোগগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয় প্রান্তে।
সময়ের পরিচায়ক কয়েকটি মামলা
চীনে #MeToo আন্দোলনের ঢেউ জাগাতে সহায়তা করা সাংবাদিক হুয়াং শুয়েচিনকে রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের অভিযোগে এ বছর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেখায়, লিঙ্গবিষয়ক সক্রিয়তাকে কত দ্রুত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে নতুনভাবে চিহ্নিত করা যায়। সমর্থকদের ভাষ্য, তাঁর কাজ ছিল হয়রানির তথ্য নথিবদ্ধ করা ও ভুক্তভোগীদের ক্ষমতায়ন করা; এসব কাজের জন্যই এখন কঠোরতম শাস্তির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
টিকার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মী হে ফাংমেইকে পাঁচ বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ তাঁর সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মামলা এবং সন্তানদের কল্যাণ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সক্রিয়তা দমনে ফৌজদারি আইন ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অন্যদের জন্য বার্তা দেওয়া হচ্ছে, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট।
আটকে রাখা নারী হিসেবে পরিচিত ঘটনাটিকে ঘিরেও জবাবদিহির দাবি এখনো রয়েছে। গ্রামীণ এলাকার একটি বাড়ির বাইরের ঘরে আট সন্তানের এক মাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ভিডিও প্রকাশের পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় তদন্ত ও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, অনেকেই এখনো পূর্ণ স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকির দাবি জানাচ্ছেন। পাচার, দুর্বল সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়াসহ নারীদের আরও গভীর সমস্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে ঘটনাটি।
খাপ খাওয়ানো ও নীরব প্রতিরোধ
সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় অনেক নারী সংস্কৃতি ও কৌতুকের মাধ্যমে নিজেদের কথা বলছেন। নারীদের লেখা ও অভিনীত নারীবাদী কমেডি ‘হার স্টোরি’ বক্স অফিসে প্রায় ৭২০ কোটি ইউয়ান আয় করেছে। নারী পরিচালিত আরেকটি চলচ্চিত্র ‘ইয়োলো’ বার্ষিক টিকিট বিক্রিতে শীর্ষে ছিল; এর আয় প্রায় ৩৪০ কোটি ইউয়ান। এসব সাফল্য ইঙ্গিত দেয়, একক অভিভাবকত্ব, বিবাহবিচ্ছেদ ও কর্মক্ষেত্রে পক্ষপাত নিয়ে গল্পে দর্শকের আগ্রহ আছে। কমেডি ক্লাবে আরও বেশি নারী শিল্পী এমন সব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলছেন, যেমন ঋতুস্রাব নিয়ে কলঙ্ক, অফিসের গতিপ্রকৃতি এবং নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব। দৈনন্দিন জীবনের ছবি তুলে ধরে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে বলেই এসব কৌতুক সাড়া ফেলে।
তবে এসব মঞ্চও নিরাপদ আশ্রয় নয়। পরিবেশনা নিষেধরেখা অতিক্রম করলে জরিমানা ও অনুষ্ঠান বাতিলের মুখে পড়েছে বিনোদনশিল্প। সামরিক বাহিনীকে অপমান করেছে বলে কর্মকর্তারা অভিযোগ তোলার পর এক শিল্পীকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং কয়েক মাস স্ট্যান্ড-আপ কমেডি জগৎ নীরব হয়ে পড়ে। অনলাইনে ইয়াং লির মতো কৌতুকশিল্পীরা ‘লিঙ্গবৈরিতা উসকে দেওয়ার’ অভিযোগে পাল্টা প্রচারণার মুখে পড়েছেন। এসব ঝুঁকি সত্ত্বেও কৌতুক সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে যাওয়ার এবং বহু নারীর পরিচিত অভিজ্ঞতা প্রকাশের অভিন্ন ভাষা গড়ে তোলার মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতির বাইরেও ছোট ছোট নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে আন্দোলন বদলে এগোচ্ছে। পাঠচক্র, আইনি সহায়তাকারী দল ও পারস্পরিক সহযোগিতার গোষ্ঠীগুলো কখনো নীরবে, কখনো প্রবাসে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি বিদেশে চলে গেছেন এবং সেখান থেকে তথ্য নথিবদ্ধ করা, অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে দাবি তুলে ধরাসহ নানা প্রচারণায় সহায়তা করছেন। দেশের ভেতরে অনেকে এনক্রিপ্ট করা বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেন; জনসমক্ষে বড় আয়োজনের বদলে ধারাবাহিক স্থানীয় কাজকে বেছে নেন। পথটি দীর্ঘ ও অসম, তবু স্রোত এখনো বহমান।
মূল বিষয়গুলো
- ১৯৯৫ সালের বেইজিং সম্মেলনের ৩০তম বার্ষিকী উপলক্ষে চীন বৈশ্বিক নারী সম্মেলনের আয়োজন করে। শি জিনপিং অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং নতুন তহবিলের প্রতিশ্রুতি দেন।
- একই সময়ে চীনের ভেতরে নারীবাদী সক্রিয়তার পরিসর সংকুচিত হয়েছে; স্বাধীন গোষ্ঠী বন্ধ হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ হয়েছে।
- ‘লিঙ্গবৈরিতা’ হিসেবে চিহ্নিত কনটেন্টকে প্ল্যাটফর্মের বিধিতে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, ফলে ব্যাপকভাবে কনটেন্ট সরানো ও অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হচ্ছে।
- উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৫ সালে ফেমিনিস্ট ফাইভকে আটক, সাংবাদিক ও #MeToo অধিকারকর্মী হুয়াং শুয়েচিনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং টিকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারক হে ফাংমেইকে কারাদণ্ড দেওয়া।
- জন্মহার কমে যাওয়া মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ নারীদের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা পালনে উৎসাহ দিচ্ছে; শি বিয়ে ও সন্তান জন্মদান নিয়ে নতুন সংস্কৃতি গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
- পারিবারিক সহিংসতা ও বৈষম্যবিরোধী আইন রয়েছে, তবে অসম প্রয়োগ দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রে সেগুলোর প্রভাব সীমিত করে।
- রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কমেছে; ২০২২ সালে নির্বাচিত ২৪ সদস্যের পলিটব্যুরোতে কোনো নারী ছিলেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচকেও চীনের অবস্থান নেমেছে।
- সেন্সর ও পাল্টা প্রচারণার বাধা সত্ত্বেও নারীবাদী মতপ্রকাশ সংস্কৃতি ও কৌতুকের মাধ্যমে নতুন পথ খুঁজছে; নারী পরিচালিত চলচ্চিত্র ও স্ট্যান্ড-আপ কমেডি দর্শক টানছে।






