ব্যক্তিগত আলাপ যখন প্রকাশ্যে
মিসরের শার্ম এল-শেখে গাজা শান্তি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তাঁর ছেলে ও ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী এরিক ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করতে শোনা যায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকে। সমবেত নেতাদের উদ্দেশে ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পর লাইভ মাইক্রোফোনে ধরা পড়া সংক্ষিপ্ত এই কথোপকথন দ্রুতই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে এতে প্রেসিডেন্টের পারিবারিক ব্যবসার প্রসঙ্গ মিশে গিয়েছিল।
সূচিপত্র
দৃশ্যটির ভিডিওতে মূল বক্তব্যের পর দুই নেতাকে একটি মঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অডিও থেকে মনে হয়, তাঁদের কেউই বুঝতে পারেননি যে মাইক্রোফোন চালু আছে। প্রাবোও এমন একটি জায়গার কথা বলেন, যেটিকে তিনি নিরাপত্তার দিক থেকে নিরাপদ নয় বলে বর্ণনা করেন। এরপর তিনি অনুরোধটি জানান। ট্রাম্প পরিচিত ভঙ্গিতে জবাব দেন এবং ফোনে তাঁর ছেলেকে যোগাযোগ করতে বলার প্রস্তাব দেন। গাজায় কয়েক মাসের লড়াই বন্ধে যুদ্ধবিরতি এবং বৃহত্তর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করতে বিশ্বনেতাদের সমবেত হওয়ার কয়েক মিনিট পর এই কথোপকথন হয়।
কথাটি সংক্ষিপ্ত হলেও স্পর্শকাতর বিষয় উঠে আসে। এরিক ট্রাম্প ও তাঁর ভাই ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র পারিবারিক ব্যবসার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে আবাসন, আতিথেয়তা প্রকল্প ও অন্যান্য ব্যবসার বিপণন করে, যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রকল্পও রয়েছে। এই যোগসূত্র অতীতেও যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ সন্তানদের পরিচালিত একটি ট্রাস্টে রেখেছেন, তবে মালিকানা নিজের কাছে রেখেছেন; তিনি নিজের অংশীদারত্ব বিক্রি করেননি বা ব্লাইন্ড ট্রাস্ট গঠন করেননি। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলছেন, দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই।
ঠিক কী বলা হয়েছিল
কথোপকথনের শোনা অংশে অনুরোধটি স্পষ্ট। মাইক্রোফোনের সামনে ট্রাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে প্রাবোও সম্মেলনের আলোচ্যসূচি থেকে প্রসঙ্গ সরিয়ে প্রেসিডেন্টের ছেলের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের দিকে নিয়ে যান।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো: "আমি কি এরিকের সঙ্গে দেখা করতে পারি?"
ট্রাম্প সম্মতি দিয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি দুইবার ফোনে ছেলেকে যোগাযোগ করতে বলার প্রস্তাব দেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প: "আমি এরিককে ফোন করতে বলব। আমি কি তা করব? সে খুব ভালো ছেলে। আমি এরিককে ফোন করতে বলব।"
এরপর প্রাবোও জানান, বৈঠকের জন্য তাঁরা আরও ভালো জায়গা খুঁজবেন। ট্রাম্পের যেকোনো এক ছেলের সঙ্গে কথা বলতেও তিনি আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দেন।
প্রাবোও সুবিয়ান্তো: "আমরা আরও ভালো জায়গা খুঁজব ... এরিক অথবা ডন জুনিয়র।"
সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের সময় প্রাবোও হারি নামটিও উল্লেখ করেন। ইন্দোনেশিয়ায় এই নামটি এমএনসি গ্রুপের ধনকুবের প্রতিষ্ঠাতা এবং ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার হারি তানোসোয়েদিবজোর সঙ্গে যুক্ত। প্রাবোও তাঁর কথা বলছিলেন, নাকি আদৌ কোনো ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল, তা অডিওতে স্পষ্ট নয়।
অনুরোধটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
কথোপকথনের পরিবেশ এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ভঙ্গুর গাজা যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন এবং শান্তি কীভাবে ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে নেতারা মিসরে ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের পরিবারের সদস্য হলেও বেসরকারি ব্যবসার একজন নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রসঙ্গ তোলা প্রবেশাধিকার ও অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্টরা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা পরিবেশে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব যোগাযোগের মূল্যায়ন হয় শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে নয়, সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থের মিশে যাওয়ার কোনো আভাস তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় আসে।
বেশির ভাগ নির্বাহী বিভাগের কর্মীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য প্রধান ফৌজদারি স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক আইন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ওই আইন কর্মকর্তাদের আর্থিক স্বার্থকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়ে অংশ নেওয়া সীমিত করে। ক্ষমতার বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এই ছাড় রাখা হয়েছে। তবে সংবিধানের ইমোলুমেন্টস ক্লজ প্রযোজ্য, আর ঘুষ ও সৎ সেবা-সংক্রান্ত আইনও প্রযোজ্য। তা সত্ত্বেও, সরকারি সিদ্ধান্তে নিজেদের সম্পদের লাভ হতে পারে—এমন ধারণা এড়াতে অধিকাংশ আধুনিক প্রেসিডেন্ট তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে স্পষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেছেন।
ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্প যেভাবে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক সাজিয়েছিলেন
প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প মালিকানা নিজের কাছে রেখে তাঁর সম্পদ ছেলেদের ও এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পরিচালিত প্রত্যাহারযোগ্য ট্রাস্টে রেখেছিলেন। নীতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের যুক্তি ছিল, এই ব্যবস্থা ব্লাইন্ড ট্রাস্টের মান পূরণ করেনি। কারণ, সুবিধাভোগী ও পরিচালকেরা প্রকাশ্য ছিলেন, সম্পত্তিগুলো পরিচিত ছিল এবং প্রেসিডেন্ট ব্যবসার নিয়মিত প্রতিবেদন পেতেন। দ্বিতীয় মেয়াদেও ট্রাম্প একই ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, দৈনন্দিন কার্যক্রমে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। সমর্থকেরা বলেন, কোনো আইন প্রেসিডেন্টকে তাঁর সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য করে না। সমালোচকদের সতর্কতা, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রেসিডেন্টের ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিদেশি সরকার ও বেসরকারি পক্ষগুলো তাঁর অনুগ্রহ পাওয়ার পথ খুঁজতে পারে।
বহুপক্ষীয় সম্মেলনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান প্রেসিডেন্টের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করায় কেন এত মনোযোগ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটটি এ থেকে বোঝা যায়। নেতারা কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলেও, কথোপকথনের ভাষা থেকে অনুরোধকারী দেশের সক্রিয় প্রকল্প থাকা এক ব্যবসায়িক নির্বাহীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ফোনালাপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই কারণেই নীতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বিষয়টির বাহ্যিক রূপের ওপর গুরুত্ব দেন। ঝুঁকিটি শুধু নির্দিষ্ট কোনো সুবিধার বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া নয়, বরং সরকারি অনুষ্ঠানের সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত যোগাযোগের পথ পাচ্ছে—এমন জনধারণাও।
ইন্দোনেশিয়া, এমএনসি গ্রুপ ও ট্রাম্প ব্র্যান্ড
ইন্দোনেশিয়ায় ট্রাম্প ব্র্যান্ডের প্রকল্পগুলো এই প্রেক্ষাপটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্প অর্গানাইজেশন জাকার্তার কাছে একটি গলফ ক্লাবকে সমন্বিত রিসোর্টের অংশ হিসেবে বিপণন করে। তাদের ওয়েবসাইটে বালির তাবানানে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও গলফ ক্লাবের প্রকল্পও শিগগির চালু হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। দুটি প্রকল্পেই ইন্দোনেশিয়ার বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এমএনসি গ্রুপের অংশীদারত্ব রয়েছে। গোষ্ঠীটির নেতৃত্বে আছেন হারি তানোসোয়েদিবজো। এমএনসি ল্যান্ড নামের সম্পত্তি বিভাগটি জাকার্তার প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে লিদো সিটিকে বিনোদন ও পর্যটন করিডর হিসেবে তুলে ধরেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাধায় প্রকল্পগুলোর সময়সূচি জটিল হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পানিব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় এমএনসি ল্যান্ডকে লিদোর উন্নয়নকাজের কিছু অংশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা এবং বিধি মেনে চলার বিষয়টি সমাধানের পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছে কোম্পানির বিবৃতি। গলফ ও আতিথেয়তা-সংশ্লিষ্ট অংশগুলোতে বিলম্ব হয়েছে, আর বালির প্রকল্পটি কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনা ও অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ইন্দোনেশিয়ার বাজারকে প্রবৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এরিক ট্রাম্প সেখানে ব্র্যান্ডটির উপস্থিতির প্রচারও করেছেন।
হারি তানোসোয়েদিবজো কে
হারি তানোসোয়েদিবজো ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত গণমাধ্যম ও সম্পত্তি ব্যবসায়ীদের একজন। এমএনসি গ্রুপের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গেমিং ব্যবসা এবং বিপুল পরিমাণ জমির নিয়ন্ত্রণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি প্রকল্পের জন্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আগ্রহী জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএনসিকে তুলে ধরেছেন। মাইক্রোফোনে ধরা কথোপকথনে প্রাবোওর হারি প্রসঙ্গটি যদি হারি তানোসোয়েদিবজোকে বোঝায়, তবে তা এমএনসি ও ট্রাম্প ব্র্যান্ডের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সঙ্গে মেলে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার মতো তথ্য অডিওতে নেই।
ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্ব দ্বীপপুঞ্জজুড়ে পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ চেয়েছে। সাবেক এই জেনারেল প্রাবোও অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখার ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পর্যটক আকর্ষণে সক্ষম, এমন বড় পরিসরে দৃশ্যমান প্রকল্পে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। প্রিমিয়াম রিসোর্টে ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের আগ্রহের সঙ্গে এই লক্ষ্য মিলে গেছে। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় যেসব দেশে প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় প্রকল্প রয়েছে, ইন্দোনেশিয়া তার মধ্যে অন্যতম।
গাজা সম্মেলনের ভেতরের কথা
গাজায় সদ্য ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এবং ভূখণ্ডটি স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ নিয়ে আয়োজিত বৈঠকের সময় কথোপকথনটি হয়। রকেট হামলা বন্ধ, মানবিক সহায়তার জন্য সীমান্তপথ আবার চালু এবং নতুন করে লড়াইয়ের ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার রূপরেখা তৈরির পদক্ষেপে সমর্থন জানাতে নেতারা শার্ম এল-শেখে জড়ো হয়েছিলেন। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধবিরতির প্রশংসা করেন এবং সহিংসতা স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সমর্থন চান। উত্তেজনা প্রশমন ও পুনর্গঠন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগুলো একমত—এমন বার্তা দেওয়াই ছিল সম্মেলনের লক্ষ্য।
সম্মেলনে প্রায়ই শিরোনাম হওয়া বক্তব্যের পাশাপাশি করিডরে ব্যক্তিগত কথাবার্তাও হয়। এসব আলোচনায় আঞ্চলিক বিরোধ, বাণিজ্য বা সরবরাহ ব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসতে পারে। মাইক্রোফোনে ধরা পড়ায় তেমনই একটি ব্যক্তিগত আলাপ প্রকাশ্যে চলে আসে। কথোপকথনটি ছিল সংক্ষিপ্ত। তবু এতে গাজা নিয়ে আলোচনা থেকে মনোযোগ সরে যায়—আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানটি কি ব্যক্তিগত যোগাযোগ সমন্বয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড পরিচালনাকারী নেতাদের কাজের মূল্যায়ন হয়—দুই ক্ষেত্রের সীমারেখা স্পষ্ট রয়েছে কি না, তার ভিত্তিতে।
ওয়াশিংটন ও জাকার্তার প্রতিক্রিয়া
কথোপকথন নিয়ে প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তরও মন্তব্য করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা অডিওটি পর্যালোচনা করেনি। ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা প্রাবোও ও ট্রাম্পের সম্পর্ককে বন্ধুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। আনুষ্ঠানিক পরিবেশেও ফোনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো তাৎক্ষণিক অনুরোধ কীভাবে আসতে পারে, তা এই ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ব্যাখ্যা করতে পারে।
নেতারা ইন্দোনেশিয়ার কোনো প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ও এমএনসি গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যক্রমে অংশ নেন না এবং তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেরা চুক্তি ও উন্নয়নকাজ দেখাশোনা করেন। ফেডারেল আইনে এ ধরনের ব্যবস্থা অনুমোদিত। তবে নীতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, জনআস্থা রক্ষায় আধুনিক প্রেসিডেন্সির ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট দূরত্ব থাকা দরকার। ইমোলুমেন্টস নিয়ে অতীতের মামলাগুলো বছরের পর বছর চলেছে। আদালত কিছু বিরোধ প্রক্রিয়াগত কারণে নিষ্পত্তি করলেও বৃহত্তর বিতর্কের মীমাংসা করেনি।
ইন্দোনেশিয়ায় এ ঘটনা প্রাবোওর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, এমন সম্ভাবনা কম। দেশে তিনি জনপ্রিয় এবং নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগী বাস্তববাদী নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। জাকার্তার বিশ্লেষকেরা ঘটনাটিকে দুই নেতার অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তবে কেউ কেউ সরকারি সফরের সময় রাষ্ট্রীয় যোগাযোগকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে আলাদা রাখতে আরও স্পষ্ট প্রটোকলের আহ্বান জানিয়েছেন।
নিয়মে কী অনুমোদিত
স্বার্থের সংঘাতের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রেসিডেন্ট ও নির্বাহী বিভাগের অধিকাংশ কর্মকর্তার মধ্যে পার্থক্য করে। ফৌজদারি স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক আইন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে উপহার, অর্থ বা সুবিধা গ্রহণে সংবিধান ফেডারেল কর্মকর্তাদের নিষেধ করে। ঘুষ গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য পদ অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও প্রেসিডেন্টদের জন্য বিধিনিষেধ রয়েছে। এই ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে স্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে স্বেচ্ছায় দূরত্ব বজায় রাখা এবং নজরদারি ও নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাবদিহির ওপর।
প্রেসিডেন্টরা ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ কেউ আনুগত্যের দ্বন্দ্বের আভাসও এড়াতে ব্লাইন্ড ট্রাস্ট গঠন করেছেন এবং শেয়ার বিক্রি করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিপুল পরিসরের আবাসন ও লাইসেন্সিং ব্যবসার মালিকানা নিজের কাছে রেখেছেন। ফলে ওই প্রতিষ্ঠান নিয়ে খবর স্বাভাবিকভাবেই সরকারি সফর ও যোগাযোগের খবরের সঙ্গে মিলে যায়। যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে সেই ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তাকারী প্রেসিডেন্টের প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ—দুটি বিষয় কত দ্রুত এক জায়গায় এসে মিশতে পারে, তার স্পষ্ট উদাহরণ।
পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করে কথোপকথন থেকে বাস্তব কোনো কাজ হয় কি না, তার ওপর। এরিক ট্রাম্প বা ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র যোগাযোগ করলে এবং আলোচনার বিষয় ইন্দোনেশিয়ার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগ হয়, তবে নজরদারি সংস্থাগুলো অভিযোগ দাখিল করতে পারে বা নথি চাইতে পারে। যোগাযোগটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে হলে বিভ্রান্তি এড়াতে কর্মকর্তারা উদ্দেশ্য ও অংশগ্রহণকারীদের নথিবদ্ধ করতে পারেন। দুই নেতা কী করতে চেয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। অডিওতে তা স্পষ্ট নয়, আর কোনো সরকারই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি।
যা জানা দরকার
- শার্ম এল-শেখে গাজা সম্মেলনে বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এরিক ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করতে শোনা যায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকে।
- ট্রাম্প বলেন, তিনি এরিককে ফোন করতে বলবেন। প্রস্তাবটি তিনি আবারও দেন। প্রাবোও বলেন, তিনি এরিক অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
- অডিওতে হারি নামের একজনের প্রসঙ্গও আছে। এটি সম্ভবত এমএনসি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হারি তানোসোয়েদিবজোর প্রতি ইঙ্গিত, যিনি ইন্দোনেশিয়ায় ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের দীর্ঘদিনের অংশীদার। তবে প্রসঙ্গটি স্পষ্ট নয়।
- কথোপকথনে ব্যক্তিগত ব্যবসা, সরকারি বিষয়, নাকি দুটিই উঠে এসেছিল, তা স্পষ্ট নয়।
- ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠান জাকার্তার কাছে একটি গলফ ক্লাবের বিপণন করে এবং বালিতে একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও গলফ ক্লাবের প্রকল্প শিগগির চালু হবে বলে উল্লেখ করেছে। দুটি প্রকল্পই এমএনসি গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারত্বে চলছে।
- পানি ও পরিবেশ-সংক্রান্ত উদ্বেগে ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় ফেব্রুয়ারিতে লিদোর উন্নয়নকাজের কিছু অংশ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। ইন্দোনেশিয়ায় দুটি প্রকল্পই বিলম্বের মুখে পড়েছে।
- প্রধান ফৌজদারি স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক আইনের আওতার বাইরে প্রেসিডেন্ট। তবে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ ও ঘুষবিরোধী আইন এখনও প্রযোজ্য। ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কেমন দেখায়, তার ভিত্তিতেও প্রেসিডেন্টদের বিচার করা হয়।
- কথোপকথন নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস, প্রাবোওর দপ্তর, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ট্রাম্প অর্গানাইজেশন বা এমএনসি গ্রুপ।






