সংস্কারের পরও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বহাল
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ২০২৪ সালের টিচিং অ্যান্ড লার্নিং ইন্টারন্যাশনাল সার্ভে (ট্যালিস)-এ অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপানি শিক্ষকেরা আবারও সবচেয়ে দীর্ঘ কর্মসপ্তাহের কথা জানিয়েছেন। জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষকেরা সপ্তাহে গড়ে ৫২.১ ঘণ্টা কাজ করেছেন, আর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সময় ৫৫.১ ঘণ্টা। ২০১৮ সালের আগের জরিপের তুলনায় গড় কর্মসময় প্রায় চার ঘণ্টা কমেছে, তবু তা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি। ওইসিডির গড় ছিল প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ৪০.৪ ঘণ্টা এবং নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য প্রায় ৪১ ঘণ্টা—ফলে ব্যবধান দুই অঙ্কের।
সূচিপত্র
- সংস্কারের পরও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বহাল
- কর্মঘণ্টা বেশি থাকার কারণ কী?
- ট্যালিস ২০২৪-এর সর্বশেষ তথ্যে যা দেখা যাচ্ছে
- প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায় এক নজরে
- ট্যালিসে সময় কীভাবে হিসাব করা হয়
- শিক্ষকসংকট আরও তীব্র হচ্ছে
- আন্তর্জাতিক তুলনা ও প্রেক্ষাপট
- সহশিক্ষা কার্যক্রমের ক্লাব ও শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনার ভূমিকা
- প্রশাসনিক কাজের চাপ ও ডিজিটাল সরঞ্জাম
- সরাসরি পাঠদানের সময় কম কেন
- দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ঝুঁকি
- সরকারি সংস্কার ও পরবর্তী পদক্ষেপ
- ২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন লক্ষ্য
- এক নজরে
এই অবস্থান জাপানের সামনে দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের বহুবিধ দায়িত্ব সামলাতে হয়, যার অনেকগুলোই নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরে। ট্যালিসে জানানো কর্মসপ্তাহে সন্ধ্যা ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়িতে করা কাজের সময়ও অন্তর্ভুক্ত। দীর্ঘ কর্মসপ্তাহ সত্ত্বেও জাপানি শিক্ষকেরা অন্য অনেক দেশের সহকর্মীদের তুলনায় পাঠদানে সরাসরি কম সময় দেন। তাঁদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় পাঠ প্রস্তুতি, প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের ক্লাব তদারকিতে।
জাপানের নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে গড়ে ১৭.৮ ঘণ্টা পাঠদান করেছেন, যা আন্তর্জাতিক গড় ২২.৭ ঘণ্টার চেয়ে কম। প্রাথমিক শিক্ষকদের পাঠদানের সময় ছিল প্রায় ২৩.২ ঘণ্টা। বিপরীতে, পাঠদানের বাইরের কাজে তাঁদের সময় ব্যয় বেশি। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা প্রতি সপ্তাহে সহশিক্ষা কার্যক্রমে প্রায় ৫.৬ ঘণ্টা দিয়েছেন, যা বৈশ্বিক গড় ১.৭ ঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি। প্রশাসনিক কাজে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা প্রায় ৫.২ ঘণ্টা এবং প্রাথমিক শিক্ষকেরা প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা ব্যয় করেছেন—এ ক্ষেত্রেও তা প্রচলিত গড়ের চেয়ে বেশি। ২০১৮ সালের পর এসব সময় কিছুটা কমেছে, তবে এখনও বেশি।
কর্মঘণ্টা বেশি থাকার কারণ কী?
জাপানের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের পাঠদানের বাইরেও বিস্তৃত দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক শিক্ষক শ্রেণিশিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা, দৈনন্দিন দেখভাল এবং পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দায়িত্ব নেন। তাঁরা অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেন, পরীক্ষা নেন, প্রতিবেদন লেখেন, সহকর্মী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেন এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। স্কুল ছুটির পর ও সাপ্তাহিক ছুটিতে ক্লাব কার্যক্রমের তদারকিও করেন; প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে যান এবং অনুশীলনের ব্যবস্থা করেন। ট্যালিসের তথ্যে দেখা যায়, নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে প্রায় ৫.৬ ঘণ্টা সহশিক্ষা কার্যক্রমে এবং ৫.২ ঘণ্টা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করেন। প্রাথমিক শিক্ষকেরা প্রশাসনিক কাজে প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা ব্যয়ের কথা জানিয়েছেন। জাপানে পাঠ প্রস্তুতিতে গড়ে ৮.২ ঘণ্টা ব্যয় হয়, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৭.৪ ঘণ্টা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্কারের ফলে এসব কাজের কিছুটা চাপ কমেছে। ২০১৮ সালের পর ক্লাব কার্যক্রমে সময় ব্যয় প্রায় ২.৫ ঘণ্টা, পাঠ প্রস্তুতিতে ০.৭ ঘণ্টা এবং প্রশাসনিক কাজে ০.৯ ঘণ্টা কমেছে। এই হ্রাস কাজের ধরনে পরিবর্তন আনার সরকারি উদ্যোগের প্রভাব পড়ছে—এমন দাবির পক্ষে যায়। তারপরও মোট কর্মসময় আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। পাঠদানের বাইরের কাজের চাপ এবং পাঠদানে তুলনামূলক কম সময়—এই দুইয়ের যোগফল থেকেই জাপানি শিক্ষকদের কর্মসপ্তাহ এত দীর্ঘ হওয়ার কারণ অনেকটা বোঝা যায়।
ট্যালিস ২০২৪-এর সর্বশেষ তথ্যে যা দেখা যাচ্ছে
ট্যালিস হলো শিক্ষকদের ও প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে ওইসিডির পরিচালিত বৈশ্বিক জরিপ, যা প্রতি পাঁচ থেকে ছয় বছর অন্তর হয়। ২০২৪ সালের জরিপে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫৫টি দেশ ও অঞ্চল এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ১৬টি দেশ ও অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি ব্যবস্থায় প্রায় ২০০টি প্রাথমিক ও ২০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে নমুনা নেওয়া হয়। জাপানে ৪০৩টি বিদ্যালয়ের ৬,৯১৪ জন শিক্ষক এবং ৪০২ জন প্রধান শিক্ষক উত্তর দিয়েছেন। মহামারির কারণে সর্বশেষ জরিপটি এক বছর পিছিয়ে যায়; ফলে ২০১৮ সালের পর এটিই প্রথম হালনাগাদ তথ্য।
প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায় এক নজরে
প্রাথমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে গড়ে ২৩.২ ঘণ্টা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কথা জানিয়েছেন, আর নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা জানিয়েছেন ১৭.৮ ঘণ্টা। উভয় পর্যায়ে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগে সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১.৪ ঘণ্টা ব্যয় হয়, যা আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে কম। সপ্তাহের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় পরিকল্পনা, কাগজপত্রের কাজ, শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা এবং ক্লাব কার্যক্রমে। স্কুলের দিনের কাঠামো এবং শিক্ষকদের বিস্তৃত দায়িত্ব মোট কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়, এমনকি সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় সীমিত হলেও।
ট্যালিসে সময় কীভাবে হিসাব করা হয়
এই জরিপে উত্তরদাতাদের নিজেদের জানানো কর্মঘণ্টার ওপর নির্ভর করা হয়। সন্ধ্যায় ও সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে করা কাজের সময়ও তাঁরা হিসাবে ধরেন। এই পদ্ধতিতে জাপানের সব ধরনের দায়িত্বের পরিধি ধরা পড়ে, যেখানে স্কুলের অনুষ্ঠান ও ক্লাব কার্যক্রম প্রায়ই কর্মঘণ্টার পরে এবং ছুটির দিনেও চলে। শ্রেণিকক্ষে না থাকলেও স্কুলের জন্য অপরিহার্য কাজগুলো সামলাতে শিক্ষকেরা কীভাবে নির্ধারিত স্কুল-সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্বের সমন্বয় করেন, সেটিও এতে প্রতিফলিত হয়।
শিক্ষকসংকট আরও তীব্র হচ্ছে
কর্মীস্বল্পতা চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের ফলাফলে জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪০.৭ শতাংশ প্রধান শিক্ষক বলেছেন, শিক্ষকসংকট উচ্চমানের শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে। নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একই কথা বলেছেন ৩৫.৬ শতাংশ। দুটি হারই যথাক্রমে ২৮.৭ শতাংশ ও ২৩.১ শতাংশের আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
২০১৮ সালের তুলনায় এই হারগুলো দ্রুত বেড়েছে। শিক্ষক কম থাকলে বড় শ্রেণি সামলাতে হয়, প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের কাজের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমে যায়, আর যাঁরা থাকেন তাঁদের ওপর প্রশাসনিক কাজের বোঝা বাড়ে। অতিরিক্ত কাজ সম্ভাব্য নতুন শিক্ষকদের পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করতে পারে, শূন্য পদ দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং নিয়োগের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়াতে পারে। শিক্ষকসংকট ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত যে স্কুলগুলোর পক্ষে দ্রুত এর সমাধান করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক তুলনা ও প্রেক্ষাপট
দীর্ঘ কর্মসপ্তাহের জন্য পরিচিত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যেও জাপান আলাদা করে চোখে পড়ে। নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে জাপানি শিক্ষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের সহকর্মীদের তুলনায় সপ্তাহে প্রায় ৯.৮ ঘণ্টা, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষকদের তুলনায় প্রায় ১২ ঘণ্টা এবং ফ্রান্সের শিক্ষকদের তুলনায় প্রায় ১৬.৪ ঘণ্টা বেশি কাজ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে জাপান ৫২.১ ঘণ্টা নিয়ে প্রথম স্থানে ছিল। এরপর ছিল নিউজিল্যান্ড (৫০.৬ ঘণ্টা) এবং অস্ট্রেলিয়া (৪৬.৩ ঘণ্টা)।
শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষকদের বেশি সম্পৃক্ত হতে হয়, এমন কিছু দেশেও মোট কর্মঘণ্টা বেশি। সিঙ্গাপুরের শিক্ষকেরা সপ্তাহে ৪৭.৩ ঘণ্টা কাজের কথা জানিয়েছেন, যা ওইসিডির গড়ের চেয়ে বেশি। তাঁরা পরিকল্পনা, পরামর্শদান, সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগেও উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন। সরাসরি পাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের বিকাশে সহায়ক কাজের পরিধি ক্রমাগত বাড়ছে—এটাই দুই দেশের মিলিত চিত্র।
সহশিক্ষা কার্যক্রমের ক্লাব ও শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনার ভূমিকা
ক্লাব কার্যক্রম বা বুকাৎসু জাপানের স্কুলজীবনের একটি বৈশিষ্ট্য। শিক্ষকেরা ক্লাসের পর ও সাপ্তাহিক ছুটিতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক ক্লাব তদারক করেন, প্রতিযোগিতার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করেন এবং প্রতিযোগিতায় নিয়ে যান। ট্যালিসের তথ্যে দেখা যায়, নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে সহশিক্ষা কার্যক্রমে প্রায় ৫.৬ ঘণ্টা ব্যয় করেন, যা আন্তর্জাতিক গড়ের তিন গুণেরও বেশি। এই দায়বদ্ধতা শিক্ষার একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে জ্ঞান, চরিত্র গঠন ও শারীরিক বিকাশকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নীতিনির্ধারকেরা ক্লাব তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি ও ক্রীড়া সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করছেন। উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বজায় রেখে শিক্ষকদের কর্মঘণ্টার বাইরের দায়িত্ব কমানো। ২০১৮ সালের পর ক্লাবে সময় ব্যয় কমেছে, তবে অনেক স্কুল এখনও শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল—বিশেষত যেসব এলাকায় বাইরের সংগঠন কম। শিক্ষার্থীদের সুযোগ বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের জন্য টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা এখনও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রশাসনিক কাজের চাপ ও ডিজিটাল সরঞ্জাম
কাগজপত্র ও স্কুল পরিচালনার কাজও দীর্ঘ কর্মসপ্তাহের আরেকটি কারণ। জাপানের নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে প্রশাসনিক কাজে প্রায় ৫.২ ঘণ্টা ব্যয়ের কথা জানিয়েছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক গড় ৩ ঘণ্টা। প্রাথমিক শিক্ষকেরা জানিয়েছেন প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা। উপস্থিতি ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নথি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন, পরীক্ষা পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনার নথি এবং অনুষ্ঠান ও আয়োজনের সমন্বয়—সবই এর মধ্যে পড়ে। ছোট ছোট কাজও জমে উল্লেখযোগ্য সময় নিয়ে নেয়।
ডিজিটাল সরঞ্জাম সহায়ক হতে পারে, যদিও সেগুলোর ব্যবহার সর্বত্র একরকম নয়। জাপানের মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ প্রধান শিক্ষক বলেছেন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি শিক্ষায় ঘাটতি রয়েছে; এই হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কম। তবে শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখনও সীমিত। জাপানে গত এক বছরে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রায় ১৬ শতাংশ এবং নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকদের ১৭.৪ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা এআই ব্যবহার করেছেন। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ শতাংশের বেশি। এই সূচকে জাপান ছিল নিচের দিকের দেশগুলোর মধ্যে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা নির্ধারণের সময় অনেক জাপানি শিক্ষক পক্ষপাত এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেন।
সরাসরি পাঠদানের সময় কম কেন
শ্রেণিকক্ষে কম সময় কাটানো মানে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কম সময় কাটান—এমন নয়। জাপানের স্কুলে নিয়মিত দিনের অংশ হিসেবে শ্রেণিশিক্ষকের কার্যক্রম, নৈতিক শিক্ষা, সমন্বিত অধ্যয়ন প্রকল্প এবং যৌথ অনুষ্ঠান থাকে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ও করিডর পরিষ্কার করে—এটি বহুদিনের প্রচলিত রীতি, যা শিক্ষকেরা তদারক করেন। দুপুরের খাবারের সময়ও পুষ্টি ও সামাজিক আচরণ শেখানোর লক্ষ্য থাকে; শিক্ষকরা এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের পথ দেখান।
সর্বাঙ্গীণ শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে এসব দায়িত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে এর ফলে সপ্তাহের যে অংশে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করা হয়, তা কমে যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়ার পাশাপাশি পাঠ প্রস্তুতি, প্রশাসনিক কাজ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকায় কর্মসপ্তাহ দীর্ঘই থেকে যায়।
দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ঝুঁকি
দীর্ঘ কর্মসপ্তাহ মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। সরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে দেশব্যাপী এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৯.৬ শতাংশ শিক্ষক দিনে ১১ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন। বেশি কর্মঘণ্টার সঙ্গে স্থায়ী ও নির্দিষ্ট মেয়াদের শিক্ষকদের মধ্যে উচ্চতর মানসিক চাপের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। উপপ্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আলাদা ছিল: তাঁরা অনেক দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কথা জানালেও মানসিক চাপের সূচকে একই ধরনের বৃদ্ধি দেখা যায়নি। গবেষকেরা এর কারণ হিসেবে পদভিত্তিক বিষয়, সম্ভাব্য অতিরিক্ত কাজের প্রবণতা বা অন্য প্রভাবকের কথা উল্লেখ করেছেন।
জাপানের শ্রম আইনে অনেক কর্মীর জন্য বছরে সর্বোচ্চ ৭২০ ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের সাধারণ সীমা নির্ধারিত আছে, তবে গবেষণার সময় সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সীমা প্রযোজ্য ছিল না। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, কিছু শিক্ষক অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকির মাত্রা ছাড়িয়ে কাজ করেন। এর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষয়, পেশায় টিকে থাকার হার কমে যাওয়া এবং কর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
সরকারি সংস্কার ও পরবর্তী পদক্ষেপ
কর্তৃপক্ষ বহু বছর ধরে কাজের ধরনে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে অতিরিক্ত কাজ নিয়ে নির্দেশিকা চালু করে, নীতিগতভাবে সীমা নির্ধারণ করে এবং স্কুলগুলোকে কর্মঘণ্টা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানায়। মন্ত্রণালয় স্কুলের ক্লাব কার্যক্রম কমিউনিটি সংগঠনের কাছে হস্তান্তর এবং পাঠদানের বাইরের কিছু কাজ সামলাতে সহায়ক কর্মী নিয়োগেও উৎসাহ দিয়েছে। ট্যালিসের সর্বশেষ ফলে ২০১৮ সালের পর গড় কর্মঘণ্টা প্রায় চার ঘণ্টা কমেছে, যা এসব উদ্যোগের প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
২০২৯ সাল পর্যন্ত নতুন লক্ষ্য
নীতিনির্ধারকেরা ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে শিক্ষকদের গড় অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা মাসে ৩০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় নিয়োগ অব্যাহত রাখা, প্রশাসনিক কাজের প্রক্রিয়া সহজ করা, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ এবং বিচক্ষণভাবে ডিজিটাল সরঞ্জাম গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে। শিক্ষার্থীদের সহায়তা কমিয়ে না দিয়ে স্কুলগুলোর চাপ কত দ্রুত কমানো যাবে, তা নির্ভর করবে বাজেট, কমিউনিটি ক্লাব পরিচালনায় স্থানীয় সক্ষমতা এবং কর্মীদের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের ওপর।
এক নজরে
- ট্যালিস ২০২৪-এ জাপানের প্রাথমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে ৫২.১ ঘণ্টা এবং নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা ৫৫.১ ঘণ্টা কাজের কথা জানিয়েছেন।
- এই মোট কর্মঘণ্টা আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১.৭ ঘণ্টা এবং নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ১৪.১ ঘণ্টা বেশি।
- সহকর্মীদের তুলনায় পাঠদানের সময় কম ছিল: প্রাথমিক পর্যায়ে ২৩.২ ঘণ্টা এবং নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে ১৭.৮ ঘণ্টা।
- নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষকেরা সপ্তাহে সহশিক্ষা কার্যক্রমে প্রায় ৫.৬ ঘণ্টা এবং প্রশাসনিক কাজে ৫.২ ঘণ্টা ব্যয় করেছেন; প্রাথমিক শিক্ষকেরা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করেছেন প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা।
- ২০১৮ সালের তুলনায় গড় সাপ্তাহিক কর্মসময় প্রায় চার ঘণ্টা কমেছে।
- শিক্ষকসংকটের কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক পর্যায়ের ৪০.৭ শতাংশ এবং নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৫.৬ শতাংশ প্রধান শিক্ষক; বৈশ্বিক গড় যথাক্রমে ২৮.৭ শতাংশ ও ২৩.১ শতাংশ।
- জাপানে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের হার প্রায় ১৬ থেকে ১৭.৪ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক হার ৩৬ শতাংশের বেশি; সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরে এই হার প্রায় ৭৫ শতাংশ।
- ২০১৯ সালে চালু করা কাজের ধরন-সংক্রান্ত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত কাজের সীমা নিয়ে নির্দেশনা এবং ক্লাব কার্যক্রম কমিউনিটি সংগঠনের কাছে হস্তান্তর।
- সরকার ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে গড় অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা মাসে ৩০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে।
- প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মঘণ্টার হিসাবে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যথাক্রমে ৫০.৬ ও ৪৬.৩ ঘণ্টা নিয়ে জাপানের পেছনে ছিল।






