ইয়াংজি নদীর তীরে একটি কেন্দ্রীয় হাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটিং সক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার দেশব্যাপী পরিকল্পনার কেন্দ্র হিসেবে চীন উহু শহরের ৭৬০ একরের একটি দ্বীপকে বিশাল ডেটা সেন্টার এলাকায় রূপ দিচ্ছে। প্রকল্পটি বহুলভাবে চীনের ‘স্টারগেট’ নামে পরিচিত। এতে হুয়াওয়ে, চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম ও চায়না ইউনিকমের সার্ভারগুলোকে একসূত্রে যুক্ত করা হচ্ছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্থাপনাগুলোকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে একত্র করাই এর লক্ষ্য, যাতে বিপুল পরিসরে কম্পিউটিং কাজের সময়সূচি নির্ধারণ ও সম্পদ ভাগাভাগি করা যায়। এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এআইয়ের চাহিদার দ্রুত বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে উন্নত প্রসেসরে সীমিত প্রবেশাধিকার। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৭০ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
সূচিপত্র
- ইয়াংজি নদীর তীরে একটি কেন্দ্রীয় হাব
- ৭৬০ একরের ডেটা আইল্যান্ডে কী থাকবে
- এখনই কেন এআই কম্পিউটিং কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে
- নেটওয়ার্কটি যেভাবে কাজ করবে
- পশ্চিমে প্রশিক্ষণ, উপকূলের কাছে ইনফারেন্স
- হুয়াওয়ে ইউবি মেশ ও ক্লাস্টার পর্যায়ে সময়সূচি নির্ধারণ
- ভর্তুকি ও চিপের সংকট
- কারা লাভবান হবে
- যুক্তরাষ্ট্রের স্টারগেট প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা
- বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ও নেটওয়ার্ক
- ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও পরিচালনা
- এরপর কী
- মূল বিষয়গুলো
স্থানীয়ভাবে ‘ডেটা আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত উহুর এই স্থাপনাটি সাংহাই, হাংজু ও নানজিংয়ের কাছাকাছি। এসব ঘনবসতিপূর্ণ নগরবাজারের নৈকট্য এআই ইনফারেন্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যায়ে প্রশিক্ষিত মডেল ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেয় বা কনটেন্ট তৈরি করে। দূরত্ব কম হলে বিলম্ব কমে; ফলে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, সার্চ, আর্থিক ঝুঁকি যাচাই, খুচরা বিক্রির সুপারিশ এবং নগরসেবায় সাড়া আরও দ্রুত পাওয়া যায়। অন্যান্য অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে চীন উলানচাব, গুইঝোউ ও ছিংইয়াংয়ে স্থাপনাও সম্প্রসারণ বা নতুন কাজে ব্যবহার করছে। এসব দূরবর্তী কেন্দ্রের অনেকগুলোই সস্তা জমি ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকা এলাকায় অবস্থিত। এআই উন্নয়নের সবচেয়ে বেশি কম্পিউটিং-নির্ভর ধাপ—মডেল প্রশিক্ষণে—সেগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
৭৬০ একরের ডেটা আইল্যান্ডে কী থাকবে
পরিচালকেরা এমন বিশাল হল তৈরি করছেন, যেখানে থাকবে অ্যাক্সিলারেটর, সিপিইউ, মেমোরি, স্টোরেজ এবং উচ্চগতির সুইচিং সরঞ্জাম। টেলিকম অপারেটররা এরই মধ্যে পুরো অঞ্চলে ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন ও পরিচালনা করছে। ফলে স্থাপনাটি কাছের শহর এবং দেশের অভ্যন্তরের অন্যান্য ক্লাস্টারের সঙ্গে উচ্চ সক্ষমতায় যুক্ত হতে পারবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কাজের জরুরিতা, খরচ ও সম্পদের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নেটওয়ার্কজুড়ে কম্পিউটিংয়ের কাজ সরানো যাবে। এক স্থানের অব্যবহৃত সম্পদ অন্য স্থানের কাজে লাগানো হবে। হুয়াওয়ে ইউবি মেশ প্রযুক্তির প্রচার করছে। কোম্পানিটির দাবি, এটি বহু হল এমনকি বিভিন্ন শহরের প্রসেসরকে যুক্ত করতে পারে; আর সফটওয়্যার সেগুলোকে প্রশিক্ষণ ও ইনফারেন্সের জন্য একটি অভিন্ন সম্পদভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করে।
এখনই কেন এআই কম্পিউটিং কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে
দেশের প্রতিটি চিপের ব্যবহার থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে চায় বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দূরবর্তী প্রদেশে অনেক অ্যাক্সিলারেটর অব্যবহৃত পড়ে ছিল, কারণ সেখানে স্থানীয় চাহিদা কম। অন্যদিকে, কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রয়োজন থাকা উপকূলীয় কোম্পানিগুলো সহজে ওই সম্পদ কাজে লাগাতে পারত না। দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে। ক্লাস্টারগুলোকে যুক্ত করে পরিকল্পনাকারীরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় উন্নত বিকল্প ব্যবস্থা, পুরো নেটওয়ার্কে বেশি ব্যবহার এবং এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা অন্য অঞ্চলের ক্রেতার কাছে বিক্রির সুযোগ আশা করছেন।
ভূরাজনীতিও এ উদ্যোগকে প্রভাবিত করছে। বিশ্লেষকদের হিসাব, বৈশ্বিক এআই কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারগুলো, আর চীনের হাতে রয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে চীন সবচেয়ে উন্নত এনভিডিয়া জিপিইউ পায় না; পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতাদের চীনা গ্রাহকদের জন্য এসব চিপ তৈরি করাও নিষিদ্ধ। তাই দেশের অভ্যন্তরে থাকা হার্ডওয়্যার আরও ভালোভাবে সমন্বয় করা অগ্রাধিকার পেয়েছে। দেশীয় চিপ প্রকল্পগুলো ব্যবধান কমানোর চেষ্টা চালানোর সময় কেন্দ্রীকরণই এখন হাতে থাকা নীতিগত হাতিয়ার।
নেটওয়ার্কটি যেভাবে কাজ করবে
পরিকল্পনায় এআইয়ের দুই ধরনের কাজের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ হলো সেই শ্রমসাধ্য ধাপ, যেখানে মডেলগুলো তথ্য থেকে শেখে। এতে সস্তা বিদ্যুৎ ও জমির সুবিধা পাওয়া যায় এমন দূরবর্তী স্থাপনা উপযোগী; সেখানে হাজার হাজার অ্যাক্সিলারেটরকে দিন বা সপ্তাহ ধরে চলা কাজে নিয়োজিত রাখা যায়। ইনফারেন্স হলো সাড়া দেওয়ার ধাপ, যেখানে প্রশিক্ষিত মডেল ব্যবহারকারীদের সেবা দেয়। এ কাজটি বড় শহরের ব্যবহারকারীদের কাছাকাছি নেওয়া হয়, কারণ সেখানে বিদ্যুতের সর্বনিম্ন খরচের চেয়ে গতি ও নির্ভরযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমে প্রশিক্ষণ, উপকূলের কাছে ইনফারেন্স
অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া ও গানসুর মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইতিমধ্যে ক্লাউড বা ইন্টারনেট সেবার জন্য নির্মিত বিশাল সার্ভার ফার্ম রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় এসব হলকে বড় ভাষা মডেলসহ (এলএলএম) বিভিন্ন মডেল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উচ্চ সক্ষমতার ফাইবার দিয়ে এগুলো উপকূলীয় শহরগুলোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রশিক্ষণের নির্দিষ্ট ধাপ শেষে সংরক্ষিত মডেল দ্রুত সাংহাই, হাংজু, গুয়াংজু এবং অন্যান্য বড় শহরের কাছের ইনফারেন্স ক্লাস্টারে কপি করা যাবে।
হুয়াওয়ে ইউবি মেশ ও ক্লাস্টার পর্যায়ে সময়সূচি নির্ধারণ
এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে অপারেটরদের দ্রুতগতির আন্তসংযোগ এবং হাজার হাজার প্রসেসরের কাজ সমন্বয় করতে পারে এমন সফটওয়্যার দরকার। ইউবি মেশকে এমন এক সংযোগব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বিভিন্ন কক্ষ বা স্থানে থাকা অ্যাক্সিলারেটরের মধ্যে যোগাযোগের অতিরিক্ত চাপ কমায়। বাস্তবে এর অর্থ হলো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিংয়ে ব্যবহৃত কৌশল, যেমন দূরবর্তী সরাসরি মেমোরি অ্যাক্সেস এবং সমবায় যোগাযোগের লাইব্রেরি। এগুলো বড় নিউরাল নেটওয়ার্ক প্রশিক্ষণের সময় অনেক চিপকে সমন্বিত রাখে। এই সংযোগব্যবস্থার ওপর কাজের সময়সূচি নির্ধারণকারী সফটওয়্যার কাজ বসাতে পারে যেখানে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, উপযুক্ত চিপ অব্যবহৃত রয়েছে, অথবা শেষ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সবচেয়ে কম বিলম্ব হয়।
ভর্তুকি ও চিপের সংকট
এআই চিপ কেনার বিলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে উহু। এ ধরনের স্থানীয় অনুদানে সার্ভার র্যাক পূরণের প্রাথমিক খরচ কমে, স্থাপন দ্রুত হয় এবং অপারেটররা আগেই নির্ধারিত ঘনত্বের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকা সর্বাধুনিক বিদেশি যন্ত্রাংশের সঙ্গে দেশীয় অ্যাক্সিলারেটরের ব্যবধানও কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।
হুয়াওয়ে ও ক্যামব্রিকনের মতো দেশীয় সরবরাহকারীরা অ্যাক্সিলারেটর ও কম্পাইলার সফটওয়্যারের মাধ্যমে এ ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। তবে অপারেটরদের এখনও বিভিন্ন প্রজন্মের হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ে কাজ করতে হচ্ছে, যা বিশেষত মডেলে প্যারামিটারের সংখ্যা ট্রিলিয়নে পৌঁছালে প্রশিক্ষণকে জটিল করে তুলতে পারে। এ চাপের ফলে একটি গোপন বাজার গড়ে উঠেছে। পুনর্বিক্রেতারা নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে নিষিদ্ধ এনভিডিয়া সিস্টেম সংগ্রহ করে চীনে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। উহুভিত্তিক এক মধ্যস্থতাকারী ব্ল্যাকওয়েল প্রজন্মের সার্ভারের অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বর্তমান নিয়মের অধীনে চীনে বড় পরিসরে এসব সরঞ্জাম চালানো সম্ভব, এমন ধারণা নাকচ করেছে এনভিডিয়া। কোম্পানিটির যুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, লাইসেন্স এবং সহায়তার শর্তের কারণে এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়।
কারা লাভবান হবে
নিকট ভবিষ্যতের লক্ষ্য হলো বড় শহরের ব্যবসাগুলোকে দ্রুত এআই ইনফারেন্স ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। ব্যাংকগুলো কম বিলম্বে ঝুঁকি যাচাই ও জালিয়াতি শনাক্ত করতে পারবে। খুচরা বিক্রেতারা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ হওয়া সুপারিশের মডেল চালু করতে পারবে। নগর কর্তৃপক্ষ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বন্যা পর্যবেক্ষণে কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করতে পারবে। গণমাধ্যম ও নকশাপ্রতিষ্ঠান কম দেরিতে ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে পারবে। স্টার্টআপগুলো আগাম হার্ডওয়্যার না কিনে ঘণ্টা হিসেবে কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাড়া নিতে পারবে। দেশের অভ্যন্তরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে উপকূলের ইনফারেন্স ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করে নেটওয়ার্কটি পরীক্ষামূলক কাজ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম—দুইয়েরই চাহিদা মেটাতে চায়।
সংযোগ দেওয়ার বাইরেও টেলিকম অপারেটরদের ভূমিকা বাড়বে। তাদের ডেটা সেন্টারগুলো এআই যুগের প্রধান গ্রাহক হয়ে উঠবে; ক্লাউড গ্রাহকদের কাছে কম্পিউটিং ও স্টোরেজ বিক্রির পাশাপাশি তারা আন্তঃনগর ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করবে, যা মডেলগুলোকে সমন্বিত রাখবে। স্থানীয় সরকারের জন্য এ নির্মাণকাজে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এমন ডিজিটাল সেবার ভিত্তি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, যা ওই অঞ্চলে নতুন প্রযুক্তি ব্যবসা গড়ে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টারগেট প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা
চীন যখন পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা নেটওয়ার্কে বহু বিদ্যমান হলকে একত্র করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ‘স্টারগেট’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি বিশাল নতুন ক্যাম্পাস গড়ে তুলছে। বিনিয়োগকারী ও অপারেটররা সারা দেশে সর্বোচ্চ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছেন। রূপরেখায় প্রায় ৭ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, যা প্রায় সাতটি বড় পারমাণবিক চুল্লির উৎপাদনের সমান। টেক্সাসের অ্যাবিলিনে একটি প্রধান ক্যাম্পাসে ৪ লাখের বেশি জিপিইউ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অংশীদারদের ভাষ্য, নির্মাণকাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সেখানে প্রায় ২৫ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান হবে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ভবিষ্যৎ এআইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে তা চালানোর হার্ডওয়্যারের সম্পর্ক তুলে ধরে বিষয়টির গুরুত্ব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। অংশীদারদের সঙ্গে নতুন স্থাপনার ঘোষণা দেওয়ার আগে, এর জন্য যে বিশাল পরিসরের সক্ষমতা দরকার—তা তিনি স্পষ্ট করে বলেন।
প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং শক্তি তৈরি করা হলেই কেবল এআই তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে।
দুই কৌশলের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এক ছাদের নিচে কয়েক লাখ অ্যাক্সিলারেটর নিয়ে বিশাল নতুন ক্যাম্পাস গড়ার ওপর বাজি ধরছে। চীন পুরোনো ও নতুন বহু ক্লাস্টারকে একসূত্রে গেঁথে সময়সূচি নির্ধারণের সফটওয়্যার ও নতুন আন্তসংযোগের মাধ্যমে সেগুলোকে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার মতো চালাতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের পদ্ধতিতে কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ, জমি ও পানির সীমা কতদূর ঠেলা যায়, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। চীনের পরিকল্পনায় ঝুঁকি ও খরচ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তবে অনেকগুলো স্থানকে একটি ব্যবস্থা হিসেবে চালানোর অতিরিক্ত জটিলতা মেনে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ও নেটওয়ার্ক
আধুনিক এআই ক্লাস্টার বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে, যা সার্বক্ষণিক অপসারণ করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও চালু থাকে, সে জন্য উহুর দ্বীপের স্থাপনায় নতুন সাবস্টেশন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও বিকল্প সক্ষমতা লাগবে। পুরোনো সার্ভার কক্ষে প্রচলিত বাতাসনির্ভর শীতলীকরণের বদলে বেশির ভাগ প্রশিক্ষণ হল চিপ ও মেমোরি থেকে সরাসরি তাপ সরাতে তরল শীতলীকরণ ব্যবহার করে। অপারেটররা কাছাকাছি পানির উৎস বা পানি উত্তোলন কমায় এমন বদ্ধ-চক্র ব্যবস্থা খুঁজবেন এবং র্যাক পর্যায়ে আরও দক্ষতা বাড়াতে সরবরাহকারীদের চাপ দেবেন।
নেটওয়ার্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দূরবর্তী প্রশিক্ষণ ফার্মকে উপকূলের ইনফারেন্স ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করতে বহু টেরাবিট সক্ষমতার ফাইবার পথ, শত শত কিলোমিটার দূরে তথ্য পাঠাতে পারে এমন অপটিক্যাল ট্রান্সপন্ডার এবং ডেটা সেন্টারের ভেতরে পূর্ব-পশ্চিমমুখী তথ্যপ্রবাহে বাধা ঠেকাতে সক্ষম সুইচ দরকার। দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক থাকা অপারেটররা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। তারা বিকল্প পথের ব্যবস্থা করতে পারে এবং নেটওয়ার্ক ট্রাফিকের প্রবাহ পরিচালনা করতে পারে, যাতে রক্ষণাবেক্ষণ বা বৈরী আবহাওয়ার সময়ও মডেল হালনাগাদ ও প্রশিক্ষণের নির্দিষ্ট ধাপ শেষে সংরক্ষিত তথ্য সময়মতো পৌঁছায়।
ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও পরিচালনা
কেন্দ্রীকরণে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ে, তবে ঝুঁকিও কেন্দ্রীভূত হয়। নেটওয়ার্কের সক্ষমতার অত্যধিক অংশ যদি কয়েকটি করিডরের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বিভ্রাট বা সাইবার হামলা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিকল্পনাকারীদের ভাষ্য, অনেকগুলো স্থানকে যুক্ত করা এবং বিকল্প পথে সংযোগের ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে এ ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা দলগুলোকে মডেলের ওজন, গ্রাহকের তথ্য এবং কাজের সময়সূচি নির্ধারণের স্তর সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিপুল কম্পিউটিং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ওই স্তরটি আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।
বাস্তব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নতুন করে একটি ক্যাম্পাসে একই প্রজন্মের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি ব্যবস্থার তুলনায় অনেকগুলো ছোট বা পুরোনো হল ব্যবহার করলে প্রশিক্ষণের দক্ষতা কমতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি ও গ্রিডের স্থিতিশীলতাকে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে হবে। কৃষিজমির রূপান্তরসহ ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত বোধ করলে বা খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে প্রশ্ন উঠতে পারে। ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত প্রভাব ও গ্রিড পরিকল্পনা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকলে জনসমর্থন গড়ে উঠবে।
এরপর কী
এখন উহুর প্রথম দফার হল সম্প্রসারণ, সেগুলোকে দেশের অভ্যন্তরের প্রশিক্ষণ ফার্মের সঙ্গে যুক্ত করা এবং বিভিন্ন স্থানে কাজের সময়সূচি নির্ধারণকারী সফটওয়্যারকে আরও নির্ভরযোগ্য করার কাজ চলছে। প্রথম দিকের গ্রাহকদের কম্পিউটিং সক্ষমতার অঙ্গীকারে উৎসাহিত করতে স্থানীয় সরকারগুলো ভর্তুকির সময়সীমার সঙ্গে ক্রয়চক্র মিলিয়ে নিচ্ছে। টেলিকম অপারেটররা নতুন ফাইবার পথ চালু ও মূল নেটওয়ার্ক উন্নত করছে, যাতে প্রশিক্ষণ থেকে উপকূলীয় শহরের কাছের ইনফারেন্স ক্লাস্টারে মডেলের নির্দিষ্ট ধাপ শেষে সংরক্ষিত তথ্য দ্রুত পাঠানো যায়।
প্রকৌশলীরা তিনটি বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। প্রথমত, একাধিক হলজুড়ে বিস্তৃত হলে ইউবি মেশ ও এ ধরনের অন্যান্য সংযোগব্যবস্থা প্রতিশ্রুত সুবিধা দিতে পারে কি না। দ্বিতীয়ত, দেশীয় অ্যাক্সিলারেটর, কম্পাইলার ও ফ্রেমওয়ার্ক গ্রহণযোগ্য দক্ষতায় সর্বাধুনিক মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা করতে পারে কি না। তৃতীয়ত, র্যাকের ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণের সরবরাহ তাল মিলিয়ে চলতে পারে কি না, যাতে বিদ্যুৎ-স্বল্পতা বা পানির সংকট না হয়। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক কত দ্রুত বিস্তৃত হবে এবং সারা দেশে এআই সেবার প্রবৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখবে।
মূল বিষয়গুলো
- চীন উহুর ৭৬০ একরের ডেটা আইল্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে একটি কেন্দ্রীভূত এআই কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক গড়ছে।
- প্রশিক্ষণ ও ইনফারেন্সের কাজ ভাগ করে নিতে নেটওয়ার্কটি উহুর স্থাপনাগুলোকে উলানচাব, গুইঝোউ ও ছিংইয়াংয়ের মতো স্থানের অভ্যন্তরীণ ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত করবে।
- হুয়াওয়ে, চায়না মোবাইল, চায়না টেলিকম ও চায়না ইউনিকম প্রধান অপারেটর; ক্লাস্টারগুলোর মধ্যে সংযোগের জন্য হুয়াওয়ে ইউবি মেশের প্রচার করছে।
- উন্নত বিদেশি জিপিইউর ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও স্থাপন দ্রুত করতে উহু এআই চিপ কেনার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে।
- বিদ্যমান অ্যাক্সিলারেটরগুলোর ব্যবহার বাড়ানো এবং সমন্বিত সময়সূচি নির্ধারণব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বৃত্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা বিক্রি করতে চায় চীন।
- বিশ্লেষকদের হিসাব, বৈশ্বিক এআই কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, আর চীনের হাতে প্রায় ১৫ শতাংশ।
- যুক্তরাষ্ট্রের স্টারগেট কর্মসূচির লক্ষ্য প্রায় ৭ গিগাওয়াট সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়। এর মধ্যে টেক্সাসের একটি ক্যাম্পাসে ৪ লাখ জিপিইউ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
- ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের ভাষ্য, এআইকে প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম করতে পর্যাপ্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
- কেন্দ্রীকরণের ফলে উপকূলের বড় শহরগুলোর ব্যবহারকারীরা কম বিলম্বে সেবা পাবেন এবং যুক্ত অনেকগুলো স্থানের মধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে।
- প্রধান চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণের সরবরাহ, সাইবার নিরাপত্তা, বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন হার্ডওয়্যার এবং জমি ও পানির ব্যবহার নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগ।






