এই বিরল চুক্তি এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান তো লামের বিরল সফরের শেষ পর্যায়ে ১০ অক্টোবর পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনাম নতুন একগুচ্ছ সহযোগিতা নথিতে সই করেছে। দীর্ঘদিনের দুই অংশীদারের সম্পর্ক সতর্কভাবে আরও গভীর করার ইঙ্গিতও দিয়েছে এই উদ্যোগ। মানসুদে অ্যাসেম্বলি হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্যেই এ সই হয়। প্রায় দুই দশকের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় কোনো ভিয়েতনামি নেতার এটিই প্রথম সফর।
সূচিপত্র
- এই বিরল চুক্তি এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ
- পিয়ংইয়ংয়ে ঠিক কী সই হয়েছে
- প্রতিরক্ষা বিষয়ে ইচ্ছাপত্র
- স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
- সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সফর
- জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কত দূর এগোতে পারে
- ভিয়েতনামের কৌশল ও প্রতিরক্ষা নীতি
- যুদ্ধকালীন বন্ধুত্ব থেকে সতর্ক সম্পৃক্ততা
- ইউক্রেন, কথিত সেনা মোতায়েন ও বৈশ্বিক নজরদারি
- স্বাস্থ্য, তথ্য ও বাণিজ্য: যেখানে সহযোগিতা দ্রুত এগোতে পারে
- আগামী কয়েক মাসে যা নজরে রাখতে হবে
- মূল বিষয়গুলো
এই চুক্তিগুচ্ছে কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, জনস্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও বাণিজ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার অভিন্ন আগ্রহের প্রতিফলন এতে রয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের জন্য, গভীর বিচ্ছিন্নতার সময়ে এটি আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার প্রকাশ্য বার্তা। হ্যানয়ের জন্য, প্রধান শক্তি ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সুপরিচিত কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখেই ঐতিহাসিক অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন পথ খুলেছে।
পিয়ংইয়ংয়ে ঠিক কী সই হয়েছে
পাঁচটি নথির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে একটি ইচ্ছাপত্র, ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও উত্তর কোরিয়ার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক, ভিয়েতনাম নিউজ এজেন্সি ও কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি এবং ভিয়েতনাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও উত্তর কোরিয়ার চেম্বার অব কমার্সের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক। ইচ্ছাপত্র কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, বরং প্রাথমিক কাঠামো। ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ক্ষেত্র নির্ধারণ ও কর্মী গোষ্ঠী গঠনের সূচনায় এটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিষয়ে ইচ্ছাপত্র
প্রতিরক্ষা নথিটি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংলাপ ও মতবিনিময়ের পথ তৈরির অভিপ্রায় জানায়। বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। বাস্তবে এ ধরনের কাঠামোর আওতায় প্রতিরক্ষা-বিষয়ক আলোচনা, সৌজন্য সফর এবং সামরিক চিকিৎসা বা দুর্যোগ মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহযোগিতা থাকতে পারে। সই অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, দুই পক্ষই বছরের পর বছর ধরে অনিয়মিতভাবে চলা যোগাযোগকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং আন্তর্জাতিক বিধির আওতায় কী করা সম্ভব তা যাচাই করতে চায়।
স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
স্বাস্থ্যবিষয়ক সমঝোতা স্মারকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসা খাতে মানবিক কার্যক্রম জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয় এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোর কাজ চালিয়ে যাওয়ার হাতে গোনা কয়েকটি ক্ষেত্রের একটি এটি। সংবাদ সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় সাধারণত সংবাদবিষয়ক উপাদান বিনিময়, কর্মীদের সফর ও কারিগরি সহযোগিতা থাকে। চেম্বার অব কমার্সের সমঝোতা স্মারক নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে না, তবে অনুমোদিত পণ্য ও পরিষেবার বৈধ বাণিজ্যের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার একটি পথ তৈরি করে। দুই রাজধানীতেই উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা এবং অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহযোগিতাবিষয়ক আন্তঃসরকারি কমিটির মতো ব্যবস্থা রয়েছে, যা চুক্তির বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে।
সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সফর
চুক্তি সইয়ের সময় পিয়ংইয়ংয়ে বড় সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উন্নত নানা অস্ত্রব্যবস্থা প্রদর্শন করা হয়। উত্তর কোরিয়া তাদের ভাষায় হোয়াসং-২০ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখায়। এর পাশাপাশি ছিল হাইপারসনিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, নতুন ধরনের একাধিক রকেট নিক্ষেপব্যবস্থা এবং তথাকথিত আত্মঘাতী ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত একটি লঞ্চার। কিম জং উনের পাশে পর্যালোচনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কুচকাওয়াজ দেখেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং, রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং ভিয়েতনামের তো লাম।
উত্তর কোরিয়ার নেতা সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে বক্তব্য দেন এবং রাষ্ট্রীয় বিবরণ অনুযায়ী, বিদেশে অভিযানে থাকা সেনাদের প্রসঙ্গও তোলেন। কেসিএনএর বক্তব্য উপস্থাপনে কুচকাওয়াজকে জাতীয় শক্তি ও প্রস্তুতির প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়।
সেনাবাহিনীর উচিত এমন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হওয়া, যা সব হুমকি ধ্বংস করে।
পিয়ংইয়ংয়ে কিমের সঙ্গে বৈঠক করা মেদভেদেভের উপস্থিতি মস্কো-পিয়ংইয়ং সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। আলোচনার উত্তর কোরীয় বিবরণে তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য উত্তর কোরীয় সেনাদের কৃতিত্ব দেন। পিয়ংইয়ংয়ে এ দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি এবং সরকারি ভাষ্যের বাইরে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে লড়াই করা উত্তর কোরীয় সেনাদের আত্মত্যাগ দুই দেশের সম্পর্কের আস্থার প্রমাণ দিয়েছে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কত দূর এগোতে পারে
২০০৬ সাল থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলোতে উত্তর কোরিয়ায় ও দেশটি থেকে অস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট সামগ্রী রপ্তানি ও আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে এমন কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিষেবা বা সহায়তার পাশাপাশি অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তাও নিষিদ্ধ। ভিয়েতনামসহ জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এসব বিধি বাধ্যতামূলক।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারগুলো অস্ত্র সরবরাহ বা সামরিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা কূটনীতি চালাতে পারে। এর মধ্যে নীতিগত আলোচনা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সামরিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, সম্মেলনে অংশগ্রহণ বা দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয় থাকতে পারে। যুদ্ধব্যবস্থা নিয়ে প্রশিক্ষণ, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি বিনিময়ের দিকে কোনো সহযোগিতা গড়ালে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকবে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম সাধারণত জাতিসংঘের পদক্ষেপগুলো মেনে চলে এবং প্রতিরক্ষা-সম্পৃক্ততা সতর্কভাবে নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভিয়েতনামের কৌশল ও প্রতিরক্ষা নীতি
হ্যানয় বহুপাক্ষিক ও স্বাধীন সম্পর্কের দীর্ঘদিনের ঘোষিত নীতি অনুসরণ করে, যা প্রায়ই ‘বাঁশ কূটনীতি’ নামে পরিচিত। ২০১৯ সালের প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে ‘চারটি না’ নীতি তুলে ধরা হয়েছিল: কোনো সামরিক জোটে না যাওয়া, এক দেশকে সমর্থন করে অন্য দেশের বিরোধিতা না করা, ভিয়েতনামে কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি না রাখা এবং শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি না দেওয়া। একই নথিতে জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহায়ক বিস্তৃত সহযোগিতায় উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে রাশিয়া ভিয়েতনামের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। তবে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং রুশ শিল্পে সরবরাহব্যবস্থার চাপ সেই পথকে জটিল করেছে। হ্যানয় সরবরাহের উৎস বহুমুখী করছে; ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করেছে এবং ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে টানাপোড়েন এড়াতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা সম্ভবত সীমিত ও সতর্কভাবে নির্ধারিত হবে।
যুদ্ধকালীন বন্ধুত্ব থেকে সতর্ক সম্পৃক্ততা
ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়া ১৯৫০ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের পার্টির মধ্যে সংহতির ওপর জোর দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রয়াত পার্টিপ্রধান নং ডাক মান ২০০৭ সালে পিয়ংইয়ং সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০১৯ সালের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে কিম জং উনের হ্যানয় সফর দীর্ঘ বিরতির পর দুই রাজধানীর সম্পর্ক ফের জোড়া লাগায়। ওই সফরে ভিয়েতনামের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছিল।
এ বছর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী। দুই সরকার ২০২৫ সালকে বন্ধুত্বের বছর হিসেবে ঘোষণা করেছে। কয়েক দশকে তারা সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বেসামরিক বিমান চলাচল, বিচারিক সহায়তা, বিনিয়োগ প্রসার ও সুরক্ষা এবং দ্বৈত কর পরিহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে নথিতে সই করেছে। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা ও আন্তঃসরকারি কমিটিসহ সংলাপের বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞায় বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় সীমিত হলেও সম্পর্কটি টিকে আছে।
ইউক্রেন, কথিত সেনা মোতায়েন ও বৈশ্বিক নজরদারি
ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ ওঠায় যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাদের অংশীদাররা তীব্র সমালোচনা করেছে। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ উত্তর কোরীয় নকশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশসহ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। উত্তর কোরিয়া থেকে রাশিয়ায় কামানের গোলা ও রকেট সরানোর অভিযোগে পশ্চিমা সরকারগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা যোগাযোগ বাড়ালে যেকোনো দেশই এসব সরকারের বাড়তি নজরে পড়বে।
উত্তর কোরীয় সেনারা ইউক্রেনে মোতায়েন হয়েছে বলে রুশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও উত্তর কোরিয়ার বার্তায় দাবি উঠেছে, তবে স্বাধীনভাবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। ভিয়েতনাম এ ধরনের দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সুনামগত ক্ষতি ও আইনি ঝুঁকির বিষয়গুলো হ্যানয় সতর্কভাবে বিবেচনা করবে। ভিয়েতনাম-উত্তর কোরিয়া প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের কোনোটি কার্যকরী সামরিক প্রশিক্ষণ বা অস্ত্রপ্রযুক্তির পর্যায়ে গেলে তা জাতিসংঘের বিধি এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ভিয়েতনামের নিজস্ব নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
স্বাস্থ্য, তথ্য ও বাণিজ্য: যেখানে সহযোগিতা দ্রুত এগোতে পারে
জনস্বাস্থ্য সহযোগিতাই সবচেয়ে কম বিতর্কিত ক্ষেত্র। স্বাস্থ্যবিষয়ক সমঝোতা স্মারকের আওতায় রোগ নজরদারি, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণে যৌথ কাজ সম্ভব হতে পারে। নিষেধাজ্ঞায় ওষুধ ও খাদ্যের জন্য মানবিক ছাড় রয়েছে। স্বল্পব্যয়ের চিকিৎসা উদ্যোগ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা বিনিময়ে দুই দেশেরই আগ্রহ রয়েছে। চিকিৎসা খাতে স্থিতিশীল যোগাযোগের পথ দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা ও যোগাযোগেও সহায়তা করে।
তথ্য ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের গুরুত্ব তুলনামূলক কম হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। ভিয়েতনাম নিউজ এজেন্সি ও কেসিএনএর সহযোগিতায় সম্ভবত সংবাদবিষয়ক উপাদান বিনিময় ও পেশাজীবীদের সফর থাকবে। চেম্বার অব কমার্সের সমঝোতা স্মারকটি অনুসন্ধানমূলক। এটি নিষিদ্ধ বাণিজ্য চালু করতে পারবে না, তবে অনুমোদিত পণ্যশ্রেণিতে বৈধ লেনদেনের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির সুযোগ দেবে। অতীতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে বেসামরিক বিমান চলাচল অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন রাজনৈতিক উষ্ণতা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আকাশপথের যোগাযোগ নিয়ে কারিগরি আলোচনা ফের চালু করতে পারে, যদিও এই দফার নথিগুলোর মধ্যে নতুন কোনো বিমান চলাচল চুক্তির ঘোষণা আসেনি।
আগামী কয়েক মাসে যা নজরে রাখতে হবে
প্রতিরক্ষা বিষয়ে ইচ্ছাপত্রের আওতায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, পর্যবেক্ষকেরা তা দেখবেন। এর মধ্যে কর্মী গোষ্ঠী গঠন, প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক আলোচনার সময়সূচি বা সামরিক চিকিৎসা দলের সফর থাকতে পারে। স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিনিধিদল ও প্রশিক্ষণ সেমিনার জনস্বাস্থ্য সমঝোতা স্মারকের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেবে। যৌথ অনুষ্ঠান বা কর্মী বিনিময়ের মাধ্যমে গণমাধ্যম সহযোগিতা দৃশ্যমান হতে পারে। চেম্বার অব কমার্সগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা মানবিক পণ্য ও পরিষেবার দিকে মনোযোগ দিয়ে অনুমোদিত বাণিজ্যের ক্ষেত্র শনাক্ত করতে বৈঠক করতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কূটনৈতিক ও যুদ্ধবহির্ভূত ক্ষেত্রের মধ্যে থাকলে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঝুঁকি কম। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে অংশীদার দেশগুলো আপত্তি তুলতে পারে। হ্যানয় সাধারণত পূর্বানুমেয়তা ও আইনি বিধি মেনে চলাকে গুরুত্ব দেয়। তাই এ সম্পর্কের বিকাশ হলে তা হবে পরিমিত, যেখানে অস্ত্র বা সামরিক কৌশলের বদলে জনস্বাস্থ্য, তথ্য বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে জোর দেওয়া হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ১০ অক্টোবর পিয়ংইয়ংয়ে কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম ও বাণিজ্য বিষয়ে পাঁচটি সহযোগিতা নথিতে সই করেছে ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়া।
- ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো তৈরিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলো একটি ইচ্ছাপত্রে সম্মত হয়েছে; এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
- জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে; জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় এ ক্ষেত্রটি সাধারণত অনুমোদিত।
- সংবাদ সংস্থা ও চেম্বার অব কমার্সগুলো সহযোগিতার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তবে যেকোনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা মেনে হতে হবে।
- কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্যাপন ও পিয়ংইয়ংয়ের বড় সামরিক কুচকাওয়াজের সময় চুক্তিগুলো সই হয়।
- কুচকাওয়াজে এক ভাষণে কিম জং উন সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করেন। রুশ কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টায় উত্তর কোরিয়ার সহায়তার প্রশংসা করেন, তবে দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
- জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় উত্তর কোরিয়াকে যেকোনো সামরিক সহায়তা সীমিত করা হয়েছে; ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কূটনীতি ও যুদ্ধবহির্ভূত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
- ‘চারটি না’ প্রতিরক্ষা নীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে মিল রেখে হ্যানয় সতর্কভাবে সম্পৃক্ততা নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।






