এশিয়ার অবৈধ অর্থ যেভাবে যুক্তরাজ্যের সম্পত্তিতে আশ্রয় খুঁজে পায়

পড়তে 12 মিনিট
এশিয়ার অবৈধ অর্থ যেভাবে যুক্তরাজ্যের সম্পত্তিতে আশ্রয় খুঁজে পায়

এশিয়ার তদন্তে অর্থের সূত্র অভিজাত ঠিকানায় পৌঁছানোয় লন্ডন আবারও কড়া নজরদারিতে

বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তের বিপুল অর্থ লন্ডনের সম্পত্তি বাজারে এসেছে; অভিজাত সারিবদ্ধ বাড়ি ও কাচের সুউচ্চ ভবন পরিণত হয়েছে সম্পদ জমিয়ে রাখার জায়গায়। এই আকর্ষণের মুখে এখন এশীয় তদন্তকারী ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক অর্থের খোঁজ এবং সম্পদ জব্দের উদ্যোগ জোরদার করেছে। মালয়েশিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের দিকে নজর দিয়েছেন। এ তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লন্ডনের কথিত সম্পদের বিষয়টিও উঠে এসেছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। প্রয়াত ধনকুবের দাইম জাইনউদ্দিনকে নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী কমিশনের অনুরোধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জুনে প্রায় ১৮ কোটি ডলার মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে। এ সম্পদের মধ্যে সিটি এলাকার বাণিজ্যিক ভবন এবং মেরিলিবোন ও বেইজওয়াটারের অভিজাত বাড়ি রয়েছে।

সূচিপত্র
  1. এশিয়ার তদন্তে অর্থের সূত্র অভিজাত ঠিকানায় পৌঁছানোয় লন্ডন আবারও কড়া নজরদারিতে
  2. যুক্তরাজ্যের স্থাবর সম্পত্তি কেন গোপন সম্পদকে আকৃষ্ট করে
  3. বিদেশি কোম্পানি ও ট্রাস্টের মাধ্যমে মালিকানার স্তর তৈরি
  4. এশিয়া থেকে আসা গোপন ব্যাংকিংয়ের অর্থপ্রবাহ
  5. মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের মামলায় লন্ডনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষার মুখে
  6. কোটি কোটি ডলার উদ্ধারে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও কঠিন বাস্তবতা
  7. অর্থ উদ্ধারে লন্ডন কি সহায়তা করতে পারে
  8. চীনের পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ও লন্ডনের সম্পত্তিতে ট্রাস্টের ফাঁক উন্মোচিত
  9. যুক্তরাজ্যে কী পরিবর্তন হয়েছে, আর কোথায় এখনো ঘাটতি রয়েছে
  10. নিয়মকানুনে এখনো কোথায় ঘাটতি
  11. এসব অর্থপ্রবাহ যেভাবে লন্ডনের পাড়া ও বাজারকে প্রভাবিত করে
  12. সারকথা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষকতা ও স্বজনতোষী ঋণ বিতরণের সময় দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যাপক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বড় ব্যবসায়ী পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ব্রিটেনের শত শত সম্পত্তিসহ কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদের খোঁজ করছেন তদন্তকারীরা। অন্যদিকে, সন্দেহভাজন চীনা অর্থ পাচারকারী চক্রকে ঘিরে সিঙ্গাপুরের বড় তদন্তের সূত্রে কয়েক কোটি ডলারের লন্ডন-সংযোগের তথ্য সামনে এসেছে। এসব ঘটনা দেখায়, যুক্তরাজ্য, বিশেষ করে লন্ডন, কেন আবাসন বাজার পরিচ্ছন্ন করা এবং গোপন মালিকদের অর্থ ইট-পাথরের সম্পত্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া ফাঁকগুলো বন্ধ করার জন্য ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্থাবর সম্পত্তি কেন গোপন সম্পদকে আকৃষ্ট করে

সন্দেহজনক সম্পদকে বৈধ বলে মনে হয় এমন সম্পদে রূপান্তরের চিরাচরিত উপায় হলো স্থাবর সম্পত্তি। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণত তিনটি পরিচিত ধাপ থাকে। প্রথমে সম্পত্তি কেনার মাধ্যমে অর্থ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। দ্বিতীয় ধাপে মালিকানা হস্তান্তর ও জটিল মালিকানা কাঠামোর মাধ্যমে একাধিক স্তর তৈরি হয়, যাতে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে তা আড়াল করা যায়। তৃতীয় ধাপে সম্পত্তি পুনঃঅর্থায়ন বা বিক্রির মাধ্যমে অর্থ বৈধ অর্থনীতিতে ফিরে আসে। ব্রিটিশ সম্পত্তি স্থিতিশীলতা, মর্যাদা এবং ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী চাহিদা দেয়। এ সমন্বয় বৈধ ক্রেতাদের পাশাপাশি অবৈধ আয় গোপন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের কাছেও একে আকর্ষণীয় করে তোলে।

বিদেশি কোম্পানি ও ট্রাস্টের মাধ্যমে মালিকানার স্তর তৈরি

বেনামি কোম্পানি, ট্রাস্ট ও মনোনীত ব্যক্তি কোনো ভবন বা অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত মালিক কে, তা জানা কঠিন করে তুলতে পারে। গোপনীয়তা-সুবিধাসম্পন্ন এখতিয়ারে নিবন্ধিত শেল কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন এলাকার বাড়িগুলোর মালিকানা ধরে রেখেছে। ট্রাস্ট মালিকানার আরেকটি স্তর যোগ করে। ট্রাস্টির পরিচয় প্রকাশ করা হলেও সুবিধাভোগীরা আড়ালে থাকতে পারেন। জমির মালিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য যুক্তরাজ্য একটি নিবন্ধনব্যবস্থা চালু করেছে। এতে স্বচ্ছতা বেড়েছে, তবে ট্রাস্ট এবং তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এখনো ফাঁক রয়েছে। ইউরোপীয় ও যুক্তরাজ্যের সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা সম্পত্তির বড় অংশে প্রকৃত মালিকদের আড়াল করতে বিদেশি কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বা একাধিক কোম্পানির শৃঙ্খলের মাধ্যমে মালিকানা বদল হলে তদন্তকারীদের পক্ষে অর্থের সূত্র খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়।

এশিয়া থেকে আসা গোপন ব্যাংকিংয়ের অর্থপ্রবাহ

এশিয়ার কয়েকটি অর্থনীতিতে মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও পুঁজি স্থানান্তরে বিধিনিষেধ বিদেশে অর্থ পাঠানোর অনানুষ্ঠানিক বাজারকে উসকে দেয়। চীনে ব্যক্তিদের বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বার্ষিক সীমা রয়েছে, পাশাপাশি বিনিয়োগের জন্য বিদেশে সম্পত্তি কেনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আছে। এগুলো এড়াতে গ্রাহকেরা আত্মীয়দের মধ্যে অর্থ ভাগ করে দিতে, মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার করতে বা অনানুষ্ঠানিক মূল্য স্থানান্তর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারেন; এগুলোকে প্রায়ই গোপন ব্যাংকিং বলা হয়। এ ব্যবস্থায় শনাক্তযোগ্য ব্যাংক লেনদেনের বদলে বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে হিসাব মেলানোর মাধ্যমে অর্থের মূল্য স্থানান্তর হয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি নথিভুক্ত করেছে, কীভাবে এসব নেটওয়ার্ক, কখনো ‘ফেই ছিয়ান’ বা ‘উড়ন্ত অর্থ’ নামে পরিচিত, কর ফাঁকি, প্রতারণা ও অপরাধলব্ধ অর্থের সঙ্গে যুক্ত লেনদেনের সুযোগ করে দেয়। বাণিজ্যভিত্তিক কৌশল, পাল্টা লেনদেন এবং বৈধ ব্যবসাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে অর্থের উৎস গোপন করা হতে পারে। একই নেটওয়ার্ক বৈধ অর্থও স্থানান্তর করে। ফলে আইন প্রয়োগ জটিল হয়, কারণ একই মাধ্যমে বৈধ ও অবৈধ অর্থ মিশে যেতে পারে।

এ ধরনের অর্থপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত লেনদেনে ঝুঁকির লক্ষণ চিহ্নিত করে যুক্তরাজ্যের আইন পেশাজীবীদের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সতর্কসংকেতের মধ্যে রয়েছে সম্পর্কহীন একাধিক তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ পরিশোধ, প্রতিবেদন করার সীমার ঠিক নিচে রাখা একাধিক লেনদেন এবং গ্রাহকের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিলাসবহুল কেনাকাটা। সম্পত্তি এজেন্ট, হস্তান্তর-আইনজীবী ও সলিসিটররা সবাই এ ক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছেন। তাদের অর্থের উৎস শনাক্ত করতে, ক্রেতা ও তৃতীয় পক্ষের অর্থদাতাদের মধ্যে সম্পর্ক যাচাই করতে এবং যাচাই সম্পন্ন করা না গেলে লেনদেন থামাতে হয়। ব্যর্থতার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থাকলে এবং নিয়ন্ত্রণগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ হলেই এগুলো কার্যকর হয়।

বিজ্ঞাপন

মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের মামলায় লন্ডনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষার মুখে

মালয়েশিয়ার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যুক্তরাজ্যের নথিপত্রেও পৌঁছেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রয়াত দাইম জাইনউদ্দিনের সম্পদ নিয়ে তদন্তের সূত্রে প্রায় ১৮ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। এসব সম্পদের মধ্যে আর্থিক এলাকার বাণিজ্যিক ভবন এবং কাছাকাছি অভিজাত বাড়ি রয়েছে। মাহাথিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লন্ডনভিত্তিক কথিত সম্পদ নিয়েও তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন মালয়েশিয়ার তদন্তকারীরা। তিনি কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন। এসব পদক্ষেপ কুয়ালালামপুর ও লন্ডনের মধ্যে এক ধরনের সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে মামলা চলাকালে সন্দেহজনক সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দের ক্ষমতাও তুলে ধরে।

সম্পত্তি জব্দ করা আর বাজেয়াপ্ত করা এক বিষয় নয়। তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ চলাকালে সম্পদ সংরক্ষণের জন্য জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত করার জন্য আরও উচ্চ আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। যুক্তরাজ্যে ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বা অপরাধলব্ধ সম্পদ আইনের আওতায় দেওয়ানি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হতে পারে। ‘অব্যাখ্যাত সম্পদ আদেশ’ নামে আরেকটি ব্যবস্থা রয়েছে। উচ্চমূল্যের সম্পদ কীভাবে অর্জন করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে আদালত কোনো ব্যক্তিকে নির্দেশ দিতে পারেন। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে এবং সন্দেহজনক অপরাধ বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার সঙ্গে যোগসূত্র থাকলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপে সম্পত্তিটি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এসব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও আছে। এর জন্য ব্যাপক তদন্ত, আন্তসীমান্তে সতর্কতার সঙ্গে প্রমাণ সংগ্রহ এবং অর্থের উৎস বৈধ ছিল বলে করা দাবির জবাব দেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।

কোটি কোটি ডলার উদ্ধারে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও কঠিন বাস্তবতা

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অপব্যবহৃত ব্যাংকঋণ, বাড়িয়ে দেখানো চুক্তিমূল্য এবং স্থানীয়ভাবে ‘হুন্ডি’ নামে পরিচিত অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদেশে রয়েছে বলে ধারণা করা সম্পদের তদন্ত চলছে, যেখানে যুক্তরাজ্যের সম্পত্তি বাজার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নাগরিক সমাজের সংগঠন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা বলেছেন, ব্রিটেনে শত শত কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি বিভিন্ন কোম্পানি ও মনোনীত ব্যক্তির নামে রয়েছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েকটি মামলায় চুরি যাওয়া সম্পদের একটি অংশ ফেরত আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে। ব্যাংকের ঋণপোর্টফোলিও পর্যালোচনা এবং যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগে দুবাই ও সিঙ্গাপুরের মতো কেন্দ্র হয়ে যাওয়া অর্থের সূত্র খুঁজতে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে।

তদন্তের আওতায় থাকা সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের একজন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারীরা তাঁর এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিপুল সম্পত্তির কথা বলেছেন; এর মধ্যে ব্রিটেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শত শত বাড়ি ও বাণিজ্যিক ইউনিট রয়েছে। বাংলাদেশে প্রকাশ করা সম্পদ বিবরণীতে অনেক কম সম্পদের তথ্য দেখা গেছে, যা নিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে তারা তদন্ত করবে। চৌধুরী এবং এসব তদন্তের আওতায় থাকা অন্যরা অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন এবং দাবিগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন। কথিত অর্থ স্থানান্তরের ব্যাপকতা এবং বিদেশি কাঠামোর ব্যবহার দেখায়, সম্পদ জব্দ এবং সম্ভব হলে তা পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ কেন যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চাইছে।

অর্থ উদ্ধারে লন্ডন কি সহায়তা করতে পারে

সীমান্ত পেরিয়ে সম্পদ উদ্ধারের প্রতিষ্ঠিত পথ রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের যৌথ উদ্যোগ ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ’-এ অংশ নেয়। পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির আওতায় কৌঁসুলিরা নথি চাওয়া, সম্পত্তি জব্দ করা এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের অনুরোধ করতে পারেন। অব্যাখ্যাত সম্পদ আদেশ ও দেওয়ানি পুনরুদ্ধারের মতো ব্রিটিশ ব্যবস্থাগুলো বিদেশি তদন্তে সহায়ক হতে পারে। সাফল্য নির্ভর করে বিস্তারিত আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য, শক্তিশালী মামলা-নথি এবং ব্রিটিশ আদালতের প্রমাণের মানদণ্ড পূরণে প্রস্তুতির ওপর। সতর্কতার ওপরও তা নির্ভর করে। আইন প্রয়োগকারী পেশাজীবীরা সতর্ক করেছেন, প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিরা আগাম খবর পেতে পারেন, সম্পদ সরিয়ে নিতে বা মালিকানা কাঠামো বদলাতে পারেন, ফলে অর্থ উদ্ধার আরও কঠিন হয়। আগাম নোটিশ ছাড়া জারি করা জব্দের আদেশ সম্পদ আবার সরিয়ে ফেলার আগে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি করে।

সম্পদ উদ্ধারে সময় লাগে। প্রথম জব্দের পদক্ষেপ থেকে চূড়ান্ত বাজেয়াপ্তির আদেশ পেতে কয়েক বছর পার হতে পারে। এ সময় বিদেশি তদন্তকারীদের তথ্য প্রকাশের শর্ত পূরণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অতীতের লেনদেনের নথি থাকা বা তাতে ভূমিকা রাখা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। এসব মামলায় সম্পদ বরাদ্দ করে এবং পেশাজীবী মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ম মেনে চলতে চাপ দিয়ে যুক্তরাজ্য সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষে শক্তিশালী মামলা-নথিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আগেভাগে প্রচার এড়ানো এবং ব্যাংক ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব কাজে লাগানো হলে ফল ভালো হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চীনের পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ও লন্ডনের সম্পত্তিতে ট্রাস্টের ফাঁক উন্মোচিত

সিঙ্গাপুরের একটি বড় মামলায় দেখা গেছে, চীনা নেটওয়ার্ক কীভাবে ব্রিটিশ সম্পত্তিতে সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে। প্রতারণা ও অবৈধ জুয়া থেকে পাওয়া অর্থ পাচারের সন্দেহে সেখানে চীনা বংশোদ্ভূত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নগররাষ্ট্রটিতে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীদের পর্যালোচনা করা নথিতে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের লন্ডনভিত্তিক সম্পত্তির সঙ্গে যোগসূত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে অক্সফোর্ড সার্কাসের কাছে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং ক্যানারি ওয়ার্ফের একটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। লন্ডনের একটি সম্পত্তি জার্সিতে নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমে কেনা হয়েছিল। ওই কোম্পানি ট্রাস্টির পরিচয় প্রকাশ করলেও ট্রাস্টের সুবিধাভোগীদের জনসমক্ষে আড়াল করে রেখেছিল। কাঠামোটি নিবন্ধনের নিয়ম মেনেছিল, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়ালেই ছিল। অপরাধলব্ধ অর্থের সঙ্গে যোগসূত্র প্রমাণ করতে পারলে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করার নির্দেশসহ তদন্ত চালাতে পারে যুক্তরাজ্য।

বৈধ সঞ্চয় এবং সরকারি পুঁজি নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলা অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যম মিলিয়ে বিপুল পরিমাণ চীনা অর্থ ব্রিটিশ সম্পত্তিতে আসে। গোপন ব্যাংক ও পাল্টা লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন থাকা গ্রাহকদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে প্রতারণা বা মাদক ব্যবসার মতো অবৈধ কার্যক্রম থেকে আসা নগদ অর্থের যোগ মেলানো হয়। গ্রাহকের পরিবার চীনে কোনো অনানুষ্ঠানিক ব্যাংকারের কাছে রেনমিনবি জমা দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের সহযোগী তখন লন্ডনে পাউন্ড সরবরাহ করেন, যা সম্পত্তির বায়না বা কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়। চোখে পড়ার মতো কোনো আন্তসীমান্ত অর্থ স্থানান্তর ঘটে না, ফলে ব্যাংকের নিয়ম মেনে চলা যাচাই ব্যাহত হয়। আইন প্রয়োগকারীরা এমন ঘটনার নথি রেখেছেন, যেখানে এসব নেটওয়ার্ক বিলাসবহুল পণ্যের কেনাকাটা ও শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো অর্থের পাশাপাশি অপরাধলব্ধ অর্থও স্থানান্তর করেছে। এ মিশ্রণ পরিস্থিতি বুঝতে জটিলতা তৈরি করে এবং নিরীক্ষার সূত্র ঝাপসা করে দেয়।

যুক্তরাজ্যে কী পরিবর্তন হয়েছে, আর কোথায় এখনো ঘাটতি রয়েছে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেন নিয়মকানুন কঠোর করেছে। অর্থনৈতিক অপরাধ, স্বচ্ছতা ও প্রয়োগ আইন বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে সম্পত্তির মালিক কে, তা শনাক্ত করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনব্যবস্থা তৈরি করেছে। পরবর্তী অর্থনৈতিক অপরাধ ও করপোরেট স্বচ্ছতা আইন কোম্পানি হাউসকে পরিচয় যাচাই এবং সন্দেহজনক নথি চ্যালেঞ্জ করার আরও ক্ষমতা দিয়েছে। সরকার নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক নির্দেশনাও হালনাগাদ করেছে, তথ্য আদান-প্রদান বাড়িয়েছে এবং অব্যাখ্যাত সম্পদ আদেশ জারি করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে বড় অঙ্কের খরচের দায় থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি গোপন ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ও নগদ অর্থ বহনকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। একটি বড় মামলায় বিপুল অঙ্কের ব্যাখ্যাতীত নগদ অর্থ ব্যবসায়িক হিসাবের মাধ্যমে সরানোর পর গয়না খাতের একটি নেটওয়ার্ক দোষী সাব্যস্ত হয়। আরেক মামলায় পশ্চিম লন্ডনের একটি গোষ্ঠী কয়েক কোটি পাউন্ড নগদ অর্থ দুবাইয়ে পাচার করেছে বলে প্রমাণিত হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, অর্থটি মাদক ও সংঘবদ্ধ অভিবাসন অপরাধ থেকে এসেছিল।

নিয়মকানুনে এখনো কোথায় ঘাটতি

ফাঁক রয়ে গেছে। ট্রাস্ট এখনো সুবিধাভোগীদের পরিচয় জনসমক্ষে আড়াল করতে পারে, যা মালিকানায় স্বচ্ছতা আনার উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের যাচাই ততটাই শক্তিশালী, যতটা শক্তিশালী তার পেছনের যাচাইপ্রক্রিয়া। নথি জাল করা যেতে পারে। কোম্পানি গঠনের সময় প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের আড়াল করতে নামসর্বস্ব পরিচালক ও মনোনীত ব্যক্তি রাখা হতে পারে। ইউরোপীয় গবেষকদের প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা সম্পত্তির বড় অংশে বিদেশি কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। এটি দেখায়, অস্বচ্ছতা এখনো একটি মৌলিক সমস্যা। আইন প্রয়োগের সক্ষমতাও সীমিত। একাধিক দেশে ছড়ানো লেনদেনের দীর্ঘ শৃঙ্খল খুলে দেখতে হয় সংস্থাগুলোকে। আইনজীবী ও সম্পত্তি পেশাজীবীদের নিয়ম মানার মাত্রায়ও ভিন্নতা রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিয়ম এড়িয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দিতে পারে, তবে তদন্তে সময় ও দক্ষ কর্মী লাগে। এদিকে প্রতিদিনই নতুন অর্থ আসছে।

পেশাদার মধ্যস্থতাকারীরাও সমাধানের অংশ। সম্পত্তি এজেন্ট, আইনজীবী, হিসাবরক্ষক এবং কোম্পানি সেবা প্রদানকারীদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্রাহক শনাক্ত করা এবং অর্থের উৎস বোঝার দায়িত্ব রয়েছে। উচ্চ ঝুঁকির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নির্দেশনায় বাড়তি যাচাই এবং যাচাইয়ে ব্যর্থ হলে লেনদেন বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সতর্কসংকেতের মধ্যে রয়েছে সম্পর্কহীন পক্ষের কাছ থেকে একাধিক অর্থ পরিশোধ, অসংগতিপূর্ণ ব্যাখ্যা এবং আয়ের সঙ্গে না মেলা কেনাকাটার ধরন। এসব প্রবেশপথের রক্ষকেরা ভালোভাবে প্রতিবেদন করলে সবচেয়ে সন্দেহজনক অর্থপ্রবাহের দিকে আইন প্রয়োগকারীরা নজর দিতে পারেন। এতে সৎ প্রতিষ্ঠানগুলোও অপরাধের মাধ্যম হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।

বিজ্ঞাপন

এসব অর্থপ্রবাহ যেভাবে লন্ডনের পাড়া ও বাজারকে প্রভাবিত করে

অবৈধ অর্থ নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব খোঁজে। লন্ডনের অভিজাত আবাসন বাজার দুটোই দেয়। গত দুই দশকে বেনামি নগদে কেনাকাটার ঢেউ বাজারের উচ্চপর্যায়ে দাম বাড়াতে অবদান রেখেছে এবং কিছু এলাকায় বছরের বেশির ভাগ সময় বাড়ি খালি পড়ে থেকেছে। ক্রেতারা অল্প তথ্য প্রকাশ করে সম্পত্তি কেনার প্রক্রিয়া চালাতে বিদেশি কোম্পানি, কনসিয়ার্জ সেবা ও ব্যক্তিগত ব্যাংকার ব্যবহার করেছেন। স্বচ্ছতার নিয়ম কঠোর হলে কিছু সম্পদ বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে চলে যায়, যেখানে তথ্য প্রকাশের নিয়ম ভিন্ন, অথবা পরিচিত অভিজাত এলাকাগুলোর বাইরের স্থানে সরে যায়। এর প্রভাব সর্বত্র এক রকম নয়। বিদেশি পুঁজি নতুন ভবন ও পুরোনো ভবন সংস্কারে অর্থ জুগিয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও কর রাজস্ব বাড়ায়। আবার গোপন অর্থ প্রতিযোগিতা বিকৃত করে, স্থানীয় ক্রেতাদের বাজারের বাইরে ঠেলে দেয় এবং আস্থায় আঘাত করে। দুর্নীতির সম্পদের উপস্থিতি সংশ্লিষ্টতার কারণে গোটা পাড়ার সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।

বিষয়টির প্রেক্ষাপট মনে রাখা জরুরি। অধিকাংশ বিদেশি ক্রেতাই বৈধ। অনেক এশীয় পরিবার পড়াশোনা, ব্যবসা বা স্থানান্তরের জন্য লন্ডনের বাড়িতে অর্থ বিনিয়োগ করে। বৈশ্বিক শহর হিসেবে লন্ডনের আকর্ষণ বাস্তব। তবে এ বাস্তবতা আরও কঠোর যাচাইয়ের প্রয়োজনকে নাকচ করে না। বেনামি কাঠামোর সুযোগ থাকলে সৎ ব্যক্তিদের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজরাও লাভবান হয়। পরিচ্ছন্ন অর্থের বিনিয়োগ সহজ রেখে অপরাধীদের অর্থ গোপন করা কঠিন করে তোলাই যুক্তরাজ্যের বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এ ভারসাম্য নির্ভর করে আরও শক্তিশালী যাচাই, উন্নত তথ্য, দ্রুত আন্তসীমান্ত সহযোগিতা এবং অন্যায়ের লাভ কেড়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নিয়মিত আইন প্রয়োগের ওপর।

বিজ্ঞাপন

সারকথা

  • প্রয়াত দাইম জাইনউদ্দিনের সম্পদ নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার অনুরোধে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৮ কোটি ডলারের ব্রিটিশ সম্পত্তি জব্দ করেছে।
  • সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লন্ডনের কথিত সম্পদ নিয়েও মালয়েশিয়ার তদন্ত চলছে; তিনি তা অস্বীকার করেছেন।
  • বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা কয়েক শ কোটি ডলার উদ্ধারে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে; এ পর্যালোচনায় ব্রিটেনে থাকা বিপুল সম্পত্তিও রয়েছে।
  • সন্দেহভাজন চীনা অর্থ পাচারকারী চক্রকে ঘিরে সিঙ্গাপুরের মামলায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের লন্ডনের সম্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে এবং ট্রাস্টের স্বচ্ছতায় ফাঁক উন্মোচিত হয়েছে।
  • গোপন ব্যাংকিং ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে স্তরে স্তরে মালিকানা তৈরি করে এশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজারে অর্থ আনা ও গোপন করা হয়; একই পথে বৈধ ও অবৈধ অর্থও মিশে যায়।
  • ব্রিটেনের নতুন করপোরেট স্বচ্ছতা আইন, বিদেশি মালিকদের নিবন্ধনব্যবস্থা এবং অব্যাখ্যাত সম্পদ আদেশ আইন প্রয়োগের হাতিয়ার উন্নত করেছে।
  • ট্রাস্ট, প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় যাচাই ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে, যা গোপন মালিকদের টিকে থাকার সুযোগ দেয়।
  • কার্যকরভাবে সম্পদ উদ্ধারে শক্তিশালী মামলা-নথি, লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের সতর্ক না করার মতো সতর্কতা এবং যুক্তরাজ্যের সংস্থা ও এশীয় কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক সহযোগিতা জরুরি।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে