প্রতিভাবানদের আকৃষ্ট করতে চালু ভিসা, অনলাইনে ক্ষোভের মুখে
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিষয়ে তরুণ পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে নতুন কে ভিসা চালু করেছে চীন। ১ অক্টোবর এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর দেশে দ্রুত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রবেশের বাধা বাড়াচ্ছে, তখন বিশ্বজুড়ে প্রতিভাবানদের জন্য চীনের দরজা আরও উন্মুক্ত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। তবে চীনে স্নাতকদের জন্য কঠিন চাকরির বাজারের মধ্যে এ উদ্যোগ চালু হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বিদেশি নতুন কর্মীরা ভঙ্গুর কর্মসংস্থান পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
সূচিপত্র
- প্রতিভাবানদের আকৃষ্ট করতে চালু ভিসা, অনলাইনে ক্ষোভের মুখে
- কে ভিসার ভেতরের কথা: সম্ভাবনা ও অনুত্তরিত প্রশ্ন
- তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের মনে কেন লেগেছে
- সংখ্যায় কঠিন চাকরির বাজার
- ভূরাজনীতি ও প্রতিভার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
- মানদণ্ড, যাচাই-বাছাই ও একীভূত হওয়া
- কর্মকর্তা ও ভাষ্যকারেরা যা বলছেন
- নীতি সফল হলে কারা লাভবান হতে পারেন
- নিয়ম চালুর সময় কী লক্ষ করবেন
- মূল বিষয়গুলো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। কে ভিসাসংশ্লিষ্ট হ্যাশট্যাগগুলো কয়েক দিনের মধ্যে কয়েক কোটি নয়, কয়েক শ কোটি বার দেখা হয়। দেশীয় তরুণদের বেকারত্বের হার উঁচু থাকা অবস্থায় বিদেশ থেকে আরও স্টেম স্নাতক আমন্ত্রণ জানানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। অন্যদের যুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োটেকের মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বৈশ্বিক দক্ষতা দরকার; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ চীনকে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে বাধ্য করছে।
ক্ষোভ প্রশমনে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম হস্তক্ষেপ করে জানায়, কে ভিসা অভিবাসনের সহজ পথ নয় এবং এ নীতি চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত লক্ষ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। তবে অনিশ্চয়তা প্রতিক্রিয়াকে আরও উসকে দিয়েছে। সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত কূটনৈতিক মিশনগুলো আবেদনের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি, আর এর সময় মিলে যায় আট দিনের জাতীয় ছুটির সঙ্গে। ফলে কারা যোগ্য এবং ভিসায় কী কী কর্মকাণ্ডের অনুমতি মিলবে, সে বিষয়ে অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
কে ভিসার ভেতরের কথা: সম্ভাবনা ও অনুত্তরিত প্রশ্ন
সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, চীন বা বিদেশের সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্টেম বিষয়ে স্নাতক বা তার চেয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণদের লক্ষ্য করে কে ভিসা। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা বা গবেষণায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এর আওতায় পড়বেন। বিদ্যমান অনেক শ্রেণির ভিসার বিপরীতে, আবেদনের আগে চীনে চাকরির প্রস্তাব বা আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ভিসাধারীরা শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও ব্যবসাসংশ্লিষ্ট কাজে আরও নমনীয়ভাবে প্রবেশ, ভিসার মেয়াদ এবং অবস্থানের সময়সীমার সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কে ভিসা চীনের আর ভিসা থেকে আলাদা; আর ভিসা রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজন এমন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি কর্মসূচির সঙ্গেও এর পার্থক্য রয়েছে। ওই কর্মসূচিতে নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা লাগে, বছরে ৮৫ হাজার ভিসার সীমা আছে এবং নতুন আবেদনের জন্য বর্তমানে প্রস্তাবিত ফি ১ লাখ ডলার। নিয়োগকর্তার শর্ত তুলে দিয়ে চীন কর্মজীবনের শুরুর পর্যায়ের প্রতিভাবানদের পাশাপাশি দেশটিতে থাকা এমন শিক্ষার্থীদের প্রতিও আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যারা স্নাতক শেষে থেকে যাওয়ার পথ খুঁজছেন।
নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো এখনো অস্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলেছে, কে ভিসা সাধারণ কাজের অনুমতিপত্র নয়। পিপলস ডেইলি পাঠকদের একে অভিবাসনের সঙ্গে এক করে না দেখতে বলেছে। আগামী দিনগুলোতে চীনা দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর যোগ্যতা, অধিকার ও আবেদনপদ্ধতি স্পষ্ট করার কথা। এর মধ্যে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া ‘চীনের এইচ-১বি’ তকমাটি এমন প্রত্যাশা ও আশঙ্কা তৈরি করেছে, যা এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় যাচাই-বাছাই গুরুত্বপূর্ণ হবে। স্বীকৃত ডিগ্রি কর্মসূচি নির্ধারণ, যোগ্যতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নিশ্চিত করা এবং অপব্যবহার ঠেকানোর শর্ত তৈরি করতে হবে নীতিনির্ধারকদের। স্পষ্ট পদ্ধতি, স্বচ্ছ পরিমাপক এবং সংযতভাবে ভিসা দেওয়ার মাধ্যমে বিভ্রান্তির ঝুঁকি কমানো ও ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে নীতিটিকে সহায়তা করা সম্ভব।
তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের মনে কেন লেগেছে
চীনের তরুণ স্নাতকেরা কঠিন শ্রমবাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আগস্টে সরকারি যুব বেকারত্বের হার ১৮.৯ শতাংশে পৌঁছায়, যা পদ্ধতি পর্যালোচনার জন্য বিরতির পর ২০২৩ সালের শেষ দিকে পরিসংখ্যানটি আবার প্রকাশ শুরুর পর সর্বোচ্চ। এ বছরের স্নাতক ব্যাচও রেকর্ডে সবচেয়ে বড়; প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ নতুন স্নাতক সীমিতসংখ্যক শ্বেত-কলার চাকরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রতি আগ্রহ তীব্র হয়েছে এবং ডিগ্রি ও পাওয়া যায় এমন পদের মধ্যে অমিল বাড়ছে।
চীন বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। গত এক দশকে স্নাতকদের প্রায় অর্ধেক স্টেম বিষয়ে পড়েছেন, ফলে দেশে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখের একটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়েছে। তবু উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পে চাকরি সৃষ্টি ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অনেক স্নাতক নিজেদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে মানানসই কাজ খোঁজার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ, বিক্রয় বা অস্থায়ী কাজে যোগ দিয়েছেন।
এ পটভূমিতে বিদেশ থেকে আরও স্টেম স্নাতক আনার ধারণা অনেকের কাছে হুমকির মতো মনে হচ্ছে। কারও আশঙ্কা, সীমিতসংখ্যক গবেষণার পদে বিদেশি ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, অথবা স্থানীয় স্নাতকদের কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক পর্যায়ের পদ তারা নিয়ে নেবেন। অন্যদের উদ্বেগ, প্রতিভা আকর্ষণের নীতি হিসেবে প্রচারিত উদ্যোগে স্নাতক ডিগ্রিকেই ন্যূনতম যোগ্যতা ধরা খুবই কম মানদণ্ড। বিদেশিবিদ্বেষী কিছু পোস্টও জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে; সম্ভাব্য ভারতীয় আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ বিদ্বেষ দেখা গেছে। অনলাইনের এই কদর্যতা চাকরি, পরিচয় ও উন্মুক্ততা নিয়ে সংবেদনশীল জাতীয় আলোচনারই প্রতিফলন।
সংখ্যায় কঠিন চাকরির বাজার
উচ্চ দক্ষতানির্ভর কাজে নিয়োগ দিয়ে স্নাতকদের জায়গা দেওয়ার সক্ষমতার চেয়ে চীনে স্নাতকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। উৎপাদন খাতে দুর্বল চাহিদার পর্যায় এসেছে, বেসরকারি বিনিয়োগে সতর্কতা রয়েছে এবং শহরাঞ্চলের সামগ্রিক বেকারত্বও উঁচু। গবেষণাগার ও প্রযুক্তি পার্কের বিস্তার ঘটলেও নিয়োগ বাছাই করে হচ্ছে। চীনের জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম বিদেশি; ২০২০ সালে তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজার। এতে বোঝা যায়, নিকট ভবিষ্যতে কে ভিসায় আসা লোকের সংখ্যা দেশীয় প্রতিভার তুলনায় কমই হবে। চাকরির জন্য জীবনবৃত্তান্ত পাঠাতে থাকা অনেক স্নাতকের তাৎক্ষণিক উদ্বেগে এ হিসাব হয়তো স্বস্তি দেবে না।
ভাষাও আরেকটি বাছাইয়ের শর্ত। চীনে অনেক বৈজ্ঞানিক চাকরিতে গবেষণাগার ও কার্যালয়ে ম্যান্ডারিন ভাষায় ভালো দক্ষতা প্রয়োজন। ফলে সরবরাহকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ক্রেতাদের সঙ্গে চীনা ভাষায় যোগাযোগ করতে হয়, এমন পদে সরাসরি প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে। শীর্ষ গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই বিশ্বজুড়ে নিয়োগ দেয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সফলভাবে চীনে যাওয়া অধিকাংশ বিদেশি শিক্ষাবিদ জাতিগতভাবে চীনা অথবা উন্নত ভাষাদক্ষতাসম্পন্ন।
ভূরাজনীতি ও প্রতিভার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
বেইজিংয়ের এ সময় নির্বাচন আকস্মিক নয়। নতুন এইচ-১বি আবেদনে নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতার খরচ ১ লাখ ডলারে উন্নীত করার পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া, প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট কিছু চীনা নাগরিককে ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করতে হয় এমন ব্যবস্থা ইভিইউএসের জন্য মার্কিন সংস্থাগুলো ৩০ ডলারের ফিও যোগ করেছে। ওয়াশিংটনের বার্তা হলো, নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হচ্ছে। চীন বিপরীত পথের ইঙ্গিত দিয়ে স্টেম শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বলছে, দেশটির গবেষণাগার, স্টার্টআপ ও যৌথ ক্যাম্পাসে তাঁদের সুযোগ রয়েছে।
উন্নত চিপ, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেওয়া মার্কিন রপ্তানি নীতির চাপে চীনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, এআই, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে চান নেতারা। কিছু ভ্রমণকারীর জন্য দীর্ঘতর ভিসামুক্ত অবস্থানের সুবিধা এবং বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে নিয়োগ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের পাশাপাশি রয়েছে কে ভিসা। বার্তা স্পষ্ট: দুই ব্যবস্থার মধ্যে চলাচল কঠিন হয়ে উঠলেও বৈশ্বিক মেধাবীদের জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে চীন।
যৌথ কর্মসূচি ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ উদ্যোগের প্রথম দিকের ব্যবহারকারী হতে পারে। চীনে বিদেশি স্নাতকেরা ডিগ্রি শেষে থেকে যাওয়ার বৈধ পথ খুঁজে পেতে প্রায়ই সমস্যায় পড়েছেন। কে ভিসা তাঁদের ইন্টার্নশিপ, গবেষণা সহকারী পদ বা প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে; বিশেষত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও বিজ্ঞান পার্কগুলোতে, যেখানে স্থানীয় সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দল নিয়োগে আগ্রহী।
মানদণ্ড, যাচাই-বাছাই ও একীভূত হওয়া
জনআলোচনায় মানদণ্ডই প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। সমালোচকেরা জানতে চাইছেন, শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিভা বাছাইয়ে স্নাতক ডিগ্রি আদৌ কার্যকর মানদণ্ড কি না। কারও মতে, ন্যূনতম যোগ্যতা হওয়া উচিত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা গবেষণার প্রমাণিত অভিজ্ঞতা। যোগ্য প্রতিষ্ঠান, স্বীকৃত বিষয় এবং বয়স বা অভিজ্ঞতার কোনো সীমা থাকলে তা প্রকাশ করে নীতিনির্ধারকেরা জল্পনা কমাতে পারেন। পেটেন্ট, প্রকাশনা ও প্রতিযোগিতায় পাওয়া পুরস্কারের মতো অর্জন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেটিও তাঁরা জানাতে পারেন।
নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার ফলে বাস্তব কিছু প্রশ্ন উঠেছে। চাকরির প্রস্তাব যাচাই, বেতন নিশ্চিত করা এবং ভিসাকে প্রকৃত পদের সঙ্গে যুক্ত করতে সরকারগুলো প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্রের ওপর নির্ভর করে। সেই ভিত্তি না থাকায় চীনা কর্তৃপক্ষকে নথি যাচাই, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা জোরদার করতে হতে পারে। জালিয়াতির জন্য শাস্তির স্পষ্ট বিধি এবং মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা ব্যবস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারে।
একীভূত হওয়া আলাদা চ্যালেঞ্জ। দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন ভাষা নিয়ে অনেক বিদেশি গবেষক সমস্যায় পড়েন। কর্মক্ষেত্রের রীতি, সহযোগিতার ধরন এবং প্রকাশনা নিয়ে প্রত্যাশা উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। চীনের রাজনৈতিক পরিবেশও গবেষণার বিষয় ও জনআলোচনাকে প্রভাবিত করে, যা শিক্ষাগত স্বাধীনতা ও মুক্ত বিতর্কে অভ্যস্ত বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যত্র সফল কর্মসূচিগুলো ভিসার সঙ্গে ভাষা সহায়তা, পরামর্শদান ও নিয়ম মেনে চলার নির্দেশনা যুক্ত করে, যাতে নতুন কর্মী ও নিয়োগকর্তারা পরস্পরের কথা বুঝতে পারেন।
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে বিদেশিবিদ্বেষ বেড়ে গেলে যোগ্য আবেদনকারীরা নিরুৎসাহিত হন এবং ইতিমধ্যে চীনে থাকা ব্যক্তিদের পেশাগতভাবে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়। নির্বাচন যে ন্যায্য হবে, নীতিটি নির্দিষ্ট ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই নেওয়া এবং নিয়োগ বা ক্যাম্পাসজীবনে বৈষম্যের স্থান নেই, কর্মকর্তারা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা জোর দিয়ে বলতে পারেন। নিয়ম স্পষ্ট এবং ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ হলে জনআস্থা বাড়ে।
কর্মকর্তা ও ভাষ্যকারেরা যা বলছেন
কে ভিসা নিয়ে আলোচনা অনুদান নয়, বরং কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ—এভাবে বিষয়টি নতুন করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে বেইজিং। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, চীনের উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন এবং এ উদ্যোগের পরিসর সীমিত। নীতির প্রকৃত ভাষার সঙ্গে মেলে না এমন গুজব ও তকমা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে বলেও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম যুক্তি দিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিশ্বজুড়ে দক্ষতাকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছেন এবং পেশাজীবীদের চীনে কর্মজীবন গড়তে উৎসাহিত করেছেন। মুখপাত্র বলেন:
মানবতার অগ্রগতি ও পেশাগত সাফল্যের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন খাত ও ক্ষেত্রের প্রতিভাবানদের চীনে এসে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলার জন্য স্বাগত জানায় চীন।
কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি অনলাইন বিতর্কের সুরের সমালোচনা করে পাঠকদের নীতির উদ্দেশ্যে মনোযোগ দিতে এবং মিথ্যা দাবি এড়িয়ে চলতে বলেছে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে:
কিছু মানুষ নীতিটির ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল বোঝাবুঝি ছড়িয়েছেন। তাঁরা উদ্ভট তত্ত্ব প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন এবং অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ তৈরি করছেন।
পরিচিত ভাষ্যকার ও গ্লোবাল টাইমসের সাবেক সম্পাদক হু শিজিন বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, মূল সমস্যা দেশে প্রতিভাবানদের চাহিদা দুর্বল এবং বাছাই করতে হবে সতর্কভাবে। হু লিখেছেন:
কে ভিসা বিতর্কের মূলে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজারের টানাপোড়েন এবং কর্মসংস্থান খুঁজতে গিয়ে তরুণদের উদ্বেগের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চীন কর্মসূচিটিকে ব্যাপক না করে লক্ষ্যভিত্তিক রাখবে। দেশীয় সরবরাহ কম এমন ক্ষেত্র এবং প্রমাণিত সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের ওপর ভিসা দেওয়ার বিষয়টি সম্ভবত গুরুত্ব পাবে। এতে সামগ্রিক চাকরির বাজারে প্রভাব সীমিত থাকবে, পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির প্রতিযোগিতায় চীনের আগ্রহের বার্তাও যাবে।
নীতি সফল হলে কারা লাভবান হতে পারেন
কয়েকটি খাত স্পষ্টতই লাভবান হতে পারে। চিপ নকশা ও উৎপাদনে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং যন্ত্রপাতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর দরকার ব্যাটারি রসায়নবিদ, বিদ্যুৎ-ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলী এবং বিদ্যুৎ গ্রিড পরিকল্পনাবিদ। এআই ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারিক গবেষক এবং বৃহৎ পরিসরের কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে। বায়োটেক কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন গবেষণাগারের বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক দক্ষতা। কে ভিসা কর্মজীবনের শুরুর পর্যায়ের কর্মী ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের বাধা কমালে এসব খাতের নিয়োগকর্তারা নির্দিষ্ট দক্ষতার ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় গবেষণাগারও লাভবান হতে পারে। বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করা গবেষণাগারে পোস্টডক্টরাল গবেষক ও গবেষণা সহকারী নিয়োগে কে ভিসা সহায়তা করতে পারে। প্রতিবছর বিদেশি শিক্ষার্থী স্নাতক করে এমন যৌথ ক্যাম্পাসগুলো তাঁদের আরও বেশি সংখ্যায় ধরে রাখতে পারবে; এতে কর্মী চলে যাওয়ার হার কমবে এবং গবেষণার ধারাবাহিকতা গড়ে উঠবে। বিজ্ঞান পার্ক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল পরিচালনাকারী স্থানীয় সরকারগুলো নির্দিষ্ট দল আকর্ষণে পরিপূরক প্রণোদনা তৈরি করতে পারে।
এসব সুবিধা সত্ত্বেও চীনের দেশীয় কর্মী তৈরির ধারার তুলনায় এর পরিসর সীমিত থাকবে। দেশটিতে প্রতিবছর লাখ লাখ স্টেম স্নাতক তৈরি হয়। বাছাই করে দেওয়া কে ভিসা বিশেষায়িত দক্ষতা যোগ করবে; প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে প্রতিযোগিতা বাড়াবে না। সাফল্য বিচার হবে ভিসার সংখ্যা দিয়ে কম, বরং নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং স্থানীয় দলকে প্রশিক্ষণ দেয় এমন প্রকল্পে অর্থবহ অবদান রাখেন কি না, তা দিয়ে।
নিয়ম চালুর সময় কী লক্ষ করবেন
অধিকার ও শর্তের স্পষ্টতা জনগ্রহণযোগ্যতা গড়ে তুলবে। কে ভিসায় বেতনভুক্ত চাকরি, ইন্টার্নশিপ নাকি শুধু বিনিময় কর্মসূচির অনুমতি মিলবে, তা আবেদনকারী, নিয়োগকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জানা দরকার। কর্তৃপক্ষের উচিত ভিসার মেয়াদ, সর্বোচ্চ অবস্থানের সময়, অনুমোদিত কর্মকাণ্ড এবং খাতভেদে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা নির্দিষ্ট করা। কোটা বা শহরভিত্তিক লক্ষ্য আছে কি না এবং আবেদন কীভাবে অগ্রাধিকার পাবে, নীতিনির্ধারকেরা সেটিও জানাতে পারেন।
স্বচ্ছতা সহায়ক হবে। ভিসা দেওয়ার সংখ্যা, অনুমোদনের হার এবং অধ্যয়নের ক্ষেত্র প্রকাশ করলে কর্মসূচিটি লক্ষ্যভিত্তিক ও ন্যায্য—এমন আস্থা তৈরি হতে পারে। জালিয়াতিবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই এবং ব্যবস্থার অপব্যবহারকারী মধ্যস্থতাকারীদের শাস্তি অনিয়ম ঠেকাবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান পার্কগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করলে কাজে যোগদান এবং নিয়ম মানার প্রক্রিয়া সহজ হবে।
একীভূত হওয়ার সহায়তা সব পক্ষের ভোগান্তি কমাতে পারে। ভাষা প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা এবং চুক্তি, সামাজিক বীমা ও শিক্ষাগত স্বীকৃতি নিয়ে নিয়োগকর্তাদের নির্দেশনা প্রত্যাশা স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে। বেতন ও শ্রমমান এমন হতে হবে, যাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগে স্থানীয় স্নাতকদের পারিশ্রমিক কমে না যায়। এতে প্রতিযোগিতা স্বাস্থ্যকর থাকবে এবং দক্ষতার ওপরই গুরুত্ব থাকবে।
যোগাযোগও ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা প্রমাণ চান যে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিভা উন্নয়ন নীতি নির্দিষ্ট গবেষণা ও শিল্পখাতের লক্ষ্য পূরণে কাজ করে—এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা এবং বিদেশিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অবস্থান অনলাইন বিতর্কের উত্তাপ কমাতে পারে। বর্তমানে চীনে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ১০ লাখের কম; কে ভিসায় আসা মানুষের সংখ্যাও কম হবে। ধীরস্থিরভাবে কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি দেশে মানসম্মত চাকরির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে তা গ্রহণ করা সহজ হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ১ অক্টোবর চীন নতুন কে ভিসা চালু করেছে; এর লক্ষ্য তরুণ স্টেম স্নাতক ও গবেষকেরা, আর আবেদনে নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন নেই।
- দুর্বল চাকরির বাজারের মধ্যে এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে; আগস্টে সরকারি যুব বেকারত্বের হার ছিল ১৮.৯ শতাংশ।
- রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলেছে, এ নীতি অভিবাসন নয় এবং গুজব ও ভুল তকমা উপেক্ষা করতে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছে।
- কে ভিসায় বেতনভুক্ত কাজ করা যাবে কি না এবং ভিসাধারীরা কত দিন থাকতে পারবেন, দূতাবাসগুলোর কাছ থেকে সেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
- যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা লাগে এবং নতুন আবেদনে ১ লাখ ডলার ফি আরোপের প্রস্তাব রয়েছে; কে ভিসা এর বিপরীত।
- মানদণ্ড, নিয়োগকর্তার সমর্থন ছাড়া যাচাই-বাছাই, ভাষাগত বাধা এবং নতুনদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
- কর্মকর্তারা বলছেন, চীন বিশ্বজুড়ে প্রতিভাকে স্বাগত জানায়; ভাষ্যকারদের মতে, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনো প্রধান চ্যালেঞ্জ।
- সেমিকন্ডাক্টর, এআই, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন ও বায়োটেক খাত লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, ভিসা দেওয়া হবে কঠোর বাছাইয়ের মাধ্যমে ও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে; ফলে বৃহত্তর চাকরির বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকবে।
- জনআস্থা অর্জনে আরও স্বচ্ছতা, স্পষ্ট নিয়ম এবং একীভূত হওয়ার সহায়তা নির্ধারক হবে।






